📄 ছেলে মুহাম্মদির প্রতি চিঠি
আলি রা. আপন ছেলে মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়াকে চিঠি লিখে বলেন, দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করো। যেসব বিষয় তোমার নিকট অপছন্দনীয় ঠেকে, তাতে তুমি নিজেকে সবর তথা ধৈর্যের ওপর অভ্যস্ত করে তোলো। তোমার সব বিষয় আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করে দাও। কেননা এটা তোমাকে দুর্ভেদ্য দুর্গ ও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে। আপন প্রতিপালকের নিকট একনিষ্ঠভাবে প্রার্থনা করো। কারণ কাউকে দেওয়া না-দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র তাঁর হাতেই। তাঁর নিকট বেশি বেশি ইসতেখারা করো।
জেনে রাখো, আল্লাহ তাআলা এ দুনিয়া ধ্বংস করে দেবেন। পরকালে মানুষকে আবাদ করবেন। তাই যদি পারো তাহলে এই দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ হয়ে যাও। যদি তুমি আমার এই উপদেশ গ্রহণ না করো, তাহলে নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, তুমি কখনো আপন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। মৃত্যুকে কখনো ডিঙাতে পারবে না। কেননা তুমি তোমার পূর্ববর্তীদের পথেই রয়েছ।
সব ধরনের নিকৃষ্ট কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে। যদিও তা তোমার কামনীয় বস্তু হয়। তুমি যে কষ্ট করছ, কখনো তার ক্ষতিপূরণ করতে পারবে না। সাবধান, আশা-আকাঙ্ক্ষার বাহন যেন তোমাকে নিয়ে না দৌড়ায়। কারণ তা তোমার পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করে দিয়েছে।
জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কারণ অধিক পরিমাণ নীরবতার মধ্যেই রয়েছে তোমার সংশোধন। যেসব বিষয় বলতে ভুলে যাও তা পরে বলার ক্ষেত্রে সহজতা অবলম্বন করবে। জিহ্বা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তুমি নিজের ভেতরের অবস্থাদি সংরক্ষণ করতে পারবে। জেনে রাখো, মধ্যমপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে সকল বিষয় উত্তমভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে।
গুনাহপূর্ণ ধনাঢ্যতার পরিবর্তে হালাল কোনো পেশা গ্রহণ করাটাই উত্তম। ব্যক্তি নিজেই নিজের গোপন বিষয়াদি উত্তমরূপে সংরক্ষণ করতে পারে। কখনো কখনো সে এমন সব বিষয় করে ফেলে যা তার জন্য হয়ে থাকে ক্ষতিকর।
আশা-আকাঙ্ক্ষার ওপর ভরসা করা থেকে বিরত থাকবে। কারণ তা হলো নির্বোধদের পুঁজি। অন্যথায় এটা তোমাকে দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতেই হতাশ করে ছাড়বে।
দুনিয়ার সর্বোত্তম বিষয় হলো উত্তম বন্ধু। তাই ভালো লোকদের সাথে ওঠাবসা করবে, তাহলে তাদের মতো হতে পারবে। মন্দ লোকদের সংশ্রব এড়িয়ে চলবে, তাহলে আপনাতেই তাদের থেকে তোমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। মন্দ ধারণা যেন তোমার ওপর প্রবল না হয়ে যায়। কেননা এটা তোমার এবং তোমার বন্ধুদের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে দেবে। লাকড়ির মাধ্যমে যেভাবে আগুন জ্বালিয়ে চারপাশকে আলোকিত করে তোলা হয়, তুমি সেভাবে শিষ্টাচারের মাধ্যমে তোমার অন্তরকে আলোকিত করে তোলো।
জেনে রাখো, অনুগ্রহ অস্বীকার করাটা হলো নীচু স্বভাব আর নির্বোধদের সাথে ওঠাবসা হলো হতভাগ্যের নিদর্শন। নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা হলো আভিজাত্যের নিদর্শন। যে সহনশীল হতে পারে সে জনগণের নেতৃত্ব দিতে পারে। যে কোনোকিছু ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে, তার জ্ঞান বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তোমার ভাইকে নসিহত করতে থাকো, চাই সেটা ভালো কিছু অর্জনের হোক বা মন্দ কিছু থেকে বিরত থাকার। ভাই-বন্ধুদের কোনো সন্দেহে নিপতিত করো না। যে তোমাকে খুশি করে তাকেও খুশি করো। কষ্ট দিয়ো না তাকে। এ কষ্ট সে আনন্দের প্রতিদান হতে পারে না।
রিজিক দুই প্রকার, এক ধরনের রিজিক হলো তোমাকে যা খুঁজে অর্জন করতে হয়। আরেক ধরনের রিজিক হলো যা নিজেই তোমাকে খুঁজে বেড়ায়। যদি তুমি তার পর্যন্ত না যাও তাহলে সে নিজেই তোমার নিকটে এসে যাবে।
হে আমার বৎস! জেনে রাখো, যে সম্পদের মাধ্যমে তুমি নিজের নিবাসকে উত্তম করতে পারো সেটাই হলো তোমার দুনিয়ার সম্পদ। তাই অর্থসম্পদ খরচ করে যাও। তা কখনো অন্যের জন্য জমা করে রাখবে না। কোনোকিছু হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কারণে যদি তুমি দুঃখবোধ করো, তাহলে তো তোমাকে ওইসব বিষয়ের জন্য দুঃখবোধ করা উচিত যা তোমার নিকট পৌঁছেনি!
চক্ষুষ্মানও কখনো কখনো নিজের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে আর অন্ধরাও কখনো-সখনো সঠিক পথ পেয়ে যায়।
যে ব্যক্তি মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে সে কখনো ধ্বংস হয় না। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াবিমুখ হয় সে কখনো প্রয়োজনগ্রস্ত হয় না।
যে ব্যক্তি যুগের ওপর নির্ভর করে যুগ তার সাথে খেয়ানত করে। আর যে ব্যক্তি যুগকে সম্মান করে যুগ তাকে অপমান করে।
দ্বীনের মূল বিষয় হলো ইয়াকিন আর সর্বোত্তম কথা হলো কাজের মাধ্যমে যা বাস্তবায়ন করা হয়।
কোথাও যেতে হলে পৌঁছানোর রাস্তাঘাট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পূর্বে আগে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে জেনে নাও, যে তোমার সাথে যাচ্ছে। আর কোথাও আবাস গড়তে চাইলে বাড়িঘরের অবস্থা জানার পূর্বে ওইসব মানুষের সম্পর্কে খোঁজ নাও যারা হবে তোমার প্রতিবেশী।
বন্ধুবান্ধবের পক্ষ থেকে কোনো অশোভনীয় আচরণ হয়ে গেলে তা হজম করে নাও। তারা তোমার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করলে তাদের ওজর-আপত্তি কবুল করে নাও।
যথাসম্ভব মন্দকে পিছিয়ে দাও। কেননা তুমি চাইলেই তাকে অগ্রগামী করে ফেলতে পারো। (অর্থাৎ এমন কাজ করবে না, যার পরিণতি হবে মন্দ।)
কখনো এমন আচরণ করবে না যে কারণে লোকেরা তোমার সাথে সম্পর্ক রাখার পরিবর্তে সম্পর্ক ছিন্ন করতে অধিক আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং তোমার প্রতি উত্তম আচরণের পরিবর্তে মন্দ কিছু করতে ভালোবাসে।
নারীদেরকে কখনো এমন বিষয়ের কর্তৃত্ব প্রদান করবে না, যার ফলে তারা নিজেদেরকেই অতিক্রম করে যায়। কারণ নারীরা হলো সুগন্ধি, তারা কারও দায়িত্বশীল নয়। এই নীতি অবলম্বন করলে তার অবস্থা উত্তম থাকবে। তার অন্তরও কোমল থাকবে। পর্দার মাধ্যমে তুমি তার দৃষ্টিকে অবনত করে রাখবে। তার নিকটাত্মীয়দের সম্মান করবে।
আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন কৃতজ্ঞতাবোধ এবং সঠিক বিষয় তোমার অন্তরে ঢেলে দেন। তোমাকে সকল কল্যাণকাজের তাওফিক প্রদান করেন। আপন অনুগ্রহে যেন তিনি তোমার থেকে সকল অকল্যাণ দূর করে দেন। ওয়াস-সালামু আলাইকা ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ。
টিকাঃ
[২৯৩] আল-ইকদুল ফারিদ, ১/১১৫
📄 সম্প্রদায় ও ব্যক্তি
আলি রা. বলেন, সম্প্রদায়ের জন্য ব্যক্তি যতটা কল্যাণকর তার চেয়ে অধিক কল্যাণকর হলো ব্যক্তির জন্য কোনো সম্প্রদায়। কারণ সম্প্রদায়ের ওপর কোনো বিপদ-আপদ এলে ব্যক্তি নিজের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ যা করে, তা হয়ে থাকে একক কোনো প্রচেষ্টা। পক্ষান্তরে ব্যক্তির ওপর বিপদ এলে সম্প্রদায়ের সকলেই একতাবদ্ধ হয়ে প্রচেষ্টা করতে পারে। তাকে তখন রক্ষা করা যায় এবং প্রকৃত সাহায্য করা যায়। আসলে মানুষ তো নিজের বংশের লোকজনকে সাহায্য করার জন্যই এগিয়ে যায়।
আলি রা. এরপর বলেন, আমি এ ব্যাপারে কুরআন কারিম থেকে কিছু আয়াত তেলাওয়াত করে শোনাব। আল্লাহ তাআলা কুরআন কারিমে লুত আলাইহিস সালামের একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। হজরত লুত আলাইহিস সালাম এক প্রেক্ষিতে বলেছেন,
قَالَ لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ آوِي إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ
(লুত বললেন) হায়, তোমাদের বিরুদ্ধে যদি আমার শক্তি থাকত অথবা আমি কোনো সুদৃঢ় আশ্রয় গ্রহণ করতে সক্ষম হতাম। (সুরা হুদ, ৮০)
এখানে তিনি 'সুদৃঢ় আশ্রয়' বলতে তার সম্প্রদায় থাকার কথা বোঝাচ্ছিলেন। উল্লেখ্য হজরত লুত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় সেখানে ছিল না।
হজরত আলি রা. এরপর বলেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, হজরত লুত আলাইহিস সালামের পর আল্লাহ তাআলা যত নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন তাদেরকে তিনি কোনো বিত্তশালী সম্প্রদায় এবং শক্তিশালী কোনো গোত্রের সাহায্যসহই পাঠিয়েছেন।
হজরত আলি রা. এরপর হজরত শুআইব আলাইহিস সালামের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তার সম্প্রদায় একবার তাকে বলে,
وَإِنَّا لَنَرَاكَ فِينَا ضَعِيفًا وَلَوْلا رَهْطُكَ لَرَجَمْنَاكَ
আমরা তো তোমাকে আমাদের মধ্যে দুর্বলই দেখছি। তোমার স্বজনের না থাকলে আমরা তোমাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করে ফেলতাম। (সুরা হুদ, ৯১):
আলি রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! তারা তো কেবল হজরত শুআইব আলাইহিস সালামের গোত্রকেই ভয় করছিল。
টিকাঃ
[২৯৪] আল-ইকদুল ফারিদ, ২/১৯৫
📄 যে ব্যক্তি আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারও নিকট চায়
হজরত আলি রা. আরাফার দিন এক ব্যক্তিকে ভিক্ষা করতে দেখে তাকে চাবুকাঘাত করে বলেন, তোমার দুর্ভোগ, এ মহিমান্বিত দিনে তুমি আল্লাহকে বাদ দিয়ে মানুষের নিকট চাচ্ছ?
টিকাঃ
[২৯৫] আল-ইকদুল ফারিদ, ২/৩৩৬
📄 প্রজ্ঞাপূর্ণ কয়েকটি বাণী
আলি রা. বলেন,
* সহনশীলরা জনগণের নেতৃত্ব দিতে পারে। আর যে ব্যক্তি নেতৃত্ব দিতে পারে সে কল্যাণ অর্জন করতে পারে।
* যে ব্যক্তি লজ্জা করে সে বঞ্চিত হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি ভয় পায় সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
* যে ব্যক্তি নেতৃত্ব তালাশ করে তাকে রাজনীতির ওপর ধৈর্যধারণ করতে হয়। যে ব্যক্তির নজর থাকে নিজের দোষত্রুটির দিকে সে অন্যের দোষত্রুটি প্রতি লক্ষ করে না।
* যে লোক বিদ্রোহের তরবারি ওঠায় তার নিজের তরবারি দিয়েই তাকে হত্যা করা হয়। যে ব্যক্তি নিজের ভাইয়ের জন্য কূপ খনন করে সে নিজেই তাতে নিপতিত হয়।
* যে নিজের ত্রুটিবিচ্যুতির কথা ভুলে যায়, অন্যের ত্রুটিবিচ্যুতি তার নিকট বড় মনে হয়।
* যে অন্যের গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করে দেয় তার ঘরের গোপন বিষয়সমূহ জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়ে যায়।
* যে অহমিকায় লিপ্ত হয় সে ধ্বংস হয়ে যায়।
* যে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয় সে ডুবে যায়।
* যে নিজের মতামত নিয়ে গর্ব করে সে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। আর যে নিজের বিবেকবুদ্ধিকে যথেষ্ট মনে করে তার পদস্খলন ঘটে।
* যে লোকজনের ওপর জুলুম করে সে একসময় লাঞ্ছিত হয়।
* যে কোনো কাজে গভীরভাবে মগ্ন হয়ে যায়, একসময় তার বিরক্তির উদ্রেক ঘটে।
* যে ব্যক্তি দুষ্ট ও নিকৃষ্ট লোকদের সাথে ওঠাবসা করে, মানুষজন তাকেও দুষ্ট মনে করতে থাকে। আর যে ব্যক্তি আলেমদের সাথে ওঠাবসা করে, লোকেরা তাকে সম্মান করে।
* যে ব্যক্তি খারাপ ও মন্দ জায়গায় যাওয়া-আসা করে, লোকেরা তার ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে।
* যার আচারব্যবহার উত্তম হয় তার জীবনের পথচলা সহজ হয়ে যায়।
* আর যার কথাবার্তা উত্তম হয় সে গাম্ভীর্যের অধিকারী হয়।
* যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে আল্লাহ তাআলার ভয় রাখে সে সফলকাম হয়ে যায়।
* যে ব্যক্তি মূর্খতাকে নিজের পথপ্রদর্শক বানায়, সে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
* যে ব্যক্তি মৃত্যুর পরিচয় লাভ করতে পেরেছে, সে বড় বড় আশা-আকাঙ্ক্ষা করা ছেড়ে দিয়েছে。
টিকাঃ
[২৯৬] আল-ইকদুল ফারিদ, ২/২৪৩