📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 কথা ও কাজে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ

📄 কথা ও কাজে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ


ইমাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব বলেন:
একথা অবশ্যই জেনে রাখা প্রয়োজন যে, আপনাকে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন "তাঁর ইবাদত করার জন্য"। তাঁর আনুগত্য আপনার ওপর ফরজ করে দিয়েছেন। তাঁর ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফরজ হচ্ছে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহকে এলেম, কথা ও কাজের দিক থেকে জানা। আল্লাহ তায়ালার নিম্মোক্ত বাণী এর প্রমাণ বা দলীল: وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا -
"তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে আঁকড়ে ধরো, আর বিচ্ছিন্ন হয়োনা।" (আল-ইমরান: ১০৩) شَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّيْنِ مَا وَصَّى بِهِ نُوْحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ ابْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
"তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করে দিয়েছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি হে মুহাম্মদ অহি করেছি আপনার প্রতি, এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মুসা, এবং ঈশাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।" (আশ শুরা-১৩)
আরো জেনে রাখা দরকার যে, বান্দার প্রতি আল্লাহ তায়ালার অছিয়ত [উপদেশ] হচ্ছে সেই তাওহীদের কলেমাকে নিশ্চিত করা, যা কুফর এবং ইসলামের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে। এখানেই লোকজন মূর্খতা বশতঃ অথবা অন্যায় ভাবেঃ কিংবা বিরোধিতা করে বিভিন্ন ফেরকায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। আন اقيموا الدين ولا تتفرقوا فيه [তোমরা দ্বীন কায়েম করো এ ব্যাপারে তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না] আল্লাহ তায়ালার এ বাণী অনুযায়ী (মুসলিম) জাতির ঐক্যই তাদেরকে একীভূত করতে পারে এর আরো প্রমাণ হচ্ছে: قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُوا إِلَى اللَّهِ مَن عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي ، وَسُبْحَنَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ -
"বলে দিন, এটাই আমার পথ, আমি এবং আমার অনুসারিরা আল্লাহর দিকে বুঝে শুনে দাওয়াত দেই। আল্লাহ পবিত্র। আমি মুশরিকদের অর্ন্তভূক্ত নই।” (ইউসুফ : ১০৮)
প্রত্যেকেরই কর্তব্য হচ্ছে যখন তাওহীদ সম্পর্কে সে জানতে পারবে এবং তা স্বীকার করে নিবে, তখন তাওহীদ ভালবাসবে অন্তর দিয়ে এবং একে সাহায্য করবে তার জবান ও হাত দিয়ে। তাওহীদের সাহায্যকারী এবং সহযোগিতাকারীকে সে সাহায্য করবে। আবার যখন শিরক সম্পর্কে সে জানতে পারবে এবং শিরককে শিরক হিসেবে স্বীকার করবে, তখন অন্তর দিয়ে সে শিরককে ঘৃণা করবে। এরকম হলেই বান্দা সেই ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হবে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا -
"তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধভাবে আকড়ে ধরো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না]"
অতএব একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই যে, তাওহীদের স্বীকৃতি অবশ্যই হতে হবে অন্তর দিয়ে [যার অপর নাম জ্ঞান], স্বীকৃতি হতে হবে জবান দিয়ে কথার মাধ্যমে, এবং স্বীকৃতি হতে হবে আমল দিয়ে বিধি-নিষেধ গুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে, যদি বান্দার মধ্যে এ বিষয়গুলোর কোনো একটি না পাওয়া যায়, তাহলে সে মুসলমান হতে পারবেনা। যদি সে তাওহীদকে স্বীকার করে নিলো কিন্তু স্বীকৃতি অনুযায়ী কাজ করলোনা, তাহলে সে ফেরাউন ও ইবলিসের মতো বিদ্রোহী কাফের হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যদি বান্দা বাহ্যিক দিক থেকে তাওহীদের আমল করে কিন্তু গোপনে বা অন্তরে তা বিশ্বাস করে না, তাহলে সে খাটি মুনাফিক হিসেবে বিবেচিত হবে, যার অবস্থা কাফেরের চেয়েও খারাপ। তিনি [মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ)] আরো বলেনঃ তাওহীদ দুই প্রকার। তাওহীদুর রুবুবিয়‍্যাহ [রুবুবিয়‍্যাত সংক্রান্ত তাওহীদ) এবং তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ [ইবাদত সংক্রান্ত তাওহীদ]
রুবুবিয়‍্যাত সংক্রান্ত তাওহীদ কাফের এবং মুসলিম উভয়েই স্বীকার করে। আর উলুহিয়্যাত সংক্রান্ত তাওহীদই কুফরী এবং ইসলামের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে। অতএব প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে উভয় তাওহীদের পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন থাকা। তার অবশ্যই জানা উচিৎ যে, আল্লাহ তায়ালাই "সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা এবং নিয়ন্ত্রক" এ কথা কাফেররা অস্বীকার করেনা।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يَخْرُجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمُيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ ، فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ : فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ -
"আপনি জিজ্ঞেস করুন, আসমান ও যমীন থেকে তোমাদেরকে কে রিযিকদান করেন, কিংবা তোমাদের কান ও চোখের মালিককে? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভিতর থেকে বের করেন, আবার কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থা করেন, তখন তারা বলে উঠবে, 'আল্লাহ'। তখন আপনি বলুনঃ তারপরও তোমরা তাঁকে ভয় করছোনা কেন?" (ইউনুছ: ৩১)
তিনি আরো ইরশাদ করেন : وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَوتِ وَالْأَرْضَ وَسَتَحَرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ : فَإِنِّي يُؤْفَكُونَ
"যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছেন, সূর্য ও চন্দ্রকে কে কর্মে নিয়োজিত রেখেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, "আল্লাহ"। তাহলে তারা কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে?" (আল আনকাবুত :৬১)
এটা যখন সুস্পষ্ট ভাবে জানা গেলো যে, কাফেররাও একথা স্বীকার করে যে, আল্লাহই সৃষ্টি করেন, রিযিক দান করেন এবং সব বিষয়ের পরিকল্পনা আল্লাহ ছাড়া কেউ করেনা' তোমার একথা তোমাকে মুসলমান বানাতে পারবেনা যতক্ষণ না তুমি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ দ্বারা যে অর্থ বুঝায় সে অনুযায়ী আমল করবে। আল্লাহর এ সব নামের প্রতিটির একটি বিশেষ অর্থ রয়েছে। আল্লাহকে তুমি 'খালেক' বলছো। 'খালেক' এর অর্থ হচ্ছে, যিনি অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে সমগ্র সৃষ্টিকে অস্তিত্বে এনেছেন, তখন থেকেই তার রিযিকের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আর মুদাব্বির অর্থ হচ্ছে তিনিই ফেরেস্তাগণকে তার পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান, আবার তাঁরই নির্দেশে তারা আকাশে উড্ডয়ন করে। তাঁরই নির্দেশনায় মেঘ আকাশে ভাসে তাঁরই নির্দেশনায় বাতাস প্রবাহিত হয়। এমনি ভাবে তাঁর সকল সৃষ্টি পরিচালিত হয়। তিনিই তাঁর ইচ্ছা মোতাবেক সকল সৃষ্টিকে পরিচালিত করেন। আল্লাহ তায়ালার এ সব নাম, যেগুলো কাফেররাও স্বীকার করে সেগুলো রুবুবিয়্যাত সংক্রান্ত তাওহীদের সাথে সম্পৃক্ত। তাওহীদুল ইলুহিয়্যাহ ইবাদত সংক্রান্ত তাওহীদ হচ্ছেঃ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর মৌখিক স্বীকৃতির সাথে সাথে রুবুবিয়্যাত সংক্রান্ত নামগুলোর অর্থ জানার মতোই 'ইলাহ' সংক্রান্ত নামগুলোর অর্থ জানা। তাই 'লা-ইলাহা ইল্লাহ এর মধ্যে ইতিবাচক নেতিবাচক দুটি দিক আছে। তা হচ্ছে উলুহিয়্যাত [ইলাহ হওয়ার যোগ্যতা] কে সম্পূর্ন রূপে অস্বীকার করে একমাত্র আল্লাহর জন্যই তা সাব্যস্ত করা। একমাত্র ইলাহ, মা'বুদ [উপাস্য] যিনি ব্যতীত ইবাদত পাওয়ার যোগ্যতা আর কারো নেই তিনি হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ । তাই যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে মানত করলো, অথবা পশু জবাই করলো, সেই গাইরুল্লাহর ইবাদত করলো। এমনি ভাবে যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া করলো, সেই গাইরুল্লাহর ইবাদত করলো।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: وَلَا تَدْعُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ ، فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّلِمِينَ
"আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকবেনা, যে তোমার ভাল করতে পারবেনা মন্দও করতে পারবেনা। বস্তুতঃ তুমি যদি এমন কাজ করো তাহলে তুমিও জালেমদের অর্ন্তভূক্ত হয়ে যাবে।" (ইউনুছঃ ১০৬)
এমনিভাবে যে ব্যক্তি তার নিজের ও আল্লাহর মাঝে কাউকে মাধ্যম বানিয়ে নিলো এবং একথা দাবী করলো যে, উক্ত মাধ্যম তাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে, সেও গাইরুল্লাহর [ মাধ্যমের] ইবাদত করলো। আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের ব্যাপারে এ বিষয়টিই উল্লেখ করেছেন: وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاءُنَا عِنْدَ اللهِ ، قُلْ اَتَنَبؤُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمُوتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ * سُبْحْنَهُ وَ تَعلَى عَمَّا يُشْرِكُونَ (يونس - (۱۸)
"তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর উপাসনা করে, যা তাদের না করতে পারে কোনো ক্ষতি, না করতে পারে কোনো উপকার। আর তারা বলে, এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ে অবহিত করতে চাও, যে সম্পর্কে তিনি আসমান ও জমীনের মাঝে অবহিত নন? তিনি পুতঃপবিত্র ও মহান সে সমস্ত জিনিস থেকে, যে গুলোকে তোমরা শরীক করছো।" (ইউনুছ: ১৮) الا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ ، وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاء مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى - إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ ، إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَذِبٌ كَفَّارُ (الزمر - (٣)
"জেনে রাখো, নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত আল্লাহরই নিমিত্ত। যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদত এজন্যই করি যেনো তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পারষ্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করে দিবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।" (আয-যুমার: ৩)

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 মুসলিমের জন্য মুশরিক থেকে আলাদা বৈশিষ্টের অধিকারী হওয়ার উপায়

📄 মুসলিমের জন্য মুশরিক থেকে আলাদা বৈশিষ্টের অধিকারী হওয়ার উপায়


মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেনঃ
পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি কোনো কিছুর অস্তিত্বহীন অবস্থার মধ্যে স্বীয় সৃষ্টি কর্মের মাধ্যমে নিজের অপরিহার্য অস্তিত্বের প্রমাণ পেশ করেন। যাঁর জাত [সত্ত্বা] এবং সিফাত [গুণাবলী] যাবতীয় সাদৃশ্য এবং উপমার উর্ধ্বে। অস্তিত্বের মধ্যে যা কিছু আছে সবই তিনি সৃষ্টি করেছেন, তাই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র জিনিস তাঁর জ্ঞান থেকে অদৃশ্য হতে পারেনা।
প্রশংসা করি পবিত্র আল্লাহর এবং তাঁরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, যিনি আমাদেরকে দ্বীন ইসলামের দিকে পথ দেখিয়েছেন। বক্রতা এবং পথ ভ্রষ্টতার সংশয় থেকে আমাদেরকে মুক্ত করেছেন। আর সাক্ষ্য দিচ্ছি এই যে, এক আল্লাহ ছাড়া অর কোনো ইলাহ নেই। তাঁর কোনো শরীক নেই। সকাল সন্ধ্যা তাঁর 'মুওয়াহহিদ' (একত্ববাদের ঘোষণাকারী) হিসেবে সাক্ষ্য দিচিছ। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নেতা মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁরই বান্দা এবং রাসূল। যিনি নবী হিসেবে আমাদের জন্য নিয়ে এসেছেন একটি ন্যায় সঙ্গত দ্বীন। যার ফলে আমরা তাঁর নিয়ে আসা স্বচ্ছ নির্মল অমীয় সূধা পান করতে সক্ষম হয়েছি। হে আল্লাহ, তুমি মুহাম্মদ (সঃ) এবং তাঁর পরিবার, তাঁর উত্তম সাহাবায়ে কেরام ও তাঁদের পরিবার বর্গের ওপর অবারিত শান্তি ও করুণা বর্ষণ করো।
আমার কতিপয় বন্ধু-(যাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করা আমার উচিৎ নয়)-এমন চারটি প্রবদ্ধ ও চারটি নীতির ব্যাপারে কিছু লিখতে এবং সংকলন করতে আবেদন করলেন, যার মাধ্যমে একজন মুসলমান একজন মুশরিক থেকে আলাদা বৈশিষ্টের অধিকারী হতে সক্ষম হয়।
এক : যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং আকৃতি বিশিষ্ট করেছেন, তিনি উদ্দেশ্যহীনভাবে আমাদেরকে এই পৃথিবীতে ছেড়ে দেননি। বরং তিনি আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন রাসূল, যার সাথে ছিলো আমাদের রবের পক্ষ থেকে এক মহাগ্রন্থ। যে ব্যক্তি তাঁর আনুগত্য করবে সে যাবে জান্নাতে। আর যে ব্যক্তি নাফরমানী করবে সে যাবে জাহান্নামে। এর প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার বাণীঃ
إِنَّا أَرْسَلْنَا إِلَيْكُمْ رَسُولًا شَاهِدًا عَلَيْكُمْ كَمَا أَرْسَلْنَا إِلَى فِرْعَوْنَ رَسُولًا - (المزمل : ١٥)
"আমি তোমাদের কাছে একজন রাসূলকে তোমাদের জন্য স্বাক্ষী হিসেবে প্রেরণ করেছি, যেমন প্রেরণ করেছিলাম ফেরাউনের কাছে একজন রাসূল।" (মুয্যাম্মিল: ১৫)
দুই : একনিষ্ঠ ভাবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করার জন্যই তিনি সমগ্র সৃষ্টি জগৎকে সৃষ্টি করেছেন। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা বাণী :
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ -
"আমি জ্বীন এবং মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।" (আয-যারিয়াত - ৫৬)
তিনি আরো বলেনঃ
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلوةَ وَيُؤْتُوا الزَّكُوةَ وَذُلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ
"তাদেরকে এটা ছাড়া কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে এবং যাকাত দিবে। এটাই সঠিক ধর্ম।" (বাইয়্যিনাহ্ : ৫)
তিন : যখন বান্দার ইবাদতের মধ্যে শিরক ঢুকবে, তখনই ইবাদত বাতিল হবে এবং প্রত্যাখাত হবে। শিরক ব্যতীত সকল পাপেরই ক্ষমার আশা করা যায়। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণী :
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ : لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ
"আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববতীদের প্রতি ওহি [প্রত্যাদেশ] হয়েছে, যদি আল্লাহর শরীক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্ত লোকের মধ্যে শামিল হবেন।" (আয যুমার: ৬৫)
আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ، وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا -
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না, যে ব্যক্তি তাঁর সাথে শরীক করে। এ ছাড়া তিনি অন্যান্য গুনাহ ক্ষমা করবেন, যার জন্য ইচ্ছা করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করলো, সে যেনো মহা অপবাদ আরোপ করলো।" (আন নিসাঃ ৪৮)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন:
إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوُهُ النَّارُ ، وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنصَارِ (المائدة (٧٢)
"নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তাঁর বাসস্থান হয়ে যায় জাহান্নাম।" (আল মায়েদা: ৭২)
চার : যদি বান্দার আমল ঠিক হয়, কিন্তু আমলে [কর্মে] ইখলাস বা একনিষ্ঠতা না থাকে তাহলে সে আমল আল্লাহর কাছে কবুল (গ্রহণযোগ্য) হবে না। আর যদি কাজে একনিষ্ঠতা থাকে, কিন্তু কাজটি শুদ্ধ না হয় তাহলেও কাজটি কবول (গ্রহণ যোগ্য) হবে না। তাই আমল [কাজ] অবশ্যই একনিষ্ঠতা পূর্ণ হতে হবে এবং মুহাম্মদ (সাঃ) এর শরীয়ত [বিধান] মোতাবেক শুদ্ধ হতে হবে। একারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আহলে কিতাবের [আসমানী কিতাবধারী যথা ইহুদী, নাসারা] ওলামা, আবেদ [পীর বজুর্গ, সূফী, দরবেশ] এবং ক্বারীদের [কিতাব পাঠক] সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ اَعْمَالاً - الَّذِينَ ضَلَّ سَعِيهُمْ فِي الْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنعًا -
"বলুন: আমি কি তোমাদেরকে সে সব লোকের সংবাদ দিবো, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত? তারাই সেই লোক, যাদের চেষ্টা সাধনা পার্থিব জীবনে বিভ্রান্ত হয়, অথচ তারা মনে করে যে, তারা খুব ভাল কাজই করছে।" (কাহাফ: ১০৩-১০৪)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন:
وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ خَاشِعَةٌ عَامِلَةٌ نَاصِبَةٌ تَصَلَّى نَارًا حَامِيَةً (الغاشية : ٧)
"অনেক মুখ মন্ডল সেদিন হবে লাঞ্চিত, ক্লিষ্ট, ক্লান্ত, তারা জ্বলন্ত আগুনে পতিত হবে। (আল-গাশিয়াহ: ২-৪)
কুরআনের এ সমস্ত আয়াত শুধুমাত্র আহলে কিতাবের [আসমানী কিতাব প্রাপ্তদের] ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয় বরং এমন প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যে, এলেম [জ্ঞান], আমল [কর্ম] ও পঠনের ক্ষেত্রে চেষ্টা সাধনা করে বটে কিন্তু তা মুহাম্মদ (সঃ) এর শরীয়ত [বিধান] সম্মত নয়, এমতাবস্থয় সে আমলের দিক থেকে সেই সব ক্ষতিগ্রস্ত লোকদেরই অর্ন্তভূক্ত হবে, যাদের কথা আল্লাহ তায়ালা তার জ্ঞান সমৃদ্ধ মহাগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। যদি সে মেধা ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হয়, তার মধ্যে যদি [পরকালের প্রতি] অনুরাগ থাকে, আর সে চরিত্রবান হয়, তাহলে কুরআনে ও হাদীসের অনুসরণ ব্যতীত তার শান্তি লাভের এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচার কোনো অজুহাত তার থাকবেনা। মেধা শক্তি, [মানুষের] শারীরিক এবং ইচ্ছা শক্তির মতোই, যে ব্যক্তি জ্ঞানগত মর্যাদা আর ইচ্ছা শক্তি প্রাপ্ত হয়েছে, অথচ সে তা শরীয়ত সম্মত ভাবে কাজে লাগায়না, তার অবস্থা ঐ ব্যক্তির মতোই যে ব্যক্তির শরীর ও দেহে শক্তি দেয়া হয়েছে অথচ শরীরিক শক্তির দ্বারা কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারে না।

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 দ্বীন ইসলামের মূল ও নীতি

📄 দ্বীন ইসলামের মূল ও নীতি


ইমাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেনঃ দ্বীন ইসলামের মূল এবং তার নীতি দুটি বিষয়ের মধ্যে নিহিত।
প্রথমটি হলো : এক আল্লাহ, যার কোনো শরীক নেই, একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার নিদের্শ দান, এ শিরক বিহীন ইবাদতের প্রতি উৎসাহ প্রদান, এ ক্ষেত্রে সাহায্য করা এবং যে ব্যক্তি একাজ পরিত্যাগ করবে তার প্রতি কুফরী আরোপ করা।
দ্বিতীয়টি হলোঃ আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে শিরকের ব্যাপারে ভয় [জাহন্নাম ও ইবাদত বাতিলের ভয়] প্রদর্শন, শিরকের বিরোধিতা করা এবং শিরকী কাজে লিপ্ত ব্যক্তির প্রতি কুফরী আরোপ করা। এ ব্যাপারে মতভেদ বা বিরোধিতা কারীদের অনেক শ্রেণী ভাগ আছে। এদের মধ্যে সব চেয়ে জঘণ্য হলো যারা সর্ব ক্ষেত্রেই বিরোধতা করে। মানুষের মধ্যে এমন লোক রয়েছে যারা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করে এবং শিরককে অস্বীকার করেনা এবং শিরক কারীদের বিরোধিতাও করেনা।
* কিছু সংখ্যক লোক এমন যারা শিরকে লিপ্ত ব্যক্তিদের বিরোধিতা করে কিন্তু তাদের প্রতি কুফরী আরোপ করেনা।
* কিছু লোক আছে যারা তাওহীদ পছন্দ করেনা আবার ঘৃনাও করেনা।
* কিছু লোক এমন আছে, যারা শিরকে লিপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি কুফরী আরোপ করে আবার এটাও দাবী করে যে, সে নেককার ব্যক্তিদের জন্য গাল-মন্দের কারণ।
* কতিপয় লোক এমন আছে, শিরকের প্রতি যাদের ক্রোধও নেই, ভালবাসাও নেই। আবার কিছু সংখ্যক লোক এমন আছে, যারা শিরক সম্পর্কে জানেও না, এবং তা অস্বীকারও করে না।
* কিছু সংখ্যক লোক এমন ও আছে, যারা তাওহীদ জানেও না, তা অস্বীকারও করেনা।
আবার কিছু সংখ্যক লোক এমনও আছে, (তারা হচ্ছে সবচেয়ে বিপদজনক) যারা তাওহীদের আমল করে বটে কিন্তু তাওহীদের মূল্য তাদের জানা নেই বিধায় তাওহীদ পরিত্যাগ কারীর প্রতি তাদের ক্রোধ নেই, ঘৃণাও নেই। এ জন্য তাওহীদ পরিত্যাগ কারীর প্রতি তারা কুফরীও আরোপ করেনা।
এমন কিছু লোক আরো আছে, যারা তাওহীদ পরিত্যাগ করেছে এবং তাওহীদ কে ঘৃণাও করে এবং তাওহীদের মূল্যও জানেনা। এসব লোক মূলতঃ আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) যা আনয়ন করেছেন তার বিরোধিতা করে। [আল্লাহই ভাল জানেন] (মাজমুআতুল ফাতাওয়া ওয়ার রাসায়েল ওয়াল আজওইবা ১২৬ পৃষ্ঠা)
শাইখ আবদুর রহমান বিন হাসান আল-শাইখ (রহ) এ কথাগুলোর সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। [দেখুন মাজমু আত্মত্তাহীদ প্রথম প্রবন্ধ পৃঃ৪৭]
ইমাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব আরো বলেনঃ যে আল্লাহ ইসলাম দ্বারা আপনার ওপর করুনা করেছেন, এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই একথা শিখিয়েছেন, আপনি যখন বলবেন যে, [আল্লাহ সম্পর্কিত] এ কথা ঠিক, এবং আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে মানিনা কিন্তু আমি মুশরিকদের বিরোধিতা করিনা এবং তাদের ব্যাপারে আমি কোনো কথাও বলি না, এর দ্বারা আপনার ইসলামে প্রবেশ করা নিশ্চিত হয়েছে। বরং আপনাকে অবশ্যই মুশরিকদের ক্রোধ ও ঘৃণা রাখতে হবে। এমনকি ঘৃণা করতে হবে এমন লোকদেরকে, যারা তাদেরকে ভালবাসে। তাদের বিরোধিতা করতে হবে, [তাওহীদের স্বার্থে) তাদের সাথে দুশমনি করতে হবে। যেমনটি করেছিলেন আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গী সাথীগণ। তাঁরা বলেছিলেন :
إِنَّا بُرَعَؤُا مِنكُم وَ مِمَّا تَعْبُdُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ ، كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيَنِكُمْ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحدَهُ - (الممتحنة: ٤)
"তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত করো, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে মানিনা। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চির শত্রুতা বহাল থাকবে।" (আল মুমতাহিনা : ৪)
فَمَنْ يَكْفُرُ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنُ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ وَالْوُثْقَى -
"যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, সে এমন শক্ত রজ্জু ধারণ করবে যা ভেঙ্গে যাবার নয়।" (আল বাকারাহ: ২৫৬)
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
"আমি প্রত্যেক উম্মতের কাছেই এ মর্মে রাসূল পাঠিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো আর তাগুত থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকো।" (নাহল: ৩৬)
যদি কেউ বলে: আমি নবী (সঃ) এর অনুসরণ করি, তিনি হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আমি লাত আর ওজজার বিরোধিতা করিনা, এবং আবু জাহেল ও তার মতো যারা আছে তাদেরও বিরোধিতা করিনা, কেননা তাদের বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনো দায়-দায়িত্ব আমার নেই, তাহলে তার ইসলাম সঠিক ও গ্রহণ যোগ্য হবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00