📄 দীনের সন্তানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের স্থান
সন্তানের জীবনকে এ দৃষ্টিকোণ থেকে সফল বানানোর জন্য প্রয়োজন হলো আপনাকে সন্তানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপারে অসাধারণ মনোযোগ দিতে হবে। চরম হিকমত, একান্ত আন্তরিক প্রচেষ্টা, ধৈর্য ও স্থৈর্যের দৃষ্টিতে যেমন সমাজের দৃষ্টিতেও তেমনি মর্যাদাকর। এর বদৌলতে আপনি দুনিয়াতেও মান-মর্যাদা ও সুনাম পাবেন এবং আখেরাতেও মান-মর্যাদার অধিকারী হবেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টিতে সন্তানের জন্য সবচেয়ে উত্তম তোহফা হলো আপনি তাকে উত্তম শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সুসজ্জিত করবেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: مَا نَحِلَ وَالِدُ وَلَدَهُ مِنْ نَحْلٍ أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَنٍ -
“পিতা নিজের সন্তানকে যাকিছু প্রদান করেন তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো ভালো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ।”
সন্তানের ভালো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সাদকায়ে জারিয়া। আপনার কাজের সময় ও সুযোগ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার আমলনামায় পুরস্কার ও সওয়াব বৃদ্ধি পেতে থাকবে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُولَهُ -
“যখন মানুষ মরে যায়, তখন তার আমলের প্রসঙ্গ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তিন বিষয়ের সওয়াব ও পুরস্কার মৃত্যুর পরও পেতে থাকে। প্রথম, সে কোনো সাদকায়ে জারিয়া করে গিয়ে থাকলে; দুই, এমন কোনো জ্ঞান যা থেকে জনগণ উপকৃত হতে থাকে; তিন, নেক পুত্র যে তার জন্য দোয়া করে।”
একবার রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কুরআনের আলেমের মাতা-পিতাকে কিয়ামতের দিন টুপি পরানো হবে। তিনি ইরশাদ করেছেন:
مَنْ قَرَءَ الْقُرْآنَ وَعَمِلَ بِهِ الْبِسَ وَالِدَهُ تَاجًا يَوْمَ الْقِيمَةِ ضَوْءَهُ أَحْسَنُ مِنْ ضوء الشَّمْسِ فِي بُيُوتِ الدُّنْيَا فَمَا ظَنَّكُمْ بِالَّذِي عَمِلَ بِهَذَا - ابو داود، حاكم
"যে কুরআনের জ্ঞান হাসিল করলো এবং তার উপর আমলও করলো তার মাতা-পিতাকে কিয়ামতের দিন টুপি পরানো হবে। যার আলো সে সূর্যের আলোর চেয়ে বেশী উত্তম হবে যে সূর্য দুনিয়ার ঘরগুলোকে আলোকিত করে থাকে। তাহলে যারা আমল করেছে তাদের ব্যাপারে তোমাদের ধারণা কি তা বলো।"-আবু দাউদ, হাকেম
হযরত বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাওয়ায়েতে টুপির পরিবর্তে জান্নাতের পোশাকের উল্লেখ রয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
“যে ব্যক্তি কুরআন পড়লো, শিখলো এবং তার উপর আমল করলো কিয়ামতের দিন তার মাতা-পিতাকে নূরানী টুপি পরিধান করানো হবে। সূর্যের আলোর মতো তার আলো হবে এবং তার মাতা-পিতাকে এমন মূল্যবান দুটি পোশাক পরানো হবে যার মূল্য সমগ্র দুনিয়াও হতে পারবে না। তখন মাতা-পিতা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করবেন, এ পোশাক তাদেরকে কিসের বিনিময়ে পরিধান করানো হচ্ছে। তাদেরকে বলা হবে, তোমাদের পুত্রের কুরআন হাসিলের বিনিময়ে এটা পরিধান করানো হচ্ছে।”
এসব বর্ণনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তান প্রশিক্ষণের অপরিসীম সওয়াব ও পুরস্কারের কথা বর্ণনা করে উম্মাতকে এ দায়িত্বের প্রশ্নে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর এ উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্য হলো, উম্মাতের কোনো গৃহই যাতে সন্তানের শিক্ষা-প্রশিক্ষণের ব্যাপারে অবহেলা করা না হয়। উদ্বুদ্ধ করণের সাথে সাথে তিনি এও আলোকপাত করেছেন যে, যে সকল মাতা-পিতা এ দায়িত্ব পালনে অবহেলা প্রদর্শন করবে তাদেরকে কিয়ামতের দিন কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
📄 সন্তানের মর্যাদার প্রতি দৃষ্টিদান
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَكْرِمُوا أَوْلادَكُمْ وَأَحْسَنُوا أَدَبَهُمْ - ترغيب وترهيب بحو اله ابن ماجه
“হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সন্তানদের সাথে রহম করমপূর্ণ ব্যবহার করো এবং তাদেরকে ভালো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দাও।”-তারগীব ও তারহীব
এ হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দানের তাকিদ দেয়ার সাথে সাথে এ তাকিদও দিয়েছেন যে, তাদের সাথে রহম-করমপূর্ণ ব্যবহার করো। বরং প্রথম এ তাকিদ দেয়া হয়েছে যে, সন্তানদের সাথে মান-মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার করো। অতপর তাকিদ দেয়া হয়েছে যে, তাদেরকে উত্তম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দাও।
মাতা-পিতার জন্য ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের সাথে রহম-করমপূর্ণ ব্যবহার এতো গুরুত্বপূর্ণ যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং সেদিকে প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অতপর উত্তম শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের কথা বলেছেন। সন্তানদের সাথে রহম-করমের ব্যবহার করার অর্থ হলো তাদের মান-মর্যাদার প্রতি চরমভাবে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের সাথে এমন আচরণ বা কথা বলা যাবে না যাতে তাদের অহংবোধে আঘাত লাগে এবং তারা নিজেদেরকে নীচু ভাবতে থাকে। সাধারণত প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সময়ই এ ধরনের অবহেলা প্রদর্শন করা হয় এবং শিশুর মর্যাদা ও অহংবোধের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয় না। প্রকৃতপক্ষে শৈশবকালেই উত্তম সময় যখন আপনি শিশুর মস্তিষ্ক ও অন্তরের পরিষ্কার আমলে আপনি যে ধরনের ইচ্ছা সে ধরনের ছবি এঁকে দিতে পারেন। এ ছবি বা চিত্র আজীবন চরিত্র ও কাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। শিশুর ভাঙ্গা-গড়ায় প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষার মৌলিক গুরুত্ব রয়েছে।
আপনিই চিন্তা করুন যে, মাতা-পিতা অথবা শিক্ষকের ভুল কর্মপদ্ধতির ফলে শিশুর মস্তিষ্কে যদি এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, সে দুর্বল, অকেজো এবং নীচ। সে এমন যোগ্য নয় যে, তার সাথে ভালোভাবে কথা বলা যায়। সে এমন নয় যে, তার সাথে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা যায়। সে এমন নয় যে, তার উপর আস্থা এনে কোনো কাজ ন্যস্ত করা যায়—তাহলে আপনিই বলুন, তার মধ্যে উচ্চ আশা, অহংবোধ, সাহসিকতা, আত্মবিশ্বাস প্রভৃতি গুণ কি করে সৃষ্টি হতে পারে। আর এ ধরনের শিশু দীন ও মিল্লাতের জন্য কিভাবে বড়ো কাজ আনজাম দিতে পারবে।
মাতা-পিতাকে নিজের কথা-বার্তা এবং কাজের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং যাদের তত্ত্বাবধানে শিশুদের শিক্ষার ভার দেয়া হবে তাদের ব্যাপারেও ইতমিনান থাকতে হবে। শিশুর অহমবোধ এবং মর্যাদাবোধ এক মৌলিক শক্তি। এ শক্তি যদি আহত হয় তাহলে শিশুর মধ্যে সাহসহীনতা, ভীরুতা, নীচতা এবং আত্মবিশ্বাসহীনতার নৈতিক দোষ সৃষ্টি হয়—আর এ ধরনের শিশুদের থেকে ভবিষ্যতে কোনো বড়ো কাজ আশা করা যায় না।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ফরমানের আলোকে নিজের গৃহকে পরীক্ষা বা পর্যালোচনা করে দেখুন এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠানসমূহকেও পর্যালোচনা করুন। উত্তম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য মৌলিক কথা হলো, মাতা-পিতা ও শিক্ষকদেরকে শিশুদের সাথে রহম-করমপূর্ণ আচরণ করতে হবে এবং কোনো এমন কথা বলতে পারবেন না যাতে শিশুর মর্যাদা বিনষ্ট এবং আহমবোধ আহত হয়।
📄 সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে জবাবদিহি
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানের প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করে এ ব্যাপারেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ পাক কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করবেন যে, আপনি সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন কিনা- পরিবারের সদস্যদের দীনি ও নৈতিক শিক্ষা দান অন্যতম দীনি দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
لَا يَسْتَرْعِى اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَبْدًا رَعِيَّةً قَلَّتْ أَوْ كَثُرَتْ إِلَّا سَأَوَلَهُ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَنْهَا يَوْمَ الْقِيمَةِ أَقَامَ فِيهَا أَمَرَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى أَمْ أَضَاعَهُ حَتَّى يَسْأَلُهُ عَنْ أَهْلِ بَيْتِهِ خَاصَّةً -
"আল্লাহ যে বান্দাকেই বেশী অথবা কম লোকের তত্ত্বাবধায়ক বানান না কেন-কিয়ামতের দিন অবশ্যই তাকে জিজ্ঞেস করা হবে যে, সে অধীনস্ত লোকদেরকে দীনের উপর চালিয়েছিল না তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। বিশেষ করে তার গৃহের লোকদের ব্যাপারেও হিসেব নেবেন।"