📄 দ্বিতীয় শর্ত : ইয়াকীন বা দৃঢ় বিশ্বাস
তাওহীদ (আল্লাহর একাত্ববাদ) জানার পর এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ জানার পর এ কলেমার প্রতি বান্দার দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে। এবং এর দ্বারা সব ধরণের ইবাদত যে একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে হবে এ কথার প্রতিও তার দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে। এ কলেমা দ্বারা যা বুঝানো হয়েছে সে ক্ষেত্রে বান্দার অন্তরে কোনো ধরণের দ্বিধা ও সন্দেহ থাকতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ، أُولَئِكَ هُمُ الصَّدِقُونَ -
"প্রকৃতপক্ষে মুমিন তো তারাই, যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের (সঃ) প্রতি ঈমান এনেছে, অতঃপর কোন সন্দেহ পোষন করেনি এবং জান মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তারাই সত্যবাদী ও সত্যনিষ্ঠ লোক।" (আল-হুজুরাতঃ১৫)
মুসলিম থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসে নবী (সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ যে বান্দা স্বাক্ষ্য দেয়, “আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি (মুহাম্মদ) (সঃ) আল্লাহর রাসূল" আর এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ পোষণ না করে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করে, (মৃত্যু বরণ করে) তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
📄 তৃতীয় শর্ত : কবুল (গ্রহণ করা)
তাওহীদ জানার পর লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ জানা এবং তাঁর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করার পর কলেমাকে মনে প্রাণে গ্রহণ করতে হবে কোনো প্রকার ইবাদতের মাধ্যমেই তা প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। [অর্থাৎ কোনো প্রকার ইবাদতই তাওহীদের পরিপন্থি, হবে না।] إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ ، وَيَقُولُونَ أَئِنَا لَتَارِكُو الهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُونِ
"এসব লোকেরা এমন ছিলো যে, তাদেরকে যখন বলা হতোঃ "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই" তখন তারা অহংকারে ফেটে পড়তো। তারা বলতোঃ আমরা এক পাগল কবির কথায় নিজেদের মাবুদগুলোকে পরিত্যাগ করবো?" (সাফফাতঃ৩৫-৩৬)
📄 চতুর্থ শর্ত : ইনকিয়াদ (সমর্পণ করা)
তাওহীদ জানার পর, লাই-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ, এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন, ইবাদতের মাধ্যমে কলেমা গ্রহণ করার পর অবশ্যই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন করতে হবে। এ সমর্পন হবে সকল তাগুতের সাথে কুফরী করার মাধ্যমে এবং তাগুত থেকে নিজেকে মুক্ত করার মাধ্যমে, এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেনঃ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا . "না, হে মুহাম্মদ, তোমার রবের নামে কসম, তারা কিছুতেই ঈমানদার হতে পারেনা, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক হিসেবে মেনে নিবে। অতঃপর তুমি যাই ফয়সালা করবে সে ব্যাপারে তারা নিজেদের মনে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবেনা বরং ফয়সালার সামনে নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পন করবে।" (আন-নিসা: ৬৫)
তৃতীয় শর্ত ও চতুর্থ শর্তের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, তৃতীয় শর্ত (কবুল) হচ্ছে কথার মধ্যে, আর চতুর্থ শর্ত (ইনকিয়াদ) হচ্ছে কর্মের মধ্যে।
আল্লামা আবদুর রহমান বিন হাসান আল শাইখ (রহঃ) বলেছেনঃ ইসলাম শুধুমাত্র একটি দাবী এবং মৌখিক উচ্চারণের নাম নয়। বরং ইসলামের অর্থ হচ্ছে একত্ববাদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন ও সোপর্দ করা, একমাত্র আল্লাহর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের কাছে আত্মসমর্পন করা (আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতকে অস্বীকার করা)। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন: فَمَنْ يَكْفُرُ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنُ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى "যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করলো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো, সেই শক্ত রজ্জু আকড়ে ধরলো।" (আল বাক্বারাহ: ২৫৬) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেনঃ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ، أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ، ذَلِكَ الدِّينُ الْقَدِيمُ وَلَكِنَّ أكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ "বস্তুত সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, স্বয়ং তাঁকে ছাড়া তোমরা কারো দাসত্ব ও বন্দেগী করবে না। এটাই সঠিক ও খাটি জীবন বিধান। কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানেনা। (ইউসূফ: ৪০) (আদ্ দুরার আস্ সুন্নিয়া কিতাবুত তাওহিদ ২/২৬৪পৃঃ)
📄 পঞ্চম শর্ত : ছিদ্ক বা সত্যতা
তাওহীদ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ জানার পর এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, তা মনে প্রাণে কবুল করা, এর প্রতি নিজেকে সমর্পন করার পর অবশ্যই বান্দাকে কলেমার ক্ষেত্রে স্বীয় সত্যতাকে প্রমাণ করতে হবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিম থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী (সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তিই সত্য নিষ্ঠ অন্তরে স্বাক্ষ্য দিবে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এবং মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন। রাসূল (সঃ) আরো ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি সত্যতার সাথে খাঁটি অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (আহমদ) যে ব্যক্তি এ কলেমা শুধু মুখে উচ্চারণ করবে কিন্তু এ কলেমা দ্বারা যা বুঝানো হয় তা যদি অন্তরে অস্বীকার করে তবে সে নাজাত [মুক্তি] লাভ করতে পারবেনা, যেমনটি আল্লাহর বর্ণনা অনুযায়ী মুনাফিকরা লাভ করতে পারবেনা। মুনাফিকরা শুধু মুখে বলেছিলো : نَشْهَدُ أَنَّكَ لَرَسُوْلُ اللهِ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল" এর জবাবে আল্লাহ তায়ালা বললেনঃ وَاللَّهُ يَعْلَمْ أَنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنْفِقِينَ لَكَذِبُونَ "আল্লাহও জানেন, আপনি অবশ্যই তাঁর রাসল। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচেছন যে মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।” (মুনাফিকুন :১) এমনি ভাবে আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলে বর্ণনা করেছেনঃ وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ أَمَنَّا بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ "আর মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বলে আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি, অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা ঈমানদার নয়"। (আল বাক্বারাহঃ৮)