📄 কুমাইল বিন যিয়াদের প্রতি উপদেশ
কুমাইল বিন যিয়াদ বলেন, হজরত আলি বিন আবু তালেব রা. একদিন আমার হাত ধরে জনমানবহীন প্রান্তের দিকে হাঁটা শুরু করেন। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে তিনি এক জায়গায় বসেন। এরপর একটু শ্বাস ফেলে বলতে শুরু করেন:
হে কুমাইল বিন যিয়াদ! মানুষের অন্তরগুলো হচ্ছে এক-একটি পাত্র। এসবের মধ্যে সর্বোত্তম পাত্র হলো যে অন্তর ইলম ধারণ করতে পারে। আমি তোমাকে যা বলব তা তুমি স্মরণ রেখো।
জেনে রাখো, মানুষ তিন ধরনের। যথা:
এক. আল্লাহওয়ালা আলেম।
দুই. ছাত্র। এই দুই শ্রেণি মুক্তি পেয়ে যাবে।
তিন. উচ্ছৃঙ্খল ধরনের মানুষ। কোথাও কিছু শুনলেই সেটার পিছু পিছু চলতে থাকে। যেদিকে বাতাস প্রবাহিত হয় তারা সেদিকেই চলে। ইলমের নূরের মাধ্যমে তারা কখনো আলোকিত হতে চায় না। কখনো তারা কোনো দৃঢ় বিষয়ের ওপর স্থির হতে পারে না।
অর্থসম্পদের চেয়ে ইলম কল্যাণকর। ইলম তোমাকে রক্ষা করবে আর অর্থসম্পদকে রক্ষা করতে হবে তোমার। আমলের মাধ্যমে ইলম বৃদ্ধি পায় আর খরচ করলে অর্থসম্পদ কমে যায়। ইলম হলো শাসক আর অর্থসম্পদ হলো শাসিত। সম্পদ শেষ হয়ে গেলে সম্পদের উপকারিতাও শেষ হয়ে যায় কিন্তু আলেমগণ মানুষের ভালোবাসার পাত্র হয়ে থাকেন। তাদের মহব্বত করাটা দ্বীনেরই অংশ। ইলম আলেমকে তার জীবদ্দশায় মানুষের আনুগত্য এনে দিয়ে থাকে আর মৃত্যুর পর তাকে দান করে মানুষের ভক্তি ও শ্রদ্ধা। সম্পৎশালীরা একসময় মৃত্যুবরণ করে কিন্তু উলামায়ে কেরাম যুগ যুগ ধরে জীবিত থাকেন। তাদের সত্তা তো বিদায় নিয়ে চলে যায় কিন্তু মানুষের অন্তরে তারা বাকি রয়ে যান।
হজরত আলি রা. এরপর নিজের বুকের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ইলম রয়েছে এখানে। কিন্তু তা বহনের জন্য তুমি এমন কিছু মেধাবীকে খুঁজে পাবে যারা আসলে আস্থাযোগ্য নয়। যারা এই দ্বীনকে ব্যবহার করে দুনিয়া অর্জনের মাধ্যম হিসাবে। আল্লাহর কিতাবের বিরুদ্ধে যারা দলিল-প্রমাণ পেশ করার দুঃসাহস দেখায়। আল্লাহর বান্দাদের ওপর তারা নেয়ামত প্রদর্শনের চেষ্টা করে। কিংবা এ ইলম বহনের জন্য তুমি পাবে এমন কিছু আলেমকে যারা হয়ে থাকে আহলে হকের শত্রু। হকের পুনরুজ্জীবনের জন্য তাদের কোনো অন্তর্দৃষ্টিই নেই। সামান্য থেকে সামান্য সন্দেহ-সংশয় তাকে দ্বিধাগ্রস্ত করে ফেলে। কিংবা তা বহনের জন্য এমন ব্যক্তিকে পাবে, যে পার্থিব ভোগবিলাসে মত্ত থাকে। প্রবৃত্তির চাহিদা তাকে পরিচালিত করে কিংবা অর্থসম্পদ জমা করার ধোঁকায় সে পড়ে থাকে। জেনে রাখো, কস্মিনকালেও তারা দ্বীনের দাঈ হতে পারে না। চতুষ্পদ জন্তুর সাথেই তাদের অধিক সাদৃশ্য রয়েছে।
আলেমের মৃত্যুর সাথে সাথে ইলমেরও মৃত্যু ঘটে যায়। তবে জেনে রাখো, প্রতি যুগেই পৃথিবীতে এমন বিষয় বিদ্যমান থাকে যা আল্লাহর দ্বীনের পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করে। আল্লাহর দলিল-প্রমাণ কখনো বাতিল হয় না। তবে সংখ্যার দিক থেকে আলেমরা অল্প হলেও আল্লাহর নিকট তারা হয়ে থাকেন অত্যন্ত মর্যাদাবান। আল্লাহ তাআলা তাদের মাধ্যমেই আপন দলিল-প্রমাণ সংরক্ষণ করেন। তারা সেগুলো নিজেদের সমপর্যায়ের ব্যক্তিদের পর্যন্ত পৌঁছে দেন। আর সে ব্যক্তিরা তা নিজেদের অন্তরে গেঁথে নেন।
প্রকৃতপক্ষে তাদের মাধ্যমেই ইলম-কালাম সমৃদ্ধ হয়। অহংকারীদের নিকট যা শক্ত এবং কঠিন মনে হয়, তাদের নিকট তা সহজ মনে হয়ে থাকে। মূর্খদের নিকট যা অচেনা ও অপরিচিত মনে হয় তাদের নিকট তা সুপরিচিত হয়ে থাকে। তারা শারীরিকভাবে দুনিয়াতে অবস্থান করেন কিন্তু তাদের আত্মা থাকে ঊর্ধ্বজগতে। তারা হলেন পৃথিবীতে নিযুক্ত আল্লাহর খলিফা এবং তার দ্বীনের দাঈ।
আহ! আহ! যদি তাদের দেখতে পারতাম। আমি তোমার ও আমার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। এরপর তিনি কুমাইল বিন যিয়াদকে বলেন, তুমি চাইলে এখন যেতে পারো。
টিকাঃ
[২৭৯] তাহযিবু হিলয়াতিল আউলিয়া, ১/৮৫; সিফাতুস সাফওয়া. ১/১৭২
📄 পবিত্র বস্তু
নাওফ আল-বাক্কালি বলেন, এক রাতে হজরত আলি ইবনে আবু তালেব রা. ঘর থেকে বের হয়ে আকাশের তারকারাজির প্রতি তাকিয়ে আমাকে বলেন, হে নাওফ! তুমি কি ঘুমিয়ে গেছ না জেগে আছ? আমি বলি, না, আমিরুল মুমিনিন; বরং আমি জেগে আছি। তিনি তখন বলেন, হে নাওফ, তাদের জন্য সুসংবাদ, যারা দুনিয়াবিরাগী এবং আখেরাতের প্রতি আগ্রহী। তারা হলো ওই সকল লোক যারা জমিনকে বিছানা হিসাবে গ্রহণ করেছে। মাটিকে বানিয়েছে নিজেদের শয্যা। পানিকে বানিয়েছে শরবত। কুরআন কারিম এবং দুআকে বানিয়েছে নিজেদের প্রতীক। হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের মতো তারা দুনিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
হে নাওফ! আল্লাহ তাআলা ঈসা আলাইহিস সালামকে ওহির মাধ্যমে বলেন, আপনি বনি ইসরাইলকে নির্দেশ প্রদান করুন, যেন তারা কেবল পবিত্র অন্তর, অবনত দৃষ্টি এবং পরিচ্ছন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়েই আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করে।
তাদের তো বটেই আমার সৃষ্টিজীবেরও কেউ যদি কোনো জুলুম করে তাহলে আমি তার দুআ কবুল করব না।
হজরত আলি রা. এরপর বলেন, হে নাওফ! তুমি কবি, গণক, পুলিশ, কর উসুলকারী ও উশর গ্রহণকারী হয়ো না। কেননা হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম একবার রাতের একাংশে ঘুম থেকে জেগে উঠে বলেন, এটা এমন এক মুহূর্ত, যে-কেউ তাতে আল্লাহ তাআলাকে ডাকবে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দেবেন। তবে গণক, পুলিশ, কর উসুলকারী, উশর গ্রহণকারী, বাদক এবং তবলাওয়ালার ডাকে সাড়া দেবেন না。
টিকাঃ
[২৮০] তাহযিবু হিলয়াতিল আউলিয়া, ১/৮৫
📄 ইলমের ফোয়ারা
আলি রা. বলেন, তোমরা হয়ে যাও ইলমের ফোয়ারা ও রাতের আলো। তোমাদের পরিধেয় কাপড়গুলো যেন হয় পুরাতন কিন্তু অন্তরগুলো যেন হয় নতুন। যার মাধ্যমে তোমরা আকাশের অধিবাসীদের চিনতে পারবে এবং জমিনের অধিবাসীদের উপদেশ দিতে পারবে。
টিকাঃ
[২৮১] তাহযিবু হিলয়াতিল আউলিয়া, ১/৮৩
📄 তাকওয়া হলো রক্ষাকবচ
আলি রা. বলেন, হে আল্লাহর বান্দারা! আমি তোমাদেরকে অসিয়ত করছি, আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। কারণ আল্লাহর ভয় সকল গোমরাহি ও ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করবে, এটাই মুক্তির পথ বাতলে দিয়ে থাকে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, তোমরা হলে কিছু শূন্য দেহ, যার ভেতরে কোনো আত্মা নেই। যা কবরে চলে গেছে। জেনে রাখো, তোমরা জীবিতরা এই দুনিয়াতে যতগুলো দিন লাভ করছ, এর মাধ্যমে কেবল নিজেদের জীবনের নির্ধারিত সময়ই শেষ করছ। তোমাদের এই দুনিয়া তো উপত্যকার ছায়ার মতো, একটু পরই যা নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিংবা এটা মুসাফিরের পাথেয়ের মতো, খানিক বাদেই যা শেষ হয়ে যায়।
আমি তোমাদেরকে সেই দিবসের ব্যাপারে সতর্ক করছি যেদিন মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ডাক চলে আসবে। সেদিন তোমাদের পদচিহ্নগুলো মুছে যাবে। ঘরবাড়িগুলো তোমাদের অপরিচিত হয়ে যাবে। ছোটরা তোমাদের হারিয়ে অভিভাবকহীন হয়ে পড়বে। তারপর তোমাদেরকে জমিনের এক গর্তে নিয়ে যাওয়া হবে। চেহারাগুলো সেদিন ধূলিমলিন করে দেওয়া হবে। সেই গর্তে তোমরা কোনো বালিশ বা বিছানা কিছুই পাবে না।
যে মহান সত্তা তার আনুগত্যের বিনিময়ে আমাদেরকে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার নিকট কামনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে তার ক্রোধ থেকে রক্ষা করেন। তার অসন্তোষ থেকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখেন এবং আমাদেরকে দান করেন তার রহমত ও অনুগ্রহ।
জেনে রাখো, সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বিষয় হলো আল্লাহর কিতাব。
টিকাঃ
[২৮২] আল-ইকদুল ফারিদ, ৪/৬৫