📄 ইসলামী আদব শিক্ষা দান
আদব ও সভ্যতা এবং জীবনের শিষ্টাচার শিক্ষার বয়সও এটাই। শিশুদেরকে অবুঝ বলে পরওয়া না করা এক ধরনের বিরাট আহাম্মকি। শৈশবকালে আপনি যে শিষ্টাচার শিখিয়ে দেবেন এবং যে অভ্যাস গড়ে তুলবেন তা তার সারা জীবনেই প্রভাব ফেলবে। শৈশবকাল যেসব ভালো অথবা খারাপ অভ্যাস গড়ে উঠে তা খুব কমই দূর হয়। এ বয়সে শিশুদের প্রতি বেশী বেশী দৃষ্টিদান খুবই প্রয়োজন। মা'র দায়িত্ব খুবই বেশী। জীবনের প্রথম দিকে সামান্য অবহেলা চিরকালের জন্য লজ্জা ও পেরেশানীর কারণ হতে পারে।
একটি পরিকল্পনার অধীন হিকমত, অধ্যবসায় ও ধৈর্যের সাথে শিশুদেরকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিন। খানা-পিনা, উঠা-বসা, ঘুম ও জাগরণের আদব শিক্ষা দিন। শিক্ষা ও শিক্ষকের প্রতি আদব, মসজিদ-মাদ্রাসার আদবের কথা বলুন। পাক-পবিত্রতার আদব, স্বাস্থ্য ও পবিত্রতার আদব, চলা-ফেরা এবং সাথী-সঙ্গীদের সাথে উঠা-বসার আদব, গৃহের এবং নিজের জিনিসসমূহকে সুন্দর ও সুশৃংখলভাবে ব্যবহারের নিয়ম শিক্ষা দিন এবং একটি সভ্য ও পবিত্র জীবন পরিচালনার জন্য অব্যাহতভাবে আপনি তার অভিভাবকত্ব করুন। একবার শুধু কোনো ভালো জিনিসের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণই যথেষ্ট নয় বরং প্রশিক্ষণের দাবী হলো যে, আপনি সে ব্যাপারে অব্যাহতভাবে দৃষ্টি রাখুন এবং বারবার ভুল সত্ত্বেও বিরক্ত হবেন না। ধৈর্য ও স্থৈর্যের সাথে এবং অন্তর দিয়ে তাদেরকে শুধরে দিতে থাকুন এবং সামান্যতম ভুলকেও তুচ্ছ মনে করবেন না। হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, একবার হযরত হাসান বিন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু সাদকার একটি খেজুর উঠিয়ে মুখে দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আরে থু মেরে তা ফেলে দাও। তুমি কি জানো না যে, আমাদের জন্য সাদকা খাওয়া ঠিক নয়।
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বিন আবু সালমা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী হযরত উম্মে সুলাইম রাদিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র ছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লালন-পালন করছিলেন। তিনি নিজের কাহিনী বর্ণনা করেছেন:
كُنتُ غُلَامًا فِي حِجْرِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانَتْ يَدِى تَطِيشُ في الصَّحْفَةِ فَقَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا غُلَامُ ! سَمِّ اللَّهَ تَعَالَى وَكُلُّ بِيَمِينِكَ وَكُلُّ مِمَّا يَلِيْكَ فَمَا زَالَتْ تِلْكَ طُعْمَتِي بَعْدُ - متفق عليه
"আমি তখন ছোট ছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোলে থাকতাম। খাবার সময় আমার হাত প্লেটের চারপাশে ঘুরছিল। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, পুত্র! বিস্মিল্লাহ্ পড়ে ডান হাত দিয়ে খাও এবং নিজের দিক থেকে খাও। ব্যাস, এরপর থেকে এটাই আমার অভ্যাসে পরিণত হলো।"
📄 পবিত্র কিসসা-কাহিনী শুনানোর ব্যবস্থা করা
শৈশবকালে শিশুরা কিসসা-কাহিনী শুনতে খুবই আগ্রহী হয়। তারা অত্যন্ত আনন্দ চিত্তে কিসসা-কাহিনী শুনেও থাকে এবং প্রভাবিতও হয়। বরং কিসসার কতিপয় চরিত্র তো তাদেরকে প্রভাবিত করে যে, তারা স্বয়ং তা হবার চেষ্টায় লেগে যায়। শিশুদের এ মনস্তাত্ত্বিক গুণের ফায়দা নিন এবং আপনি তাদেরকে যেভাবে তৈরির আকাঙ্ক্ষা করেন, সে ধরনের কিসসা-কাহিনীই শুনান। শুধুমাত্র তাদের আগ্রহ পূরণের জন্য কিসসা শুনাবেন না। বরং কিসসাকে শিক্ষার উত্তম মাধ্যম মনে করে তার ব্যবস্থা করুন। নবীদের পবিত্র কাহিনী শুনান। সাহাবায়ে কিরামের উদ্যমপূর্ণ ঘটনাবলী শুনান। ইসলামের মুজাহিদদের বীরত্ব গাঁথা শুনান। যুদ্ধের ময়দানের কৃতিত্বের উল্লেখ করুন। এমনিভাবে ইসলামের জন্য তাদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করুন।
জ্বীন-পরীর কাহিনী, ভূত-প্রেতের ঘটনা, যাদু-টোটকার কিসসা, দেও- দৈত্যের কাহিনী শিশুদের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। তাদের খারাপ প্রভাবে শিশুদের মন-মগজ খারাপভাবে এক অজানা ভীতি তাদের অন্তর ও মস্তিষ্কে ছেয়ে থাকে। উচ্চতম শিক্ষা লাভ সত্ত্বেও বিভিন্ন ধরনের সংশয়ে তারা ভোগে।
কিসসা-কাহিনী শোনার আগ্রহ শিশুদের সহজাত আগ্রহ। তাতে বাধা দানও ঠিক নয় আবার এ ব্যাপারে তাদেরকে স্বাধীন ছেড়ে দেয়াও ভুল। অত্যন্ত কৌশল বা হিকমতের সাথে তাদেরকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করুন এবং এ প্রয়োজন ও আগ্রহ এমনভাবে পূরণ করুন যাতে আপনি তাদের সর্বোত্তম প্রশিক্ষণদানে সফল হন।
📄 নামাযের তাকিদ
নামায এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত যা দীনের সাথে মানুষকে সম্পর্কযুক্ত রাখে। নামায দীনকে হেফাজতও করে। আবার দীনের প্রতি আকর্ষণও করে থাকে। দীনদার জীবন অতিবাহিত করার জন্য মানুষকে প্রস্তুতও করে। শুরু থেকেই শিশুদেরকে নিয়মিত নামায পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে অহেতুক স্নেহ-প্রীতি এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশী নরম প্রদর্শন খুবই ক্ষতিকারক।
এশার নামায পড়া ব্যতিরেকে শিশুদেরকে শুতে দিবেন না। শুয়ে পড়লেও উঠিয়ে নামায পড়ান। ফযরের নামাযের জন্য প্রথম ওয়াক্তে ঘুম থেকে জাগান এবং সকালে উঠার অভ্যাস করান। আল্লাহর নির্দেশ হলো :
وَأَمر أَهْلَكَ بِالصَّلوةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا - طه : ۱۳২
"নিজের পরিবার-পরিজনকে নামাযের তাকিদ দাও। এবং নিজেও তা দৃঢ়তার সাথে পালন করতে থাকো।"-সূরা ত্বহা : ১৩২
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন :
مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَوَةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ -
"যখন তার বয়স সাত বছর হয় তখন সন্তানকে নামায পড়ার তাকিদ দাও। যখন তার বয়স দশ বছর হয়ে যায় তখন নামায পড়ার জন্য তার উপর কঠোরতা আরোপ করো এবং এ বয়স হবার সাথে সাথে তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।"
এ সকল নির্দেশের অর্থ হলো, স্বয়ং আপনি নামাযের পাবন্দ থাকবেন এবং গৃহের পরিবেশ এমনভাবে তৈরি করবেন যাতে শিশুরাও আগ্রহ সহকারে নামায পড়বে। আপনার কাজ এটাই প্রমাণ করবে যে, নামাযের প্রতি অবহেলা আপনি কোনোক্রমেই বরদাশত করবেন না।