📄 দ্বিতীয় রুকন : এক আল্লাহ্র প্রতি ঈমান
তাওহীদের দ্বিতীয় রুকন বা স্তম্ভ হচ্ছে, এক আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করা।
আল্লাহর প্রতি ঈমান : আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং আল্লাহ তায়ালার রুবুবিয়্যাত সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ এবং তাঁর যাবতীয় নাম ও গুণাবলী (আসমা ও সিফাত) এর ক্ষেত্রে একত্ববাদকে স্বীকার করে নেয়া এবং এমন সকল ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদকে মেনে নেয়া যা একমাত্র তাঁরই জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমান তিনটি ভাগে বিভক্ত।
এক : আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের প্রতি ঈমান। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের সাথে খাস (বিষেশিত) আল্লাহর এমন যাবতীয় কর্মের প্রতি ঈমান পোষণ করা। যেমন : সৃষ্টি করা, রিযিক প্রদান, বিধান রচনা করা ইত্যাদি আল্লাহ তায়ালার কর্মের অন্তর্ভুক্ত। এ কাজগুলো আল্লাহর একক ক্ষমতার অধীন। তাই এ কাজগুলো এক আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। এ সব কাজে গাইরুল্লাহর অংশ গ্রহণকে অস্বীকার করতে হবে। এ সব কাজের বিন্দুমাত্র অংশও গাইরুল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা যাবেনা।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন : اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ ثُمَّ رَزَقَكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ ، هَلْ مِنْ شُرَكَائِكُمْ مَنْ يَفْعَلْ مِنْ ذَلِكُمْ مِّنْ شَيْءٍ ، سُبْحَنَهُ وَ تَعْلَى عَمَّا يُشْرِكُونَ "আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর রিযিক দিয়েছেন, এরপর তোমাদের মৃত্যু দিবেন। এরপর জীবিত করবেন। তোমাদের বানানো শরীকদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এসব কাজের মধ্যে কোনো একটিও করতে পারবে? তারা যাকে শরীক করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র।" (আর-রূম: ৪০)
দুই: আল্লাহ তায়ালার আসমা ও সিফাত [নাম ও গুনাবলী]-এর প্রতি ঈমান। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার ঐ সমস্ত নাম ও গুনাবলীর [আসমা ও সিফাত] প্রতি ঈমান আনয়ন করা যেগুলো আল্লাহ নিজেই নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন এবং তাঁর রাসুল তাঁর জন্য সাব্যস্ত করেছেন। ঈমান আনয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার কোনো নাম ও গুণকে আকৃতি বিশিষ্ট বলা যাবেনা, নিরর্থক বা অকার্যকর বলা যাবে না, পরিবর্তন করা যাবে না, (সৃষ্টির) সমতুল্য বলা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْئً وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ -
"বিশ্বলোকের কোনো কিছুই তাঁর (আল্লাহর) মতো নয়। অথচ তিনি সর্ব শ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।" (আশ-শুরাঃ১১)
অতঃপর যে সব নাম ও গুণাবলী একমাত্র আল্লাহরই জন্য প্রযোজ্য সেগুলোকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট করতে হবে এবং কোনো প্রকার অংশীদারীত্ব থেকে এগুলোকে মুক্ত রাখতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ
قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ -
'একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আসমান ও যমীনের কেউ গায়েবের খবর জানেনা।" (আন-নামল: ৬৫)
তিন : আল্লাহ তায়ালার উলুহিয়্যাতের প্রতি ঈমান।
এর অর্থ হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন "ইলাহ এবং মা'বুদ" (উপাস্য) একথা বিশ্বাস করা। দোয়া, রুকু, সেজদা, মানতসহ যাবতীয় ইবাদতের নিরঙ্কুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। যাবতীয় ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিবেদন করতে হবে। ইবাদতের বিন্দুমাত্র অংশও গাইরুল্লাহর জন্য নিবেদিত করা যাবেনা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا -
"তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীফ করো না। (আন্-নিসাঃ ৩৬)
📄 আল্লাহ্র একত্ববাদের অনুসারী (মুওয়াহ্হিদ)
একথা অবশ্যই জেনে রাখা উচিৎ যে, বান্দা দুটি বিষয় ব্যতীত আল্লাহর "মুওয়াহহিদ" বা একত্ববাদের অনুসারী হতে পারবেনা।
📄 তাওহীদ বিনষ্টকারী বিষয়
'নাকেদ্ব' বা বিনষ্টকারী বলতে এমন কিছুকে বুঝায়, যার অস্তিত্বের কারণে অন্য কোনো জিনিস বিনষ্ট বা বাতিল হয়ে যায়। এ কথা অবশ্যই জেনে রাখা প্রয়োজন যে, নামাজ বিনষ্ট বা বাতিল হওয়ার যেমন কিছু কারণ ও বিষয় আছে, তেমনিভাবে তাওহীদ বিনষ্টকারী কিছু কারণ ও বিষয় আছে। মুসল্লি যদি নামাজ বিনষ্টকারী বিষয়গুলোর যে কোনো একটিতে পতিত হয়, তাহলে সাথে সাথে তার নামাজ বাতিল হয়ে যায়। যেমন নামাজের মধ্যে শব্দ করে হাসা, কিছু আহার করা বা পান করা ইত্যাদি। এমনি ভাবে তাওহীদ বিনষ্টকারী কিছু কারণ ও বিষয় রয়েছে যার মধ্যে বান্দা পতিত হলে তার তাওহীদ বিনষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে সে কাফের মুশরিক হিসেবে গণ্য হয়।
তাওহীদ বিনষ্টকারী কতিপয় বিষয় নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ
১। আল্লাহর সাথে শরীক করা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ : لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ -
"আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি এ প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আপনি আল্লাহর সাথে শরীক [কাউকে] করেন, তবে আপনার সকল আমল বাতিল বা নিষ্ফল হয়ে যাবে। এবং ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।" (আয-ঝুমার: ৬৫)
২। আল্লাহ এবং বান্দার মাঝখানে এমন মাধ্যম স্থির করা যার কাছে বান্দা সুপারিশ কামনা করে এবং তার ওপর তাওয়াক্কুল করে। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاءُنَا عِندَ اللَّهِ -
"তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর উপাসনা করে, যা তাদের কোনো ক্ষতিও করতে পারেনা উপকারও করতে পারেনা। তারা বলেঃ এরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য সুপারিশকারী।" (ইউনুস: ১৮)
এটা হচ্ছে আউলিয়া এবং নেককার লোকদের কবরের উদ্দেশ্যে যারা যায় তাদের অবস্থা। তারা সেখানে গিয়ে কবরবাসিকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন ইবাদতে লিপ্ত হয়, কবরবাসী আল্লাহর কাছে সুপারিশ করতে পারবে এ বিশ্বাসে যেমনঃ তাদের কাছে দোয়া করা, তাদের উদ্দেশ্যে মানত করা, পশু যবাই করা, তাদের কাছে সাহায্য কামনা করা এবং কবরের চারপাশে প্রদক্ষিণ করা।
৩। মুশরিকদেরকে কাফের মনে না করা অথবা তাদের কুফরীর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা অথবা তাদের কুফরী মতবাদকে সহীহ মনে করা। এখানে সন্দেহ দ্বারা বুঝানো হচ্ছে যে, মুসলিম উম্মাহ যার কাফের হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করে তার কুফরীর ব্যাপারে কোনো মুসলমানের সন্দেহ পোষণ করা যেমনঃ ইহুদী নাসারা মুশরিক [অর্থাৎ ইহুদী নাসারা ও মুশরিকদের কুফরীর ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর কোনো দ্বিমত নেই, তাই কোনো মুসলমান এব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করতে পারবেনা। করলে সেও কুফরী মতবাদে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।] এ দৃষ্টি কোন থেকে জাহেলি যুগের মুশরিক যারা নিজেদের মুশরিক হওয়ার ব্যাপারে নিজেরাই স্বাক্ষ্য প্রদান করেছিলো, আর বর্তমান যুগের মুশরিক যারা ইসলাম ও ঈমানের দাবী করে অথচ আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট হককে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করে, এই দুই ধরনের মুশরিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
ইমাম শওকানী (রহঃ) বলেন: শিরক নামকরণকৃত কতিপয় বিষয়ের ওপর শুধু মাত্র শিরক নাম জুড়ে দিলেই শিরক বলা যায়না, বরং শিরক হচ্ছে গাইরুল্লাহর জন্য এমন কাজ করা যা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই নির্দিষ্ট। চাই সে কাজ জাহেলী যুগের কোনো নামেই হোক, অথবা বর্তমান যুগের অন্য কোনো নামেই হোক। এক্ষেত্রে নামে কিছুই আসে যায়না। [অর্থ্যৎ কোনো কাজ যদি শিরকের অন্তর্ভূক্ত হয়। তাহলে সেটা যে যুগেই হোক, আর যে নামেই হোক, শিরক হিসেবেই গণ্য হবে। যেমনঃ ভক্তির নামে গাইরুল্লাহকে সেজদা করা]
৪। রাসূল (সঃ) এর দ্বীন, অথবা [পূন্য কাজের] সাওয়াব অথবা [পাপের জন্য] শাস্তি এবং দ্বীনের যে কোনো বিষয় রং-তামাশা বিদ্রুপ করা কুফরী। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ قُلْ أَبِاللَّهِ وَأَيْتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِؤُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ -
"আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর আয়াত সমূহের সাথে, তার রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? তামাশা করো না, তোমরা তো ঈমান প্রকাশ করার পর কাফের হয়ে গেছো।" (আত-তাওবাহ: ৬৫-৬৬)
৫। যাদু: যাদুর মধ্যে রয়েছে (যাদু-মন্ত্র দ্বারা) স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিছিন্নতা সৃষ্টি করা; উভয়ের মধ্যে পরষ্পরের প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি করা। তাছাড়া "তাওলার" আশ্রয় নেয়া। তাওলা হচ্ছে [যাদু মন্ত্রের সাহায্যে) স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে বশীভূত করণ, যাতে স্ত্রীর ভালবাসায় স্বামী পাগল প্রায় হয়ে থাকে। এটা শিরক হওয়ার কারণ হচ্ছে, এর দ্বারা বিপদাপদ দূর করা এবং উপকার বা কল্যাণ সাধনের বিষয়টিকে গাইরুল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা হয়। এটা নিঃসন্দেহে কুফরী।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ وَمَا يُعَلِّمُنِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ - "তারা উভয়েই একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিতোনা যে, দেখো, আমরা নিছক পরীক্ষা মাত্র অতএব তুমি কুফরী করোনা।" (আল-বাকারাহঃ ১০২)
৬। মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষ নেয়া ও সহযোগিতা করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ، إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ - "তোমাদের মধ্যে কেউ যদি তাদেরকে [মুশরিকদেরকে] বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তাহলে সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা জালেমদেরকে হেদায়াত করেন না।" (মায়েদাহঃ ৫১)
৭। মূর্তি, প্রতিমা, মানব রচিত সংবিধান ইত্যাদি সহ অন্যান্য তাগুতকে সম্মান, ভক্তি ও শ্রদ্ধা করার জন্য শপথ করা।
ইমাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেন: অন্তরে আল্লার দ্বীনের স্থান হবে ধ্যান ধারনা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে, দ্বীনের প্রতি ভালবাসা এবং গাইরুল্লাহর প্রতি ক্রোধ ও ঘৃণার মাধ্যমে, দ্বীনের স্থান হবে মুখে স্বীকৃতির মাধ্যমে এবং কুফরী কথা পরিত্যাগের মাধ্যমে। এমনি ভাবে দ্বীনের স্থান হবে অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো কার্যকর করা এবং যাবতীয় কুফরী কর্ম পরিত্যাগ করার মাধ্যমে। এ তিনটি বিষয়ের কোনো একটি বিষয় যদি বান্দা পরিত্যাগ না করে তাহলে সে কুফরী করলো এবং দ্বীন পরিত্যাগ করলো বলে বিবেচিত হবে। (আদ্দোরার অসুন্নিয়া (৮/৭৮)
তাঁর কাশফুশ শুবহাত নামক পুস্তিকায় তিনি আরো বলেন: এটা যখন নিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত যে, কতিপয় মুনাফিক যারা রাসূল (সঃ) এর সাথে রুমের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে ও তাদের ঠাট্টা ও বিদ্রুপাত্নক কথার দ্বারা কুফরী করেছে, তখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, যে ব্যক্তি সম্পদের স্বল্পতার আশংকায় কিংবা কিছু প্রাপ্তির আশায় অথবা কারো মন তুষ্টির জন্য কুফরী কথা বললো অথবা কুফরী কর্ম করলো, সে অবশ্যই ঐ ব্যক্তির চেয়ে জঘণ্য কাজ করেছে যে ঠাট্টা ও বিদ্রুপাত্নক কথা বলেছে।
৮। মুহাব্বত ও ভালবাসার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা অথবা কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা। ইমাম ইবনুল কায়্যিম বলেন: এ কারণেই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে শিরক। আল্লাহর সাথে শিরকের ভিত্তি হচ্ছে মুহাব্বতের ক্ষেত্রে [আল্লাহর সাথে] শিরক করা। (আল জাওয়াবুল কাফি)
📄 লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহর অর্থ
মুজাদ্দিদ ইমাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) [লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ নামক অধ্যায়ে] বলেনঃ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ হচ্ছে, মহান, মর্যাদাকর ও মহামূল্যবান বাণী বা কলেমা। যে ব্যক্তিই এ কলেমা আকড়ে ধরলো সেই নিরাপদ থাকলো ও নিরাপত্তা অর্জন করলো। রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেছেন:
من قال لا اله الا الله وكفر بما يعبد من دون الله حرم ماله ودمه وحسابه على الله عز و جل
"যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বললো এবং গাইরুল্লাহর ইবাদতকে অস্বীকার করলো, তার জান ও মাল, মুসলমানদের কাছে পবিত্র আমানত আর [মনের কুটিলতার] হিসাব-নিকাশ আল্লাহর তায়ালার ওপরই ন্যাস্ত।" (মুসলিম)
হাদীসটি এর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর' নিজস্ব শব্দ এবং অর্থ রয়েছে। কিন্তু মানুষ এ ক্ষেত্রে [শব্দ ও অর্থের ব্যাখ্যার] তিনটি ফেরকায় বিভক্ত। একটি ফেরকার লোকেরা এ কলেমার কথা বলে এবং এর যাবতীয় অধিকার আদায় করে। তারা এ কলেমার অর্থ সম্পর্কে সচেতন এবং সে অর্থ মোতাবেক আমল করে। এ কলেমার সাথে সাংঘর্ষিক এবং কলেমা বিনষ্টকারী বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকে।
আরেকটি ফেরকা আছে যারা কলেমাকে বাহ্যিক দিক থেকে কলেমার কথা বলে। তারা কথার মাধ্যমে নিজেদের বহিদৃশ্যকে খুব সৌন্দর্যমন্ডিত করে তোলে, আর কুফরী ও কলেমার ব্যাপারে তাদের সন্দেহকে অন্তরে গোপন রাখে।
আরো একটি ফেরকা আছে যারা মৌখিক ভাবে কলেমার কথা উচ্চারণ করে। কিন্তু এর অর্থ মোতাবেক কোনো আমল করেনা। বরং কলেমার সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো আমল করে তারা এমন লোক।
الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِلُونَ صُنعًا -
এখানে উল্লেখিত প্রথম ফেরকাটি হচ্ছে ফেরকা নাজিয়া [যারা আখেরাতে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে]। এরাই হচ্ছে প্রকৃত মুমিন।
দ্বিতীয় ফেরকার লোকেরা হচ্ছে মুনাফিক আর তৃতীয় ফেরকার লোকেরা হচ্ছে 'মুশরিক'
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ হচ্ছে সত্য ও ন্যায়ের এক শক্তিশালী দূর্গ। কিন্তু মুশরিকরা এর ওপর যুদ্ধের অস্ত্র চালিয়েছে। এর প্রতি তারা ধ্বংসের পাথর নিক্ষেপ করেছে। এর ফলে মুশরিক ও মুনাফিকদের শয়তান চড়াও হয়ে কলেমার অর্থকে তাদের কাছ থেকে ছিনেয়ে নিয়েছে। অতঃপর তাদেরকে কলেমার মূল কথা থেকে বিচিছন্ন করে বাহ্যিক সূরতের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
হাদীস শরীফে এসেছে: ان الله لا ينظر الى صوركم و ابدانكم ولكن ينظر الى قلوبكم واعمالكم
"আল্লাহ তোমাদের সুরত আর তোমাদের শরীরের দিকে দৃষ্টি দেননা বরং তিনি দৃষ্টি দেন তোমাদের অন্তর এবং তোমাদের আমলের দিকে।" [অর্থাৎ আল্লাহর কাছে মানুষের বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে নিয়ত এবং আমল] তাদের কাছ থেকে শয়তান লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ কেড়ে নিয়েছে। ফলে তাদের কাছে বাকী থাকলো শুধুই মুখের বাচালতা আর অর্থহীন বাকচারিতা, এর উদাহরণ হচ্ছে শক্তির উৎস তথা দূর্গের কথা বলা, কিন্তু এর সাথে সম্পর্কে না রাখা। এ যেনো ঠিক সেই আগুনের কথা বলা, যা দহন করতে অক্ষম, সেই পানির কথা বলা, যা ডুবাতে অক্ষম, সেই রুটির কথা বলা যা তৃপ্ত করতে অক্ষম, সেই তলোয়ারের কথা বলা যা কাটতে অক্ষম, এমনি ভাবে সেই দূর্গ বা শক্তির কথা বলা যা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অক্ষম। কথা হচ্ছে ফলের ছাল বা তুষ সমতুল্য, আর অর্থ হচ্ছে কোন ফলের শাস বা মূল জিনিসের সমতুল্য। এমনি ভাবে 'কথা' হচ্ছে ঝিনুকের মতো, আর তার অর্থ হচ্ছে মুক্তার সমতুল্য। বান্দা কি করবে ফলের ছাল বা তুষ দিয়ে, যদি ফলের শাঁস পাওয়া না যায়, সে ঝিনুক দিয়ে কি করবে যদি তাতে মুক্তা পাওয়া না যায়? লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থসহ তার স্থান হচ্ছে আত্মাসহ দেহের মতো। আত্মা বিহীন দেহের মধ্যে যেমন কোনো কল্যাণ নেই, তেমনি ভাবে অর্থ বিহীন কলেমা [লা-ইলাহা ইল্লাহর] এর মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।
তাই মর্যাদাবান আলেমগণ এ কলেমার বাহ্যিক সূরত [শব্দ ও কথা] এবং অর্থকে উপলদ্ধি করেছেন। এর ফলে তারা তাদের বহিদৃশ্যকে কথা অর্থাৎ মৌখিক স্বীকৃতির মাধ্যমে, এবং তাদের অভ্যন্তরকে কলেমার অর্থের উপলদ্ধির মাধ্যমে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছেন। স্বীকৃতির মাধ্যমে প্রকাশ ঘটেছে তাদের সত্যের সাক্ষ্যের।
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَئِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ ، لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। ফেরেস্তাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও স্বাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী এবং প্রজ্ঞাময়।" (আল- ইমরান-১৮)
আর জ্ঞান পাপীরা কলেমার অর্থকে বাদ দিয়ে শুধু এর বহিদৃশ্য [সূরত] কে [অর্থাৎ কলেমার মৌখিক উচ্চারণ ও স্বীকৃতিকে] ধরে রেখেছে। এর ফলে তাদের বাহ্যিক দিকটাকে কথার মাধ্যমে সৌন্দর্য মন্ডিত করেছে আর তাদের অভ্যন্তরকে সাজিয়েছে কুফরী দিয়ে। তারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এমন জিনিসের ওপর যার মঙ্গল অমঙ্গল করার কোন ক্ষমতা নেই, তাদের অন্তরে রয়েছে অন্ধকার আর অমানিশা। হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার মতো ক্ষমতা আল্লাহ তাদেরকে দেননি। কিয়ামতের দিবসেও তারা কুফরীর অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে। ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلْمِتِ لَا يُبْصِرُونَ
"আল্লাহ তাদের দৃষ্টিশক্তি উঠিয়ে নিলেন এবং তাদেরকে অন্ধকারে ছেড়ে দিলেন। ফলে তারা কিছুই দেখতে পায় না।" (আল-বাকারাহ : ১৭)
যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে, অথচ দাসত্ব করে তার কুপ্রবৃত্তির, তার টাকা-পয়সার, অর্থের এবং দুনিয়ার, তাহলে কিয়ামতের দিন তার প্রভূর সামনে তার কি জবাব হবে? أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوْهُ
"আপনি তার প্রতি খেয়াল করেছেন সে তার কুপ্রবৃত্তিকে তার ইলাহ [উপাস্য] বানিয়ে নিয়েছে?" (জাসিয়া : ২৩)
"ধ্বংস হোক দিনারের পুজারী, দেরহামের পুজারী, পেটের পুজারী। দিতে পারলেই সে খুশী, আর দিতে না পারলেই সে ক্রোধান্বিত।” (বুখারী)
তুমি যখন বলবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ তখন যদি এ কলেমার স্থান হয় শুধু তোমার জবানে তাহলে ফলাফলের দিক থেকে এর কোনো ফল নেই, অতএব তুমি একজন মুনাফিক। আর যখন এ কলেমার স্থান হবে তোমার অন্তরে, তখন তুমি একজন মুমিন। কিন্তু সাবধান থাকবে, তুমি যেনো অন্তর বাদ দিয়ে শুধু মুখে মুখে মুমিন না হও। তাহলে কিয়ামতের ময়দানে এ কলেমা তোমার বিরুদ্ধে (আল্লাহকে) ডেকে বলবে: হে আমার ইলাহ, এ ব্যক্তির সাহচার্যে এত বছর আমি ছিলাম, কিন্তু সে আমার অধিকারের স্বীকৃতি দেয়নি, আমার যথাযোগ্য হুরমাত বা সম্মান সে রক্ষা করেনি। অতএব এ কলেমা হয় তোমার পক্ষে, না হয় তোমার বিপক্ষে সাক্ষ্য দান করবে।
মর্যাদাবান আলেমদের পক্ষে এ কলেমা সম্মানের সাথে কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দান করবে যতক্ষণ না তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। পক্ষান্তরে জ্ঞান পাপীদের [যারা কলেমার অর্থকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করেছে] বিরুদ্ধে এ কালেমা সাক্ষ্য দান করবে যতক্ষণ না তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ -
"একদল প্রবেশ করবে জান্নাতে আরেক দল প্রবেশ করবে জাহান্নামে।" (আশ-শুরাঃ ৭)
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ হচ্ছে এক শান্তির বৃক্ষ। যদি তুমি এ বৃক্ষটি রোপন করো সত্যে ও স্বীকৃতির উৎস মূলে, গোড়ায় ঢালো ইখলাসের [নিষ্ঠার] পানি, আর যদি এর পরিচর্যা করো নেক আমল দিয়ে, তাহলে মজবুত হবে এ বৃক্ষের মূল, কান্ড হবে অনড় ও স্থির, এর পত্রগুলো সবুজ, ফলগুলো হবে পরিপক্ক এবং ফলের পরিমান বেড়ে যাবে অনেক।" تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينِ بِإِذْنِ رَبِّهَا -
"সে তার পালন কর্তার নির্দেশে আহরহ ফল দান করে।" (ইবরাহীম: ২৫)
আর যদি এ বৃক্ষটি রোপন করো মিথ্যা আর নিষ্ঠুরতার উৎস স্থলে, রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা) ও মুনাফিকীর পানি যদি এর গোড়ায় সিঞ্চন করো, বদ আমল ও অশ্লীল কথার দ্বারা তার পরিচর্যা করো, তার ওপর দিয়ে যদি প্লাবিত হয় পঙ্কিল পুকুরের পানি, আর যদি তাকে আঘাত করো দুপুরের প্রচন্ড খরতাপে, তাহলে তার ফলগুলো খসে পড়বে, পত্রগুলো পতিত হবে মাটিতে, তার মূল মাটি থেকে হয়ে যাবে বিচ্ছিন্ন, তার কান্ড হয়ে যাবে খন্ড -বিখন্ড, তার ওপর আঘাত হানবে দুর্গন্ধময় ঘুণিঝড় যা বৃক্ষটিকে ভেঙ্গে করে দিবে চূর্ণ-বিচূর্ণ। وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْشُورًا -
"আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করবো, অতঃপর সেগুলোকে [তাদের কৃতকর্মকে] ধূলি কণার মতো উড়িয়ে দিবো।" (আল-ফুরকান: ২৩)
একজন মুসলিম যখন ইসলামের এ রুকনটি (তাওহীদ নামক অপরিহার্য মৌলিক বিষয়টি) নিশ্চিত করবে, তখন ইসলামের বাদ বাকী রুকন [অপরিহার্য মৌলিক বিষয়] গুলোকেও তার জীবনে নিশ্চিত করবে। যেমনটি হাদীস শরীফে এসেছে:
بنى الاسلام على خمس شهادة أن لا اله الا الله وان محمدا رسول الله واقام الصلاة وايتاء الزكاة وصوم رمضان وحج البيت الحرام من استطاع اليه سبيلا ومن كفر فان الله غنى عن العالمين -
"ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল এর সাক্ষ্য দান করা, নামাজ কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানের রোযা রাখা, সক্ষম ব্যক্তির জন্য [বাইতুল্লাহর] হজ্ব করা আর যে ব্যক্তি কুফরী করবে (তার জেনে রাখা উচিত যে) আল্লাহ তায়ালা সমগ্র বিশ্বের প্রতি অমুখাপেক্ষী।" দরুদ ও সালাম মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি তাঁর পরিবারের প্রতি এবং তাঁর সকল সাহাবায়ে কেরামের প্রতি (আদদুরার আস সুন্নিয়্যাহ ২/১১২)