📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 মহান মায়ের প্রশিক্ষণে ভাগ্য পরিবর্তন

📄 মহান মায়ের প্রশিক্ষণে ভাগ্য পরিবর্তন


সওদাগরদের একটি কাফেলা বাগদাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। তাদের সাথে একজন নব যুবকও ছিল। কতিপয় হিদায়াতসহ তার মা সে কাফেলার সাথে পাঠিয়ে ছিলেন। যাতে সে সহিহ-সালামতে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে এবং দীনের শিক্ষা অর্জন করে আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর নির্দেশাবলী শুনাতে এবং আলো প্রদর্শন করতে পারে।
কাফেলা খুব স্বচ্ছন্দেই অগ্রসর হচ্ছিল। পথিমধ্যে একটি ডাকাত দল কাফেলার উপর হামলা করে বসলো। কাফেলায় যোগদানকারীরা নিজে দেল মাল-সামান রক্ষার জন্য অনেক চাল-চাললো। কিন্তু তাদের চালে ডাকাতদের কিছু হলো না। তাদের নানা ধরনের দয়ার আবেদনও ডাকাতরা কর্ণপাত করলো না। কাফেলার প্রত্যেকের নিকট থেকে তারা সবকিছু ছিনিয়ে নিল। ডাকাতদের কাজ সারা হলে তাদের মধ্যে একজন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ সে নব যুবককে জিজ্ঞাসা করলো:
ডাকাতঃ মিয়া, তোমার কাছে কি কিছু আছে?
যুবকঃ জ্বী হাঁ। আমার কাছে ৪০টি দিনার আছে।
ডাকাতঃ তোমার নিকট ৪০টি দিনার আছে। (ডাকাতের বিশ্বাস হচ্ছিল না। এ খাস্তা হাল গরীবের নিকট ৪০টি দিনার কোত্থেকে এলো। আর যদি থাকেও তাহলে সে আমাদের কাছে বলছে কেন-ডাকাতটি অনেকক্ষণ চিন্তা করলো এবং এ আশ্চর্য ধরনের যুবককে সরদারের নিকট নিয়ে গেল।)
ডাকাতঃ সরদার! এ ছেলেটিকে দেখুন। সে বলে, তার নিকট ৪০টি আশরাফি আছে।
সরদার: মিয়া সাহেব জাদা! তোমার কাছে কি সত্যি দিনার আছে?
যুবকঃ জ্বী হাঁ। আমার কাছে ৪০টি দিনার আছে।
সরদার: ভালো, তোমার দিনার কোথায় রেখেছ? সরদার গরীব ছেলেটির প্রতি আশ্চর্য নজরে দেখতে লাগলো।
যুবকঃ জ্বী, আমার কোমরের সাথে একটি থলি বাঁধা আছে। দিনারগুলো তাতেই রয়েছে।
সরদার: যুবকটির কোমর থেকে থলি খুলে গুণে দেখলো তাতে ৪০টি দিনারই রয়েছে। সরদার হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ পর্যন্ত যুবকটিকে দেখতে লাগলো। অতঃপর বললো, সাহেব জাদা! তুমি কোথায় যাচ্ছ?
যুবকঃ আমি দীনের ইলম হাসিলের জন্য বাগদাদ যাচ্ছি।
সরদার: সেখানে কি তোমার পরিচিত কেউ আছে?
যুবকঃ জ্বী না। সেটা একটি অপরিচিত শহর। আমার আম্মা আমাকে ৪০টি দিনার দিয়েছিলেন। যাতে আমি নিশ্চিন্তে দীনের ইলম হাসিল করতে পারি। সে অপরিচিত শহরে আমার প্রয়োজনের প্রতি কে নজর রাখবে—আর আমিইবা কেন অপরের মুখাপেক্ষী থাকবো।
সরদার অত্যন্ত আগ্রহ ও বিস্ময়ের সাথে যুবকটির কথা শুনছিলো। তার পেরেশানী বাড়ছিলো। এবং চিন্তা করছিলো যে, যুবকটি দিনারগুলো কেন লুকায়নি। যদি সে না বলতো, তাহলে আমার কোনো সাথীর ধারণাও হতো না যে, এ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও গরীব যুবকের নিকট আবার কিছু থাকতে পারে। যুবকটি কেন ভাবলো না যে, সে এক অপরিচিত স্থানে যাচ্ছে। তার ভবিষ্যত এবং শিক্ষার ব্যাপারটি এ অর্থের উপরই নির্ভরশীল। শেষ পর্যন্ত সে এ অর্থ লুকালো না কেন। যুবকটির সরলতা ও সত্যবাদিতা তার অন্তরে অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করছিলো। সে জিজ্ঞেস করলো, সাহেব জাদা! তুমি এ অর্থ লুকাওনি কেন? যদি তুমি না বলতে এবং অস্বীকার করতে তাহলে আমরা সন্দেহও করতাম না যে, তোমার নিকট আবার কোনো অর্থ থাকতে পারে।
যুবক : আমি যখন বাড়ী থেকে বের হচ্ছিলাম তখন আমার আম্মা নসিহত করলেন যে, বেটা! যাই হোক, কখনো মিথ্যা বলবে না। আমি আমার আম্মার নির্দেশ কি করে লংঘন করতে পারি।
সরদারের আভ্যন্তরীণ মানসটি জেগে উঠলো। সে চিন্তা করতে লাগলো, এ যুবক নিজের ভবিষ্যতের অনিবার্য ধ্বংস দেখেও মায়ের নির্দেশ অমান্য করতে প্রস্তুত নয়-আর আমি দীর্ঘ দিন যাবত আমার পরওয়ারদিগারের নির্দেশাবলীকে পদদলিত করছি। সে যুবকটির সাথে কোলাকুলি করলো। তার দিনার তাকে ফিরিয়ে দিল। কাফেলায় অংশগ্রহণকারীদের আসবাবপত্র প্রত্যর্পণ করলো এবং আল্লাহর সমীপে সিজদাবনত হয়ে কাঁদতে শুরু করলো। সত্যিকারভাবে সে তাওবা করলো এবং আল্লাহর রহমাত তাকে ঘিরে নিলো। এ ডাকাত সমকালীন যুগে আল্লাহর একজন মহান ওলি হয়েছিলেন এবং আল্লাহর বান্দাদের লুণ্ঠনকারী আল্লাহর বান্দাদের দীনের দৌলতে বণ্টনকারী হয়ে গিয়েছিলেন। মহান মাতার শিক্ষা শুধু যুবককেই উঁচু মর্যাদায় সমাসীন করেনি বরং ডাকাতদের তাকদীরও বদলে দিয়েছিল। এ সেই সম্ভাবনাপূর্ণ যুবক যিনি সমগ্র ইসলামী বিশ্বে আবদুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহ আলাই নামে সুপ্রসিদ্ধ এবং যাঁর নামের প্রসঙ্গ উঠতেই শ্রদ্ধায় অন্তর অবনত হয়ে পড়ে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00