📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 দ্বিতীয় বিষয়

📄 দ্বিতীয় বিষয়


আল্লাহর একাত্ববাদের স্বীকৃতি প্রদান এবং বিশ্বাস, কথা ও কাজের মাধ্যমে তাঁরই ইবাদত করা। কেননা আল্লাহর ইবাদত এবং তাওহীদ দুটি রুকন বা স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

(১) তাগুতের সাথে কুফরী, (২) আল্লাহর প্রতি ঈমান।

(১) তাগুতের সাথে কুফরীঃ এ বিষয়টি তাওহীদের রুকন (অত্যাবশ্যকীয় স্তম্ভ) গুলোর মধ্যে প্রথম রুকন। এ অত্যাবশ্যকীয় স্তম্ভটি বিশ্বাস, কথা এবং কাজের মাধ্যমে তাগুতের সাথে কুফরী করা ব্যতীত কখনো সহীহ (শুদ্ধ) হবে না। বান্দা যখনই তার বিশ্বাস, কথা ও কাজের মাধ্যমে তাগুতের সাথে কুফরী করবে তখনই সে তাগুতকে অস্বীকারকারী হিসেবে গণ্য হবে। এ তিনটি অপরিহার্য বিষয়ের কোনো একটিতে যদি গন্ডগোল থাকে, তাহলে বান্দা তাগুতের অস্বীকারকারী হিসেবে গণ্য হবে না। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণীঃ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
"আমি প্রত্যেক উম্মাতের কাছেই এ মর্মে রাসুল পাঠিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে আর তাগুত থেকে দূরে থাকবে।" (নাহল : ৩৬)

ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি যে, তাগুত থেকে দূরে থাকতে হবে বিশ্বাস, কথা ও কাজের মাধ্যমে। এর উদাহরণ হচ্ছে, কোন মানুষ বিশ্বাস করলো যে, একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই বিধান রচনার মালিক এবং এ কথা মুখে উচ্চারণও করলো। কিন্তু পরবর্তীতে একথার ওপর সে প্রতিষ্ঠিত থাকলো না বরং কোনো কুফরী কাজ করে ফেললো, যেমন কাজের মাধ্যমে বিধান রচনার শক্তি ও অধিকারের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিলো। আইন ও বিধান রচনার নিরঙ্কুশ অধিকারের ক্ষেত্রেযা একমাত্র আল্লাহরই আধিকার রয়েছে-নিজেকে জড়ানোর জন্য সে কর্মক্ষেত্রে আল্লাহর রুবুবিয়াতের মধ্যে শিরককারী বা মুশরিক হিসেবে গণ্য হবে। ইমাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেনঃ দ্বীন বান্দার অন্তরে থাকবে বিশ্বাস, মুহাব্বত ও তাগুতের প্রতি] ক্রোধ ও ঘৃণার মাধ্যমে। দ্বীন মুখে থাকবে হক কথা উচ্চারণ আর কুফরী কথা পরিত্যাগের মাধ্যমে। আর অঙ্গেরমধ্যে দ্বীন থাকবে ইসলামের রুকন (অপরিহার্য মৌলিক শর্তাবলী) গুলো পালন করা এবং কুফরী কার্যাবলী পরিত্যাগ করার মাধ্যমে। এ তিনটি বিষয়ের যে কোনো একটিতে গন্ডগোল থাকলে সে কুফরী করলো এবং দ্বীন থেকে বের হয়ে গেলো।

(২) আল্লাহর প্রতি ঈমানঃ এটা হচ্ছে তাওহীদের দ্বিতীয় রুকন (মৌলিক স্তম্ভ)। এ স্তম্ভটি সহীহ বা শুদ্ধ ততক্ষন পর্যন্ত হবেনা যতক্ষন না বান্দা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে বিশ্বাস, কথা ও কাজের মাধ্যমে এবং তাঁরই ইবাদত করবে। বান্দা আল্লাহর প্রতি যখনই তার আক্বীদা [বিশ্বাস] কথা ও কাজের মাধ্যমে তার রবের প্রতি ঈমান আনবে তখনই তাকে মুমিন বিল্লাহ [আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করী] বলা হবে। এ তিনটি অপরিহার্য বিষয়ের কোনো একটিতে গন্ডগোল থাকলে বান্দা মুমিন বিল্লাহ [আল্লাহর বিশ্বাস স্থাপনকারী] হতে পারবেনা। ইমাম আল্ আজরী (রহঃ) তার "আশ শারীয়াহ" নামক গ্রন্থে এসংক্রান্ত একটি অধ্যায় সন্নিবেশিত করেছেন। উক্ত অধ্যায়ে তিনি বলেনঃ ঈমান হচ্ছে আন্তরিক ভাবে সত্যায়ন, মৌখিক স্বীকৃতি এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে কার্য সম্পাদন। একত্রে এ তিনটি বিষয়ের সমাবেশ ব্যতীত বান্দা মুমিন হতে পারবেনা [অর্থাৎ অন্তরে আল্লাহকে বিশ্বাস করবে, মুখে স্বীকার করবে, শরীর দিয়ে তাঁর বিধান কায়েম করবে]। অতএব বান্দা আল্লাহর মুওয়াহহিদ' [আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী] হিসেবে গন্য হবে দুটি বিষয়ের মাধ্যমেঃ

একঃ আল্লাহর হক সম্পর্কে জ্ঞান লাভ। এ ব্যাপারে তিনটি হক সম্পর্কে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
দুইঃ আল্লাহর তাওহীদে বিশ্বাসী হওয়া এবং [আক্বীদা] বিশ্বাস কথা এবং কাজের মাধ্যমে তার ইবাদত করা। এ ব্যাপারে বিশ্বাস, কথা ও কাজের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদতের ধরন সম্পর্কিত আলোচনা [দ্বিতীয় বিষয়ে] করা হয়েছে যার অর্থ হচ্ছে, বান্দার মধ্যে তাগুতের সাথে কুফরী করার যাবতীয় অপরিহার্য বিষয় এবং আল্লাহর প্রতি ঈমানের অপরিহার্য বিষয়গুলো পুরোপুরি ভাবে পাওয়া যাওয়া প্রয়োজন।
كشف الشبهات
ইমাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব তার ‘কাশফুশ্ শুবহাত’ নামক পুস্তিকায় লিখেছেন :
এতে কোনো মতবিরোধ নেই যে, তাওহীদ নিশ্চিত হতে হবে অন্তর, জবান ও আমলের মাধ্যমে। যদি এর মধ্যে বিন্দুমাত্র গন্ডগোল থাকে, তাহলে একজন ব্যক্তি মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে না।
তিনি আরো বলেন : এ ব্যাপারে উম্মতের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই যে, তাওহীদ অবশ্যই হতে হবে অন্তর দিয়ে, যার অর্থ হচ্ছে তাওহীদ সংক্রান্ত জ্ঞান। তাওহীদ হতে হবে জবান দিয়ে যার অর্থ হচ্ছে তাওহীদ সংক্রান্ত কথা। তাওহীদ হতে হবে আমল বা কর্ম দ্বারা যার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর বিধি-নিষেধ বাস্তবায়ন করা। যদি কেউ এর চেয়ে কম করে, তাহলে সে মুসলিম হতে পারবেনা। যদি কেউ আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকার করে কিন্তু স্বীকৃতি মোতাবেক আমল করেনা, তাহলে সে ফেরাউন এবং ইবলিসের মতো বিদ্রোহী কাফের হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি বাহ্যতঃ তাওহীদ অনুযায়ী আমল করে কিন্তু গোপনে তা বিশ্বাস করেনা তাহলে সে খাটি মুনাফিক হিসাবে গণ্য হবে। এমতাবস্থায় সে কাফেরের চেয়েও খারাপ। (আদ দুরার আস্ সুন্নিয়া ১৭৪/৭পৃঃ)
শাইখ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আবা-বাতিন (রহঃ) বলেনঃ "একজন মুসলমান যখন এ কথার [তাওহীদের] মহত্ব বুঝতে পারলো এবং এর শর্তাবলীর ব্যপকতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানতে পারলো, তখন অবশ্যই "তাওহীদ" হতে হবে আন্তরিক বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি এবং অপরিহার্য মৌলিক বিষয়গুলো কার্যে পরিণত করার মাধ্যমে। এ বিষয়গুলোর কোনো একটির মধ্যে যদি গন্ডগোল থাকে, তাহলে বান্দার পক্ষে মুসলমান হওয়া সম্ভব নয়। কোনো লোক যদি মুসলমান হয় এবং তাওহীদের আরকান (মৌলিক বিষয়গুলো) কার্যে পরিণত করে অতঃপর তার কোনো কথা, কাজ ও বিশ্বাস তাওহীদের পরিপন্থ এবং এর সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তার ঐসব লোক দেখানো আমলগুলো কোনো কাজে আসবেনা। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা তাবুক যুদ্ধে না যাওয়ার ব্যাপারে যারা অজুহাত পেশ করেছিলো তাদের সম্পর্কে বলেনঃ
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ -
"তোমরা টাল বাহানা করোনা। তোমরা ঈমান গ্রহণের পর কুফরী করেছো।" (আত-তাওবাহঃ ৬৬)
আল্লাহ তায়ালা অন্যদের ব্যাপারে বলেন:
وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِم (توبه (٧٤)
"তারা অবশ্যই কুফরী কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কুফরী করেছে।" (আত-তাওবাহঃ ৭৪)
আল্লামা সুলাইমান বিন সাহমান (রহঃ) বলেন: অবশ্যই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য দানের মধ্যে অন্তর দিয়ে বিশ্বাস, মুখ দিয়ে স্বীকৃতি প্রদান এবং তাওহীদের অপরিহার্য মৌলিক বিষয়ের বাস্তবায়ন বা আমলের কথা থাকতে হবে। এগুলোর কোনো একটির মধ্যে অসুবিধা থাকলে কোনো ব্যক্তি মুসলমান হতে পারবেনা। কোনো ব্যক্তি যদি মুসলমান হয়ে অপরিহার্য মৌলিক বিষয়গুলো আমল করে অতঃপর তার মধ্যে এমন কথা অথবা কাজ অথবা এমন বিশ্বাস পাওয়া যায়, যা তাওহীদের পরিপন্থী বা তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক, তাহলে তার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর সাক্ষ্য প্রদান কোনো কাজে আসবেনা। কুরআন, হাদীস এবং ইসলামের নেতৃস্থানীয় ইমামগণের কথাও এর পক্ষে অগণিত দলীল, প্রমাণ হিসেবে গণ্য। (আদদারর্ সুন্নাহ ৩৫০/৭)
আল্লামা শাইখ আবদুর রহমান বিন আল শাইখ (রহঃ) বলেনঃ মুরতাদদের হুকুমের [বিধান] ব্যাপারে ফকীহগণ উল্লেখ করেছেন যে; একজন ব্যক্তি যে কথা বলে সে কথার দ্বারা কুফরী করতে পারে অথবা সে যে কাজ করে সে কাজ দ্বারাও কুফরী করতে পারে। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সাক্ষ্য দান করা, নামাজ পড়া, রোজা ও যাকাত আদায়ের পরও উক্ত কুফরীর কারণে সে মুরতাদ [ধর্ম ত্যাগি] হয়ে যেতে পারে। এর ফলে বাতিল হয়ে যেতে পারে তাঁর যাবতীয় নেক আমল, বিশেষ করে যদি সে [তওবা ছাড়া] মৃত্যু বরন করে। বান্দার আমল বাতিল বা নষ্ট হওয়ার পক্ষেই ওলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত অভিমত। তবে যদি মৃত্যুর পূর্বেই বান্দা তওবা করে সে ক্ষেত্রে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। (আদ্‌ দুরার আস্ সুন্নিয়াহ ১১/৫৮৬)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00