📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 চতুর্থ শর্ত : ইনকিয়াদ (সমর্পণ করা)

📄 চতুর্থ শর্ত : ইনকিয়াদ (সমর্পণ করা)


তাওহীদ জানার পর, লাই-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ, এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন, ইবাদতের মাধ্যমে কলেমা গ্রহণ করার পর অবশ্যই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন করতে হবে। এ সমর্পন হবে সকল তাগুতের সাথে কুফরী করার মাধ্যমে এবং তাগুত থেকে নিজেকে মুক্ত করার মাধ্যমে, এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেনঃ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا . "না, হে মুহাম্মদ, তোমার রবের নামে কসম, তারা কিছুতেই ঈমানদার হতে পারেনা, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক হিসেবে মেনে নিবে। অতঃপর তুমি যাই ফয়সালা করবে সে ব্যাপারে তারা নিজেদের মনে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবেনা বরং ফয়সালার সামনে নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পন করবে।" (আন-নিসা: ৬৫)

তৃতীয় শর্ত ও চতুর্থ শর্তের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, তৃতীয় শর্ত (কবুল) হচ্ছে কথার মধ্যে, আর চতুর্থ শর্ত (ইনকিয়াদ) হচ্ছে কর্মের মধ্যে।
আল্লামা আবদুর রহমান বিন হাসান আল শাইখ (রহঃ) বলেছেনঃ ইসলাম শুধুমাত্র একটি দাবী এবং মৌখিক উচ্চারণের নাম নয়। বরং ইসলামের অর্থ হচ্ছে একত্ববাদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন ও সোপর্দ করা, একমাত্র আল্লাহর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের কাছে আত্মসমর্পন করা (আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতকে অস্বীকার করা)। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন: فَمَنْ يَكْفُرُ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنُ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى "যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করলো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো, সেই শক্ত রজ্জু আকড়ে ধরলো।" (আল বাক্বারাহ: ২৫৬) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেনঃ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ، أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ، ذَلِكَ الدِّينُ الْقَدِيمُ وَلَكِنَّ أكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ "বস্তুত সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, স্বয়ং তাঁকে ছাড়া তোমরা কারো দাসত্ব ও বন্দেগী করবে না। এটাই সঠিক ও খাটি জীবন বিধান। কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানেনা। (ইউসূফ: ৪০) (আদ্‌ দুরার আস্ সুন্নিয়া কিতাবুত তাওহিদ ২/২৬৪পৃঃ)

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 পঞ্চম শর্ত : ছিদ্ক বা সত্যতা

📄 পঞ্চম শর্ত : ছিদ্ক বা সত্যতা


তাওহীদ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ জানার পর এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, তা মনে প্রাণে কবুল করা, এর প্রতি নিজেকে সমর্পন করার পর অবশ্যই বান্দাকে কলেমার ক্ষেত্রে স্বীয় সত্যতাকে প্রমাণ করতে হবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিম থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী (সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তিই সত্য নিষ্ঠ অন্তরে স্বাক্ষ্য দিবে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এবং মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন। রাসূল (সঃ) আরো ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি সত্যতার সাথে খাঁটি অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (আহমদ) যে ব্যক্তি এ কলেমা শুধু মুখে উচ্চারণ করবে কিন্তু এ কলেমা দ্বারা যা বুঝানো হয় তা যদি অন্তরে অস্বীকার করে তবে সে নাজাত [মুক্তি] লাভ করতে পারবেনা, যেমনটি আল্লাহর বর্ণনা অনুযায়ী মুনাফিকরা লাভ করতে পারবেনা। মুনাফিকরা শুধু মুখে বলেছিলো : نَشْهَدُ أَنَّكَ لَرَسُوْلُ اللهِ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল" এর জবাবে আল্লাহ তায়ালা বললেনঃ وَاللَّهُ يَعْلَمْ أَنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنْفِقِينَ لَكَذِبُونَ "আল্লাহও জানেন, আপনি অবশ্যই তাঁর রাসল। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচেছন যে মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।” (মুনাফিকুন :১) এমনি ভাবে আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলে বর্ণনা করেছেনঃ وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ أَمَنَّا بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ "আর মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বলে আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি, অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা ঈমানদার নয়"। (আল বাক্বারাহঃ৮)

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 ষষ্ঠ শর্ত : ইখলাস (একনিষ্ঠতা)

📄 ষষ্ঠ শর্ত : ইখলাস (একনিষ্ঠতা)


তাওহীদ, লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহর অর্থ, এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, অন্তর দিয়ে তা গ্রহণ, এর কাছে নিজেকে সমর্পণ এবং ঈমানের সত্যতা যাচাই এর পর বান্দাকে অবশ্যই কলেমার ব্যাপারে মুখলেস বা একনিষ্ঠ হতে হবে। আর ইখলাস হচ্ছে বান্দার ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিবেদিত হওয়া, গাইরুল্লাহর জন্য ইবাদতের বিন্দুমাত্র অংশও নিবেদিত হবে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينِ حُنَفَاءَ -
"তাদেরকে এ ছাড়া কোন হুকুমই দেয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে, একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে।" (বাইয়্যিনাহঃ ৫)
ইখলাসের মধ্যে এটাও অন্তর্ভুক্ত যে, বান্দা এ কলেমা কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে কিংবা কোনো ব্যক্তির সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বলবেও না আকড়েও ধরবে না। রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ
فان الله حرم على النار من قال لا اله الا الله يبتغي بذلك وجه الله -
"আল্লাহ তায়ালা ঐ ব্যক্তির জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন, যে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ উচ্চারণ করেছে"। (বুখারী ও মুসলিম)
রাসূল (সঃ) আরো বলেছেনঃ
اسعد الناس بشفاعتي يوم القيامة من قال لا اله الا الله خالصا مخلصا من قلبه -
'যে ব্যক্তি একনিষ্ঠ অন্তরে বললো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ সেই হচ্ছে কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ লাভের জন্য সবচেয়ে সৌভাগ্যবান"। (বুখারী )

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 সপ্তম শর্ত : মুহাব্বত (ভালবাসা)

📄 সপ্তম শর্ত : মুহাব্বত (ভালবাসা)


তাওহীদ জানার পর লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ, এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, অন্তর দিয়ে তা গ্রহণ, এর কাছে নিজেকে সমর্পন, ঈমানের সত্যতার যাচাই, কলেমার ব্যাপারে একনিষ্ঠ হওয়ার পর বান্দাকে অবশ্যই কলেমাকে মুহাব্বত করতে হবে। অন্তর দিয়ে কলেমাকে মুহাব্বত করতে হবে, আর মুখে কলেমার প্রতি মুহব্বতকে প্রকাশ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন
وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبٌّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حَبَّا لِلَّهِ ، وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذ يَرَوْنَ الْعَذَابَ ، أَنَّ الْقُوَّةَ اللَّهِ جَمِيعًا وَأَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعَذَابِ .
"আর মানুষের মধ্যে এমনও লোক রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি মুহব্বত বা ভালবাসা পোষণ করে, যেমন ভালবাসা উচিৎ একমাত্র আল্লাহকে। কিন্তু যারা ঈমানদার আল্লাহর প্রতি তাদের ভালবাসা সবচেয়ে বেশী। আর কতইনা ভাল হতো যদি এ জালেমরা পার্থিব কোনো কোনো আযাব প্রত্যক্ষ করে অনুধাবন করে নিতো যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য এবং শাস্তি প্রদানের ব্যাপারে আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর।"
(আল বাকারাহ: ১৬৫)
শাইখ সুলাইমান বিন সামহান (রহঃ) বলেনঃ এ সব বিষয়ে কথা বলা এবং জবাব দেয়ার পূর্বে আমি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ, এবং উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে যা বলেছেন তা উল্লেখ করতে চাই। এর সাথে সাথে আমাদের উস্তাদ শাইখ আবদুর রহমান বিন হাসান (রহঃ) যিনি দারুন্নজদিয়ার মুফতি, কলেমার সেই শর্তাবলীর কথাও উল্লেখ করতে চাই যেসব শর্তাবলী পূরণ করা ব্যতীত কোনো মানুষের ইসলাম সঠিক হবে না। একজন মানুষের মধ্যে যখনই এ শর্তগুলোর সমাবেশ ঘটবে এর জ্ঞান, আমল ও ধ্যান ধারণার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে এ কলেমাকে উচ্চারণ করবে, সাথে সাথে শাইখুল ইসলাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) এর উল্লেখকৃত ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক দশটি বিষয় থেকে সে মুক্ত থাকবে, তখনই তার ইসলাম সঠিক বলে বিবেচিত হবে। কারণ, এটাই হচ্ছে কলেমার মূল, যার উপর ভিত্তি করে এসব মাসআলার বিভিন্ন শাখা প্রশাখা এবং হুকুমের উদ্ভব হয়েছে। (আদ্ দুরার আস সুন্নিয়া কিতাবুত তাওহীদ)
আল্লামা শাইখ আবদুর রহমান বিন হাসান আল শাইখ বলেনঃ তুমি কলেমার ব্যাপারে যা উল্লেখ করেছো তাতে আমি খুশী। তোমার জানামতে, অধিকাংশ লোকই লা-ইলাহা ইল্লাহর অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞ। তাদের অবস্থা এইযে, যদি মুখে কলেমার কথা উচ্চারণ করে, তাহলে অর্থের দিকটা অস্বীকার করে। তাই ছয়টি অথবা সাতটি বিষয়ে তোমাকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। এ ছয়টি বিষয়ের সমাবেশ ব্যতীত একজন বান্দা কুফ্রী ও মুনাফিকী থেকে মুক্ত থাকতে পারেনা। একজন বান্দার মধ্যে ছয়টি বিষয়ের সমাহার এবং তদানুযায়ী আমল করার মাধ্যমেই সত্যিকারে মুসলিম হওয়া সম্ভব। তাই জ্ঞান, আমল, বিশ্বাস, গ্রহণ, মুহাব্বত ও আনুগত্যের দিক থেকে বান্দার অন্তর ও জবানের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে।
অতএব একজন মুসলমানের জ্ঞান এমন হতে হবে, যেখানে মুর্খতার অবকাশ নেই। তার ইখলাস হবে শিরক মুক্ত, সত্যতা হবে মিথ্যাচার মুক্ত, তার চরিত্র হতে হবে শিরক এবং নিফাক মুক্ত। তার বিশ্বাস হতে হবে সন্দেহ ও সংশয়মুক্ত। সে কলেমা উচ্চারণ করবে অথচ তার মনে কালেমা দ্বারা যা বুঝায় তার ব্যাপারে এবং এর দাবীগুলোর ব্যাপারে কোনো প্রকার সংশয় থাকবে না। তার মনে থাকবে সেই ভালবাসা, যার মধ্যে থাকবে না কোনো ঘৃনা, থাকবে এমন গ্রহণ যোগ্যতা যার মধ্যে থাকবে না কোনো অস্বীকৃতি। সেই আরব মুশরিকদের মতো তার অবস্থা হবে না যারা কলেমার অর্থ বুঝতো অথচ তা গ্রহন করেনি।
একজন মুসলিমের মধ্যে থাকা চাই সেই আনুগত্য, যার মধ্যে থাকবে না শিরকের অস্তিত্ব, যে শিরকের উদ্ভব হয়েছে কালেমার দাবী, অপরিহার্য বিষয় ও অধিকার পরিত্যাগ করার কারনে। কলেমার এসব দাবী ও অপরিহার্য বিষয়গুলোর মাধ্যমেই বান্দার ইসলাম ও ঈমান পরিশুদ্ধ হয়।
* উল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রতিফলন যথার্থ ভাবে যার জীবনে ঘটবে, সে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ শিক্ষার ক্ষেত্রে তার কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে। সাথে সাথে সে তার জ্ঞান 'প্রজ্ঞা' ভাল-মন্দের বিচার বুদ্ধি, হেদায়াত ও স্থিরতার সাহায্যে তার দ্বীনকে উপলদ্ধি করতে সক্ষম হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00