📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 সন্তানের প্রতি রাসূলের ভালোবাসা

📄 সন্তানের প্রতি রাসূলের ভালোবাসা


প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ খাদেম ছিলেন হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি দিন-রাত তাঁর খিদমতে লেগে থাকতেন। তিনি বলেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের আত্মীয়-স্বজনকে যেভাবে ভালোবাসতেন তেমন আর কাউকে ভালোবাসতে দেখেননি। -সিরাতুন্নবী: দ্বিতীয় খণ্ড
০ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্থায়ী নিয়ম ছিলো, যখনই তিনি সফরে যেতেন তখন সর্বশেষ নিজের প্রিয় কন্যা হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহে যেতেন এবং সফর থেকে ফিরে সর্বপ্রথম মসজিদে দু রাকাত নামায আদায় করে হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহে পৌছতেন।
০ একবার কোনো কথায় হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা এবং হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর মধ্যে মন কষাকষি হয়ে গেল। এ ঘটনা জানতে পেরে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের গৃহে গেলেন এবং উভয়ের মধ্যে মিলমিশ করিয়ে দিলেন। অতপর তিনি যখন বাইরে এলেন তখন খুব হাসি-খুশি ছিলেন। লোকজন জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যখন গৃহাভ্যন্তরে গমন করেছিলেন তখন খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। আর যখন বাইরে আসছিলেন তখন খুব খুশী অবস্থায় ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "হাঁ আমি ঐ দু ব্যক্তিকে মিলিয়ে দিয়েছি। তাদেরকে আমি অত্যন্ত ভালোবাসি।" -সিরাতুন্নবী: দ্বিতীয় খণ্ড
০ একবার হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু দ্বিতীয় বিয়ে করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা জানতে পেরে খুব দুঃখিত হলেন। তৎক্ষণাৎ মসজিদে গিয়ে খুতবা দিলেন। খুতবায় তিনি নিজের নাখোশের কথা উল্লেখ করে বললেন, ফাতেমা আমার প্রিয় কন্যা এবং কলিজার টুকরা। যে তাকে কষ্ট দেবে সে আমাকে কষ্ট দেবে। -বুখারী
• হযরত যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহার স্বামী আবুল আছ বদরের যুদ্ধে গ্রেফতার হয়ে এলেন। সিদ্ধান্ত হলো যে, এসব কয়েদীকে ফিদিয়া নিয়ে মুক্ত করে দেয়া হবে। আবুল আছের নিকট ফিদিয়া আদায় করার মতো অর্থ ছিল না। মুক্তির জন্য স্বগৃহে ফিদিয়ার অর্থ প্রেরণের খবর পাঠালেন। পতিভক্তা স্ত্রী নিজের মা হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রদত্ত হার তৎক্ষণাৎ পাঠিয়ে দিলেন। আবুল আছ এ হার ফিদিয়া হিসেবে পেশ করলেন। হার যখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে এলো তখন তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। সাহাবীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, "তোমরা সম্মত হলে এ হার কি যয়নবকে ফিরিয়ে দেয়া যায়?" সাহাবীরা বললেন, অবশ্যই ফিরিয়ে দিন। অতপর তিনি সে হার হযরত যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহাকে ফিরিয়ে দিলেন।
• প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে ছোট পুত্র হযরত ইবরাহীম মদীনার মফস্বল এলাকার এক কামার আবু ইউসুফের নিকট লালিত-পালিত হচ্ছিলেন। তিনি প্রায়ই পায়ে হেঁটে সেখানে যেতেন। আবু ইউসুফ ছিলেন কামার। এজন্য ঘর ধোয়ায় আচ্ছন্ন থাকতো। তিনি সে ধোয়ার মধ্যেই বসতেন। শিশুকে কোলে নিতেন এবং আদর করতেন। অতপর মদীনা ফিরে আসতেন। -সিরাতুন্নবী : দ্বিতীয় খণ্ড
০ একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথাও যাচ্ছিলেন। হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু রাস্তার উপর খেলা করছিলেন। তিনি দু বাহু আন্তরিক স্নেহে প্রসারিত করে দিলেন। যাতে হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর নিকট চলে আসেন। হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু হাসতে হাসতে তাঁর নিকট আসতেন এবং দুষ্টুমী করে আবার সরে যেতেন। অবশেষে তিনি তাকে ধরে ফেললেন এবং এক হাত তার থুতনীর উপর ও অপর হাত মাথার উপর রেখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। অতপর বললেন, হুসাইন আমার, আর আমি হুসাইনের। -সিরাতুন্নবী : দ্বিতীয় খণ্ড, বুখারী উদ্ধৃতিসহ
০ হযরত যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহার একটি প্রিয় শিশু কন্যা ছিল। তার নাম ছিল উমামাহ। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমামাকে খুব ভালোবাসতেন। প্রায় নামাযের সময়ই সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থাকতো। তিনি নামাযে দাঁড়ালে সে কাঁধের উপর সওয়ার হয়ে যেত। রুকূ'র সময় তিনি তাকে নামিয়ে দিতেন। তিনি পুনরায় খাড়া হলে সে আবার সওয়ার হতো।
০ একবার এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে তোহফা হিসেবে কিছু জিনিস পাঠালেন। তার মধ্যে সোনার হারও ছিল। সে সময় সে সেখানে খেলছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম বললেন, এ হার আমি তাকে দিবো, ঘরে যে আমার সবচেয়ে প্রিয়। গৃহের মহিলারা মনে করলেন যে, তিনি এ হার হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকেই দেবেন। কিন্তু তিনি উমামাহকে নিজের কাছে ডাকলেন এবং স্বয়ং নিজের পবিত্র হাত দিয়ে তার গলায় সে হার পরিয়ে দিলেন। -সিরাতুন্নবী : দ্বিতীয় খণ্ড

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 মায়ের মমতা এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিদ্ধান্ত

📄 মায়ের মমতা এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিদ্ধান্ত


নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এক ব্যক্তি স্ত্রীকে তালাক দিলো এবং শিশু সন্তান নিজের নিকট রাখতে চাইল। মায়ের অবস্থা ছিল অকল্পনীয়। একদিকে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্নতার দুঃখ, অপরদিকে শিশু সন্তান ছিনিয়ে নেয়ার কষ্ট। এ করুণ অবস্থায় মহিলাটি রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে ফরিয়াদ নিয়ে উপস্থিত হলো এবং নিজের ঘটনা অত্যন্ত দরদপূর্ণ ভাষায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পেশ করলো:
“হে আল্লাহর রাসূল! আমার স্বামী আমাকে তালাক দিয়ে তার নিকট থেকে পৃথক করে দিয়েছে এবং এখন সে আমার নিকট থেকে এ আদরের পুত্তলিকে ছিনিয়ে নিতে চায়। হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার কলিজার টুকরা। আমার পেট তার আরামস্থল। আমার বুকের ছাতি তার মশক সদৃশ এবং আমার কোল তার ঘরের মতো। হে আল্লাহর রাসূল! আমি এ দুঃখ কি করে বরদাশত করবো।”
মহিলাটির এ ফরিয়াদ শুনে রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি দ্বিতীয় বিয়ে না করবে, ততক্ষণ তোমার নিকট থেকে তোমার সন্তানকে কেউই ছিনিয়ে নিতে পারবে না।”-আবু দাউদ: কিতাবুত তালাক

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের আকাঙ্ক্ষা

📄 হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের আকাঙ্ক্ষা


হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ঘটনা শোনালেন। তিনি বললেন, একবার জনৈক ব্যক্তি হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করলেন, হযরত! আপনার দৃষ্টিশক্তি কি কারণে ক্ষীণ হয়ে আসছে এবং আপনার কোমর কেন বেঁকে যাচ্ছে? হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম জবাবে বললেন, দৃষ্টিশক্তি তো ইউসুফ আলাইহিস সালামের চিন্তায় চিন্তায় ক্ষীণ হয়ে আসছে। আর কোমর তার ভাই বিন ইয়ামিনের চিন্তায় বেঁকে গেছে। ঠিক তক্ষুণি হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের নিকট এলেন এবং বললেন, “আপনি আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন?” হযরত ইয়াকুব আলাইহিস • সালাম বললেন, “না, বরং আল্লাহর দরবারে নিজের দুঃখ কষ্টের ফরিয়াদ পেশ করছি।” হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, “আপনি আপনার যে দুঃখ বর্ণনা করলেন, তা আল্লাহ খুব ভালোভাবেই জানেন।” অতপর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম চলে গেলেন। হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম নিজের কামরায় প্রবেশ করলেন এবং বলতে লাগলেন, হে আমার পরওয়ারদিগার! তোমার কি এক বৃদ্ধ ব্যক্তির উপর রহম হয় না? তুমি আমার চক্ষুও ছিনিয়ে নিয়েছ এবং আমার কোমরও বাঁকিয়ে দিয়েছ। পরওয়ারদিগার! আমার দুটি ফুলকে আমার নিকট ফিরিয়ে দাও। যাতে করে আমি উভয়কে শুধু শুঁকতে পারি। অতপর তুমি যা ইচ্ছে তাই আমার সাথে করো। হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম পুনরায় তাশরিফ আনলেন এবং বললেন, হে ইয়াকুব! আল্লাহ তাআলা তোমাকে সালাম বলেছেন এবং বলেছেন, ইয়াকুব খুশী হয়ে যাও। যদি তোমার দু পুত্র মরে যেত তাহলেও তোমার খাতিরে আমি তাদেরকে জীবিত উঠিয়ে দিতাম। যাতে তুমি উভয়কে দেখে নিজের চক্ষু শীতল করতে পার। -তারগিব ও তারহিব: তৃতীয় খণ্ড

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 রাসূলের দরবারে এক মা’র ফরিয়াদ

📄 রাসূলের দরবারে এক মা’র ফরিয়াদ


নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে একজন মহিলা এসে ফরিয়াদ করতে লাগলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি পুত্র আছে। অনেক কাজেই সে আমাকে সাহায্য করে। মহিলা হবার কারণে আমি বাইরে কাজ করতে পারি না। সে কূপ থেকে আমার জন্য পানি এনে দেয় এবং বাইরের অন্যান্য কাজও করে দেয়। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার থেকে বিচ্ছিন্ন আমার স্বামী এ শিশুকেও আমার নিকট থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়।"
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলাটির ফরিয়াদ শুনে সিদ্ধান্ত দিলেন, "ঠিক আছে, লটারী করো। লটারীতে যার নাম আসবে সে শিশু পুত্রকে সাথে নিয়ে যাবে। পুত্রের পিতা বললো, “হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার পুত্র। অন্য কেউ তাকে সাথে নিয়ে যাবার দাবী কি করে করতে পারে? আর আমি থাকতে অন্য কেউ তাকে কি করে নিয়ে যেতে পারে?"
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতা-পিতা উভয়ের কথা শুনে পুত্রের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, "বেটা! ইনি তোমার পিতা এবং ইনি তোমার মাতা। যাকে চাও তার হাত ধরে চলে যাও। এ স্বাধীনতা তোমার রয়েছে। পুত্র নিজের স্থান থেকে উঠে দাঁড়ালো। অতপর নিজের মা'র কাছে গেল এবং তার হাত ধরলো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00