📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 ইসলামের দৃষ্টিতে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ

📄 ইসলামের দৃষ্টিতে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ


ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যত কি? এ প্রশ্নের সঠিক জবাব পেতে হলে একটি আনুসঙ্গিক প্রশ্ন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। প্রশ্নটি হলো মুসলমান মাতা-পিতা সন্তানের আকাঙ্ক্ষা কেন করে থাকেন? অন্যান্য মাতা-পিতার সাথে তাদের আকাঙ্ক্ষার পার্থক্য কোথায়? এ তাৎপর্যকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য আমাদেরকে হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের আয়াত বুঝতে হবে:
قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنّى وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَلِى مِنْ وَرَائِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِنْ لَّدُنكَ وَلِيًّا يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ وَ وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا مريم : ٦٤
“[হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম] বললেন, হে আমার রব! আমার অস্থি মজ্জা পর্যন্ত গলে গেছে। আর মাথা বার্ধক্য চিহ্নে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট দোয়া করে কখনও ব্যর্থকাম হইনি। আমার পরে আমার ভাই-বন্ধুদের দুষ্কৃতির ভয় রয়েছে আমার মনে। আর আমার স্ত্রী হচ্ছে বন্ধ্যা। তুমি তোমার বিশেষ অনুগ্রহে আমাকে এক উত্তরাধিকারী দান করো। যে আমার উত্তরাধিকারীও হবে। আর ইয়াকুব বংশের মীরাসও লাভ করবে। আর হে রব! তাকে একজন পসন্দ সই মানুষ বানাও।"-সূরা মরিয়ম : ৪-৬
হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম এবং তার স্ত্রী আল ইয়াশবা উভয়েই বয়সের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলো এবং তাদের কর্মশক্তি জবাব দিয়েছিল। এ অবস্থায় হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম এ ভেবে মনে কষ্ট পাচ্ছিলেন যে, তার পরে তার মিশনের ঝাণ্ডাবাহী কে হবে? এবং আল্লাহর দীনের হেফাজত ও প্রচারের দায়িত্ব কে আনজাম দেবে। তিনি দেখছিলেন যে, নবী বংশের যুবকেরা ধর্মদ্রোহী ও দায়িত্বহীন। একজনও এমন নেই যে, হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের উত্তরাধিকার হতে পারে। তিনি এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে অবনত মস্তকে আল্লাহর নিকট দোয়া করতেন।
"পরওয়ারদিগার! আমাকে একজন উত্তরাধিকার দান করো। যে আমার ও আলে ইয়াকুব আলাইহিস সালামের মিরাছের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। হে আমার রব! তাকে তোমার পসন্দনীয় বান্দা বানিও।" হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম নিজের বংশ ধারা বাকী রাখার জন্য সন্তানের আকাঙ্ক্ষা করেননি। তার ধন-সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার জন্যও সন্তান কামনা করেননি। বরং তারপর দীনের দায়িত্ব গ্রহণ এবং তার যথার্থ উত্তরাধিকার ও আল্লাহর পসন্দনীয় বান্দা হবার জন্য সন্তান কামনা করেছিলেন।
মু'মিন পিতার অন্তরের গভীর তলদেশ থেকে উত্থিত এ দোয়া আল্লাহ পাক কবুল করেছিলেন এবং তাঁকে এমন এক নেক্কার পুত্র দান করেছিলেন যার শানদার ভবিষ্যত সম্পর্কে আল্লাহর কিতাবেই সাক্ষী রয়েছে:
وَآتَيْنَهُ الْحُكْمَ صَبِيًّا وَحَنَانًا مِّنْ لَّدُنَّا وَزَكُوةً وَكَانَ تَقِيًّا وَبَرًّا بِوَالِدَيْهِ وَلَمْ يَكُنْ جَبَّارًا عَصِيًّا مريم : ١٢-١٤
"আমরা তাকে বাল্যকাল থেকেই 'হুকুম' দ্বারা ধন্য করেছি এবং নিজের নিকট থেকে তাকে নম্র মন ও পবিত্রতা দান করেছি আর সে বড়ো পরহেজগার এবং তার মাতা-পিতার অধিকার রক্ষাকারী ছিল। সে না ছিল অহংকারী-অত্যাচারী, আর না নাফরমান।"
সফল ভবিষ্যতের চিত্র এঁকে পবিত্র কুরআনে এখানে হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের চরিত্রের কতিপয় বিশেষ গুণাবলীর উপর আলোকপাত করা হয়েছে।
হুকুম, নরম অন্তর, পবিত্রতা, মুত্তাকিয়ানাহ জীবন, মাতা-পিতার অধিকার সংরক্ষণকারী এবং বিদ্রোহ ও নাফরমানী থেকে পবিত্র জীবন।
হুকুমের অর্থ হলো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি। দীন ও দুনিয়ার ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার যোগ্যতা খুবই পসন্দনীয় এবং ভালো গুণ।
নরম অন্তর শুধু একটি গুণই নয়। বরং অনেক নৈতিক গুণের ভিত্তি।
পবিত্রতা অর্থাৎ গুনাহ, শরমহীনতা, বিপথগামী এবং যুলুম-নির্যাতন থেকে তাঁর নফস পবিত্র ছিল। নফসের পবিত্রতা উঁচু ধরনের নৈতিক মর্যাদা।
তাকওয়া, আল্লাহভীতি এবং পরহেজগারীর জীবনই সফল জীবন। আর একজন মুত্তাকী মানুষই আল্লাহর দৃষ্টিতে ইজ্জত ও মর্যাদার দাবীদার হতে পারে।
মাতা-পিতার অধিকার সংরক্ষণ সে সম্পদ যা সমাজ জীবনে সফল অধিকার আদায়ের জন্য মানুষকে প্রস্তুত রাখে। মাতা-পিতার চক্ষুর আলো এবং অন্তরের শান্তি সে সন্তানই দিতে পারে যে অনুগত, খিদমতগুজার এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণকারী। তারা বিদ্রোহীও নয় এবং নাফরমানও নয়।
পবিত্র কুরআনের এ বর্ণনাকে সামনে রেখে পর্যালোচনা করে দেখুন আপনি কি চান। আপনার আকাঙ্খা কি। আপনি আপনার রবের নিকট কি আশা এবং দোয়া করে থাকেন। আপনার দৃষ্টিতে সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নকশা কি। সে নকশার সাথে কুরআনের এ নকশার কতটুকু মিল রয়েছে। আর এজন্য আপনার চেষ্টাইবা কি?
উজ্জ্বল ভবিষ্যত লাভ শুধু এ নয় যে, আপনার সন্তান সচ্ছল হবে। তারা উঁচু ডিগ্রীধারী এবং বড়ো বড়ো পদ লাভ করবে। আরাম-আয়েশের সকল বস্তু তাদের নিকট থাকবে। দুনিয়ার মান-মর্যাদা এবং ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি হবে। প্রাসাদোপম অট্টালিকা এবং উন্নত ধরনের গাড়ী থাকবে।
আপনি আপনার সন্তানের জন্য এসব আকাঙ্ক্ষা করবেন, অথবা তা হাসিলের জন্য সাহায্য করবেন, ইসলাম তাতে বাধা দেয় না। অবশ্য ইসলাম আপনার মস্তিষ্কের এ প্রশিক্ষণ দিতে চায় যে, আপনার দৃষ্টি যেন শুধু এসব বস্তুতেই সীমাবদ্ধ না থাকে এবং আপনি যেন এসব বস্তুকেই উজ্জ্বল ভবিষ্যত লাভ মনে করতে না থাকেন।
আপনার এ আশা অপসন্দনীয় নয় যে, আপনার সন্তান উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হোক, উঁচু পদ লাভ করুক, আরাম-আয়েশের সম্মান লাভ করুক এবং বস্তুগত দিক থেকে সফল হোক। এ সবের জন্যও আপনার চেষ্টা অপসন্দনীয় নয়। অপসন্দনীয় হলো, এ দুনিয়া বা বস্তুগত সাফল্যকেই আপনার জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নেয়া এবং সন্তানের দীন ও আখলাক থেকে গাফেল হয়ে যাওয়া। মুসলমান মা কোনো সময়ই এ সত্যকে যেন মস্তিষ্ক থেকে বের করে না দেন যে, প্রকৃত জীবন হলো আখেরাতের জীবন এবং ঈমান থেকে গাফেল থেকে সে জীবন লাভ কখনোই সম্ভব নয়। আপনার সন্তানের শানদার ভবিষ্যত হলো সে দীনি শিক্ষায় সজ্জিত হোক। দীনের ব্যাপারে তারা গভীরতা লাভ করুক। তারা পবিত্র চরিত্র এবং ইসলামী সভ্যতার প্রতিনিধি হোক। সামাজিক দায়িত্ব পালনে তারা অগ্রগণ্য হোক। তাদের জীবন পবিত্র, আল্লাহভীতি এবং পরহেজগারীর নমুনা হোক। মাতা-পিতার অনুগত ও খিদমত গুজার হোক। বস্তুগত জীবনের উঁচু উঁচু পদে সমাসীন থেকেও দীনে হকের সত্য প্রতিনিধি এবং অকপট খাদেম হোক।

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 দীনের সন্তানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের স্থান

📄 দীনের সন্তানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের স্থান


সন্তানের জীবনকে এ দৃষ্টিকোণ থেকে সফল বানানোর জন্য প্রয়োজন হলো আপনাকে সন্তানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপারে অসাধারণ মনোযোগ দিতে হবে। চরম হিকমত, একান্ত আন্তরিক প্রচেষ্টা, ধৈর্য ও স্থৈর্যের দৃষ্টিতে যেমন সমাজের দৃষ্টিতেও তেমনি মর্যাদাকর। এর বদৌলতে আপনি দুনিয়াতেও মান-মর্যাদা ও সুনাম পাবেন এবং আখেরাতেও মান-মর্যাদার অধিকারী হবেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টিতে সন্তানের জন্য সবচেয়ে উত্তম তোহফা হলো আপনি তাকে উত্তম শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সুসজ্জিত করবেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: مَا نَحِلَ وَالِدُ وَلَدَهُ مِنْ نَحْلٍ أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَنٍ -
“পিতা নিজের সন্তানকে যাকিছু প্রদান করেন তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো ভালো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ।”
সন্তানের ভালো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সাদকায়ে জারিয়া। আপনার কাজের সময় ও সুযোগ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার আমলনামায় পুরস্কার ও সওয়াব বৃদ্ধি পেতে থাকবে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُولَهُ -
“যখন মানুষ মরে যায়, তখন তার আমলের প্রসঙ্গ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তিন বিষয়ের সওয়াব ও পুরস্কার মৃত্যুর পরও পেতে থাকে। প্রথম, সে কোনো সাদকায়ে জারিয়া করে গিয়ে থাকলে; দুই, এমন কোনো জ্ঞান যা থেকে জনগণ উপকৃত হতে থাকে; তিন, নেক পুত্র যে তার জন্য দোয়া করে।”
একবার রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কুরআনের আলেমের মাতা-পিতাকে কিয়ামতের দিন টুপি পরানো হবে। তিনি ইরশাদ করেছেন:
مَنْ قَرَءَ الْقُرْآنَ وَعَمِلَ بِهِ الْبِسَ وَالِدَهُ تَاجًا يَوْمَ الْقِيمَةِ ضَوْءَهُ أَحْسَنُ مِنْ ضوء الشَّمْسِ فِي بُيُوتِ الدُّنْيَا فَمَا ظَنَّكُمْ بِالَّذِي عَمِلَ بِهَذَا - ابو داود، حاكم
"যে কুরআনের জ্ঞান হাসিল করলো এবং তার উপর আমলও করলো তার মাতা-পিতাকে কিয়ামতের দিন টুপি পরানো হবে। যার আলো সে সূর্যের আলোর চেয়ে বেশী উত্তম হবে যে সূর্য দুনিয়ার ঘরগুলোকে আলোকিত করে থাকে। তাহলে যারা আমল করেছে তাদের ব্যাপারে তোমাদের ধারণা কি তা বলো।"-আবু দাউদ, হাকেম
হযরত বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাওয়ায়েতে টুপির পরিবর্তে জান্নাতের পোশাকের উল্লেখ রয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
“যে ব্যক্তি কুরআন পড়লো, শিখলো এবং তার উপর আমল করলো কিয়ামতের দিন তার মাতা-পিতাকে নূরানী টুপি পরিধান করানো হবে। সূর্যের আলোর মতো তার আলো হবে এবং তার মাতা-পিতাকে এমন মূল্যবান দুটি পোশাক পরানো হবে যার মূল্য সমগ্র দুনিয়াও হতে পারবে না। তখন মাতা-পিতা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করবেন, এ পোশাক তাদেরকে কিসের বিনিময়ে পরিধান করানো হচ্ছে। তাদেরকে বলা হবে, তোমাদের পুত্রের কুরআন হাসিলের বিনিময়ে এটা পরিধান করানো হচ্ছে।”
এসব বর্ণনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তান প্রশিক্ষণের অপরিসীম সওয়াব ও পুরস্কারের কথা বর্ণনা করে উম্মাতকে এ দায়িত্বের প্রশ্নে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর এ উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্য হলো, উম্মাতের কোনো গৃহই যাতে সন্তানের শিক্ষা-প্রশিক্ষণের ব্যাপারে অবহেলা করা না হয়। উদ্বুদ্ধ করণের সাথে সাথে তিনি এও আলোকপাত করেছেন যে, যে সকল মাতা-পিতা এ দায়িত্ব পালনে অবহেলা প্রদর্শন করবে তাদেরকে কিয়ামতের দিন কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 সন্তানের মর্যাদার প্রতি দৃষ্টিদান

📄 সন্তানের মর্যাদার প্রতি দৃষ্টিদান


عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَكْرِمُوا أَوْلادَكُمْ وَأَحْسَنُوا أَدَبَهُمْ - ترغيب وترهيب بحو اله ابن ماجه
“হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সন্তানদের সাথে রহম করমপূর্ণ ব্যবহার করো এবং তাদেরকে ভালো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দাও।”-তারগীব ও তারহীব
এ হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দানের তাকিদ দেয়ার সাথে সাথে এ তাকিদও দিয়েছেন যে, তাদের সাথে রহম-করমপূর্ণ ব্যবহার করো। বরং প্রথম এ তাকিদ দেয়া হয়েছে যে, সন্তানদের সাথে মান-মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার করো। অতপর তাকিদ দেয়া হয়েছে যে, তাদেরকে উত্তম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দাও।
মাতা-পিতার জন্য ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের সাথে রহম-করমপূর্ণ ব্যবহার এতো গুরুত্বপূর্ণ যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং সেদিকে প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অতপর উত্তম শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের কথা বলেছেন। সন্তানদের সাথে রহম-করমের ব্যবহার করার অর্থ হলো তাদের মান-মর্যাদার প্রতি চরমভাবে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের সাথে এমন আচরণ বা কথা বলা যাবে না যাতে তাদের অহংবোধে আঘাত লাগে এবং তারা নিজেদেরকে নীচু ভাবতে থাকে। সাধারণত প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সময়ই এ ধরনের অবহেলা প্রদর্শন করা হয় এবং শিশুর মর্যাদা ও অহংবোধের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয় না। প্রকৃতপক্ষে শৈশবকালেই উত্তম সময় যখন আপনি শিশুর মস্তিষ্ক ও অন্তরের পরিষ্কার আমলে আপনি যে ধরনের ইচ্ছা সে ধরনের ছবি এঁকে দিতে পারেন। এ ছবি বা চিত্র আজীবন চরিত্র ও কাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। শিশুর ভাঙ্গা-গড়ায় প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষার মৌলিক গুরুত্ব রয়েছে।
আপনিই চিন্তা করুন যে, মাতা-পিতা অথবা শিক্ষকের ভুল কর্মপদ্ধতির ফলে শিশুর মস্তিষ্কে যদি এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, সে দুর্বল, অকেজো এবং নীচ। সে এমন যোগ্য নয় যে, তার সাথে ভালোভাবে কথা বলা যায়। সে এমন নয় যে, তার সাথে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা যায়। সে এমন নয় যে, তার উপর আস্থা এনে কোনো কাজ ন্যস্ত করা যায়—তাহলে আপনিই বলুন, তার মধ্যে উচ্চ আশা, অহংবোধ, সাহসিকতা, আত্মবিশ্বাস প্রভৃতি গুণ কি করে সৃষ্টি হতে পারে। আর এ ধরনের শিশু দীন ও মিল্লাতের জন্য কিভাবে বড়ো কাজ আনজাম দিতে পারবে।
মাতা-পিতাকে নিজের কথা-বার্তা এবং কাজের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং যাদের তত্ত্বাবধানে শিশুদের শিক্ষার ভার দেয়া হবে তাদের ব্যাপারেও ইতমিনান থাকতে হবে। শিশুর অহমবোধ এবং মর্যাদাবোধ এক মৌলিক শক্তি। এ শক্তি যদি আহত হয় তাহলে শিশুর মধ্যে সাহসহীনতা, ভীরুতা, নীচতা এবং আত্মবিশ্বাসহীনতার নৈতিক দোষ সৃষ্টি হয়—আর এ ধরনের শিশুদের থেকে ভবিষ্যতে কোনো বড়ো কাজ আশা করা যায় না।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ফরমানের আলোকে নিজের গৃহকে পরীক্ষা বা পর্যালোচনা করে দেখুন এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠানসমূহকেও পর্যালোচনা করুন। উত্তম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য মৌলিক কথা হলো, মাতা-পিতা ও শিক্ষকদেরকে শিশুদের সাথে রহম-করমপূর্ণ আচরণ করতে হবে এবং কোনো এমন কথা বলতে পারবেন না যাতে শিশুর মর্যাদা বিনষ্ট এবং আহমবোধ আহত হয়।

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে জবাবদিহি

📄 সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে জবাবদিহি


প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানের প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করে এ ব্যাপারেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ পাক কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করবেন যে, আপনি সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন কিনা- পরিবারের সদস্যদের দীনি ও নৈতিক শিক্ষা দান অন্যতম দীনি দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
لَا يَسْتَرْعِى اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَبْدًا رَعِيَّةً قَلَّتْ أَوْ كَثُرَتْ إِلَّا سَأَوَلَهُ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَنْهَا يَوْمَ الْقِيمَةِ أَقَامَ فِيهَا أَمَرَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى أَمْ أَضَاعَهُ حَتَّى يَسْأَلُهُ عَنْ أَهْلِ بَيْتِهِ خَاصَّةً -
"আল্লাহ যে বান্দাকেই বেশী অথবা কম লোকের তত্ত্বাবধায়ক বানান না কেন-কিয়ামতের দিন অবশ্যই তাকে জিজ্ঞেস করা হবে যে, সে অধীনস্ত লোকদেরকে দীনের উপর চালিয়েছিল না তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। বিশেষ করে তার গৃহের লোকদের ব্যাপারেও হিসেব নেবেন।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00