📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 প্রথম রুকন : তাগুতকে অস্বীকার করা

📄 প্রথম রুকন : তাগুতকে অস্বীকার করা


প্রিয় ভ্রাতা, (আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথের দিশা দান করুন-) আপনাকে জেনে রাখতে হবে যে, তাগুতের কুফরী ব্যতীত একজন বান্দা কখনো "মুওয়াহ্যিদ" (আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী) হতে পারে না। আর তাগুত কি জিনিস তা জানা ব্যতীত, তাগুতকে অস্বীকার করা কখনো সম্ভব নয়।

আভিধানিকভাবে তাগুতের সংজ্ঞা: তাগুত আরবী طغيان (তুগইয়ান) শব্দ থেকে উৎসরিত। যার অর্থ সীমা লংঘন করা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
إِنَّا لَمَّا طَغَا الْمَاءُ حَمَلْنَكُمْ فِي الْجَارِيَةِ "যখন জলোচ্ছাস হয়েছিলো তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম" (আল-হাককাহ - ১১) এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, 'যখন পানি বৃদ্ধি পেয়ে তার সীমা অতিক্রম করেছিল।

শরীয়তের পরিভাষায় তাগুতের সংজ্ঞা: এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই "তাগুত" যে, খোদাদ্রোহী হয়েছে এবং সীমা লংঘন করেছে, আর আল্লাহর কোনো হককে নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করেছে এবং এমন বিষয়ে নিজেকে আল্লাহর সাথে সমকক্ষ বানিয়েছে, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য খাস।

সুস্পষ্ট ভাবে তাগুতের অর্থ হচ্ছে, কোনো মাখলুক (সৃষ্টি) নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ের যে কোনো একটি বিষয়কে (আল্লাহর স্থলে) নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা:
এক: কোনো মাখলুক (সৃষ্টি) কর্তৃক আল্লাহ তায়ালার কার্যাবলীর যে কোনো কার্য সম্পাদনের বিষয়টি নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা। যেমন সৃষ্টি করা, রিজিক দান অথবা শরীয়ত (বিধান) রচনা। এসব বিষয়গুলো সম্পাদনের ব্যাপারকে যে ব্যক্তি নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করবে (অর্থাৎ কেউ যদি বলে, আমি সৃষ্টি করি আমি রিজিক দান করি, আমি বিধান রচনা করি) সেই "তাগুত"।
দুই: কোনো মাখলুক (সৃষ্টি) আল্লাহ তায়ালার কোনো সিফাত [বা গুণ] কে নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা। যেমন এলমে গায়েব জানা। যদি কেউ তা করে [অর্থাৎ বলে আমি এলমে গায়েব জানি] তাহলে তাকে তাগুত হিসেবে গণ্য করা হবে।

তিন : যে কোনো ইবাদত মাখলুক কতৃক (বা সৃষ্টির) এর উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা। যেমনঃ দোয়া, মান্নত, নৈকট্য লাভের জন্য পশু জবাই, অথবা বিচার ফয়সালা চাওয়া। যদি [কোনো মাখলুক] এসব ইবাদত [নিজের জন্য] স্বীকার করে নেয় বা মেনে নেয়, তাহলে সেই তাগুত। ব্যক্তির নীরবতা, অস্বীকার না করাও স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হবে যদি না সে এ অবস্থা থেকে নিজেকে পবিত্র অথবা মুক্ত করে নেয়।

উপরোক্ত যে তিনটি বিষয় আলোচনা করেছি, তার যে কোনো একটি বিষয়কে যদি কেউ নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে বা নিজের জন্য সম্পাদন করে তাহলে সে তাগুত হিসেবে গণ্য এবং নিজেকে আল্লাহর সমতুল্য বলে সাব্যস্ত করে নিলো।

ইমাম মালেক (রহঃ) তাগুতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেনঃ এমন প্রতিটি জিনিসকেই তাগুত বলা হয়, আল্লাহ তায়ালাকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত করা হয়।
(তাফসীর ইবনে কাসীর সুরা নিসা: ১৫ ও সুরা বাকারাহ: ৫২)

এ সংজ্ঞাটি উত্তম এবং ব্যাপক অর্থজ্ঞাপক। আল্লাহ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয়, এমন সব কিছুই এ সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। যে সব মাবুদ (উপাস্য) কে তাগুত হিসেবে গণ্য করা হয় সে গুলোর মধ্যে রয়েছে মূর্তী, এমন সব কবর, গাছ, পাথর ও অচেতন পদার্থ যেগুলোর উপাসনা করা হয়। আল্লাহর আইন ব্যতীত এমন সব আইন যার মাধ্যমে বিচার-ফয়সলা চাওয়া হয়। এমন সব বিচারক তাগুতের অন্তর্ভুক্ত যারা আল্লাহর আইনের বিরোধী আইন দ্বারা মানুষের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করে। শয়তান, যাদুকর, গণক (যারা এলমে গায়েবের বিষয় কথা বলে), উপাস্য হতে যারা রাজী, যারা নিজেদেরকে কোনো কিছু হালাল, হারাম করা ও আইন রচনা করার অধিকার রাখে বলে মনে করে, তারা সবাই তাগুত। তাদেরকে অস্বীকার করা ওয়াজিব, তাদের কাছ থেকে এবং তাদেরকে যারা উপাসনা করে উভয়ের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করা অত্যাবশ্যক।
আল্লামা আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আবা-বাতীন (রহঃ) বলেনঃ
ওলামায়ে কেরামের উপরোক্ত বক্তব্যের সারকথা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ ব্যতীত সকল মাবুদ [উপাস্য], সব গোমরাহীর প্রধান, যে বাতিলের দিকে আহ্বান জানায়, বাতিলকে সৌন্দর্য মন্ডিত করে, তাগুতের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের পরিপন্থী সব জাহেলী আইনের মাধ্যমে যারা মানুষের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করে তারাও তাগুতের মধ্যে শামিল। এর সাথে সাথে গণক, যাদুকর ও কবরবাসীসহ অন্যান্য বস্তুর উপাসনার ক্ষেত্রে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে [কবর, মাযার ইত্যাদির খাদেম। তারাও তাগুতের মধ্যে শামিল। (মাজমুআতুত্ তাওহীদ ১৭৩/১ পৃঃ)

প্রধান প্রধান তাগুত
ইমাম মোহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেন: তাগুতের সংখ্যা অনেক। তবে পাঁচ ধরনের তাগুত নেতৃত্বের আসনে রয়েছেঃ
এক : গাইরুল্লাহর [আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু] ইবাদতের দিকে আহ্বানকারী শয়তান। এর প্রমাণ আল্লাহ তায়ালার নিম্মোক্ত বাণী। اَلَمْ اَعْهَدُ اِلَيْكُمْ يَـبَنِىْ اٰدَمَ اَنْ لَّا تَعْبُدُوا الشَّيْطٰنَ اِنَّهٗ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِيْنٌ - "হে আদম সন্তানগণ! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, শয়তানের ইবাদত করোনা, কেননা, সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন"। (ইয়াসীন : ৬০)
দুই : আল্লাহর আইন পরিবর্তনকারী জালেম শাসক। এর দলিল; আল্লাহ তায়ালার বাণী। اَلَمْ تَرَ اِلَى الَّذِيْنَ يَزْعُمُوْنَ اَنَّهُمْ اٰمَنُوْا بِمَآ اُنْزِلَ اِلَيْكَ وَمَآ اُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيْدُوْنَ اَنْ يَّتَحَاكَمُوْا اِلَى الطَّاغُوْتِ وَقَدْ اُمِرُوْا اَنْ يَّكْفُرُوْا بِهٖ - "আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি, যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি তারা ঈমান আনয়ন করেছে। তারা বিরোধপূর্ণ বিষয়কে ফয়সালার জন্য তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি তাকে (তাগুতকে) অমান্য করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (আন-নিসা : ৬০)
তিন : আল্লাহ তায়ালার নাযিলকৃত বিধান ছাড়া যে বিচার-ফয়সালা করে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ وَمَنْ لَّمْ يَحكُمْ بِمَآ اَنْزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْكٰفِرُوْنَ "যারা আল্লার নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক বিচার-ফয়সালা করেনা তারাই কাফের।" (আল-মায়েদাহ : ৪৪)
এর দ্বারা এমন বিচারক বুঝানো হয়েছে, যে আল্লাহর শরীয়তকে পরিবর্তনকারী কোনো বিধানের সাহায্যে বিচার-ফয়সালা করে।
চার : আল্লাহ ব্যতীত যে ব্যক্তি এলমে গায়েব জানে বলে দাবী করে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন। عٰلِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلٰى غَيْبِهٖٓ اَحَدًا "তিনি আলিমূল গায়েব [অদৃশ্যের জ্ঞানী] । বস্তুতঃ তিনি স্বীয় গায়েবের [অদৃশ্য] বিষয় কারো কাছে প্রকাশ করেন না। (আল জ্বিনঃ ২৬)
পাঁচ : আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা হয় এবং এ ইবাদত গ্রহণে যে রাজী বা সন্তুষ্ট থাকে। এর দলীল, আল্লাহ তায়ালার বাণী: وَمَنْ يَّقُلْ مِّنْهُمْ اِنِّيْٓ اِلٰهُ مِّنْ دُوْنِهٖ فَذٰلِكَ نَجْزِيْهِ جَهَنَّمَ ، كَذٰلِكَ نَجْزِي الظّٰلِمِيْنَ "তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বলে যে, আল্লাহ ব্যতীত আমিই উপাস্য, তাকে আমি জাহান্নামের শাস্তি দিবো। আমি জালিমদেরকে এভাবেই প্রতিফল দিয়ে থাকি।" (আম্বিয়া-২৯)
وَلا يشرك بعبادة ربه احدا আরো বলেন যে, এ আয়াতের অর্থবহ জ্ঞান একমাত্র ঐ ব্যক্তির পক্ষেই অর্জন করা সম্ভব যে রুবুরিয্যাত ও উলুহিয্যাতের তাওহীদ (অর্থাৎ 'রব' হওয়ার বিষয়ে এবং 'ইলাহ' হওয়ার বিষয়ে আল্লাহর একত্ববাদ) এর মধ্যে সম্পূর্ন রূপে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে এবং অধিকাংশ মানুষ কিসের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে তা জানে, অর্থাৎ হয় মানুষ এমন তাগুতের ভূমিকায় রয়েছে যার ফলে রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে তারা ঝগড়া করে কিন্তু মুশরিক যে ধরনের শিরক করেছে সে পর্যায়ে তারা এখনো পৌছেনি, না হয় তারা মুশরিকদের সমর্থন করে, এবং তাদের অনুসরণ করে অথবা তাদের অবস্থা এমন ব্যক্তির মতো, যে সন্দেহের আবর্তে নিমজ্জিত, সে জানেনা আল্লাহ তাঁর রাসুলের (সাঃ) ওপর কি অবতীর্ণ করেছেন, এবং সে রাসূল (সঃ) এর দ্বীন আর খৃষ্টানদের দ্বীনের মধ্যে পার্থক্য করতেও সক্ষম নয়। (তারিখে নজদ লি হাসান বিন গানাম)

তাগুতকে কিভাবে অস্বীকার করবেন
পাঁচ ভাবে তাগুতকে অস্বীকার করা অপরিহার্যঃ
এক : তাগুতের ইবাদত বাতিল এ আক্বীদা পোষণের মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
ذلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَثِيرٌ
"এটা এ জন্য যে, আল্লাহই প্রকৃত সত্য। আর আল্লাহ ছাড়া তারা যাকে ডাকে তা বাতিল ও অসত্য। আল্লাহই সবার উচ্চে এবং আল্লাহই মহান"। (হজ্জ: ৬২)
দুই : তাগুতকে পরিত্যাগ ও তাগুত থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে। এর অর্থ হচ্ছে তাগুতের ইবাদত পরিত্যাগ করা, পরিহার করা। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
"আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকো।” (নাহল: ৩৬) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ
فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
"সুতরাং তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো, আর মিথ্যা বলা থেকে দূরে থাকো"। (হজ্জ: ৩০)
এটা অবশ্যই জেনে রাখতে হবে যে, তাগুত এবং মূর্তির কাছে বিচার-ফয়সালার জন্য গমন করা, তাদের মাধ্যমে সাহায্য কামনা করা এবং তাদের জন্য মান্নত করা, তাদের ইবাদত করার মধ্যেই শামিল।
হাফেজ ইবনে কাসির (রহঃ) এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেনঃ মূর্তিরপূজা, এর কাছে বিচার-ফয়সালার জন্য যাওয়া এবং এর মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া সহ জাহেলী যুগের লোকেরা যে সব জঘণ্য গুণার কাজ করতো এসব তাগুত তথা শয়তানের ইবাদতের মধ্যে শামিল। (সুরা আল বাক্বারার ২৫৬ নং আয়াতের তাফসীর)
একথা জেনে রাখা প্রয়োজন যে, তাগুত তিন ভাবে পরিত্যাগ করা যায়।
প্রথমত : আক্বীদা বা বিশ্বাসগত ভাবে।
দ্বিতীয়ত : কথার মাধ্যমে।
তৃতীয়ত : কাজের মাধ্যমে।
উপরোক্ত তিনটি ক্ষেত্রে বান্দা তাগুতকে পরিত্যাগ করতে না পারলে সম্পূর্ন রূপে তাগুতকে পরিত্যাগ করা সম্ভব হবে না। কেননা যে ব্যক্তি কথা ও কাজের মাধ্যমে তাগুতকে পরিত্যাগ করে কিন্তু আক্বীদাগত ভাবে পরিত্যাগ করেনা, তার অবস্থা মুনাফিকের মতো।
যে ব্যক্তি আক্বীদাগত ভাবে তাগুতকে পরিত্যাগ করে কিন্তু কথায় পরিত্যাগ করেনা, তার অবস্থা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির মতো যে মূর্তি, প্রতিমা ও তাগুতকে সম্মান করে।
যে ব্যক্তি আক্বীদাগত ভাবে তাগুতকে পরিত্যাগ করে কিন্তু কাজের মাধ্যমে পরিত্যাগ করেনা তার অবস্থা ঐ ব্যক্তির মতো যে, তাগুতকে সেজদা করে অথবা তার উদ্দেশ্যে মান্নত করে, অথবা বিচার ফয়সালার জন্য তাগুতের কাছে যায়, আবার এ দাবীও করে যে তার আক্বীদা শুদ্ধ আছে।
অতএব উপরোক্ত তিনটি ক্ষেত্রে তাগুতকে পরিত্যাগ করতে না পারলে বান্দা তাগুতকে পরিত্যাগকারী হিসাবে গণ্য হবে না।
আল্লামা শাইখ সুলাইমান বিন আবদুল্লাহ আল-শাইখ তাঁর “তাইসীরুল আজীজিল হামীদ” নামক গ্রন্থের ৪১৯ পৃষ্ঠায় أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এ আয়াত কিতাব ও সুন্নাহ [কুরআন ও হাদীস] ব্যতীত তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা না নিয়ে যাওয়া ফরজ, একথার সুস্পষ্ট দলীল বা প্রমাণ। যে ব্যক্তি তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা নিয়ে যায়, সে মুমিনও নয় এমনকি মুসলমানও নয়।
এখানে একটি ব্যাপারে শতর্ক থাকা অত্যাবশ্যক আর তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তায়ালা যখন আমাদেরকে তাগুতকে অস্বীকার করা, তাকে পরিত্যাগ করার নির্দেশ তাগুতী স্বভাব ও প্রকৃতির দৃষ্টি কোন থেকে দিয়েছেন, তখন যে 'হক' আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য প্রযোজ্য নয় তা তাগুতের জন্য নিবেদন করা কখনো উচিৎ নয়।
অতএব, যার মাধ্যমে সাহায্য কামনা করা হয়, তাগুত যদি এই শ্রেণীভূক্ত হয়, তাহলে বান্দার করণীয় হচ্ছে তার দ্বারা সাহায্য কামনা না করা। তাগুত যদি এমন শ্রেণীর হয় যার উদ্দেশ্যে পশু জবাই করা হয় এবং এর মাধ্যমে তার নৈকট্য লাভ করা হয়, তাহলে বান্দার করণীয় হচ্ছে তার উদ্দেশ্যে পশু জবাই না করা। তাগুত যদি এমন শ্রেণীর হয় যার কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া হয় তাহলে বান্দার করণীয় হচ্ছে তার কাছে বিচার-ফয়সালার জন্য না যাওয়া।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেনঃ এই জন্যই যে ব্যক্তির কাছে আল্লাহর কিতাব ছাড়া বিচার-ফয়সালা চাওয়া হয়, তাকেই তাগুত নামে আখ্যায়িত করা হয়। [অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব ছাড়া বিচার-ফয়সালা কারীই তাগুত] (মাজমু উল ফতোয়া ৭০১/৭৮পৃঃ)
ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: প্রত্যেক কওমের ঐ ব্যক্তিই হচ্ছে তাগুত, কওমের লোকেরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে (সঃ) বাদ দিয়ে যার কাছে বিচার-ফয়সালা চায়। (এ'লামু মুকিঈন ৪০/১পৃঃ)
তিন : দুশমনি বা শত্রুতার মাধ্যমেঃ আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর ঘটনা বর্ণনা করতঃ বলেনঃ
قَالَ أَفَرَأَيْتُمْ مَا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ ۞ أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ ۞ فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِي إِلَّا رَبَّ الْعُلَمِينَ
"ইবরাহীম বললো : তোমরা এবং তোমাদের অতীত বাপ-দাদারা যে সব জিনিসের ইবাদত করে আসতেছো, সে গুলি কি কখনো তোমরা চোখ মেলে দেখেছো ? এরা সবাইতা আমার দুশমন একমাত্র রাব্বুল আলামীন ছাড়া।" (আশ্ শুআরা : ৭৫-৭৭)
চার : ক্রোধ ও ঘৃনার মাধ্যমেঃ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ ۞ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ ۞ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ
"তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সংঙ্গীগণের মধ্যে সুন্দর আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলো : তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত করো, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমরা যতক্ষণ না এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে, ততক্ষণ তোমাদের ও আমাদের মধ্যে থাকবে চির শত্রুতা, ক্রোধ ও ঘৃণা"। (আল মুমতাহিনা : ৪)
وَ لَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ নামক গ্রন্থের ১/৯০ পৃষ্ঠায় الدرر السنية لعلماء النجد এ আয়াতের ব্যাখায় বলা হয়েছে এ আয়াতটি এ কথারই প্রমাণ যে, মানুষ যদি তার রবের আনুগত্য, মুহাব্বত এবং তিনি যা পছন্দ করেন তার মুহাব্বতে ইবাদত করে, কিন্তু মুশরিকদেরকে এবং তাদের কাজকে ঘৃণা করেনা, বিরোধিতা করে, তবে সে তাগুতকে পরিত্যাগ করতে পারেনি। আর যে ব্যক্তি তাগুতকে পরিত্যাগ করতে পারেনি সে ইসলামেও প্রবেশ করতে পারেনি। অতএব সে কাফের যদিও সে রাত জেগে ইবাদত করার মাধ্যমে আর দিনে রোযা রাখার মাধ্যমে উম্মতের সবচেয়ে বড় আবেদ ও বুজুর্গ ব্যক্তি হয়ে থাকে। তার অবস্থা হচ্ছে ঐ নামাজী ব্যক্তির মত, যে ফরজ গোসল ব্যতীত নামাজ আদায় করলো অথবা তীব্র গরমের দিনে নফল রোযা রেখে রমযান মাসে দিনের বেলা অশ্লীল কাজে লিপ্ত থাকলো।
পাঁচ: অস্বীকার বা কুফরী করার মাধ্যমেঃ অর্থাৎ তাগূতকে অস্বীকার করা। তাগুতের যারা উপাসনা করে এবং নেতৃত্বেব আসনে বসায় তাদেরকে অস্বীকার করা এবং যে ব্যক্তি কুফরী মতবাদের প্রবর্তন করে অথবা কুফরীর দিকে আহবান জানায় তাকে অস্বীকার করা।
ইমাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেন: "আদম সন্তানের ওপর আল্লাহ তাআ'লা সর্ব প্রথম যে ফরজটি চাপিয়ে দিয়েছেন তা হচ্ছে, তাগূতকে অস্বীকার করা এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা"। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণীঃ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ -
"আমি প্রত্যেক উম্মতের কাছে এ মর্মে রাসুল পাঠিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো আর তাগূত থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকো।" (নাহলঃ৩৬)
তাগুতকে অস্বীকার করার ধরন বা প্রকৃতি হচ্ছে , গাইরুল্লাহর ইবাদত বাতিল বলে বিশ্বাস করা, গাইরুল্লাহর ইবাদত পরিহার করা, গাইরুল্লাহর ইবাদত কারীদেরকে অস্বীকার বা কুফরী করা এবং তাদের বিরোধিতা করা। " তিনি আরো বলেন: তাগুতের সাথে কুফরী করা অর্থাৎ তাগুতকে অস্বীকার করা ব্যতীত কেউ মুমিন হতে পারবেনা। এর প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার বাণী : فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ
"যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে সেই সুদৃঢ় হাতল ধারণ করেছে।" (আল বাক্বারাহ্ : ২৫৬) (মাজমুআতুত্ তাওহিদ আররিসালাতুল উলা ১৪-১৫পৃঃ)
তিনি আরো বলেন : ভাই সব, আল্লাহর ওয়াস্তে বলছি; আপনারা আপনাদের দ্বীনের মূলকে আঁকড়ে ধরুন, আঁকড়ে ধরুন অদ্যোপান্ত এবং আপদমস্তক। লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য প্রদান করুন। এর অর্থ অনুধাবন করুন। এ কলেমাকে ভালবাসুন। ভাল বাসুন এর ধারক ও বাহকদেরকে। তাদেরকে আপনারা আপনাদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করে নিন যদিও তারা আপনাদের কাছ থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। তাগুতগুলোকে আপনারা অস্বীকার করুন। তাদের বিরুদ্ধাচরণ করুন। তাদেরকে ঘৃণা করুন। ঘৃণা করুন ঐ সব লোকদেরকে, যারা তাদেরকে ভালবাসে, তাদের পক্ষে যারা তর্ক করে অথবা যারা তাদেরকে অস্বীকার করে না। অথবা একথা বলে যে, তাদের ব্যাপারে আমার কিছু করার নেই। অথবা বলে তাদেরকে কিছু বলা বা করার দায়িত্ব আল্লাহ আমাকে দেননি। একথা বললে অবশ্যই সে আল্লার প্রতি জঘণ্য মিথ্যা আরোপ করেছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা তার ওপর দায়িত্ব অর্পন করেছেন। তাদেরকে অস্বীকার করা আল্লাহ ফরজ করে দিয়েছেন। যদি তারা ভাই কিংবা সন্তানও হয় তবু তাদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে বলেছেন।
আল্লাহর ওয়াস্তে এ আদর্শকে আকড়ে ধরুন। আপনাদের রবের সাথে আপনাদের সাক্ষাৎ ঘটবে। তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবেন না। হে আল্লাহ, মুসলমান হিসেবে আমাদের মৃত্যুদান করুন এবং নেককার লোকদের সাথে আমাদেরকে মিলিয়ে দিন।

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 দ্বিতীয় রুকন : এক আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান

📄 দ্বিতীয় রুকন : এক আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান


তাওহীদের দ্বিতীয় রুকন বা স্তম্ভ হচ্ছে, এক আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করা।

আল্লাহর প্রতি ঈমান : আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং আল্লাহ তায়ালার রুবুবিয়্যাত সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ এবং তাঁর যাবতীয় নাম ও গুণাবলী (আসমা ও সিফাত) এর ক্ষেত্রে একত্ববাদকে স্বীকার করে নেয়া এবং এমন সকল ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদকে মেনে নেয়া যা একমাত্র তাঁরই জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমান তিনটি ভাগে বিভক্ত।

এক : আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের প্রতি ঈমান। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাতের সাথে খাস (বিষেশিত) আল্লাহর এমন যাবতীয় কর্মের প্রতি ঈমান পোষণ করা। যেমন : সৃষ্টি করা, রিযিক প্রদান, বিধান রচনা করা ইত্যাদি আল্লাহ তায়ালার কর্মের অন্তর্ভুক্ত। এ কাজগুলো আল্লাহর একক ক্ষমতার অধীন। তাই এ কাজগুলো এক আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। এ সব কাজে গাইরুল্লাহর অংশ গ্রহণকে অস্বীকার করতে হবে। এ সব কাজের বিন্দুমাত্র অংশও গাইরুল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা যাবেনা।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন : اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ ثُمَّ رَزَقَكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ ، هَلْ مِنْ شُرَكَائِكُمْ مَنْ يَفْعَلْ مِنْ ذَلِكُمْ مِّنْ شَيْءٍ ، سُبْحَنَهُ وَ تَعْلَى عَمَّا يُشْرِكُونَ "আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর রিযিক দিয়েছেন, এরপর তোমাদের মৃত্যু দিবেন। এরপর জীবিত করবেন। তোমাদের বানানো শরীকদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এসব কাজের মধ্যে কোনো একটিও করতে পারবে? তারা যাকে শরীক করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র।" (আর-রূম: ৪০)
দুই: আল্লাহ তায়ালার আসমা ও সিফাত [নাম ও গুনাবলী]-এর প্রতি ঈমান। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার ঐ সমস্ত নাম ও গুনাবলীর [আসমা ও সিফাত] প্রতি ঈমান আনয়ন করা যেগুলো আল্লাহ নিজেই নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন এবং তাঁর রাসুল তাঁর জন্য সাব্যস্ত করেছেন। ঈমান আনয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার কোনো নাম ও গুণকে আকৃতি বিশিষ্ট বলা যাবেনা, নিরর্থক বা অকার্যকর বলা যাবে না, পরিবর্তন করা যাবে না, (সৃষ্টির) সমতুল্য বলা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْئً وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ -
"বিশ্বলোকের কোনো কিছুই তাঁর (আল্লাহর) মতো নয়। অথচ তিনি সর্ব শ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।" (আশ-শুরাঃ১১)
অতঃপর যে সব নাম ও গুণাবলী একমাত্র আল্লাহরই জন্য প্রযোজ্য সেগুলোকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট করতে হবে এবং কোনো প্রকার অংশীদারীত্ব থেকে এগুলোকে মুক্ত রাখতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ
قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ -
'একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আসমান ও যমীনের কেউ গায়েবের খবর জানেনা।" (আন-নামল: ৬৫)
তিন : আল্লাহ তায়ালার উলুহিয়্যাতের প্রতি ঈমান।
এর অর্থ হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন "ইলাহ এবং মা'বুদ" (উপাস্য) একথা বিশ্বাস করা। দোয়া, রুকু, সেজদা, মানতসহ যাবতীয় ইবাদতের নিরঙ্কুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। যাবতীয় ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিবেদন করতে হবে। ইবাদতের বিন্দুমাত্র অংশও গাইরুল্লাহর জন্য নিবেদিত করা যাবেনা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا -
"তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীফ করো না। (আন্-নিসাঃ ৩৬)

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 আল্লাহ্‌র একত্ববাদের অনুসারী (মুওয়াহ্‌হিদ)

📄 আল্লাহ্‌র একত্ববাদের অনুসারী (মুওয়াহ্‌হিদ)


একথা অবশ্যই জেনে রাখা উচিৎ যে, বান্দা দুটি বিষয় ব্যতীত আল্লাহর "মুওয়াহহিদ" বা একত্ববাদের অনুসারী হতে পারবেনা।

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 তাওহীদ বিনষ্টকারী বিষয়

📄 তাওহীদ বিনষ্টকারী বিষয়


'নাকেদ্ব' বা বিনষ্টকারী বলতে এমন কিছুকে বুঝায়, যার অস্তিত্বের কারণে অন্য কোনো জিনিস বিনষ্ট বা বাতিল হয়ে যায়। এ কথা অবশ্যই জেনে রাখা প্রয়োজন যে, নামাজ বিনষ্ট বা বাতিল হওয়ার যেমন কিছু কারণ ও বিষয় আছে, তেমনিভাবে তাওহীদ বিনষ্টকারী কিছু কারণ ও বিষয় আছে। মুসল্লি যদি নামাজ বিনষ্টকারী বিষয়গুলোর যে কোনো একটিতে পতিত হয়, তাহলে সাথে সাথে তার নামাজ বাতিল হয়ে যায়। যেমন নামাজের মধ্যে শব্দ করে হাসা, কিছু আহার করা বা পান করা ইত্যাদি। এমনি ভাবে তাওহীদ বিনষ্টকারী কিছু কারণ ও বিষয় রয়েছে যার মধ্যে বান্দা পতিত হলে তার তাওহীদ বিনষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে সে কাফের মুশরিক হিসেবে গণ্য হয়।
তাওহীদ বিনষ্টকারী কতিপয় বিষয় নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ
১। আল্লাহর সাথে শরীক করা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ : لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ -
"আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি এ প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আপনি আল্লাহর সাথে শরীক [কাউকে] করেন, তবে আপনার সকল আমল বাতিল বা নিষ্ফল হয়ে যাবে। এবং ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।" (আয-ঝুমার: ৬৫)
২। আল্লাহ এবং বান্দার মাঝখানে এমন মাধ্যম স্থির করা যার কাছে বান্দা সুপারিশ কামনা করে এবং তার ওপর তাওয়াক্কুল করে। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاءُنَا عِندَ اللَّهِ -
"তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর উপাসনা করে, যা তাদের কোনো ক্ষতিও করতে পারেনা উপকারও করতে পারেনা। তারা বলেঃ এরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য সুপারিশকারী।" (ইউনুস: ১৮)
এটা হচ্ছে আউলিয়া এবং নেককার লোকদের কবরের উদ্দেশ্যে যারা যায় তাদের অবস্থা। তারা সেখানে গিয়ে কবরবাসিকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন ইবাদতে লিপ্ত হয়, কবরবাসী আল্লাহর কাছে সুপারিশ করতে পারবে এ বিশ্বাসে যেমনঃ তাদের কাছে দোয়া করা, তাদের উদ্দেশ্যে মানত করা, পশু যবাই করা, তাদের কাছে সাহায্য কামনা করা এবং কবরের চারপাশে প্রদক্ষিণ করা।
৩। মুশরিকদেরকে কাফের মনে না করা অথবা তাদের কুফরীর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা অথবা তাদের কুফরী মতবাদকে সহীহ মনে করা। এখানে সন্দেহ দ্বারা বুঝানো হচ্ছে যে, মুসলিম উম্মাহ যার কাফের হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করে তার কুফরীর ব্যাপারে কোনো মুসলমানের সন্দেহ পোষণ করা যেমনঃ ইহুদী নাসারা মুশরিক [অর্থাৎ ইহুদী নাসারা ও মুশরিকদের কুফরীর ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর কোনো দ্বিমত নেই, তাই কোনো মুসলমান এব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করতে পারবেনা। করলে সেও কুফরী মতবাদে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।] এ দৃষ্টি কোন থেকে জাহেলি যুগের মুশরিক যারা নিজেদের মুশরিক হওয়ার ব্যাপারে নিজেরাই স্বাক্ষ্য প্রদান করেছিলো, আর বর্তমান যুগের মুশরিক যারা ইসলাম ও ঈমানের দাবী করে অথচ আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট হককে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করে, এই দুই ধরনের মুশরিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
ইমাম শওকানী (রহঃ) বলেন: শিরক নামকরণকৃত কতিপয় বিষয়ের ওপর শুধু মাত্র শিরক নাম জুড়ে দিলেই শিরক বলা যায়না, বরং শিরক হচ্ছে গাইরুল্লাহর জন্য এমন কাজ করা যা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই নির্দিষ্ট। চাই সে কাজ জাহেলী যুগের কোনো নামেই হোক, অথবা বর্তমান যুগের অন্য কোনো নামেই হোক। এক্ষেত্রে নামে কিছুই আসে যায়না। [অর্থ্যৎ কোনো কাজ যদি শিরকের অন্তর্ভূক্ত হয়। তাহলে সেটা যে যুগেই হোক, আর যে নামেই হোক, শিরক হিসেবেই গণ্য হবে। যেমনঃ ভক্তির নামে গাইরুল্লাহকে সেজদা করা]
৪। রাসূল (সঃ) এর দ্বীন, অথবা [পূন্য কাজের] সাওয়াব অথবা [পাপের জন্য] শাস্তি এবং দ্বীনের যে কোনো বিষয় রং-তামাশা বিদ্রুপ করা কুফরী। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ قُلْ أَبِاللَّهِ وَأَيْتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِؤُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ -
"আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর আয়াত সমূহের সাথে, তার রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? তামাশা করো না, তোমরা তো ঈমান প্রকাশ করার পর কাফের হয়ে গেছো।" (আত-তাওবাহ: ৬৫-৬৬)
৫। যাদু: যাদুর মধ্যে রয়েছে (যাদু-মন্ত্র দ্বারা) স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিছিন্নতা সৃষ্টি করা; উভয়ের মধ্যে পরষ্পরের প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি করা। তাছাড়া "তাওলার" আশ্রয় নেয়া। তাওলা হচ্ছে [যাদু মন্ত্রের সাহায্যে) স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে বশীভূত করণ, যাতে স্ত্রীর ভালবাসায় স্বামী পাগল প্রায় হয়ে থাকে। এটা শিরক হওয়ার কারণ হচ্ছে, এর দ্বারা বিপদাপদ দূর করা এবং উপকার বা কল্যাণ সাধনের বিষয়টিকে গাইরুল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা হয়। এটা নিঃসন্দেহে কুফরী।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ وَمَا يُعَلِّمُنِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ - "তারা উভয়েই একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিতোনা যে, দেখো, আমরা নিছক পরীক্ষা মাত্র অতএব তুমি কুফরী করোনা।" (আল-বাকারাহঃ ১০২)
৬। মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষ নেয়া ও সহযোগিতা করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ، إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ - "তোমাদের মধ্যে কেউ যদি তাদেরকে [মুশরিকদেরকে] বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তাহলে সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা জালেমদেরকে হেদায়াত করেন না।" (মায়েদাহঃ ৫১)
৭। মূর্তি, প্রতিমা, মানব রচিত সংবিধান ইত্যাদি সহ অন্যান্য তাগুতকে সম্মান, ভক্তি ও শ্রদ্ধা করার জন্য শপথ করা।
ইমাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেন: অন্তরে আল্লার দ্বীনের স্থান হবে ধ্যান ধারনা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে, দ্বীনের প্রতি ভালবাসা এবং গাইরুল্লাহর প্রতি ক্রোধ ও ঘৃণার মাধ্যমে, দ্বীনের স্থান হবে মুখে স্বীকৃতির মাধ্যমে এবং কুফরী কথা পরিত্যাগের মাধ্যমে। এমনি ভাবে দ্বীনের স্থান হবে অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো কার্যকর করা এবং যাবতীয় কুফরী কর্ম পরিত্যাগ করার মাধ্যমে। এ তিনটি বিষয়ের কোনো একটি বিষয় যদি বান্দা পরিত্যাগ না করে তাহলে সে কুফরী করলো এবং দ্বীন পরিত্যাগ করলো বলে বিবেচিত হবে। (আদ্দোরার অসুন্নিয়া (৮/৭৮)
তাঁর কাশফুশ শুবহাত নামক পুস্তিকায় তিনি আরো বলেন: এটা যখন নিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত যে, কতিপয় মুনাফিক যারা রাসূল (সঃ) এর সাথে রুমের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে ও তাদের ঠাট্টা ও বিদ্রুপাত্নক কথার দ্বারা কুফরী করেছে, তখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, যে ব্যক্তি সম্পদের স্বল্পতার আশংকায় কিংবা কিছু প্রাপ্তির আশায় অথবা কারো মন তুষ্টির জন্য কুফরী কথা বললো অথবা কুফরী কর্ম করলো, সে অবশ্যই ঐ ব্যক্তির চেয়ে জঘণ্য কাজ করেছে যে ঠাট্টা ও বিদ্রুপাত্নক কথা বলেছে।
৮। মুহাব্বত ও ভালবাসার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা অথবা কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা। ইমাম ইবনুল কায়্যিম বলেন: এ কারণেই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে শিরক। আল্লাহর সাথে শিরকের ভিত্তি হচ্ছে মুহাব্বতের ক্ষেত্রে [আল্লাহর সাথে] শিরক করা। (আল জাওয়াবুল কাফি)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00