📄 আমল না করে কেবল আশা করে বসে থাকা
আলি রা. এক খুতবায় বলেন, লোকসকল! তোমরা তাদের মতো হয়ে যাবে না যারা আমল না করেই পরকালীন উত্তম নিবাসের আশা করে বসে আছে এবং বড় বড় আশা-আকাঙ্ক্ষা করে তাওবা করতে বিলম্ব করছে। তারা দুনিয়াবিমুখদের মতো কথা বলে আর জীবনযাপন করে দুনিয়াদারদের মতো। দুনিয়ার কিছু প্রদান করা হলেও তারা পরিতৃপ্ত হয় না আর তাদেরকে না দেওয়া হলে তারা অল্পেতুষ্টির পন্থাও অবলম্বন করে না। তারা কৃতজ্ঞতা আদায় করে না আর নিজের নিকট মজুত থাকা সত্ত্বেও আরও বেশি বেশি তালাশ করে। তারা অন্যদেরকে সৎকাজের আদেশ করে কিন্তু নিজেরা তা পালন করে না। মানুষকে অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে কিন্তু নিজেরা তা থেকে বিরত থাকে না। সালেহিনদের ভালোবাসে কিন্তু তাদের মতো আমল করে না। জালেমদের ঘৃণা করে কিন্তু তারা নিজেই মানুষের ওপর জুলুম করে। তাদের ধ্যানধারণার ওপর তাদের প্রবৃত্তি বিজয়ী হয়ে যায় কিন্তু তাদের অন্তরের বিশ্বাস প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী হতে পারে না।
যখন তারা সুস্থ-সবল থাকে তখন মানুষের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় আর যখন অসুস্থ হয়ে যায় তখন দুঃখবোধ করতে থাকে। দুঃখদুর্দশা ও দারিদ্র্যে নিপতিত হলে তারা নিরাশ ও দুর্বল হয়ে পড়ে। আল্লাহর নেয়ামত পেয়ে এভাবেই তারা তাঁর অবাধ্যতা করতে থাকে।
তারা যখন সুস্থ থাকে তখন আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, আর যখন বিপদে নিপতিত হয়ে যায় তখন আর ধৈর্যধারণ করতে পারে না। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয় যেন তাদেরকে নয় বরং অন্যদেরকে মৃত্যুর ব্যাপারে সতর্ক করা হচ্ছে। যেন পরকালের হুমকি-ধমকির উদ্দেশ্য তারা নয় বরং অন্যরা।
হে ওই সকল লোকেরা, যারা দুনিয়ার টার্গেট হয়ে গেছে, মৃত্যুর হাতে যারা বন্ধক রয়েছে, মৃত্যুর পেয়ালা যাদের সামনে উপস্থিত রয়েছে, কালের দুর্যোগ যাদের ওপর আপতিত হয়েছে, যুগের বিপদ যাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে, যারা হয়ে গেছে জামানার গ্রাস, কালের দুর্বিপাক যাদের ওপর আপতিত হয়েছে, সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণের সামনেও যারা বোবা হয়ে বসে আছে, ফিতনা-ফাসাদের সমুদ্রে যাদের জাহাজ ডুবে গেছে এবং এসবের ফলে যারা অতীত থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারছে না, আমি তাদের সকলকে লক্ষ করে বলছি, জেনে রাখো, যারা মুক্তি লাভ করেছে তারা কেবল নফসের পরিচয় লাভ করেই মুক্তি পেয়েছে আর যারা ধ্বংস হয়ে গেছে তারা কেবল নিজের কর্মের কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। লক্ষ করে দেখো, আল্লাহ তাআলা কী বলছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করো। (সুরা তাহরিম, ৬)
আল্লাহ তাআলা আমাদের এবং তোমাদের সবাইকে সে সকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা উপদেশ শ্রবণ করে তা গ্রহণ করে। আমলের প্রতি যাদের আহ্বান জানানোর পর তারা আমল করে。
টিকাঃ
[৩৬৪] কানযুল উম্মাল, ১৬/২০৫, ক্রমিক নম্বর, ৪৪২২৯
📄 বিপদ এবং ধৈর্য
আলি রা. বলেন, যে ব্যক্তি দারিদ্র্যের ভান ধরে সে দরিদ্র হয়ে যায়। যে দীর্ঘ জীবন লাভ করে সে পরীক্ষায় নিপতিত হয়। আর যে ব্যক্তি বিপদ-মুসিবতের জন্য প্রস্তুত থাকে না, বিপদ এলে সে ধৈর্যধারণ করতে পারে না। যে ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করে সে স্বার্থপর বনে যায়। আর যে ব্যক্তি মানুষের সাথে পরামর্শ করে কাজ করে না, সে লজ্জিত হয়。
টিকাঃ
[৩৬৫] কানযুল উম্মাল, ১৬/১৯৭
📄 ইসলামের নাম
আলি রা. বলেন, অচিরেই সে সময় চলে আসবে যখন কেবল ইসলামের নাম বাকি থাকবে আর কুরআন কারিমের লিখিত রূপ থাকবে, কিন্তু তার ওপর আমল থাকবে না。
টিকাঃ
[৩৬৬] কানযুল উম্মাল, ১৬/১৯৭
📄 মৃত্যুপরবর্তী জীবনকে সুন্দরবাদ
হজরত আলি রা.-এর নিকট একবার তার কোনো এক সঙ্গীর মৃত্যুর খবর পৌঁছে। কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন যে, সে আসলে মৃত্যুবরণ করেনি। তখন তিনি তার উদ্দেশে চিঠি লিখে বলেন :
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। পরসমাচার, আমার কাছে প্রথমে আপনার মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছেছিল, আমি জানতে পেরেছিলাম সে কারণে আপনার সঙ্গী-সাথিরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। পরে আমি জানতে পারি যে, সেটা ছিল মিথ্যা সংবাদ। তাই তখন আমরা আবার আনন্দিত হয়ে উঠি। তবে জেনে রাখুন, সে আনন্দ অচিরেই শেষ হয়ে যাবে, খুব শীঘ্রই প্রথম সংবাদটি সত্য হয়ে হাজির হবে।
আপনার অবস্থা কি সেই ব্যক্তির মতো, যে মৃত্যুকে স্বচক্ষে দেখেছে, মৃত্যুপরবর্তী জীবনকে প্রত্যক্ষ করেছে, এরপর সে দুনিয়াতে ফিরে আসার জন্য অনুনয়-বিনয় শুরু করে দিয়েছে? কবরজগতের সামানা লাভ করার জন্য সে পুনরায় ফিরে আসতে চাচ্ছে? সে চাচ্ছে প্রয়োজন পরিমাণ অর্থসম্পদ দুনিয়া থেকে পরকালে নিয়ে যেতে? সে মনে করছে এই সম্পদ ছাড়া তার আর কোনো পুঁজি নেই।
জেনে রাখুন, দিবারাত্রির এই পালাবদলে আমাদের জীবন ফুরিয়ে আসছে। আমাদের জন্য নির্ধারিত সম্পদ শেষ হয়ে আসছে। মৃত্যু ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। আফসোস সে সকল জাতির জন্য, যাদেরকে আদ ও সামুদ জাতির পরিণাম বরণ করতে হয়েছে। তাদের পরও বহু জাতি গত হয়েছে, যারা একসময় নিজেদের রবের নিকট উপনীত হয়েছে। আপন আপন কর্ম অনুযায়ী প্রতিদান পেয়েছে।
জেনে রাখুন, এই দিবস ও রজনী বারবার ফিরে আসে, অতীতের কোনো বিপদ-আপদ যাকে ক্লিষ্ট করতে পারে না। প্রতিটি দিবস ও রজনীই সেসব বিপদ-আপদের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখে যা অতীতে তার ওপর দিয়ে গিয়েছে। আপনি আপনার ভাই-বন্ধুদের মতোই একজন মানুষ। আপনার দৃষ্টান্ত তো হলো সেই দেহের মতো, যার শক্তি ফুরিয়ে গেছে, এখন কেবল নিভুনিভু করে তার জীবনপ্রদীপ জ্বলছে। অপেক্ষা করছে কখন মৃত্যুর ডাক চলে আসে। অতএব আপনি নিজেকে সংশোধন করুন। আল্লাহর নিকট শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় চান এবং তার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করুন。
টিকাঃ
[৩৬৭] কানযুল উম্মাল, ১৬/১৯৯, ক্রমিক নম্বর, ৪৪২২১