📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি। তাঁরই সাহায্য কামনা করি। তাঁরই কাছে ক্ষমা চাই। আমাদের নফসের সকল অনিষ্টতা এবং আমাদের সকল কর্মের ভুল ভ্রান্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আল্লাহ যাকে হেদায়েত দান করেন কেউ তাকে গোমরাহ করতে পারে না। আর যাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেন, কেউ তাকে হেদায়েত করতে পারে না। আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরো স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সঃ) তাঁরই বান্দা এবং রাসূল।

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ آمَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ "হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে যেমন ভাবে ভয় করা দরকার ঠিক তেমন ভাবে ভয় করো। আর তোমরা অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যু বরণ করোনা।" (আল-ইমরান : ১০২)

يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِى خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَٰحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَآءً ۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ ٱلَّذِى تَسَآءَلُونَ بِهِۦ وَٱلْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا "হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার জুড়ী সৃষ্টি করেছেন, আর বিস্তার ঘটিয়েছেন তাদের দু'জন থেকে অগনিত নারী ও পুরুষ। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা পরস্পরের কাছে প্রার্থনা করে থাকো, আর আত্মীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআ'লা তোমাদের ব্যাপারে সুক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।" (আন-নিসা : ১)

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ آمَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَقُولُواْ قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَٰلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا "হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দিবেন। আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে।" (আল-আহযাব : ৭০-৭১)

এ পুস্তকে তাওহীদ (আল্লাহর একত্ববাদ) এবং বর্তমান সময়ে প্রচলিত শিরকের বিভিন্নরূপের বর্ণনা সংক্রান্ত তিনটি প্রবন্ধ সেই জ্ঞান ও সত্যানুসন্ধানকারীর সামনে উপস্থাপন করছি, যে বর্তমান সময়ে তার দ্বীন ও তাওহীদের চেতনা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। কেননা বর্তমান সময়ে একমাত্র আল্লাহ তায়ালা যার প্রতি করুনা করেছেন, আর শিরক থেকে রক্ষা করেছেন, সে ছাড়া অধিকাংশ লোকের মধ্যেই কতিপয় শিরক লুকায়িত আছে বলে প্রতিয়মান হচ্ছে। এ বিষয়গুলোর বিস্তারিত আলোচনা কয়েকটি, প্রবন্ধে উপস্থাপন করেছি। আর এগুলোর সম্মিলিত নাম দিয়েছি “রাসায়েলু মিরাসিল আম্বিয়া, নবীদের উত্তরাধিকারের বর্ণনা সংক্রান্ত সিরিজ।" আম্বিয়ায়ে কেরামের কাছ থেকে উম্মতগণ উত্তরাধিকার হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ যে সম্পদ অর্জন করেছে, তা হচ্ছে "তাওহীদ " বা আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের শিক্ষা।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ : فَمِنْهُمْ مَنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُمْ مِّنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلُلَةٌ ، فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ -
"আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি, এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত করো, আর তাগুত থেকে দূরে থাকো। অতঃপর তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোককে আল্লাহ্ হেদায়েত করেছেন, আর কিছু সংখ্যক লোকের জন্য গোমরাহী অবধারিত হয়ে গেলো। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমন করো, আর লক্ষ্য করো মিথ্যারূপকারীদের কি রকম পরিণতি হয়েছে।" (সুরা নাহলঃ ৩৬)
রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ
و ان العلماء ورثة الأنبياء وان الانبياء لم يورثوا دينارا ولا درهما وانما ورثوا العلم فمن أخذه أخذ بحظ وافر - (رواه ابو داود و ترمذي)
"নিশ্চয়ই ওলামায়ে কেরাম হচ্ছে নবীগণের ওয়ারিশ, (উত্তরাধিকারী) আর নবীগণ উত্তরাধিকার হিসেবে দিনার ও দিরহাম (অর্থ সম্পদ) রেখে যাননি, বরং তাঁরা একমাত্র এলেমই (জ্ঞান) উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন। অতএব যে ব্যক্তি এলেমকে (জ্ঞান) গ্রহণ করে সে যেনো পূর্নাঙ্গ অংশই গ্রহণ করে।" (আবু দাউদ ও তিরমিযী)
জ্ঞানের মধ্যে তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের জ্ঞানই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ। কারণ তাওহীদের জন্যই আল্লাহ তার বান্দাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ -
"আমি জ্বিন এবং মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।" (যারিয়াত: ৫৬)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেনঃ
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ . وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَشْوكُمْ
"হে নবী জেনে রাখো- আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার ত্রুটির জন্য এবং মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত।" (মুহাম্মদ: ১৯)
লাইলাহা ইল্লাল্লাহ সম্পর্কিত জ্ঞানের অপরিহার্য বিষয় হচ্ছে এতদসংক্রান্ত জ্ঞানের শর্তাবলী, মৌলিক উপাদান, এর সাংঘর্ষিক দিক এবং অত্যাবশকীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা। এ সিরিজের প্রথম প্রবন্ধে এ বিষয়গুলোই আলোচনা করেছি অর্থাৎ তাওহীদের অর্থ, এর শর্তাবলী, এর মৌলিক উপাদান, এর সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়, এর ভিত্তিমূল এবং এর নিয়মাবলী আলোচনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে বর্ণনা করা হয়েছে, যে ব্যক্তি তাগুতের কাছে (অর্থাৎ খোদাদ্রোহী শক্তির কাছে) বিচার-ফয়সালা প্রার্থনা করে, সে তাগুতকে অস্বীকার করেনা। যারা তাগুতী শক্তির বলে বিচার-ফয়সালা করে এ আলোচনায় তাদেরকে বুঝানো হয়নি বরং আলোচনায় তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে যারা তাগুতী শক্তির কাছে বিচার চায় এবং বিবাদের ফয়সালা উক্ত শক্তির কাছে ন্যস্ত করে।
আফসোসের বিষয় হচ্ছে এই যে, আমরা বর্তমান যমানায় এমন কিছু লোক দেখতে পাই; যারা সামান্য অর্থ, পদবী ইত্যাদি লাভের জন্য বিচার-ফয়সালা তাগুতী শক্তির কাছে নিয়ে যায়। তারা এ কথা জানেনা যে, এ সব তুচ্ছ জিনিসের জন্য জিহাদ থেকে সরে থাকা মানুষের জন্য জায়েয নেই।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجِكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ نِ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمُسْكِنْ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادِ فِي سَبِيلِهِ .
"আপনি বলে দিন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তানাদি, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যা তোমরা উপার্জন করিয়াছ, সে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ করো- তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর রাস্তায় জেহাদ করার চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফয়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না।" (আত্ তাওবাহ: ২৪)
মানুষ যদি উল্লেখিত আয়াতে বর্ণিত আটটি কারণে জিহাদ থেকে বিরত থাকে, তাহলে কি সে মাযুর (অর্থাৎ জেহাদে না যাওয়ার সংগত অজুহাত) বলে গণ্য হবে? এর জবাব হচ্ছে, 'না'। কেননা আল্লাহ তায়ালা উপরোক্ত পার্থিব কারণ গুলোর নিন্দা করেছেন, যে গুলোর সাথে নিজেদের জীবনকে সম্পৃক্ত করে রাখার কারণে তারা জিহাদকে পরিত্যাগ করেছে।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, যে ব্যক্তি তাওহীদ (আল্লাহর একাত্ববাদ) কে পরিত্যাগ করেছে, সে বেশী জঘন্য অপরাধ করেছে, নাকি যে ব্যক্তি আটটি পার্থিব কারণে জেহাদ পরিত্যাগ করেছে সে বেশী জঘন্য অপরাধ করেছে? এখানে জবাব হচ্ছে, নিঃসন্দেহে বলা যায়, যে ব্যক্তি তাওহীদ পরিত্যাগ করেছে, সে জেহাদ পরিত্যাগকারীর চেয়ে জঘন্য অপরাধী। পার্থিব ৮টি বিষয়ের কারণে যদি আল্লাহ তায়ালা জিহাদ পরিত্যাগকারীর অজুহাত কবুল না করে থাকেন, তাহলে কিভাবে উক্ত পার্থিব বিষয়গুলোর কারণে তাওহীদ পরিত্যাগকারীর অজুহাত গ্রহণ করবেন। একমাত্র বল প্রয়োগে সংকটাপন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রেই কুফরী কথা উচ্চারণের ওজর গ্রহণ করেছিলেন। আর বল প্রয়োগের মাধ্যমে সংকটাপন্ন ব্যক্তির দৃষ্টান্ত হচ্ছে; তার সাথে এমন কাজ করা, যা করা হয়েছিলো আম্মার বিন ইয়াসির (রঃ) এর সাথে। এটা শুধু জীবন বাঁচানোর জন্য অনুমতির ব্যাপার মাত্র। কিন্তু দৃঢ় ঈমানের পথ গ্রহণ করা সর্বোত্তম। এব্যাপারে অনেক হাদীছ রয়েছে।
শাইখ হামাদ বিন আতীক (রহঃ) তাঁর ( بيان سبيل النجاة والفكاك ) নামক প্রবন্ধে উপরোক্ত আয়াতের (من موالاة المرتدين واهل الاشراك) উপর মন্তব্য পেশ করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ তায়ালা কোনো ব্যক্তির 'বাপ-ভাই' এর অভিভাবকত্ব মেনে নিতে নিষেধ করেছেন, যদি তাদের আদর্শ ইসলাম ভিন্ন অন্য কিছু হয়ে থাকে, অথচ বাপ-ভাই মানুষের মধ্যে তার জন্য সবচেয়ে নিকটতম ব্যক্তি।
আরো বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি তার বাপ ও ভাই কাফের হওয়া সত্ত্বেও তাদের অভিভাবকত্ব মেনে নিবে সে ব্যক্তি জালেম। তাহলে সে ব্যক্তির অবস্থা কি দাঁড়ায়, যে তার নিজের দুশমন, তার পূর্বপুরুষদের দুশমন এবং তার দ্বীনের দুশমন কাফেরদেরকে অভিভাবক ও বন্ধু মেনে নেয়? সে কি জালেম হবে না? আল্লাহর কসম অবশ্যই সে সবচেয়ে বড় জালেমদের অন্তর্ভূক্ত হবে।
অতঃপর আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন যে, কাফেরদেরকে অভিভাবক ও বন্ধু হিসেবে মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে আয়াতে বর্ণিত আটটি পার্থিব বিষয় কখনো অজুহাত হিসেবে গ্রহণ যোগ্য হতে পারে না। অতএব কোনো ব্যক্তির জন্যই স্বীয় বাপ, ভাই, দেশ অথবা সম্পদের ওপর ভয় অথবা পরিবার পরিজনের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আবেগ অথবা স্ত্রীর ওপর কোনো আশঙ্কার কারণে কাফেরদেরকে অভিভাবক ও বন্ধুরূপে মেনে নেয়া বৈধ নয়। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাঁর সৃষ্টির জন্য এগুলোকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে কেউ যদি বলেঃ অনেক মুফাস্সিরীনে কেরام বলেছেনঃ এ আয়াত নাযিল হয়েছে জিহাদের ব্যাপারে, তখন তার জবাব হবে দুটিঃ
একটি হচ্ছে: যদি উল্লেখিত আটটি বিষয় জিহাদ (যা ফরজে কেফায়া) পরিত্যাগ করার অজুহাতে বর্ণনা না হয়ে থাকে তাহলে মুশরিকদের সাথে দুশমনি আর সম্পর্কচ্ছেদের বিষয়টি পরিত্যাগ করার অজুহাত নিশ্চিয়ই হতে পারেনা।
দ্বিতীয় জবাব হচ্ছেঃ আয়াতটি আলোচিত বিষয়েরই প্রমাণ পেশ করছে যেমনি ভাবে জেহাদের প্রমাণ পেশ করে। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادِ فِي سَبِيلِهِ
“তোমাদের কাছে আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং তাঁর পথে জেহাদের চেয়েও বেশী প্রিয়।” (আত-তাওবাহ: ২৪)
অতএব আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) প্রতি মুহাব্বতের অপরিহার্য দাবী হচ্ছে ৮টি বিষয়ের ওপরে মুশরিকদের সাথে দুশমনি এবং তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার প্রদান করা এবং সর্বাগ্রে নিয়ে আসা। এমনিভাবে জেহাদের প্রতি মুহাব্বতের দাবী হচ্ছে জিহাদকে আটটি বিষয়ের ওপর অগ্রাধিকার দেয়া।
মীরাসুল আম্বিয়ার তৃতীয় প্রবন্ধটি হচ্ছে যারা আইন প্রণয়ন ও রচনাকারী সংসদ ও তার বৈঠকাদিতে যোগদানের বিষয়টিকে বৈধ বলে মনে করে তাদের জবাব এবং ভোট প্রার্থী ও ভোট দাতা উভয়েই বড় শিরকের মধ্যে নিপতিত এ সংক্রান্ত বর্ণনা।
আল্লাহ তায়ালার কাছে তাঁর সুন্দর সুন্দর নাম এবং মহান সিফাতগুলোর উসিলায় প্রার্থনা করছি যে, তিনি যেনো আমাদেরকে যাবতীয় শিরক থেকে হেফাজত করেন। গোপন ও প্রকাশ্য ফিতনাগুলোতে নিপতিত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। তিনি যেনো আমাদের ঈমান আক্বীদা, কথা এবং কাজে যথার্থ ভূমিকা পালনের তৌফিক দান করেন। কুফরী ও ভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়া থেকে তিনি যেনো আমাদের হেফাজত করেন। নিশ্চয়ই তিনি মহা শক্তির অধিকারী।
আল্লাহর পক্ষ থেকে অসংখ্য রহমত ও করুণা বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ (সঃ), তাঁর পরিবার ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর।

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 তাওহীদের অর্থ

📄 তাওহীদের অর্থ


হে আমার মুসলিম ভাই [আল্লাহ আপনাকে রহম করুন] আপনি একথা জেনে রাখুন যে, তাওহীদ হচ্ছে বান্দার ওপর আল্লাহর হক। আর এ তাওহীদই হচ্ছে সেই লক্ষ্য, যার জন্য আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
"আমি জ্বিন এবং মানব জাতিকে একমাত্র আমার এবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি"। (আয যারিয়াতঃ ৫৬)
ليعبدون এর ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেন (ليُوحدونی) (আমার একত্ববাদ মেনে নেয়ার জন্যই তাদেরকে সৃষ্টি করেছি)। আমি তাদেরকে আদেশ দেই আবার নিষেধও করি।
অতএব তাওহীদ হচ্ছে সবচেয়ে বড় ন্যায় পরায়ণতা। যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদকে মেনে নিলো, সে একটি জিনিসকে তার নিজস্ব স্থানে রাখলো এবং ইবাদতকে তার যথাযোগ্য প্রাপকের উদ্দেশ্যে নিবেদিত করলো। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"আল্লাহ নিজেই এ কথার স্বাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। ফেরেস্তা এবং সব জ্ঞানবান লোকেরাও সততা ও ইনসাফের সাথে এ স্বাক্ষ্যই দিচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে সেই মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানী ছাড়া আর কেহই ইলাহ হতে পারেনা"। (আলে-ইমরানঃ ১৮)
তাওহীদ হচ্ছে বান্দা তার রবের একত্বকে মেনে নেয়া, তাঁর রুবুবিয়াত সংক্রান্ত কাজগুলোর মধ্যে, তাঁর সকল আসমা ও সিফাত (নাম ও গুণাবলী) এর মধ্যে এবং (বান্দার) সকল ইবাদতের মধ্যে।

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 শিরকের অর্থ

📄 শিরকের অর্থ


আর শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করলো, সে বস্তুকে যথাস্থানে না রেখে অন্যস্থানে এবং ভিন্ন উৎসে রাখলো, আর ইবাদতকে নিবেদিত করলো যে এর প্রাপক নয় তার উদ্দেশ্যে এর ফলে সে বিরাট বড় পাপের অধিকারী হলো। আল্লাহ তায়ালা লোকমান হাকিম কর্তৃক তার ছেলেকে উপদেশ প্রদানের ঘটনা বর্ণনা দিয়ে ইরশাদ করেছেনঃ
وَإِذْ قَالَ لِقَمَنُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَبْنَى لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ، إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
"স্বরণ করো, লোকমান যখন নিজের ছেলেকে উপদেশ দিচ্ছিলো তখন সে বললো, পুত্র! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করোনা। বস্তুতঃ শিরক হচ্ছে বড়ই জুলুমের কাজ"। (লোকমান :১৩)
ইমাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেন, (দ্বিতীয় মাসআলা) আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাঁর যে বিরাট ও মহান কর্ম সম্পাদনের কথা উল্লেখ করেছেন, তা (মানুষের) জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধি মোতাবেক যতটুকু বুঝতে সক্ষম ততটুকু বর্ণনা করেছেন, তা আল্লাহ তায়ালার আযমত ও জালালত [বড়ত্ব ও মহানুভবতা] (মানুষের) জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দ্বারা যতটুকু অনুমান করা যায়, তার চেয়েও অনেক বেশী। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ
مَا السَّمٰوتُ السَّبْعُ وَالْاَرْضُوْنَ السَّبْعُ فِيْ كَفِّ الرَّحْمٰنِ اِلَّا كَخَرْدَلَةٍ فِيْ كَفِّ اَحَدِكُمْ -
"রহমানের [আল্লাহর] হাতের তালুতে সপ্তাকাশ ও সপ্ত যমীনের অবস্থা তোমাদের কারো হাতের তালুতে সর্ষে দানার মতোই।" এটাই হচ্ছে আল্লাহর আযমত ও জালালতের নমুনা, তাহলে যে মাখলুক [সৃষ্টি] নিজের কল্যাণ অকল্যাণ সাধনের কোন ক্ষমতা রাখেনা, তাকে কিভাবে স্রষ্টার স্থানে বসানো সম্ভব? এ রকম করাটাই হচেছ সবচেয়ে বড় জুলুম আর চরম মুর্খতা। যেমনটি নেককার বান্দা [ লোকমান হাকীম। তাঁর ছেলেকে বলেছিলেনঃ
يٰبُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيْمٌ
"হে পুত্র, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না, বস্তুতঃ শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম"। (লোকমান: ১৩)
শিরক : শিরক হচ্ছে, বান্দা আল্লাহর সাথে তাঁর রুবুবিয়াত সংক্রান্ত কর্ম কিংবা তাঁর আসমা ও সিফাত [নামসমূহ ও গুণাবলী] অথবা ইবাদতের মধ্যে কাউকে শরীক করা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00