📄 পঁচিশ জন ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
"অতএব তোমর রবের কসম, তারা ঈমানদার হতে পারবেনা যতক্ষণ না তাদের বিবাদপূর্ন বিষয়ে তোমাকে ন্যায় বিচারক হিসেবে মেনে নিবে। অতঃপর তোমার ফয়সালার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো রকম সংকীর্ণতা থাকতে পারবেনা বরং সন্তুষ্ট চিত্তে তা গ্রহণ করে নিবে।" (আন্ নিসা : ৬৫)
১। ইমাম উবনু হাযম (রহঃ) এ আয়াত প্রসংগে বলেনঃ যে ব্যক্তি বুদ্ধিমান, সাবধানী, আল্লাহর প্রতি এবং কেয়ামতের প্রতি বিশ্বাসী, এবং এ আয়াত যে আল্লাহ তায়ালা ও বান্দার মধ্যে একটি চুক্তি তা দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করে সে ব্যক্তির পক্ষে নিজেকে অনুসন্ধান এবং পরখ করার জন্য এ আয়াতই যথেষ্ট। সে নিজেকে পরখ করতে গিয়ে যদি দেখতে পায় যে, রাসূল (সঃ) তাঁর যে সব খবর [অহী] পৌঁছেছে সে ক্ষেত্রে তিনি সঠিক ফয়সালা দিয়েছেন, অথবা সে যদি নিজের অন্তরকে দেখতে পায় যে, রাসূল (সঃ) কর্তৃক আনীত বিষয় বা তাঁর ফয়সালা তার কাছে গ্রহণ যোগ্য নয় বরং অন্য কোনো ব্যক্তির কথা ও ফয়সালার প্রতি তাঁর আগ্রহ ও ঝোক প্রবনতা রয়েছে; অথবা তার নিজস্ব "কিয়াস" এবং নিজস্ব বিচার বুদ্ধিতে উত্তম, এর দিকে তার ঝোক রয়েছে অথবা নিজেকে দেখতে পেলো যে, বিবাদকৃত বিষয়টির বিচার-ফয়সালা আল্লাহর রাসূলকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে চাওয়া হয়েছে, তাহলে প্রথমোক্ত অবস্থা ছাড়া সকল অবস্থাতেই তাকে জানা উচিত যে, আল্লাহ তায়ালার কসম ও হক কথা অনুযায়ী সে মুমিন নয়। আর যদি সে মুমিনই না হয়, তাহলে সে কাফের। এখানে তৃতীয় কোন শ্রেণীর অবকাশ নেই। (আহকাম ফী উসুলিল আহকাম ৯৭/১ পৃঃ)
পূর্বোক্ত আয়াতের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন: আল্লাহ তায়ালার উদ্ধৃত আয়াতে তিনি নিজের কসম দিয়ে বলেছেন; কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবেনা যতক্ষণ সে রাসূল (সঃ) কর্তৃক আনীত সকল বিষয়ে অন্তর দিয়ে নিঃসঙ্ক চিত্তে তাঁর ফয়সালা মেনে না নিবে।
অতএব আন্তরিক ভাবে [রাসূল (সঃ) এর] ফয়সালা মেনে নেয়া ব্যতীত ঈমান শুদ্ধ হবেনা এটাই সঠিক কথা, আল্লাহ ও রাসূলের ফয়সালা নিঃসঙ্ক' চিত্তে মেনে নেয়ার ঈমান হলো প্রকৃত ঈমান। এ ধরনের ঈমান যার নেই তার ঈমানের কোনো মূল্য নেই। (আলফাসলু ফি মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নহল ৭৩৫/৩পৃঃ)
তিনি আরো বলেন: আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সঃ) এর ফয়সালা মেনে নেয়াকে ঈমান নাম দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেন যে, আল্লাহর রাসুল যা ফয়সালা দিয়েছেন তাতে অন্তরে কোনো দ্বিধা সংকোচ থাকতে পারবে না, এরকম না হলে ঈমানের কোনো মূল্য নেই তাতে। অতএব এটা সত্য বলে প্রমাণিত হলো, আমল, চুক্তি এবং কথার সমন্বিত নামই হচ্ছে ঈমান। কেননা বিচার ফয়সালা হচ্ছে আমল, যা কথা ছাড়া সম্ভব নয়, আর এটা নিঃসঙ্ক চিত্তের সাথে হওয়া চাই, আর এটাই হচ্ছে চুক্তি।
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدًى وَيَتَّبِعُ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنَصْلِهِ جَهَنَّمَ ، وَسَاءَتْ مَصِيرًا -
"যে ব্যক্তি রাসূলের বিরুদ্ধাচরন করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং মুসলমানদের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফিরাবো, যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। আর জাহান্নাম হচ্ছে নিকৃষ্টতর গন্তব্য স্থান।" (আন্ নিসাঃ ১১৫)
এ আয়াত প্রসংগে তিনি আরো বলেন:
আবু মুহাম্মদ বলেছেন: যারা এ রকম করবে, এ আয়াত তাদের প্রতি কুফরী আরোপের প্রমাণ। যদি কেউ একথা বলে যে, যে ব্যক্তি মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরন করে, সে ব্যক্তি মুমিনদের অন্তর্ভূক্ত নয়। তখন বলবো, যে ব্যক্তি মুমিনদের পথ অনুসরণ না করে ভিন্ন পথ অনুসরণ করে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই কাফের নয়। কারণ জ্বিনা-ব্যভিচার, মদ্যপান, অন্যায় ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষন মুমিনদের পথ নয়, আমরা জানি উপরোক্ত পাপের পথ যারা অনুসরণ করে তারা অবশ্যই মুমিনদের পথ অনুসরণ করেনা। এতদসত্ত্বেও তারা কাফের নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার এ বাণী।
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فَي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে বিবাদপূর্ণ বিষয়ে আপনাকে ন্যায়বিচারক মেনে নিবে। অতঃপর আপনার ফয়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কোনো রকম সংকোচ থাকবেনা বরং সন্তুষ্ট চিত্তে তা গ্রহণ করবে। (আন্ নিসা: ৬৫)
আবু মুহাম্মদ আরো বলেন: এটি এমন একটি উদ্ধৃতি [বা আয়াত যা ব্যাখ্যার (ঘুরানোর) কোনো অবকাশ নেই এবং এমন কোনো উদ্ধৃতি (আয়াত ও) আসেনি না যা দ্বারা এর বাহ্যিক সাধারণ বক্তব্য ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করা যায়, আর এমন প্রমাণও আসেনি যার দ্বারা এর বক্তব্যকে ঈমানের কতিপয় দিককে খাস (বিশেষিত) করা যায়, (অর্থাৎ উপরোক্ত আয়াত যারা রাসূল (সঃ) এর বিচার-ফয়সালা যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে মেনে নেবেনা সে মুমিন নয় বরং কাফের “ এ বক্তব্যকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার কোনো অবকাশ নেই এবং কোনো দলীল, প্রমাণও নেই।
২। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেনঃ
কাফেরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যে ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা আহলে কিতাব ও মুনাফিকদেরকে দোষারোপ করেছেন) এর মধ্যে কুফরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত লোকদের মতাদর্শের প্রতি ঈমান আনায়ন করা কিংবা আল্লাহর কিতাব বাদ দিয়ে, তাদের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত। [অর্থাৎ কাফেরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা আর কুফরী মতাদার্শের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।] আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَبِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبَتِ وَالطَّاغُوتِ
"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, যারা মান্য করে প্রতিমা ও তাগুতকে।" (আন্ নিসা: ৫১)
'কাফেরদেরকে সাহায্যকারী ও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার অন্তর্ভূক্ত' একথার দ্বারা তিনি একথাই বলেছেন যে, কাফেরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে বড় কুফরী। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ -
"তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (আল-মায়েদা : ৫১
তিনি দুই শ্রেণীর লোকের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম শ্রেণীর লোকজন হচ্ছে, আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদী এবং নাসারা। দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা হচ্ছে, সেই সব মুনাফিক যারা কুফরীকে অন্তরে লুকিয়ে রাখে আর ইসলামকে প্রকাশ করে। এরপর আরো দুটি বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন যে, আহলে কিতাবের কুফরীর প্রতি বিন্দুমাত্র ঈমান আনা অথবা আল্লাহর কিতাব ছাড়া বিচার-ফয়সালা চাওয়া মূলতঃ কাফেরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করারই নামান্তর। "অথবা তাদের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া" এ কথা টুকুর প্রতি একটু লক্ষ্য করুন; 'অথবা' শব্দটিকে এখানে কিভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে, 'অথবা' শব্দটিকে মূলতঃ দুটি বিষয়ের যেকোনো একটিকে বাছাই করে নেয়ার অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে উভয় বিষয়ই (আহলে কিতাবের কিছু কুফরী মতাদার্শের প্রতি ঈমান আনা, আর আল্লাহর কিতাব বাদ দিয়ে তাদের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া।) আল্লাহকে অস্বীকার করার অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর খেয়াল করে দেখুন কিভাবে তিনি উভয় বিষয়ের জন্যই
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتُبِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ
"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে যারা মেনে চলে প্রতিমা ও তাগুতকে।" (আনিসা: ৫১)
আয়াতটিকে প্রমান হিসেবে পেশ করেছেন। তিনি আরো বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ -
"তিনি সমস্ত আসমানী গ্রন্থের প্রতি ঈমানের দাবীদার ব্যক্তিদের দোষারোপ করেছেন। কারণ তারা কি তাঁর কিতাব ও সুন্নাহ (কুরআন ও হাদীস) কে বাদ দিয়ে বড় বড় তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চায়। যেমনটি ঘটে থাকে ইসলামের বহু দাবীদার ব্যক্তিদের বেলায়। তারা বিচার-ফয়সালা চাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্নিপূজারী দার্শনিকদের প্রবন্ধ অথবা ইসলাম পরিত্যাগকারী তুরস্কের রাজা-বাদশাদের নীতি গ্রহণ করে। (মাজমুউল ফাতোয়া ৩৩৯/১৭)
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ، وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ -
"যখন মুমিনদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য তাদেরকে আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের দিকে আহবান করা হয়, তখন তারা একথাই বলে: আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম মূলতঃ তারাই সফল কাম।" (আন নূরঃ ৫১)
এ আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি আরো বলেনঃ আল্লাহ তায়ালা বর্নণা করেছেন, যে ব্যক্তি রাসূল (সঃ) এর আনুগত্য করে না, আর হুকুম ও বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে মুনাফিক, মুমিন নয়। মুমিন তো তারাই, যারা বলে: 'আমরা শ্রবন করি এবং আনুগত্য করি।'
কেবলমাত্র আল্লাহর হুকুম ও বিধান থেকে বিমুখ হওয়া আর গাইরুল্লাহর কাছে বিচার-ফয়সালার বাসনা ও ইচ্ছাই যদি মুনাফিকীর প্রমাণ আর ঈমান চলে যাওয়ার কারণ হয়, তাহলে এর অর্থ হচ্ছে কুরআন ও হাদীসকে নির্ভেজালভাবে পরিত্যাগ করা। এ পরিত্যাগ কখনো প্রবল কামনা ও বাসনা শক্তির কারণেও হতে পারে। আর যদি সেটা হয় ত্রুটি'ও গালিগালাজ কিংবা অন্য কোনো কারণে, তাহলে [পরিণতিটা কেমন হবে] এখানে মুনাফিকীর দ্বারা সে জঘণ্য মোনাফিকীই বুঝানো হয়েছে যা মুসলিম মিল্লাত থেকে মুনাফিককে বের করে দেয়। এর প্রমাণ হচ্ছে كيف بالنقص والسب ونحو ইত্যাদির কারণে হয়, তাহলে ফলাফল কেমন হবে? যদিও এখানে প্রতিয়মান হচ্ছে যে, রাসুল (সঃ)-এর হুকুম [বিধান] থেকে ফিরে থাকা আর গাইরুল্লাহর কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া কুফরী আমল এবং চরম মুনাফিকী নয়, তারপরও বিষয়টিকে গালিগালাজের মুকাবেলায় রাখা হয়নি [তুলনা করা হয়নি] এবং এর ওপর কিয়াস ও করা হয়নি। বরং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সঃ) গালিগালাজ করে সে ঐ ব্যক্তির চেয়ে জঘণ্য কুফরী করে, যে তাগুতের কাছে বিচার ফয়সালা নিয়ে যায়। লেখকের উপরোক্ত كيف بالنقص والسب ونحوه কথার মধ্যে এটাই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ উভয় বিষয়টাই আল্লাহকে অস্বীকার করার অন্তর্ভুক্ত, তবে কুফরীর দিক থেকে [আল্লাহ ও রাসূলকে] গালিগালাজ করা অধিকতর জঘণ্য কাজ।
লক্ষ্য করুন, লেখক বলেছেন : 'এর অর্থ হচ্ছে কুরআন হাদীসকে নির্ভেজাল ভাবে পরিত্যাগ করা' এ পরিত্যাগ কখনো প্রবল কামনা ও বাসনা শক্তির কারণে হতে পারে। এখানে কুফরীর কারণ 'অস্বীকার করা কিংবা হারামকে হালাল মনে করা, বলা হয়নি! বরং রাসূল (সঃ) এর ফয়সালা না মানা এবং বিচার-ফয়সালা তাগুতের নিকট চাওয়ার মাধ্যমে নির্ভেজাল পরিত্যাগ আর কুপ্রবৃত্তির অনুসরণকেই কুফরীর কারণ বলা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন : আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : وَ لَوْ كَانُوْا يُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَ النَّبِيِّ وَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوْهُمْ أَوْلِيَاءَ - "যদি তারা আল্লাহর প্রতি, নবীর প্রতি এবং তাঁর প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে তার প্রতি ঈমান থাকতো, তাহলে তারা তাদেরকে ইহুদি, নাসারাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতো না।" فَلَا وَ رَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ - "অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যে বিবাদপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালার ব্যাপারে আপনাকে ন্যায় বিচারক হিসেবে মেনে নেয়।" আল্লাহ তায়ালা উক্ত বিষয়গুলোকে ঈমান ঠিক থাকার শর্ত করে দিয়েছেন। অতএব প্রমাণিত হলো যে, ঈমান হলো সেই শর্তগুলো সম্পর্কে জানা, যেগুলো পূরণ হওয়া ব্যতীত ঈমানকে ঈমান হিসেবে গণ্য হবে না। (মাজমুউল ফাতাওয়া ১৫/৭পৃঃ)
তিনি আরো বলেন : সেই আনছারীর কথাও কুফরী বা ঈমানহীনতার শামিল যে, কালো কন্টকাকীর্ণ ভূমির উপর দিয়ে চলে যাওয়া খালের পানি ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয়ে যুবাইর (রাঃ) এর বিরুদ্ধে রাসূল (সঃ) এর কাছে নালিশ করার পর বিচারের ফয়সালা হিসেবে তিনি যুবাইরকে লক্ষ্য করে বললেন, হে যুবাইর, তোমার জমিতে পানি দেয়ার পর তোমার প্রতিবেশীর জন্য পানি ছেড়ে দাও। এ ফয়সালায় সন্তুষ্ট হতে না পেরে আনসারী বলেছিলো : সে [যুবাইর] নবীর ফুফাত / খালত ভাইতো, এ জন্যেই কি তার পক্ষে রায় দিয়েছেন? [অর্থাৎ নবীর ফয়সালায় আমি সন্তুষ্ট নই।]
সেই ব্যক্তির কথাও কুফরীর শামিল, রাসূল (সঃ) এর ফয়সালা যার বিপক্ষে হওয়ার পর বলেছিলো : আমি [এ বিচারে] রাজী নই। সে তখন [তার মতে] সুবিচার পাওয়ার জন্য প্রথমে হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং পরে হযরত ওমর (রাঃ) এর কাছে গিয়েছিলো। কিন্তু হযরত ওমর (রাঃ) লোকটিকে রাসূল (সঃ) এর ফয়সালা না মানার কারণে হত্যা করেছিলেন। পরিশেষে তিনি বলেন, এ অধ্যায়ের সম্পূর্ণ বক্তব্য ছিলো যা দ্বারা হত্যা ওয়াজিব বলে প্রমাণিত হয় এবং যা দ্বারা ব্যক্তি কাফের মুনাফিক প্রমাণিত হয় ও হত্যা বৈধ বলে গণ্য হয়। রাসুল (সঃ) এর ফয়সালা অমান্যকারীকে কাফের বলার বিষয়টি লক্ষ্য করে দেখুন। এক্ষেত্রে তিনি হযরত ওমর (রাঃ) এর ঘটনায় উল্লেখ করেছেন। এ ঘটনায় হযরত ওমর (রাঃ) ঐ মুনাফিক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন, যে রাসূল (সঃ) এর ফয়সালায় সন্তুষ্ট ছিলোনা। যে ব্যক্তি রাসূল (সঃ) এর ফয়সালায় সন্তুষ্ট নয়, তার ব্যাপারেই যদি হত্যার মতো কাজটি বৈধ হয়, (কাফের গণ্য হওয়ার কারণে) তাহলে যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানকে প্রত্যাখ্যান করলো আর বিচার ফয়সালা চাইলো গাইরুল্লাহ অর্থাৎ তাগুতের কাছে তার পরিণতি কি হতে পারে।
তিনি আরো বলেন: হযরত ওমর (রাঃ) এর বিষয়টি উল্লেখ করেছি যে, তিনি ঐ লোকটিকে হত্যা করেছেন, যে রাসূল (সঃ) এর ফয়সালা বা বিচারে অসন্তুষ্ট ছিলো। পরবর্তিতে হযরত ওমর (রাঃ) এর পক্ষেই কুরআন এর আয়াত নাযিল হয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি রাসূল (সঃ) এর বিচার-ফয়সালা (বিধান) কে গালি দেয়, আক্রমণ করে, তাহলে তার পরিণতি কি হতে পারে? এখানে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর কথার অর্থ হচ্ছে, যে রাসূল (সঃ) এর বিচার-ফয়সালায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি সে কুফরী করেছে। অতএব যে ব্যক্তি তার ফয়সালা বা বিধানকে আঘাত করে সে নিঃসন্দেহে কুফরী করে। যে ব্যক্তি রাসূল (সঃ) কে বিচার ফয়সালাকারী হিসেবে মেনে নেয় না সে ব্যক্তি কাফের এটাই তাঁর সুস্পষ্ট বক্তব্য।
৩। ইমাম ইবনুল, কায়্যিম বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) ছাড়া অন্য কারো কাছে তার বিবাদীর বিচার ফয়সালা চাইলো, সে মূলতঃ তাগুতের কাছেই বিচার চাইলো। অথচ তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য তাকে নিদের্শ দেয়া হয়েছে। বান্দা তাগুতকে অস্বীকার করতে পারবে না যতক্ষণ না সে সমস্ত বিধানকে একমাত্র আল্লাহর জন্য যেমনটি নির্ধারিত ঠিক তেমনটিই সাব্যস্ত করে। বান্দাহ তাগুতকে অস্বীকার করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সমস্ত বিধানকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই সাব্যস্ত করবে। এখানে একথা বলা হয়নি, যতক্ষণনা সমস্ত বিধানের মালিক একমাত্র আল্লাহ বলে বিশ্বাস করবে। তাঁর বক্তব্যের শুরুতে ومن تحاكم خصمه
যে ব্যক্তি তার বিবাদীর বিচার-ফয়সালা চায় " এ কথার দ্বারা এটা সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিয়মান হয় যে, বিচার-ফয়সালা চাওয়া একটি কর্ম, যা বিবদমান দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘটিত হয়। অতএব حتى يجعل الحكم الله وحده এর অর্থ হবে যতক্ষণ না তার বিবাদীর ফয়সালা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নত মোতাবেক চাওয়া হবে। যদি কুরআন ও সুন্নাহ ব্যতীত যদি বিচার-ফয়সালা চায় তাহলে সমস্ত বিধান দানের বিষয়টি একমাত্র আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা হয় না। অতএব সে তাগুতকেও অস্বীকার করলো না। আর যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করলো না, তার ইসলামও শুদ্ধ হলো না। অথচ তাগুতকে অস্বীকার করা, তাওহীদের এমন একটি রুকন অপরিহার্য মৌলিক স্তম্ভ যার মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহর প্রতি ঈমান আনায়নসহ একজন বান্দা মুসলমানে পরিণত হয়। فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ، ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا.
"যদি তোমরা কোনো বিষয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হও, তাহলে তা মীমাংসার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যার্পণ করো। যদি তোমরা আল্লাহর ও কিয়ামতের প্রতি ঈমান এনে থাকো। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক থেকে উত্তম।" (আন নিসা : ৫৯)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন দ্বীনের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে যাবতীয় বিতর্কিত বিষয়ের মীমাংসা বা ফয়সালা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) ন্যস্ত করা ওয়াজিব (অপরিহার্য কর্তব্য)। আল্লাহ ও রাসুল ছাড়া অন্য কারো কাছে নয়। যে ব্যক্তিই বিতর্কিত বিষয়ের জন্য আল্লাহ ও রাসূল (সঃ) ব্যতীত অন্যের কাছে ন্যস্ত করে সে আল্লাহর নিদের্শের বিরোধিতা করে। আর যে ব্যক্তি বিতর্কিত বিষয়ের মীমাংসার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) বিধান ব্যতীত অন্য কিছুর দিকে আহবান জানায় সে মূলতঃ জাহিলিয়াতের দিকেই আহবান জানায়। অতএব যতক্ষণ পর্যন্ত সে বিতর্কিত ও বিবাদপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) ওপর ন্যস্ত না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে ইসলামে প্রবেশ করতে পারবে না। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ - "যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের (কিয়ামাত) প্রতি ঈমানদার হয়ে থাকো",
এটা ইতিপূর্বে আলোচিত বিষয় অর্থাৎ এটা একটি শর্ত যা না পাওয়া না গেলে শর্তকৃত জিনিস ও পাওয়া যায় না। অতএব প্রমাণিত হলো যে, যে ব্যক্তি বিবাদকৃত বা বিতর্কিত বিষয়ের ফয়সালার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বিচারক মানে সে আল্লাহর প্রতি, কেয়ামতের দিবসের প্রতি, ঈমানের অপরিহার্যদাবী থেকে সরে গিয়েছে। এ আয়াতটি বর্ণনা ও ভুল নিরসনের দিক থেকে আপনার জন্য যথেষ্ট। আয়াতটি এক দিক থেকে হেফাজতকারী অপর দিক থেকে ধ্বংসকারী। কেননা এ আয়াত ঈমান ও তাওহীদের বিরোধিতাকারীকে [জ্ঞানহীন বাতিল যুক্তি তর্কের অপনোদনের মাধ্যমে) ধ্বংস করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধি নিষেধগুলোকে কার্যকর করার মাধ্যমে এ আয়াতকে আঁকড়ে ধরবে তাকে এ আয়াত গোমরাহী থেকে রক্ষা করবে। (আররিসালাতু বুকিয়া লিইবনি কাইয়্যেম জাওয়াজি ১৩৩পৃঃ)
তিনি আরো বলেন: অতঃপর আল্লাহ তায়ালা ঐ সব ব্যক্তিদের অবস্থা সম্পর্কে খবর দিয়েছেন, যারা রাসূল (সঃ) কর্তৃক আনীত জিনিস (কুরআন ও সুন্নাহ) ব্যতীত অন্য কিছুর কাছে বিচার-ফয়সালা চায়।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنْفِقِينَ - "যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা আল্লাহর নির্দেশিত দিকে এসো, যা তিনি রাসূলের প্রতি নাজিল করেছেন, তখন আপনি মোনাফিকদেরকে দেখবেন, তারা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে।" (আননিসা: ৬১)
এখানে আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সঃ) কর্তৃক আনীত জিনিস তথা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া এবং ভিন্ন দিকে আকৃষ্ট হওয়াকে মুনাফিকির স্বরূপ বলে সাব্যস্ত করেছেন। ঠিক যেমনি ভাবে রাসূলের (সঃ) বিধানকে যখনই বিচার ফয়সালা করা হয় তখনই নিঃসঙ্ক চিত্তে তা গ্রহণ করা এবং মুহাব্বত ও ভালবাসার সাথে তা গ্রহণ করাকে ঈমানের মূল বলে অভিহিত করেছেন। আল্লাহর ও রাসূলের (সঃ) ফয়সালা স্বতঃস্ফুর্ত ও দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেয়াই ঈমানের স্বরূপ, আর তা প্রত্যাখ্যান করাই হচ্ছে মুনাফিকির আসল রূপ। (মুখতাছার সাওয়ায়েকে মুরসাল)
তাঁর কথা লক্ষ্য করুন, তিনি বলেছেন : আল্লাহ তা'আলা রাসূল (সঃ) কর্তৃক আনীত জিনিস তথা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া এবং ভিন্ন দিকে আকৃষ্ট হওয়াকে মুনাফিকির স্বরূপ বলে সাব্যস্ত করেছেন " এখানে মুনাফিকির স্বরূপ কথার দ্বারা নেফাকে আকবর [জঘন্য মুনাফিকি] বুঝানো হয়েছে" শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন : কুফরীর কোনো শাখার কার্য সম্পাদনকারী যতক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত কুফরী (যে কুফরী কাজে কোনো সন্দেহ) কর্ম সম্পাদন না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত নিরঙ্কুশ কাফের পরিণত হবে না। (অর্থাৎ আংশিক কুফরী কাজ দ্বারা পুর্ণাঙ্গ কাফেরে পরিণত হয় না। যেমন নামাজ না পড়া কুফরী কর্ম হলেও বে-নামাজীকে কাফের বলা যাবে না যতক্ষণ না তার দ্বারা সুস্পষ্ট কুফরী কর্ম সম্পাদিত হয়)।
ইবনুল কাইয়্যিম তার স্বরচিত কবিতায় বলেন: নিজ সত্ত্বার কসম খেয়েছেন মহান আল্লাহ পাক জাত, যে কসমে করেছেন বয়ান ঈমানের হাকীকাত। সে তো নয় মুমিন কভু চায় যে বিচার অন্যের কাছে, মহান নবীকে বাদ দিয়ে ভাবে, আছে সুবিচার তাগুতের কাছে। সেই তো পরিচয় দেয় ঈমানের, বিধান চায় যে হাদীস, কুরআনের। দ্বিধা যদি থাকে লুকিয়ে মনে, নয় সে মুমিন আছে বিধানে যদি না মানে উদার মনে যেমনটি আছে বিধান কুরআনে।
তিনি আরো বলেন: সুস্পষ্ট অহিতে বিচার করেন তিনি, দুটি বিধায়ক আছে তার কাছে বলেছেন যিনি। অন্যায় বিচার তারা করেনা কভু এনেছেন ন্যায়ের সওদা, দিয়েছেন তাদের প্রভু
একটি হলো তার কিতাব আল্লাহর, ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক, শান্তি ও সুখের সুধা লুফে নেয় সে, অশান্তির অনলে যে, বিচলিত দিক-বিদিক।
অপরটি হলো রাসূলের (সঃ) বাণী, যার নাম মুমিনের দ্বিতীয় বিধায়ক, এ ছাড়া কভু না হবে ইনসাফ হবে না কোনো দিন ন্যায় বিচারক।
তাকে যদি তারা তোমায় কখনো ছেড়ে দিয়ে বিধান কুরআন ও সুন্নাহ্, তাগুতের ডাকে কভূ দিওনা সাড়া তাহলে তুমি বেঈমান ও পাপী, হবে গুনাহগার।
তিনি আরো বলেন: প্রত্যেক কওমের সেই হচ্ছে তাগুত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) কে বাদ দিয়ে লোকেরা যার কাছে বিচার ফায়সালা চায়। (আ'লামুল মুকিন ৫০/১)
৪। হাফেজ ইবনে কাসির (রহঃ) বলেনঃ (অতঃপর জুওয়াইনী ইয়াসা আইনের কিছু কথা উল্লেখ করেছেন। এ আইনের মধ্যে রয়েছে, যে জ্বেনা-ব্যভিচার করবে তাকে হত্যা করা হবে, সে বিবাহিতই হোক কিংবা অবিবাহিত। যে ব্যক্তি সমকামিতায় লিপ্ত হবে তাকে হত্যা করা হবে। যে ইচ্ছা পূর্বক মিথ্যা বলবে তাকে হত্যা করা হবে, যে যাদু করবে তাকে হত্যা করা হবে। যে গুপ্তচরী করবে তাকে হত্যা করা হবে। যে ব্যক্তি দু'জন বিবদমান ব্যক্তির মাঝে হস্তক্ষেপ করবে এবং একজনকে অপরজনের বিরুদ্ধে সাহায্য করবে তাকে হত্যা করা হবে। বদ্ধ পানিতে যে পেশাব করবে, তাকে হত্যা করা হবে। যে ব্যক্তি পানিতে ডুব দিবে তাকে হত্যা করা হবে। যে ব্যক্তি অনুমতি ছাড়া কোনো বন্দীকে খাবার দিবে অথবা পানি পান করাবে কিংবা কাপড় পরিধান করতে দিবে তাকে হত্যা করা হবে। যে ব্যক্তি কোনো পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে পেয়ে তাকে প্রত্যার্পণ না করবে তাকে হত্যা করা হবে। যে ব্যক্তি কোনো বন্দীকে খাওয়াবে অথবা ভক্ষিত জিনিস তার দিকে নিক্ষেপ করবে তাকে হত্যা করা হবে। [বরং হাত হাতে প্রদান করবে।] কোনো ব্যক্তি কাউকে কিছু খেতে দিলে তা থেকে নিজে প্রথমে খাবে যদি সে ব্যক্তি (যাকে খাওয়ানো হবে) বন্দী না হয়ে আমীরও হয় তবু। যে ব্যক্তি নিজে খাবে তার সাথের ব্যক্তিকে খাওয়াবে না তাকেও হত্যা করা হবে। যে ব্যক্তি পশু জবাই করবে তাকে পশুর মতো জবাই করা হবে, বরং তার পেট চিড়ে হাত দিয়ে তার হৃদপিন্ড প্রথমেই বের করা হবে। এ সব কথা আম্বিয়ায়ে কেরামের ওপর আল্লাহর যে শরীয়ত (জীবন বিধান) নাযিল হয়েছে তার সম্পূর্ন পরিপন্থী। সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর ওপর নাযিলকৃত শরীয়তকে যে পরিত্যাগ করে এবং রহিতকৃত বিধানের কাছে বিচার-ফয়সালা চায় সে কুফরী করে। তাহলে যে ব্যক্তি "ইয়াসা"র কাছে বিচার-ফয়সালা চায় তার অবস্থাটা কি হতে পারে? এমনটি যে, সে মুসলমানদের সর্বসম্মত রায়ে কুফরী করে। (আল বেদায়া ওয়ান নেহায়াহ ১৩৭/১৩)
এটা তাঁর (হাফেজ ইবনে কাসিরের) সুস্পষ্ট কথা যে, যে ব্যক্তি রহিত হয়ে যাওয়া খোদায়ী বিধান (তাওরাতের শরীয়ত) এর কাছে বিচার ফয়সালা চায় সে সর্বসম্মত রায়ে কুফরী করে। তাহলে মানব রচিত বিধানের কাছে যে বিচার-ফয়সালা চায়, তার অবস্থা কি? সে নিশ্চায়ই তুলনামূলকভাবে বেশী জঘণ্য অপরাধে অপরাধী। কেউ কেউ (কুফরীর) এ হুকুম এবং সর্বসম্মত রায়ে কুফরী সংক্রান্ত ধমক তাতারীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বলে ধরে নিয়েছে। কারণ যে সব কাজ মানুষকে কাফেরে পরিণত করে এ ধরণের কাজ তাতারীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। এ ধারণা সম্পূর্ণরূপে বাতিল। বাতিল হওয়ার কারণ হিসেবে আমরা বলতে চাই, যে হুকুম বা বিধানের ইজমা (সর্ব সম্মত রায়) পাওয়া গিয়েছে সেটাকে তাতারীদের সাথে খাছ করার কি প্রমাণ আছে? ইবনে কাসির (রহঃ) এর কথা এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট। তিনি বলেছেন: যে কেউ শরীয়তের বিধান পরিত্যাগ করবে। এটা সবারই জানা যে, [من] "যে কেউ” কথাটি সকলের জন্যই উন্মুক্ত। [অর্থাৎ কোনো জাতির জন্য নিদিষ্ট নয়]। ইবনে কাসির এখানে হুকুম [বিধানের] এর ক্ষেত্রে শরীয়তের সাধারণ মাসআলার কথা বলেছেন। আর মাসআলাটি হচ্ছে, শরীয়া মুহাম্মাদী পরিত্যাগ করা এবং ইসলাম বাদ দিয়ে [মানব রচিত অন্যান্য বিধানের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া।] তিনি একথা ও উল্লেখ করেছেন যে, রহিত হয়ে যাওয়া খোদায়ী শরীয়ত [বিধান] এর কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়াই যদি কুফরী হয়, তাহলে মানব রচিত কুফরী বিধানের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়ার ফল কি হতে পারে? অতএব যে ব্যক্তি ইয়াসার কাছে বিচার-ফয়সালা চায়? আর ইয়াসা হচ্ছে সেই মানব রচিত বিধান যা চেঙ্গিস খান রচনা করেছিলো। এ ব্যাপারে কিছু কথা প্রারম্ভিক আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব তিনি বলেন : এ সব কথা আম্বিয়ায়ে কেরামের ওপর আল্লাহর যে শরীয়ত [ জীবন বিধান] নাযিল হয়েছে তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অতঃপর তিনি সর্বসম্মত সেই অভিমতের কথা উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী কোনো বিধানের মাধ্যমে বিচার-ফয়সালা করে সে কুফরী করে। এক্ষেত্রে তাতারীদের কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে তারা [তাতারীরা।] এ ধরনের কুফরীর মধ্যে পতিত হয়েছে।
افحكم الجاهلية يبغون "তারা কি জাহেলী যুগের বিচার ফয়সালা কামনা করে?" এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি যা বলেছেন তা আলোচিত বিষয়টিকে আরো সুস্পষ্ট করে দেয়। তিনি বলেন: যারা সঠিক কল্যাণময়, সকল মন্দকে নিষেধকারী আল্লাহর বিধান থেকে [অমান্য করার মাধ্যমে] বের হয়ে গিয়েছে এবং যারা আল্লাহর শরীয়তের কোনো দলীল প্রমান ছাড়াই মানুষের মনগড়া মতামত চিন্তা ভাবনা এবং পরিভাষার দিকে ফিরে যায়। ঠিক যেমনি ভাবে জাহেলিয়াতে নিমজ্জিত লোকেরা গোমরাহী, মুর্খতাপূর্ণ আইন দ্বারা শাসন করে থাকে, যে আইন তারা রচনা করে তাদের নিজস্ব মতামত ও কামনা বাসনার ভিত্তিতে। তাতারীরাও তাদের রাজা চেঙ্গিস খানের রাজনীতি প্রসূত বিধানের সাহায্যে বিচার ফয়সালা করতো, যা ইয়াসেক কর্তৃক প্রণীত হয়েছিলো। তাদের সংবিধান ছিলো মূলত: বিভিন্ন শরীয়ত তথা ইয়াহুদী খৃষ্টান ও মুসলিম মিল্লাত থেকে সংগৃহীত ও সংকলিত একটি আইন গ্রন্থ। এ খানে এমন বহু আইন রয়েছে যা আইন প্রণেতার শুধু ব্যক্তিগত দৃষ্টি ভঙ্গি এবং মনের আবদার কামনা বাসনা থেকে জন্ম নিয়েছে [অর্থাৎ মানুষের কোনো কল্যান সাধনের জন্য নয়]। পরবর্তিতে এ মনগড়া আইনই একটি অনুসৃত বিধান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং এ আইনকে কুরআন ও সুন্নাহর উর্ধে স্থান দেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি এমনটি করবে সে নিঃসন্দেহে কাফের। যতক্ষণ সে আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ) এর দিকে প্রত্যার্বতন না করে ততক্ষণ তার সাথে যুদ্ধ করা ওয়াজিব। কম হোক আর বেশীই হোক এটা ছাড়া তার জন্য অন্য কোনো ফয়সালা নেই। এখানে তিনি দুটি উদাহরণ পেশ করেছেন।
একঃ তিনি বলেছেন: যেমনি ভাবে জাহিলিয়াত বা মুর্খতায় নিমজ্জিত লোকেরা, গোমরাহী মুর্খতাপূর্ণ আইন দ্বারা শাসন করে, যে আইন তারা রচনা করে তাদের নিজস্ব মতামত, কু প্রবৃত্তি ও কামনা বাসনার ভিত্তিতে। তাঁর এ কথার দ্বারা এ হুকুম [বিধান] যে তাতারীদের ব্যাপারে খাস, এটা খন্ডিত হয়ে গিয়েছে। [অর্থাৎ এ কথা তাতারীদের জন্য খাস নয়] বরং বিধান সকলের জন্য। এ হুকুম বা নির্দেশ যে ব্যক্তি মানব রচিত বিধান এবং তাগুতী আইন কানুন ইত্যাদি জাহেলী বিধান দ্বারা বিচার ফয়সালা চায় এমন প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
দুইঃ তিনি বলেছেন: 'যেমনি ভাবে তাতারীরা ও তাদের রাজা চেঙ্গিস খাঁনের রাজনীতি প্রসূত বিধানের সাহায্যে বিচার-ফয়সালা করতো'। এর দ্বারা তিনি তাতারীদের কথা উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর রায় তাতারীদের জন্য খাস নয়, এটাই সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করেছেন; এ জন্যই তাঁর ফতোয়া বা রায়কে তিনি বর্ণনা করেছেন। সকলের জন্য উন্মুক্ত রেখে তার কথা শেষ করেছেন। তিনি তাঁর বাক্যের মধ্যে من )যে কেউ) শর্ত ব্যাপক শব্দ ব্যবহার করে পূর্ণ বাক্যটি শর্ত জ্ঞ্যাপক বাক্যে রূপান্তরিত করেছেন, যার অর্থ হচ্ছে যে কেউ উক্ত কাজ (আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে তাগুতী বিধানের সাহায্যে বিচার-ফয়সালা) করবে, সেই কাফের হিসেবে গণ্য হবে। তিনি তাঁর ইজমা (সর্ব সম্মত রায়) সম্পর্কে বলেন: যে ব্যক্তি এ কাজ (তাগুতী বিধান দ্বারা বিচার) করবে, সে মুসলমানদের ইজমায় (সর্ব সম্মত রায়ে) কুফরী করে। তাঁর এ সাধারণ ও উন্মুক্ত কথার দ্বারা তার ফতোয়ার (বা রায়ের) বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা প্রদানের সুযোগ শেষ হয়ে গিয়েছে।
এ "ইজমা” (সর্ব সম্মত রায়) এর ব্যাপারে ইসলাম বিরোধীদের মধ্যে দ্বিধা ও সংশয় রয়েছে। কারণ তারা বলে: রহিত হয়ে যাওয়া শরীয়তের কাছে বিচার ফয়সালা চাওয়া কুফরী। কেননা রহিত হয়ে যাওয়া (মানসূখ) শরীয়ত 'দ্বীন' হিসেবে গণ্য, যে ব্যক্তি এর মধ্যে বিচার-ফয়সালা চায়, তখন দ্বীনি আক্বীদা বিশ্বাসের ভিত্তিতে তা চায়। কিন্তু মানব রচিত শরীয়ত (আইন কানুন) দ্বীন (জীবন বিধান) হিসেবে বিবেচিত নয়)। এর জবাবে আমরা বলবো: একথা (মানব রচিত আইন কানুন দ্বীন হিসেবে গণ্য নয়) নিঃসন্দেহে বাতিল। বাতিলের প্রামাণ্য দিক হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তায়ালা তার মহাগ্রন্থে কাফির ও মুশরিকদের আইন কানুন রীতি-নীতি কে তাদের দ্বীন (জীবন বিধান) হিসেবে নামকরণ করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَفِرُونَ ، لَا أَعْبُdُ مَا تَعْبُdُونَ ، وَلَا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُdُ ، وَلَا أَنَا عَابِدُ مَا عَبَدْتُمْ ، وَلَا أَنْتُمْ عٰبِدُونَ مَا أَعْبُdُ ، لَكُمْ دِينَكُمْ وَلِىَ دِينِ “আপনি বলে দিন হে কাফের সম্প্রদায়, তোমরা যার ইবাদত করো আমি তার ইবাদত করিনা এবং তোমরাও ইবাদতকারী নও আমি যার ইবাদত করি এবং আমি ইবাদত কারী নই তোমরা যার ইবাদত করো। তোমরা ইবাদত কারী নও আমি যার ইবাদত করি। তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য, আর আমার দ্বীন আমার জন্য।” (কাফিরুন ১-৬)
আল্লাহ তায়ালা তাঁর মহা গ্রন্থের অন্য এক স্থানে সুস্পষ্টভাবে নীতি, বিধান ও পদ্ধতিকে দ্বীন হিসাবে সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা সুরা ইউসুফে ইরশাদ করেছেনঃ كَذَلِكَ كِدْنَا لِيُوْسُفَ مَا كَانَ لِيَأْخُذَ أَخَاهُ فِي دِيْنِ الْمَلِكِ “এমনি ভাবে আমি ইউসুফকে কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলাম। সে বাদশাহর আইনে আপন ভাইকে কখনো দাসত্বে নিতে পারতো না।” (ইউসুফ:৭৬)
হাফেজ ইবনে কাসির (রহঃ) এ আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বলেনঃ মিসরের রাজার আইন (দ্বীন) মোতাবেক তাকে (তার ভাইকে) ধরে নেয়া যথার্থ ছিলো না। (রাষ্ট্র আইন কানুনকে এখানে দ্বীন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে) ইমাম কাসেমী (রহঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ কুফরী রীতি-নীতি ও আইন কানুনকে তাদের দ্বীন হিসেবে নামকরণ করা সম্পূর্ণ রূপে জায়েয এবং বৈধ। তাঁরা আরো বলে: রহিত হয়ে যাওয়া শরীয়তের বিচার ফয়সালা যে ব্যক্তি চায়, তাকে কাফের বলা হবে এ জন্য যে এর প্রতি আক্বীদা বিশ্বাস ছাড়া বিচার চাওয়া যায় না। তাদের এ কথাও বাতিল। আর বাতিল হওয়ার প্রমাণ্য দিক হচ্ছে এই যে, আমরা তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাইঃ যদি কোনো ব্যক্তি বিশ্বাসের কারণে নয় বরং দুনিয়ার স্বার্থ আদায়ের জন্য রহিত হয়ে যাওয়া বিধানের ভিত্তিতে বিচার ফয়সালা চায়, তাহলে কি আপনাদের কাছে সে কাফের হিসেবে গণ্য হবে? যদি আপনার জবাবে 'না' বলেন, তাহলে যে বিষয়ে ইজমা [সর্বসম্মত রায়] প্রতিষ্টিত হয়েছে তা আপনারা ধূলিস্মাৎ করে দিলেন। আর যদি জবাবে 'হাঁ' বলেন, তাহলে আমরা বলবো, যে ব্যক্তি রহিত হয়ে যাওয়া শরীয়তের বিচার চাইলে। আর যে ব্যক্তি মানব রচিত শরীয়ত বিধানের বিচার চাইলো এ দুইয়ের মধ্যে কি পার্থক্য আছে? আমরা এটা জানি যে, উভয়েই যা করেছে তা আক্বীদা বিশ্বাসের জন্য নয় বরং দুনিয়ার স্বার্থ আদায়ের জন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ذلِكَ بِأَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيٰوةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَأَنَّ اللهَ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الْكَفِرِينَ “এটা এ জন্য যে তারা পার্থিব জীবনকে পরকালের চাইতে প্রিয় মনে করেছে এবং আল্লাহ কাফেরদেরকে মুক্তির পথ প্রদর্শন করেন না”। (নাহলঃ ১০৭)
ইমাম মাহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) তাঁর 'কাশফুশ শুবহাত' নামক পুস্তিকায় এ আয়াতের তাফসীর প্রসংগে বলেন : এটা সুস্পষ্ট যে, কুফরী এবং শাস্তির কারণ বিশ্বাস অথবা অজ্ঞতা কিংবা দ্বীনের প্রতি ক্রোধ ও বিদ্ধেষ অথবা কুফরীর প্রতি ভালবাসা নয়। বরং এর কারণ হচ্ছে এর পিছনে দুনিয়ার স্বার্থ নিহিত ছিলো, যার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দ্বীনের ওপরে দুনিয়াকে প্রাধান্য দিয়েছে।
অতএব রহিত হয়ে যাওয়া বিধান কিংবা মানব রচিত বিধানের ভিত্তিতে বিচার-ফয়সালা চাওয়া এমন কুফরী যা ইসলামের গন্ডি থেকে মানুষকে বের করে দেয়। চাই বিচার প্রার্থী বিশ্বাসের ভিত্তিতেই বিচার চাক অথবা অবিশ্বাসের ভিত্তিতেই বিচার চাক। সর্বাবস্থাতেই তার এ কর্ম তাকে মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে দিবে।
ইমাম ইবনে হাযম (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ইঞ্জিলের [হযরত ঈসা (আঃ) এর ওপর নাযিলকৃত কিতাব খৃষ্টানদের কাছে যা "বাইবেল" নামে পরিচিত] সেই বিধান মোতাবেক বিচার ফয়সালা করলো, যা অহীর মাধ্যমে ইসলামী শরীয়তে অনুমোদিত হয়নি, সে কাফির, মুশরিক এবং ইসলাম থেকে বর্হিভূত বলে বিবেচিত হবে। (আহকাম ফি উসুলিল আহকাম)
শাইখ আহমাদ শাকের (রহঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি স্বজ্ঞানে, ইচ্ছাকৃত ভাবে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান বাদ দিয়ে বিচার-ফয়সালা করলো সে কাফের এবং যে এই বিচার-ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকলো এবং স্বীকৃতি দিলো সেও কাফের। চাই সে আহলে কিতাবের শরীয়তের [বিধান] নামেই বিচার করুক অথবা মানব রচিত বিধানের নামেই বিচার করুক। এর সবটুকুই কুফরী আর ইসলাম থেকে খারিজ হওয়ার শামিল। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এ অবস্থা থেকে হেফাজত করুন। (মুসনাদ ইমাম আহমদ বিতাহকিক তা'লিকিশ্ শায়খ আহমদ সাকের ১৮০-১৮৪)
শাইখ সালেহ বিন ফাউজান আল-ফাউজান তাঁর الارشاد الى صحيح الاعتقاد والرد على اهل الشرك নামক কিতাবে তাতারীদের সম্পর্কে হাফেজ ইবনে কাসীরের বক্তব্যের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেনঃ যে আইন কানুনের কথা তিনি তাতারীদের ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন এবং যে আইনকে ইসলামী শরীয়তের বিকল্প বিধান হিসেবে সাব্যস্ত করার কারণে কুফরীর ফতোয়া দিয়েছেন সে আইনের উপমা হচ্ছে বর্তমান সময়ের মানব রচিত আইন, যাকে অনেক রাষ্ট্রই আইনের উৎস বলে গণ্য করে, যার কারণে তথাকথিত কতিপয় ব্যক্তিগত অবস্থা ব্যতীত জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ইসলামী শরীয়তকে বাতিল ও প্রত্যাখ্যান করেছে। এসব যারা করেছে তাদেরকে কাফের হিসেবে গণ্য করার বহু প্রমাণ কুরআনে রয়েছে। যেমনঃ
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكُفِرُونَ "যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক শাসন বা বিচার-ফয়সালা করে না, তারাই কাফের" (আল-মায়েদা : ৪৪)
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ .
"এবং তোমার রবের কসম, সে লোক ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের মধ্যে বিবাদপূর্ণ বিষয়ে তোমাকে ন্যায় বিচারক হিসেবে মেনে নিবে।" (আন-নিসা: ৬৫)
হাফেজ ইবনে কাসীর (রহঃ) فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ، ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا -
"যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি যদি তোমাদের ঈমান থাকে, তাহলে বিরোধপূর্ণ বিষয়টি ফয়সালার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সঃ) দিকে প্রত্যার্পন করো। এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক থেকে উত্তম।" (আন-নিসা: ৫৯)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: যে ব্যক্তি বিবাদপূর্ণ বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর ওপর বিচারের ভার না দিবে এবং এ ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন না করবে, সে আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণ হিসেবে বিবেচিত হবে না। (ফাতহুল মাজীদ)
৫। দার নাজদিয়ার মুফতী, ফাতহুল মাজীদ গ্রন্থের লিখক আব্দুর রহমান বিন হাসান আল শাইখ (রহঃ( فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ )c) ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করে) এ আয়াত প্রসংগে বলেন: তাগুতের কাছে বিচার ফয়সালা চাওয়ার অর্থই হচ্ছে তাগুতকে বিশ্বাস করা। একই অধ্যায়ে তিনি আরো বলেন: হযরত ওমর (রাঃ) এর ঘটনায় যে মুনাফিককে বিচার-ফয়সালা কা'ব বিন আশরাফ নামক ইহুদীর কাছে চাওয়ার অপরাধে তিনি হত্যা করেছিলেন, তা দ্বারা যার মধ্যে কুফরী এবং মুনাফিকী প্রকাশ পাবে তাকে হত্যা করার প্রমাণ নিহিত রয়েছে।
৬। আল্লামা শাইখ জামাল উদ্দীন আল-কাসেমী (রহঃ) তাঁর محاسن التأويل নামক তাফসীর গ্রন্থে আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন: আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ ، وَيُرِيدُ الشَّيْطَنَ أَنْ يُضِلُّهُمْ ضَلُّلًا بَعِيدًا .
"তারা বিচার-ফয়সালা তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায় অথচ তাকে অস্বীকার কারার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে চরম গোমরাহীতে নিমজ্জিত করতে চায়।" (আন-নিসা: ৬০)
এখানে তাগুতের কাছে বিচার - ফয়সালা চাওয়ার বিষয়টিকে মূলতঃ তাগূতের প্রতি ঈমান আনা বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাগুতের প্রতি ঈমান আনার অর্থই হচ্ছে আল্লাহর সাথে কুফরী করা। যেমনি ভাবে তাগুতের সাথে কুফরী করা মানেই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা।
৭। আল্লামা শাইখ সুলাইমান বিন আবদুল্লাহ আল শাইখ (রহঃ) তাঁর تيسير العزيز الحميد নামক গ্রন্থের ৪১৯ পৃষ্ঠায় الَم تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: কুরআন সুন্নাহ বাদ দিয়ে তাগুতের কাছে বিচার - ফয়সালা চাওয়া পরিত্যাগ করা ফরজ। যে ব্যক্তি তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চায়, সে মুমিন তো নয়ই এমনকি মুসলমান ও নয়।
৮। আল্লামা শাইখ আবদুল লতিফ বিন আবদুর রহমান বিন হাসান বিন আল শাইখ (রহঃ) বলেন: যে ব্যক্তি জেনে বুঝে কুরআন ও সুন্নাহ বাদ দিয়ে বিচার-ফয়সালা চাইলো সে কাফের (আদ্ দুরাবুস সুন্নিয়াহ ৪৭৬/১০)
৯। আল্লামা শাইখ হামাদ বিন আতীক (রহঃ) বলেন: যে সব জিনিস একজন মুসলিমকে মুরতাদে [ধর্ম তা্যগীতে] পরিণত করে সে সব জিনিসের মধ্যে রয়েছে কুরআন ও সুন্নাহকে বাদ দিয়ে বিচার-ফয়সালা চাওয়া। আমি বলি: এর মতোই তাদের উদাহরণ যারা তাদের বাপ-দাদার পূর্ব পুরুষদের স্বরচিত, অভিশপ্ত বিধানের কাছে বিচার ফয়সালা চায় (তারা এর নাম দিয়েছে বন্ধুত্বের বিধান) এবং কুরআন সুন্নাহর ওপরে বিধানকে স্থান দেয়। এ কাজ যে করবে সে নিঃসন্দেহে কাফের। (সাবিলিন নাজাতি ওয়াল ফাকাকি মিন মুওয়ালাতিল মুরতাদ্দীন)
১০। আল্লামা শাইখ হামাদ বিন নাসের আল মা'মার (রহঃ) বলেন সব চেয়ে বড় কথা হচ্ছে:
فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ، ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا -
"যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়, তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি ঈমানদার হলে বিরোধপূর্ণ বিষয়টিকে মীমাংসার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যার্পন করো। এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক থেকে উত্তম।" (আন-নিসা :৫৯)
দ্বীনের মৌলিক কিংবা প্রাসংগিক সকল বিষয়ে মানুষের মধ্যে বিবাদ ও বিরোধ সৃষ্টি হলে তার মিমাংসার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) কাছে প্রত্যাপর্ণ করা ওয়াজিব, উপরোক্ত আয়াতটি এরই প্রমাণ। এজন্যই إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান এনে থাকো) এখানে প্রত্যার্পণের বিষয়টিকে ঈমানের সাথে শর্ত হিসেবে জুড়ে দেয়া হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে বিবাদ পূর্ণ বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের (সঃ) কাছে প্রতার্পণ না করলে ঈমানও থাকবেনা। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সাঃ) বাদ দিয়ে বিবাদ পূর্ণ বিষয়ে অন্য কাউকে বিচারক ও ফয়সালাকারী মানলো, সে আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণের অপরিহার্য দাবী থেকে বের হয়ে গিয়েছে। (মাজমুআতুর রাসায়েল ওয়াল ফাতাওয়া)
১১। আল্লামা শাইখ সুলাইমান বিন সামহান (রহঃ) বলেন: আহলে তাগুতকে (খোদাদ্রোহী শক্তিকে যারা মান্য করে ও বিশ্বাস করে) যখন বলা হয়, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) বিধানের দিকে প্রত্যাবর্তন করো এবং তাগুতী বিধানগুলোকে পরিত্যাগ করো, তখন তারা বলে: আমরা শুধু পারসপরিক হত্যার ভয়ে এরকম করছি। আমি যদি এ [মানব রচিত] আইনের কাছে [যার নাম বন্ধুত্বের বিধান] বিচার-ফয়সালার ব্যাপারে আমার সাথীর সাথে একমত না হই তাহলে হয়তো সেই আমাকে হত্যা করবে না হয় আমি তাকে হত্যা করবো। এরপর তিনি একটি মূল্যবান কথা বলেছেনঃ তাহলো, তুমি যখন জানতে পারলে যে তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া কুফরী, তখন জেনে রাখো যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, কুফরী হত্যার চেয়েও জঘণ্য অপরাধ।
وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرٌ مِنَ الْقَتْلِ - "ফেতনা হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ)" (আল-বাকারাহ ২১৭)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: وَالْفِتْنَةُ أَشَدَّ مِنَ الْقَتْلِ "ফেতনা হত্যার চেয়েও জঘণ্য অপরাধ।" (আল-বাকারাহ: ১৯১)
কুফরীই মূলতঃ ফেতনা। যে ইসলামী শরীয়ত দিয়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে (সঃ) পাঠিয়েছেন, পৃথিবীতে তার পরিপন্থী তাগুতী বিধান জারি হওয়ার চেয়েও সভ্য-অসভ্য দুজনে মারা মারি করে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অনেক সহজ। অতঃপর তিনি বলেন: তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থনা যদি কুফরী হয়, আর ঝগড়া-বিবাদ যদি একমাত্র দুনিয়ার জন্যই হয় তাহলে ঐ কুফরী কিভাবে বৈধ হতে পারে [অর্থাৎ কুফরী কোনো অবস্থায়ই বৈধ নয়] । কেননা, একজন মানুষের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য কিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে মুমিন হতে পারবেনা । এমনকি রাসূল (সঃ) তার কাছে স্বীয় সন্তান, মাতা-পিতা ও সমস্ত মানুষের চেয়ে বেশী প্রিয় হতে হবে। তোমার দুনিয়ার সবটাই যদি নষ্ট হয়ে যায় তবুও দুনিয়ার স্বার্থ রক্ষায় তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া তোমার জন্য জায়েয নয় । যদি কোনো পাপীষ্ঠ ব্যক্তি তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া অথবা তোমার পার্থিব স্বার্থ জলাঞ্জলী দেয়া, এদুটি বিষয়কে বেছে নেয়ার এখতিয়ার দেয়, তাহলে তোমার পার্থিব স্বার্থ জলাঞ্জলী দেয়া ওয়াজিব তবু তাগুতের কাছে বিচার ফয়সালা চাওয়া তোমার জন্য জায়েয নয়। (আদদুরাবুস সুন্নিয়াহ)
হযরত ওমর (রাঃ) কর্তৃক মুনাফিক হত্যার ঘটনা (যাকে তিনি শুধু মাত্র তাগুতের কাছে বিচার চাওয়ার কারণে হত্যা করেছেন) উল্লেখ করে বলেনঃ তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা যারা চায়, তাদের সকলের ক্ষেত্রেই এ রকম আচরণ করা উচিৎ। একজন সত্যানুসারী সচেতন খলীফা যদি লোকটিকে শুধুমাত্র তাগুতের কাছে বিচার চাওয়া অপরাধে হত্যা করতে পারেন, তাহলে এ [দৃঢ়তাপূর্ণ] স্বভাবের ওপর যিনি প্রতিষ্ঠিত, এবং এটা ছাড়া যিনি নিজের জন্য ও তাঁর সমমনাদের জন্য অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট নন, তাঁর পক্ষে ধর্মত্যাগীকে এবং দুনিয়াতে বিপর্যয় সৃষ্টি কারীকে হত্যা করা অধিকতর সহজ ও সমীচিন। কেননা সৃষ্টির জন্য আল্লাহই একমাত্র মাবুদ [উপাস্য], মুহাম্মদ (সঃ) ই তাঁর একমাত্র নবী যার আনুগত্য তাকে করতে হবে এবং তাঁর শরীয়ত বা বিধানের কাছেই সে বিচার চাবে, এর মধ্যেই রয়েছে সমস্ত মঙ্গল ও কল্যাণ। এ মহা সত্যের অনুপস্থিতিতে সৃষ্টি হবে বিরাট বিপর্যয় এবং দেখা দিবে অনিষ্টতা। তাই আল্লাহ তায়ালা বলেন: أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ -
"তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা দাবী করে যে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ তা বিশ্বাস করে।"
এ আয়াতে এটাই বর্ণনা করা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) প্রতি ঈমান পোষণের দাবী করে অথচ ইসলামী শরীয়ত ছাড়া অন্য বিধানের কাছে বিচার ফয়সালা চায় সে মিথ্যাবাদী, মুনাফিক, সরল ও সঠিক পথ থেকে সে বিচ্যুত। (আদদুরাবুস সুন্নিয়া)
১২। শাইখ আবদুর রহমান আস সাদী (রহঃ) তাঁর القول السديد على كتاب التوحيد নামক গ্রন্থে বলেন: আল্লাহ তায়ালার হালালকৃত জিনিস হারাম করার ক্ষেত্রে এবং আল্লাহর হারামকৃত জিনিস হালাল করার ক্ষেত্রে আলেম ও আমীর ওমারাগণের আনুগত্য করার অর্থই হচ্ছে তাদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করা। তিনি আরো বলেন: প্রতিটি ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কাউকে বিচারক হিসাবে গ্রহণ না করা এবং মানুষের মধ্যে বিবাদ পূর্ণ বিষয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) কাছে প্রত্যার্পণ করা। এর মাধ্যমেই বান্দার দ্বীন সম্পূর্ণ রূপে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হবে। এবং তাঁর তাওহীদ একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর জন্য নিশ্চিত হবে। যে ব্যক্তিই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সঃ) বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে বিচার-ফয়সালা চাইলো সে মূলত: তাগুতের কাছে বিচার চাইলো, যদি সে নিজেকে এমতাবস্থায় মুমিন বলে দাবী করে, তাহলে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে গণ্য হবে, তার ঈমান সহীহ ও পূর্ণ হবেনা যতক্ষন পর্যন্ত না সে দ্বীনের মৌলিক ও প্রাসংগিক বিষয়ে এবং সমস্ত অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) কাছে বিচার- ফয়সালা চায়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সঃ) বাদ দিয়ে যারই কাছে বান্দা বিচার-ফয়সালা চাইলো, তাঁকেই সে রব হিসেবে গ্রহণ করলো এবং তাগুতের কাছে বিচার ফয়সালা প্রার্থনা করলো। তাই আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ، ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا -
"যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ো, আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি যদি তোমরা ঈমানদার হও, তাহলে ফয়সালার জন্য বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) প্রতি প্রতার্পণ করো।"
(আন-নিসা: ৫৯)
এ আয়াত দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়, যে ব্যক্তি বিবাদপূর্ণ বিষয় ফয়সালা করার জন্য কুরআন ও হাদীছের কাছে প্রত্যাপর্ণ না করবে সে প্রকৃত মুমিন নয়। বরং সে তাগুতের প্রতি ঈমান পোষণ করে। যেমনটি এর পরবর্তী আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৩। আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম ১৪। শাইখ আবদুল্লাহ বিন হামীদ ১৫। শাইখ আবদুল লতিফ বিন ইবরাহীম ১৬। শাইখ আবদুল আজীজ আল-শাতরী ১৭। শাইখ আবদুল লতিফ বিন মুহাম্মদ, ১৮। শাইখ আবদুল্লাহ বিন আকীল ১৯। শাইখ আবদুল আজীজ বিন রাশীদ, ২০। শাইখ মুহাম্মদ বিন আওদাহ এবং ২১। শাইখ মুহাম্মাদ বিন মুহাইরি (রহঃ) বলেনঃ সবচেয়ে খারাপ কাজ ও সবচেয়ে জঘণ্য অন্যায় কাজ হচ্ছে, আল্লাহর শরীয়ত [বিধান] কে বাদ দিয়ে মানব রচিত বিধান ও আইন-কানুন পূর্ব-পুরুষ ও বাপ-দাদা কর্তৃক গৃহীত রীতি-নীতির ভিত্তিতে বিচার-ফয়সালা চাওয়া। এ গোমরাহী ও কুফরীর মধ্যে বর্তমান যুগের বহুলোক নিমজ্জিত এবং আল্লাহ তায়ালা যে শরীয়ত দিয়ে তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) কে পাঠিয়েছেন তার বদলে তারা মানব রচিত বিধান নিয়েই সন্তুষ্ট। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা হচ্ছে বান্দার সবচেয়ে বড় মোনাফিকী, কুফরী, জুলুম, ফাসেকী এবং কুরআন কর্তৃক বাতিলকৃত ও রাসূল (সঃ) কর্তৃক সাবধানকৃত জাহেলী বিধানের সবচেয়ে বড় আলামত।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُNzِلَ مِن قَبِلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ ، وَيُرِيدُ الشَّيْطَنَ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَلًا بَعِيدًا -
"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, তারা আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তা তারা বিশ্বাস করে, তারা বিচার-ফয়সালাকে তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায়, তথচ তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে নিদের্শ দেয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে চরম গোমরাহীতে নিমজ্জিত করতে চায়।" (আন নিসা: ৬০)
আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেনঃ وَمَن لَّمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكُفِرُونَ
"যে সব লোক আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক বিচার-ফয়সালা করেনা, তারাই কাফের।" (আল-মায়েদা: ৪৪) وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنZَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ
"যে সব লোক আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক বিচার-ফয়সালা করেনা, তারাই জালেম।" (আল-মায়েদা: ৪৫)
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَسِقُونَ -
"যে সব লোক আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক বিচার- ফয়সালা করেনা, তারাই ফাসেক।" (আল-মায়েদা: ৪৭)
এটা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার কিতাব ও তাঁর রাসুলের (সঃ) সুন্নাত থেকে বিরত থাকা এবং কুরআন ও সুন্নাহ বাদ দিয়ে বিচার চাওয়ার বিরুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে সকল বান্দার বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে বিচার-ফয়সালা করে, সে নিঃসন্দেহে কাফের, জালেম, ফাসেক, মুনাফিকী চরিত্রের অধিকারী এবং জাহিলিয়্যাতে বিশ্বাসী, এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা। হে মুসলমান ভাইসব, আপনাদেরকে সেই ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যে ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা আপনাদেরকে সাবধান করে দিয়েছেন। সকল বিষয়ে আপনারা আল্লাহর শরীয়তকেই ফয়সালাকারী মেনে নিন। এর বিরোধী বিধানের ব্যাপারে আপনারা সতর্ক থাকুন। এর (কুরআন ও সুন্নাহর) ভিত্তিতে আপনারা একে অপরকে উপদেশ দিন। আল্লাহর শরীয়তের বিরোধিতাকারীদের প্রতি, তাঁর বিধানের যারা অমর্যাদা করে, এর সাথে যারা উপহাস ও কটাক্য করে অথবা গাইরুল্লাহর বিধানের কাছে ফয়সালা চাওয়ার পথ সুগম করে দেয় তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করুন, ঘৃণা প্রকাশ করুন। যাতে করে আল্লাহর প্রদত্ত সম্মান নিয়ে আপনারা সফলকাম হতে পারেন আর আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপদ থাকতে পারেন। অপরদিকে এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসুলের (সঃ) বিধান মোতাবেক বিচার-ফয়সালাকারীদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করার যে দায়িত্ব তিনি আপনাদের দিয়েছেন সে দায়িত্বও পালন করা হবে। আমাদেরকে এবং আপনাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শনের বিষয়টি আল্লাহর ওপর ন্যস্ত। কাফের ও মুনাফিকদের সদৃশ হওয়া থেকে তিনিই আমাদেরকে এবং আপনাদেরকে রক্ষা করবেন। তিনি তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করবেন এবং দ্বীনের শত্রুদেরকে করবেন অপমানিত ও লাঞ্চিত। তিনিই সর্ব শক্তিমান। অসংখ্য দরূদ ও সালাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল মুহাম্মদ (সঃ) এর ওপর, তাঁর পরিবার বর্গ ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের ওপর।
(ফতোয়া সাইখ মাহমুদ বিন ইবরাহিম ৭৫৬/১৭)
২২। আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ আল-আমীন আল-শানকিতী (রহঃ) বলেন: অবাক ও বিস্ময় হতে হয় ঐ ব্যক্তিকে নিয়ে, যে ব্যক্তি আল্লাহর শরীয়ত (বিধান) কে বাদ দিয়ে বিচার-ফয়সালা চায়। অতঃপর ইসলামেরও দাবী করে (অর্থাৎ নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করে)। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
الَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أَنْزَلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ ، وَيُرِيدُ الشَّيْطَنَ أَنْ يُضِلُّهُمْ ضَلُّلًا بَعِيدًا -
“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি তারা ঈমান এনেছে কিন্তু তাঁরা যাবতীয় ব্যাপারে বিচার-ফয়সালা তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য তাদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে চরম গোমরাহীতে নিমজ্জিত করতে চায়”। (আন-নিসা : ৬০)
তিনি আরো বলেন:
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَفِرُونَ “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক বিচার-ফয়সালা করেনা, তারাই কাফের।” (আল মায়েদা : ৪৪)
তিনি আরো বলেন: এ ব্যাপারে সবচেয়ে সুষ্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা যা সূরা নিসাতে বর্ণনা করেছেন, সেখানে আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন যে, যারা আল্লাহ্ তাআলার শরীয়ত বা বিধান বাদ দিয়ে বিচার-ফায়সালা চায় আবার তারা মুমিন হওয়ার দাবীও করে এতে তিনি বিস্ময় বোধ করেন। এর কারণ হচ্ছে তাগুতের কাছে বিচার-ফায়সালা চাওয়ার সাথে তাদের ঈমানের দাবীটা এতটাই চরম মিথ্যা যা দ্বারা শুধু বিস্ময়ই সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তায়ালার নিম্মোক্ত বাণীই এর প্রমাণঃ
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِن قَبِلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ ، وَيُرِيدُ الشَّيْطَنَ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَلًا بَعِيدًا - “আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি তারা ঈমান এনেছে কিন্তু তাঁরা যাবতীয় ব্যাপারে বিচার-ফয়সালা তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য তাদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে চরম গোমরাহীতে নিমজ্জিত করতে চায়”। (আন-নিসা : ৬০)
উল্লেখিত এ ঐশী বাণীতে একথা সূর্যালোকের মতো সুষ্পষ্টভাবে প্রতিভাত হচ্ছে যে, রাসূল গণের জামানাতে যে বিধান ও শরীয়ত আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন, তার পরিপন্থী শয়তান ও তার দোসরদের রচিত বিধানের যারা অনুসরন করে, তাদের কুফরী ও শেরেকীর ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ নেই। তবে আল্লাহ যাদের দৃষ্টি শক্তিকে ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং তাদের মতোই অহীর (ঐশী বাণী) আলো থেকে অন্ধ বানিয়ে দিয়েছেন তাদের কথা ভিন্ন।
তিনি আরো বলেন: আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা, আর তাঁর ইবাদতের ক্ষেত্রে কাউকে শরীক করা মূলতঃ একই অর্থ জ্ঞাপক। এ দুটি বিষয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অতএব যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর নীতি ও গাইরুল্লাহর বিধান অনুসরন করে সে ঐ ব্যক্তির মতোই যে মূর্তির ইবাদত বা উপাসনা করে আর প্রতিমাকে সেজদা করে।
কোনো দিক থেকেই এ দুটি কর্মের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দুটি কর্মেরই ফলাফল এক। দুজনই আল্লাহর সাথে শিরককারী।
২৩। শাইখ আবদুর রহমান বিন মুহাম্মদ বিন কাসেম (রহঃ) কিতাবুত্তাওহীদের হাশিয়ায় (টিকা) ( أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ ) আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন: যে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই) এ সাক্ষ্য দিলো অতঃপর বিবাদপূর্ণ বিষয়ে সে আল্লাহর রাসূলকে বাদ দিয়ে বিচার-ফয়সালা চাইলো, তাহলে সে তার সাক্ষ্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো। আয়াতের অর্থ হচ্ছে এই যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তার রাসূলের (সঃ) ওপর নাযিলকৃত কিতাব এবং তার পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবসমূহের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে বলে দাবী করে অথচ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বাদ দিয়ে বিবাদপূর্ণ বিষয়ের বিচার-ফয়সালা গাইরুল্লাহর কাছে চায়, তার ঈমানের দাবীকে আল্লাহ তায়ালা অস্বীকার করেছেন। কেননা أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ এ আয়াতে রয়েছে তিরষ্কার, ভর্ৎসনা ও অস্বীকৃতি জনিত প্রশ্ন আর ঐ ব্যক্তিকে দোষারোপ করা হয়েছে যে কুরআন ও সুন্নাহকে পরিত্যাগ করেছে এবং কুরআন সুন্নাহ বাদ দিয়ে বাতিল তথা তাগুতের প্রতি আগ্রহী হয়েছে। যেমনিভাবে ইবনে কায়্যিমের কথা ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে। আর তা হলো যার মাধ্যমে বান্দা তার সীমা অতিক্রম করে (অর্থাৎ আল্লাহর সাথে কুফরী ও শেরেকীতে লিপ্ত হয়) যেমন কোনো সৃষ্টিকে মাবুদ হিসেবে গ্রহণ করা। তাই যে ব্যক্তিই কুরআন সুন্নাহ বাদ দিয়ে অন্য কোনো বিধানের কাছে বিচার-ফয়সালা চাইলো সে মূলতঃ সেই তাগুতের কাছেই বিচার-ফয়সালা চাইলো যাকে অস্বীকার করার জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ সেই বিধানকেই অস্বীকার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা তাগুত কর্তৃক বিচার-ফয়সালার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। বিচার-ফয়সালা একমাত্র আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহতে রাসুলের (সঃ) কাছেই প্রার্থনা করতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সঃ) ব্যতীত যে কেই বিচার-ফয়সালা চাইবে সেই তার সীমা অতিক্রম করবে এবং আল্লাহরও তাঁর রাসলের (স) শরীয়ত থেকে সে বের হয়ে যাবে। এমনি ভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহকে ছাড়া অন্য কিছুর এবাদত করে সে মূলতঃ তাগুতের ইবাদত করে। আর সে মানুষকে এর মাধ্যমে বাতিলের দিকে আহবান জানায়। যে ব্যক্তি একাজ করবে তার জন্য কাজটাকে সৌন্দার্যমন্ডিত করে তোলে। অথচ একাজটি হচ্ছে তাওহীদের পরিপন্থি। কেননা তাওহীদ হচ্ছে, ইবাদতকারীরা আল্লাহ ব্যতীত যার ইবাদত করে সেই তাগুতকে অস্বীকার করা, তাই যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সঃ) বিধানকে বাদ দিয়ে বিচার-ফয়সালা করার জন্য অন্যকে আহবান জানালো, সে মুলতঃ রাসুলকে (সঃ) এর নিয়ে আসা জীবনাদর্শকে ত্যাগ করলো এবং আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে শরীক করলো। সাথে সাথে রাসুল (সঃ) কর্তৃক আনীত সেই নির্দেশের বিরোধীতা করলো যা আল্লাহ তায়ালা নিম্মোক্ত আয়াতে দিয়েছেনঃ
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -
"অতএব আপনার রবের কসম, তারা মুমিন হতে পারবেনা, যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যকার বিবাদপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালার ব্যাপারে আপনাকে ন্যায় বিচারক মানে। অতঃপর আপনি যা ফয়সালা করবেন সে ব্যাপারে তাদের নিজেদের মনে বিন্দুমাত্র সংকোচ থাকবে না। বরং ফয়সালার সামনে নিজেদেরকে সম্পূর্নরূপে সমর্পন করবে।" (আন-নিসা : ৬৫)
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাদের ঈমানের দাবীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন, উক্ত আয়াতে يزعمون (তারা দাবী করে) এ কথা দ্বারা তাদের ঈমান অস্বীকার করা হয়েছে। কেননা يزعمون (তারা দাবী করে) এ কথটি অধিকন্তু এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়েছে, যে এমন বিষয়ে দাবী পেশ করে, যে বিষয়ে সে মিথ্যাবাদী। وَقَدْ أَمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا به ( وَقَدْ )অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য) এ বক্তব্যের দ্বারা উপরোক্ত কথাটির সত্যতা যাচাই হয়ে গেলো। কেননা তাগুতকে অস্বীকার করা তাওহীদের একটি রুকন (অপরিহার্য মৌলিক বিষয়)। এ রুকন বা মৌলিক বিষয়ে গন্ডগোল থাকলে বান্দা মুত্তয়াহহিদ (আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী) হতে পারেনা। যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করতে পারেনি, সে আল্লাহর প্রতিও ঈমান আনতে পারেনি। আর তাওহীদই হচ্ছে ঈমানের মূল যার ওপর ভিত্তি করে আমল পরিশুদ্ধ হয়। তাওহীদ নষ্ট হলে আমলও নষ্ট হয়ে যায়।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنُ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى - "যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে সেই শক্ত অবলম্বন কে আকড়ে ধরে।"
২৪। শাইখ আহমাদ শাকের (রহঃ) বলেন: যারা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি এবং তাঁর ওপর নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি ঈমান আনার দাবী করে, অতঃপর يُرِيدُوْنَ إِنَّ يَتَحَاكُمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ "রা বিচার-ফয়সালাকে তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায় অথচ তাকে (তাগুত) অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে" তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার ফয়সালার বিষয়টি আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি ফয়সালা দিয়েছেন যে, তারা হচ্ছে মুনাফিক। কেননা তাদেরকে যখন রাসূল (সঃ) এর প্রতি আল্লাহ তায়ালার নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে, তখন তারা প্রচন্ড ভাবে এর পথ রোধ করে দাড়িয়েছে। আর মুনাফিকী হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের কুফরী।
২৫। শাইখ হামূদ বিন আবদুল্লাহ আলুওয়াইরিজী (রহঃ) বলেনঃ এ সাদৃশ্যের কারণে বহু লোক দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়েছে। বেশীর ভাগ লোকের ক্ষেত্রেই এ বিচ্যুতি তাদেরকে মুরতাদ বানিয়েছে এবং ইসলাম থেকে তাদেরকে সম্পূর্ণ রূপে বের করে দিয়েছে।
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيمِ
শরীয়াতে মুহাম্মাদীয়া (ইসলামের বিধান) কে বাদ দিয়ে বিচার- ফয়সালা চাওয়া চরম গোমরাহী এবং জঘণ্য মোনাফিকী। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أَمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ ، وَيُرِيدُ الشَّيْطَنَ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَلًا بَعِيدًا وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنْفِقِينَ يُصَدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا (النساء ٢١-٢٠)
"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তা তারা বিশ্বাস করে। তারা বিচার-ফয়সালাকে তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তাগুতকে অমান্য করার জন্যই তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শয়তান তাদেরকে গোমরাহ করে সত্যপথ থেকে বহুদূর নিয়ে যেতে চায় (অর্থাৎ চরম গোমরাহীতে নিমজ্জিত করতে চায়)। তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ তায়ালা যা অবতীর্ন করেছেন, তার প্রতি এবং রাসূল (সঃ) এর প্রতি চলে এসো, তখন আপনি মুনাফিকদেরকে দেখতে পাবেন যে, তারা সম্পূর্ণভাবে আপনার কাছ থেকে সরে গিয়েছে।" (আন-নিসা: ৬০-৬১)
তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা নিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, তাগুতের প্রতি ঈমান আনয়ন করা আর আল্লাহর প্রতি কুফরী করার (বা আল্লাহকে অস্বীকার করা) বিষয়ে ইসলামের ইমামদের মতামত।
এ ক্ষেত্রে আল্লামা ইবনে কাছীর (রহঃ) যে ইজমা (সর্ব সম্মত) অভিমত উদ্ধৃত করেছেন তাই (বিষয়টি অনুধাবনের জন্য) যথেষ্ট। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে শরীয়তের সুস্পষ্ট উদ্ধৃতি ও প্রমাণাদির ভিত্তিতে যে সর্বসম্মত আভিমতের বর্ণনা উপস্থাপিত হয়েছে বিষয়টি উপলদ্ধি করার জন্য হেদায়াত লাভে আগ্রহী ব্যক্তির পক্ষে এত টুকুই যথেষ্ট।
📄 আল-ইয়াসেক তাতারীর সাথে পূর্বসূরীদের আচরণ
হাফেজ ইবনে কাছীর (রহঃ) (أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ "তারা কি জাহেলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে?"
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: আল্লাহ তায়ালা ঐ সব লোকদের নিন্দা বা দোষারোপ করেছেন, যারা সার্বিক কল্যাণময় সকল মন্দকে নিষেধকারী আল্লাহর বিধান থেকে বের হয়ে গিয়েছে এবং যারা আল্লাহ তায়ালার শরীয়তের কোনো দলীল প্রমাণ ছাড়াই মানুষের মনগড়া মতবাদ, চিন্তা-ভাবনা ও পরিভাষার দিকে ফিরে যায়। ঠিক যেমনি ভাবে জাহিলিয়্যাতে নিমজ্জিত লোকেরা গোমরাহী ও মুর্খতাপূর্ণ আইন দ্বারা ফয়সালা করে থাকে, এ আইন ও বিধান তারা রচনা করে তাদের নিজস্ব মতামত ও কামনা বাসনার ভিত্তিতে। তাতারীরা ও তাদের রাজা চেঙ্গিস খাঁনের রাজনীতি প্রসূত বিধানের সাহায্যে বিচার-ফয়সালা করতো যা ইয়াসেক কর্তৃক প্রণীত হয়েছিলো। তাদের সংবিধান ছিলো মূলতঃ বিভিন্ন শরীয়ত (বিধান) যথাঃ ইহুদী, খৃষ্টান ও মুসলিম মিল্লাত থেকে সংগৃহিত ও সংকলিত একটি আইন গ্রন্থ। এখানে এমন বহু আইন রয়েছে যা আইন প্রণেতার শুধু ব্যক্তিগত দৃষ্টি-ভঙ্গি এবং মনের কামনা-বাসনা থেকে জন্ম হয়েছে। পরবর্তিতে এ মনগড়া আইনই একটি অনুসৃত বিধান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং এ আইনকেই কুরআন ও সুন্নাহর উর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি এমনটি করবে সে নিঃসন্দেহে কাফের।
তিনি আল-বেদায়া ওয়ান্নেহায়াতে (১৩-১২৮) বলেন: যে ব্যক্তি সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ বিন আবদিল্লাহ (সঃ) এর ওপর নাযিলকৃত মহান শরীয়ত (বিধান) কে পরিত্যাগ করবে, আর রহিত বা বাতিলকৃত শরীয়তের ভিত্তিতে বিচার-ফয়সালা চাইবে সে কুফরী করে। তাহলে যে ব্যক্তি ইয়াসার (মানব রচিত বিধান) কাছে বিচার-ফয়সালা চায় এবং একে আল্লাহর বিধানের ওপরে স্থান দেয় তার পরিনতি কি হতে পারে? এ রকম যে করলো সে মুসলমানদের (ওলামায়ে কেরামের) সর্ব সম্মত রায়ে কুফরী করলো।
এ হচ্ছে ইবনে কাছীর (রহঃ) এর কথা। মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর শরীয়তকে বাদ দিয়ে বিচার-ফয়সালা চায় সে কাফের। এ মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই পূর্বসূরীগণ ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কায়্যিম এবং ইবনে কাছীর (রহঃ) উপরে বর্ণিত তাতারীদের কুফরী ও তাগুতী বিধানের মৃত্যু ঘটিয়ে ছিলেন। এর ফলে তারা তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চায়নি, তারা মানব রচিত বিধান পড়েনি, তা শিক্ষা গ্রহন করেনি, তা তারা কার্যকর করেনি, তার সাথে তারা সম্পর্ক রাখেনি। বরং যে ব্যক্তিই মানব রচিত বিধানের কাছে বিচার-ফয়সালা চেয়েছে তার সাথে তারা কুফরী করেছে (অর্থাৎ তাকে অস্বীকার করেছে) ঐ যুগে মুসলমানরা কুফরী বিধানের সাথে এ আচরণ করেছে। সে যুগে মুসলমানরা যা করেছে তা যদি বর্তমান সময়ের লোকেরা করতো, তাহলো বর্তমান যমানার এ দূরাবস্থা হতোনা। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই। যে ব্যক্তি হেদায়াত পেতে চায় তার জন্য এতটুকু জ্ঞানই যথেষ্ট।
📄 বিচারক নিয়োগের বৈধতা এবং শরীয়তের বিচারক না পাওয়া গেলে করণীয় সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের মতামত
আল খাতাবী (রহঃ) তাঁর সুনানে আবী দাউদ নামক গ্রন্থে সফরের সময় আমীর নিয়োগ সংক্রান্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: اذا خرج ثلاثة في سفر فليامروا احدهم
"তিনজন সফরে বের হলে তাদের একজনকে তারা যেনো আমীর ঠিক করে নেয়।"
রাসূল (সঃ) তাদেরকে আমীর ঠিক করে নেয়ার নির্দেশ এজন্য দিয়েছেন যে, তারা যেনো ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং মতামতের ক্ষেত্রে তারা যেনো বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। তারা যেনো মতানৈক্যের মধ্যে পতিত না হয়, আর পরস্পরে কঠোরতা অবলম্বন না করে। এ হাদীসে এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায় যে, বিবাদমান দুব্যক্তি যদি কোনো সমস্যার মীমংসার জন্য তৃতীয় ব্যক্তিকে বিচারক মেনে নেয় এবং সে যদি হক বিচার করে তাহলে তার রায় কার্যকর হবে। (মাআলিমুস সুনান)
আবু বকর বিন আল-মুনযির আন-নাইসাবুরী তাঁর "আল ইজমা, নামক কিতাবে বলেন: ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেন যে, (নিয়োগকৃত সরকারী) কাজী (বিচারক) ব্যতীত অন্য কাজী যদি কোনো ফয়সালা দেয়, আর তা যদি শরীয়ত সম্মত হয় তাহলে তা জায়েয (বৈধ) (কিতাবুল ইজমা)
আবু বকর বিন আল-মুনযির অন্য কাজী বলতে দারুল ইসলামের নিয়োগ প্রাপ্ত বা বিচারের কাজে দায়িত্ব প্রাপ্ত কাজী বা বিচারককে বুঝানো হয়েছে। এবং যদি শরীয়ত সম্মত হয় এ কথার দ্বারা ইসলামী শরীয়তকে বুঝানো হয়েছে।
ইমাম ইবনে কুদামা তাঁর 'আল মুগনী' নামক গ্রন্থে বলেন: যদি বিবাদমান দু'ব্যক্তি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে বিচার নিয়ে যায় এবং সে ব্যক্তি যদি দু'জনের মধ্যে বিচার যোগ্য বিষয়ে সন্তোষ জনকভাবে মীমাংসা করে দেয়, তাহলে তার বিচার করা জায়েয এবং তার রায় বিচার প্রার্থী দু'ব্যক্তির মধ্যে কার্যকর হবে। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এ মতই ব্যক্ত করেছেন। ইমাম শাফী (রহঃ) এর এ ব্যাপারে দু'টি মতামত ব্যক্ত করেছেন। একটি হচ্ছে এই যে, এখানে বিচার প্রার্থী দু'জনের সন্তুষ্টি ছাড়া তৃতীয় ব্যক্তির ফয়সালা দু'জনের জন্য অপরিহার্য নয়। কেননা ফয়সালা তখনই অপরিহার্য হবে যখন এর ব্যাপারে সে রাজী হবে। আর বিচার-ফয়সালা সম্পর্কে জানার পরই সন্তুষ্টি সম্ভব হয়। আর আমাদের কাছে আবু শুরাইহের বর্ণনাই গ্রহণ যোগ্য প্রমাণ। আর তা হচ্ছে রাসুল (সঃ) আবু শুরাইহকে লক্ষ্য করে বললেন: আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন ন্যায়ের আধার অতএব “আবুল হাকাম" উপনামে কেনো তোমাকে ডাকা হয়? (অর্থাৎ আবুল হাকাম উপনাম কেনো তুমি গ্রহণ করেছো) শুরাইহ বললো : আমার জাতি তাদের বিরোধপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসার জন্য আমার কাছে আসে। আমি তাদের মধ্যে এমনভাবে ফয়সালা করে দেই যে, বিবদমান উভয় পক্ষই তাতে সন্তুষ্ট হয়ে যায়। রাসুল (সঃ) তখন বললে এটা কতোই না ভাল কাজ। আচ্ছা, তোমার বড় ছেলের নাম কি? সে বললো: শুরাইহ রাসুল (সঃ) বললেন, অতএব তুমি আবু (শুরাইহ) শুরাইহের পিতা] (নাসায়ী)
হাদীসে বর্নিত আছে, রাসুল (সঃ) এরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি বিবদমান দু'জনের মধ্যে বিচার করলো, এবং এতে উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট হলো কিন্তু যদি বিচারক ইনসাফ না করে তবে সে হবে অভিশপ্ত। যদি বিচারকের বিচার উভয়ের জন্য অপরিহার্য না হতো তাহলে বিচারকের সাথে এ বদনাম সংযুক্ত হতো। হযরত ওমর (রাঃ) এবং উবাই বিন কা'ব (রাঃ) হযরত যায়েদের কাছে বিচার প্রার্থী হয়ে ছিলেন। হযরত ওমর (রাঃ) আরাবি (বেদুইনের) বিরুদ্ধে দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে শুরাইহের কাছে বিচার প্রার্থী হয়েছিলেন। হযরত ওসমান এবং তালহা (রাঃ) হযরত জবাইর বিন মাতআমের কাছে বিচার প্রার্থী হয়েছিলেন অথচ তারা কেউই কাজী বা বিচারক ছিলেন না।
ইমাম আলমাওয়ারদী (রহঃ) বলেন: কোনো শহরের দু'বিবদমান ব্যক্তি যদি প্রজাদের মধ্য থেকে কোনো ব্যক্তিকে তাদের বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালার, জন্য বিচারক ঠিক করে তাহলে ঐ শহরের নিয়োগকৃত বিচারক থাকুক বা নাই থাকুক পূর্ণ বিষয়ের মীমংসা করা জায়েয হবে। হযরত ওমর এবং উবাই বিন কা'ব (রাঃ) হযরত যায়েদ বিন ছাবিত (রাঃ) এর কাছে বিচার প্রার্থী হয়েছিলেন হযরত আলী বিন আবু তালিব (রাঃ) যখন ইমামতির ব্যাপারে ফয়সালা দিলেন তখন ইমামতী ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে বিচার-ফয়সালা করা তো আরো বেশী যুক্তিযুক্ত। এমনিভাবে আবদুর রহমান বিন আওফ ইমামতীর ব্যাপারে আহলে শুরাকে ফয়সালা দিয়েছেন। (আল হাদি আল কাবির)
কাজী আবু ইয়ালা আল-হাম্বলী সুলতানী আইন কানুন সংক্রান্ত বিষয়ে বলেন: যদি কোনো শহরের অধিবাসীরা কাজী শূন্য হয় অর্থাৎ তাদের নির্ধারিত কোনো বিচারক যদি না থাকে, তারা যদি কোনো কাজীর অনুকরণের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে এ ব্যাপারে আমার কথা আছে। যদি তাদের ইমাম ধর্মীয় নেতা, বর্তমান থাকে। তা হলে কাজীর অনুকরণ বাতিল বলে গণ্য হবে। আর যদি ইমাম বর্তমান না থাকে তাহলে অনুকরণ শুদ্ধ হবে এবং কাজীর রায় তাদের ওপর কার্যকর হবে। (আহকামে সুলতানিয়া)
ইবনু আবেদীন আল-হানাফী তাঁর হাশিয়া বা টিকায় বলেন: যদি কাফেরদের আধিক্যের কারণে কোনো স্থানে ধর্মীয় নেতা বা অভিভাবক না পাওয়া যায়, তাহলে মুসলামনদের জন্য অবশ্যকরণীয় হচেছ জুমআর জন্য একজন ইমাম ঠিক করে নেয়া।
তিনি আরো বলেন: যদি কোনো দেশের প্রশাসকেরা সকলেই কাফের হয়, তাহলে মুসলমানদের জুমআ ও ঈদের নামাজের জন্য একজন লোক নিয়োগ করা জায়েয আছে এবং তাঁদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে নিয়োগকৃত কাজী, কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। মুসলমানদের মধ্যে থেকে একজন শাসক খুঁজে বের করা তাদের অপরিহার্য কর্তব্য।
তিনি আরো বলেন: যদি মুসলমানদের জন্য এমন কোনো শাসক কিংবা এমন কোনো কাজী না পাওয়া যায় যার অনুকরণ বা অনুসরণ করা জায়েয, যেমন বর্তমান কসোেভার মত কতিপয় মুসলিম দেশ তাহলে মুসলমানদের উচিৎ হচ্ছে তাদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে একজনকে শাসক ঠিক করে নেয়া। যিনি তাদের বিচারের দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করবেন সাথে সাথে ইমামের দায়িত্ব পালনার্থে জুমআর নামাজও পড়াবেন। (হাসিয়া রদ্দে মুখতার ও দুররুল মুখতার ৩০৮/৪)
📄 জাতিসংঘের কাছে বিচার প্রার্থী হওয়া ও তার সদস্যপদ লাভ করা
জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করা মূলতঃ আল্লাহর শরীয়তকে বাদ দিয়ে (মানব রচিত আইনের কাছে) বিচার প্রার্থী হওয়ারই নামান্তর। এটা এ জন্য যে তাতে গাইরুল্লাহর কাছে বিচার প্রার্থনা করা এবং ঐ আইনের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি জড়িত আছে।
জাতিসংঘ সনদের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় লেখা আছে : ‘এ সব উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে আমরা পারস্পারিক ক্ষমার নীতি গ্রহণে এবং আমরা একত্রে শান্তিতে বসবাস করতে ও সহ অবস্থান করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। শান্তি ও আন্তজার্তিক নিরাপত্তা রক্ষার জন্য আমরা আমাদের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমরা এর নির্দিষ্ট মূলনীতি ও প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আমাদের সশস্ত্র শক্তি যৌথ স্বার্থ সংরক্ষণ ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহার করবোনা। আমারা আন্তর্জাতিক উপকরণগুলোকে সকল জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের কাজে ব্যয় করবো।’
এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, সনদে লিখিত বক্তব্যের যা অর্থ দাড়ায় তা দ্বারা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে জিহাদ) বাতিল হয়ে যায়। অথচ এ জিহাদের মধ্যেই বান্দাগণকে বান্দার গোলামী থেকে বান্দার রবের গোলামীর দিকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিহিত আছে। শুধু তাই নয় এ সনদের বক্তব্যের মাধ্যমে ইসলামের জিজিয়া বা করের নীতিকে বাতিল করা হয়েছে।
জাতিসংঘ সনদের প্রথম অধ্যায়ে প্রথম ধারায় এর উদ্দেশ্যাবলী ও মূলনীতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ ১। আন্তজার্তিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। এ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠান শান্তির জন্য হুমকি প্রদানকারী এবং শান্তি বিনষ্টকারী সকল কারণগুলোকে প্রতিরোধ করার জন্য কার্যকারী যৌথ ব্যবস্থা গ্রহন করবে। আন্তজার্তিক আইন ও ন্যায়ের মূলনীতি অনুযায়ী শান্তির পথে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী সকল আগ্রাসী কার্যকলাপের মূলোৎপাটন শান্তিপূর্ণ উপায় উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে করবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই আন্তর্জাতিক বিবাদ মীমাংসা করা, যা শান্তি বিনষ্টের দিকে ধাবিত করতে পারে।
২। বিভিন্ন জাতির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি হবে সেই মূলনীতির সম্পূর্ন প্রদর্শন যা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক জাতির আত্ম নিয়ন্ত্রনাধিকার থাকবে। এমনি ভাবে সাধারণ শান্তিকে অধিক শক্তিশালী করার জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতির এবং মানবিক বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল আন্তজার্তিক সমস্যার সমাধানের জন্য এবং সকল মানুষের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাকে জোরদার করার জন্য আন্তজার্তিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে জাতি, ধর্ম ও ভাষার মধ্যে কোনো তারতম্য না করে এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ না করে নির্বিশেষে সকলকেই উৎসাহ প্রদান।
এক নম্বর ধারার কথাগুলো লক্ষ্য করুন, আন্তর্জার্তিক আইন ও ন্যায়ের মূলনীতি অনুযায়ী শান্তির পথে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী সকল আগ্রাসী কার্যকলাপের মূলোৎপাটন শান্তিপূর্ণ উপায় উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে করবে। জিহাদ বাতিলের সুস্পষ্ট ঘোষণা এখানে রয়েছে এবং সকল দিক থেকেই আন্তজার্তিক বিধানের কাছে বিচার চাওয়াকে অপরিহার্য করা হয়েছে। যা মূলতঃ তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থনারই নামান্তর। দুই এবং তিন উপধারার কথার দিকে লক্ষ্য করুন যা সম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে "সকল মানুষের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাকে জোরদার করার জন্য আন্তজার্তিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা।" এ ক্ষেত্রে জাতি, ধর্ম ও ভাষার মধ্যে কোনো তারতম্য না করে এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ না করে নির্বিশেষে সকলকেই উৎসাহ প্রদান, কে রাব্বুল আলামীনের ইবাদত করে, আর কে মূর্তি, প্রতিমা, জড় পদার্থ, গরু ও পাথরের পূজা করে এর মধ্যে কোনো পার্থক্যের কথা এখানে বলা হয়নি। প্রত্যেকেরই নিজস্ব অধিকার আছে। যে ব্যক্তিই এ প্রতিষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করবে, সদস্যপদ লাভ করবে তাকেই উপরোক্ত বাতিল কথাগুলোর স্বীকৃতি দিতে হবে। জাতিসংঘ সনদের ৪র্থ ধারার প্রথম উপধারায় লেখা আছে।
১। শান্তিপ্রিয় অন্যান্য সকল রাষ্ট্রের জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করা বৈধ। যে দেশ সনদের সন্নিবেশিত সকল বাধ্যবাধকতা মেনে চলবে এবং যে দেশের ব্যাপারে এ প্রতিষ্ঠান মনে করবে যে, দেশটি যাবতীয় বাধ্যবাধকতা মেনে চলার জন্য সক্ষম এবং এ প্রতিষ্ঠান যে দেশের ব্যাপারে আগ্রহী হবে সে দেশের জন্য সদস্য পদ লাভ করা বৈধ।
সনদের ৬ষ্ঠ ধারায় লেখা আছে: জাতিসংঘের কোনো সদস্য যদি অনুধাবন করে কোনো দেশ কর্তৃক সনদের মৌলিকত্ব খর্ব হবে, তাহলে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ সভার জন্য ঐ দেশের সদস্যপদ বাতিল করার বৈধতা রয়েছে।
এই কুফরী উপধারার স্বীকৃতির দ্বারা জিহাদ, জিজিয়া এবং ইসলামের অভিভাবকত্বের নীতি বাতিল করা হয়েছে এবং দ্বীন ইসলামকে বিশ্বজনিনের পরিবর্তে প্রাদেশিক দ্বীন বানানো হয়েছে। [আল্লাহর] একাত্ববাদে বিশ্বাসী লোকদের বিরুদ্ধে পৌত্তলিকতা ও মুর্খতার পতাকাতলে কাফেরদের সাথে মিশে যুদ্ধ করার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বিবাদপূর্ন বিষয়ের ফয়সালার জন্য তাদের দাবী অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইন তথা আন্তর্জার্তিক আদালতের কাছে যেতে বলা হয়েছে। এ সব বিষয়ের প্রত্যেকটিই ইসলাম পরিত্যাগ করে মুরতাদ হওয়াকে অপরিহার্য করে তোলে। তাই যে দেশই জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভে অংশ গ্রহণ করবে, সে দেশই জাতিসংঘ সনদের স্বীকৃতির মাধ্যমে কলেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর বিরোধিতা দ্বারা কুফরী করবে। নিচে সংক্ষেপে জাতিসংঘ সনদে কুফরীর কয়েকটি বিষয় প্রদত্ত হলো।
১। সদস্য পদ লাভের সময় জাতিসংঘের সকল আইন-কানুন মেনে নেয়া অপরিহার্য (৪র্থ ও ৬ষ্ঠ ধারা)।
২। অধিকার ও দায়িত্ব কর্তব্যের ক্ষেত্রে একজন মূর্তি পূজারী কাফের এবং একজন তাওহীদবাদী মুসলমানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই এবং এতে রয়েছে ইসলামের জিজিয়া বা কর প্রথা রহিত করণ (১ম ধারা ৩য় উপধারা)।
৩। জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ [আল্লাহর পথে সংগ্রাম] এর ফরজিয়াত বাতিল বা রহিত করণ (১ম ধারা প্রথম উপধারা।)
৪। সিদ্ধান্ত এবং ফয়সালা চুড়ান্ত হয় সংখ্যাঘরিষ্ট লোকের রায়ের ভিত্তিতে, আল্লাহ ও রাসুল (সঃ) বিধানের ভিত্তিতে নয়। (১৮তম ধারা ২য় উপধারা) এতে লেখা রয়েছে, সাধারণ গুরুত্বপূর্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণকারী উপস্থিত (সভায়) দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের রায় বা ভোটের ভিত্তিতে। যে সব বিষয় এর অন্তর্ভূক্ত সেগুলো হচ্ছে, আন্তজার্তিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বিশেষ সুপারিশ। নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যদের নির্বাচন। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সদস্যদের নির্বাচন। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নির্বাচন (৮৬ নং ধারা মোতাবেক) জাতিসংঘে নতুন সদস্য গ্রহণ। সদস্যগণের সদস্য পদ সংক্রান্ত অধিকার প্রয়োগ স্থগিতকরণ এবং তা ভোগ করা। সদস্যদের বহিস্কার। সুপারিশ ও উপদেশ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ সংক্রান্ত বিষয় এবং বাজেট সংক্রান্ত বিষয়।
৫। জাতিসংঘের সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের জন্য যে নিরাপত্তা পরিষদ সামরিক ও যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্ম কান্ড পরিচালনা করবে, তা গঠিত হবে সমস্ত কুফরী রাষ্ট্রগুলো নিয়ে। সৈন্য পরিচালনার জন্য জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যগুলোই হচ্ছে মূল নিয়ন্ত্রক। দেশগুলো হচ্ছে: (১) চীন (২) ফ্রান্স (৩) রাশিয়া (৪) বৃটেন (৫) আমেরিকা।
কোনো অবস্থায়ই এদেশগুলোর নেতৃত্ব বদলাবে না। অর্থাৎ যুদ্ধ পরিচালিত হবে তাদের নেতৃত্বে। এ ব্যাপারে ২৩ নং ধারা ১ নং উপধারায় লিখিত আছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গঠিত ১৫টি দেশ নিয়ে। দেশগুলো হচ্ছে – চীন, ফ্রান্স, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েট ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, উত্তর আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, এ সব দেশগুলোর এ’তে স্থায়ী সদস্য থাকবে। সাধারণ সভা জাতিসংঘের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে থেকে নিরাপত্তা পরিষদের জন্যে অস্থায়ী সদস্য হিসাবে দশ জনকে নির্বাচিত করবে।
আন্তজার্তিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য উদ্দেশ্য সাধনের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে জাতিসংঘের সদস্যদের অংশ গ্রহণের বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। যেমনভাবে ন্যায় সংগত ভৌগোলিক বণ্টনের বিষয়টি খেয়াল রাখা হয়।
একইভাবে জাতিসংঘের ৪৬তম, ৪৭তম এবং ৪৮তম ধারায় যে বর্ণনা এসেছে তা দ্বারা এটাই সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয়েছে যে যুদ্ধ পরিচালিত হবে মুশরিকদের তত্ত্বাবধানে।
৪৬তম ধারায় বলা হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহারে জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহন করবে, নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধ পরিচালনা কমিটির সহযোগিতায়।
৪৭তম ধারার ১ নং উপধারায় বলা হয়েছে ষ্টাফ অফিসারদেরকে নিয়ে কমিটি গঠিত হবে। এ কমিটির কাজ হবে নিরাপত্তা পরিষদকে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান এবং আন্তজার্তিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের নেতৃত্বে ও তত্ত্বাবধানে শক্তি ব্যবহার করার জন্য সশস্ত্রকরণ ব্যবস্থাপনা এবং যথাসাধ্য নিরস্ত্রীকরণের জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে সহযোগিতা প্রদান।
৪৮তম ধারার প্রথম উপধারায় রয়েছে" নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতিসংঘের সকল সদস্য অথবা কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য পরিষদের সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কর্ম তৎপরতা চালাবে।
৬। বন্ধুত্ব ও শত্রুতার ইসলামী দৃষ্টিকোণ রহিত করণঃ এ ব্যাপারে ৪৭তম ধারায় বলা হয়েছে, সকল মানুষের মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতা জোরদার করার জন্য জাতি, ধর্ম ও ভাষার মধ্যে কোন তারতম্য না করে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য না করে নির্বিশেষে সকলকেই উৎসাহ প্রদান এবং বিশ্বের সকল জাতির মধ্যে পারস্পারিক কি সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা অনুধাবন করার জন্য উৎসাহ প্রদান।
৭। তাগুতের (বা খোদাদ্রোহী শক্তির) কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার। (৯২তম ধারা) জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতই হচ্ছে তার বিচার সংক্রান্ত উপকরণ বা মাধ্যম। এ আদালত কাজ করবে সনদের সাথে সম্পৃক্ত মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী। এ সনদের ভিত্তি হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্থায়ী আদালতের মৌলিক নীতি, যা জাতিসংঘ সনদের অবিচ্ছেদ অংগ।
৯৪তম ধারার ১ নং উপধারায় বলা হয়েছে: জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য যে কোন বিষয়ে বা মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মেনে নিতে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ।
উপরোক্ত এ সব বিষয়গুলো দ্বীন ইসলাম এবং তাওহীদে বিশ্বাসী জাতির সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শ। অথচ এ আদর্শ দিয়েই আল্লাহ তায়ালা সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরامকে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
"আমি প্রত্যেক জাতির কাছেই রাসূল প্রেরণ করেছি, এ মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দুরে থাকো।" (নাহল:৩৬)
এটা নিঃসন্দেহ যে, জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভকারী প্রতিটি রাষ্ট্রই এ জঘণ্য কুফরীতে পতিত হয়েছে। কেননা এর মধ্যে রয়েছে তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থনা করা, জিহাদ এবং জিজিয়া (কর প্রথা) রহিত করণ, মুশরিকদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহন করা এবং তাদেরকে সাহায্য করা তাওহীদবাদী লোকদের বিরুদ্ধে তাদের পতাকা ও নিশান সমুন্নিত রাখার বাধ্যবাধকতা যার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাদের মূর্তি ও প্রতিমাগুলো তাদের আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি এবং সরকারী প্রতীক সমুহের সম্মান প্রদর্শন।
জাতিসংঘ সনদে সংরক্ষণ, বাস্তবায়ন এবং কার্য সম্পাদন সংক্রান্ত বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া এবং সমাবেশে তা ঘোষণা দেয়া। আন্তর্জাতিক সিন্ধান্ত গ্রহনের ব্যাপারে সংখ্যা গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভোট প্রদান, আল্লাহর হুকুমে নয়। ভোট প্রদান যদি আল্লাহর কোন নির্দেশের বিরুদ্ধে কিংবা কোনো নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে হয় তবুও ভোট দেয়া। যেমন-ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অথবা না করা অথবা লুটেরা উপনিবেশবাদীকে বহিষ্কার করা।
কোনো তাওহীদবাদী দেশ যদি আল্লাহর পথে জিহাদ করে আর কোনো দেশ জয় করে, তাহলে এসব নাস্তিক, খোদাদ্রোহী দেশগুলোর পক্ষে থেকে ঐ মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে লড়তে বাধ্য। কেননা এসব [জাতিসংঘভূক্ত] রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সীমারেখা একে দেয়া হয়েছে, তা সংরক্ষনে ঐক্যবদ্ধ এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অধিকার ও দায়িত্ব কর্তব্যের ক্ষেত্রে কাফের মুসলিম নির্বিশেষে সকলের অধিকার সমান। এ নীতিতে জিহাদ, জিজিয়া (কর) গনিমত এবং বন্দী সংক্রান্ত বিষয়ের কোনো অবকাশ নেই। জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্যের জন্যই এ বিষয়গুলো অপরিহার্য। যে সদস্যই এর বিরোধিতা করবে তাকে বুঝতে হবে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো। আর প্রকাশ্য কিংবা গোপনে যে কোনো অবস্থায় উপরোক্ত বিষয়গুলোতে সম্মতি জ্ঞাপন করার অর্থই হচ্ছে সুস্পষ্ট ভাবে ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়ে যাওয়া।