📄 নাম পরিবর্তন
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাম সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন থাকতেন। কোনো দিক দিয়ে কারোর নাম যদি খারাপ মনে হতো তাহলে তিনি তার নাম পরিবর্তন করে দিতেন এবং কোনো ভালো নাম প্রস্তাব করতেন। যদি কোনো নামে তাওহীদের ধ্যান-ধারণা বিরোধী কোনো অর্থ প্রকাশ পেতো অথবা তা অর্থহীন হতো অথবা তা কোনো অপসন্দনীয় এবং খারাপ বস্তুর নাম হতো অথবা তাতে কোনো অপসন্দনীয় অর্থ হতো অথবা তার মাধ্যমে ব্যক্তিগত দিক থেকে কোনো গুনাহর সম্পর্ক হতো অথবা তাতে নিজের বড়াই এবং আত্মগরিমা প্রকাশ পেতো এবং অথবা অন্য কোনো খারাপ দিক হতো তাহলে তিনি তার নাম পরিবর্তন করে দিতেন এবং তার পরিবর্তে কোনো ভালো ও পবিত্র নাম প্রস্তাব করতেন।
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খারাপ নাম পরিবর্তন করে দিতেন। -জামে' তিরমিযী
এক : হানি ইবনে যায়েদ এক প্রতিনিধি দলের সাথে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হলেন। এ সময় তিনি শুনলেন যে, তার কুনিয়ত হলো আবুল হাকাম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ডেকে বললেন, "হাকাম" তো আল্লাহ এবং লুকম প্রদান তার অধিকারের আওতাধীন। তুমি "হাকাম” কুনিয়ত কি করে রাখলে? ইবনে যায়েদ বললেন, কথা তা নয়। (আমি আল্লাহর সে অধিকারে শরীক হতে চাই) প্রকৃত ব্যাপার হলো, আমার কওমের লোকদের মধ্যে যখন কোনো কথায় পরস্পর মতভেদ হয়ে যায় তখন তারা আমার নিকট আসে। আমি তাদের মধ্যে সঠিক ফায়সালা করে দিই এবং উভয় পক্ষ সে সিদ্ধান্ত আনন্দের সাথে মেনে নেয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কি সুন্দর বিষয় তুমি বর্ণনা করেছ। অতপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কোনো সন্তান নেই? ইবনে যায়েদ বললেন, তার তিন পুত্র আছে। তাদের নাম হলো শুরাইহ, আবদুল্লাহ এবং মুসলিম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তাদের মধ্যে বড়ো কে? ইবনে যায়েদ বললো, "শুরাইহ” সকলের বড়ো। তিনি বললেন, তাহলে তোমার কুনিয়ত হলো আবু শুরাইহ এবং তার ও তার পুত্রদের জন্য দোয়া করলেন। উপরন্তু আপনি জানতে পারলেন যে, সে প্রতিনিধি দলের এক ব্যক্তির নাম হলো আবদুল হাজার। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার নাম কি?” সে বললো, "আবদুল হাজার।" তিনি বললেন না, তোমার নাম হবে "আবদুল্লাহ।”
শুরাইহ বলেন, হানি ইবনে যায়েদ যখন স্বদেশ ফিরতে লাগলেন তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন্ কাজ করলে অবধারিতভাবে জান্নাত পাব, তা আমাকে বলে দিন। তিনি বললেন, দুটি বিষয়ের ব্যবস্থা করো। মানুষের সাথে ভালোভাবে কথা বলো এবং খুব করে খাদ্য বণ্টন করো। -আল আদাবুল মাফরুজ
দুই : হযরত আবদুর রহমান বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি? আমি বললাম, আমার নাম "আবদুল উজ্জা” তিনি বললেন, না তোমার নাম "আবদুর রহমান।" অন্য এক রাওয়ায়েতে আছে, আমি বললাম, "আমার নাম আজীজ।” এতে তিনি বললেন, "আজিজ তো আল্লাহ।"-আল আদাবুল মাফরুজ
তিন: হযরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আছিয়া নাম পরিবর্তন করে, বললেন, তোমার নাম জামিলাহ। -আল আদাবুল মাফরুজ
সহীহ মুসলিমের রাওয়ায়েতে আছে, হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কন্যার নাম ছিলো আছিয়াহ এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিবর্তন করে তার নাম রেখেছিলেন জামিলাহ।
চার: হযরত মুহাম্মদ বিন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, তিনি একদিন আবু সালমার কন্যা যয়নবের [সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী উম্মে সালমার কন্যা ছিলেন। প্রথম স্বামী আবু সালমার পক্ষের কন্যা] নিকট গেলেন। এ সময় যয়নব আমার সাথের কার বোনের নাম জিজ্ঞেস করলেন। আমি তাকে বললাম, তার নাম বাররাহ। সে বললো, তার নাম পরিবর্তন করে দাও। কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাদী যখন যয়নব বিনতে জাহশের সাথে হয়েছিল তখন তাঁর নাম ছিলো বাররাহ। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নাম পরিবর্তন করে যয়নব রেখেছিলেন। তখন তার মা তাকে বাররাহ বাররাহ বলে ডাকছিলো। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নিজের পবিত্রতার ডংকা বাজিও না। আল্লাহই ভালো জানেন, তোমাদের মধ্যে কে নেককার ও কে বদকার এবং বললেন, তার নাম যয়নব রাখো। আমার মা উম্মে সালমা বললেন, ঠিক আছে, তাহলে তার নাম যয়নব রাখা হলো।
পাঁচ: হযরত রায়েতা বিনতে মুসলিম বলেন, আমার পিতা মুসলিম আমাকে বললেন, আমি হুনাইনের যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি? আমি বললাম, আমার নাম গুরাব (কাক)। তিনি বললেন, না তোমার নাম মুসলিম।
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে উল্লেখ করলেন যে, তাকে শিহাব বলা হয়। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, না বরং তুমি হিশাম।
ছয়: ইসলামের পূর্বে আবদুর রহমান বিন সাঈদ মাখজুমীর পুত্রের নাম ছিল "আছ-ছরম।" অতপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা পরিবর্তন করে "সাঈদ” রেখে দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাঈদকে জিজ্ঞেস করলেন, "আমাদের উভয়ের মধ্যে বড়ো কে? আমি, না তুমি?" হযরত সাঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, "আপনি আমার থেকে বড়ো আমি আপনার থেকে বয়সে আগে।"
তিনি যখন অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন তখন হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু শুশ্রূষার জন্য উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে বললেন, আপনি জুমায়ার নামায এবং জামায়াতের নামাযে অবশ্যই উপস্থিত হবেন। তিনি বললেন, আমাকে পৌঁছাবে এমন কে আছে? হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন গোলাম তার পথপ্রদর্শন ও খিদমতের জন্য পাঠিয়ে দিলেন।
সাত: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিজের সন্তানের নাম হুবাব রেখো না। কেননা, শয়তানের নাম হুবাব। সন্তানের নাম হুবাব হতে পারে না। বরং সন্তানের নাম হলো আবদুর রহমান।
সাপকে হুবাব বলা হয় এবং দুনিয়াকে উম্মে হুবাব বলা হয়ে থাকে। এজন্যে তিনি হুবাব নাম রাখতে নিষেধ করেন।
📄 খারাপ নামের খারাপ প্রভাব
মদীনার মশহুর তাবেয়ী মুহাদ্দিস হযরত সাঈদ বিন মুসায়্যিব নিজের দাদা হুরুন-এর ঘটনা বর্ণনা করে বলেছেন, একবার সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হলেন। এ সময় তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার নাম কি?” তিনি বললেন, "আমার নাম হায়ন।” তিনি বললেন না, "তোমার নাম হায়ন নয় বরং তোমার নাম হলো সাহালা।” হায়ন বললো, আমি তো নিজের পিতা প্রদত্ত নাম পরিবর্তন করে দ্বিতীয় কোনো নাম রাখবো না।
সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব বলেন, এ কারণেই আমাদের বংশে তারপর থেকে এখন পর্যন্ত অব্যাহতভাবে দুঃখ চলে আসছে।
📄 আল্লাহর নিকট সবচেয়ে খারাপ নাম
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخْنَى الْأَسْمَاءِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ تُسَمَّى مَلِكُ الْأَمْلاكِ - الادب المفرد
"হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট চূড়ান্ত খারাপ ও ক্রোধ সম্বলিত নাম হলো কোনো ব্যক্তিকে মালিকুল আমলাক নামে ডাকা।"
মালিকুল আমলাক শব্দের অর্থ হলো, বাদশাহদের বাদশাহ। ফারসীতে তার অর্থ হলো শাহানশাহ। অর্থের দিক থেকে এটা অত্যন্ত খারাপ নাম। কেননা এতে শিরকের ইঙ্গিত রয়েছে। ক্ষমতা এবং বাদশাহী এককভাবে আল্লাহর অধিকারভুক্ত। এ অধিকারের অন্য কারো অংশীদার নেই। সহীহ মুসলিমে এ শব্দও রয়েছে। এর অর্থ হলো বাদশাহী এবং ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য।
📄 সম্বোধককে তার পছন্দনীয় নামে ডাকা
কারোর নাম নিয়ে যখন আপনি ডাকেন তখন আপনি তার পসন্দনীয় নামসহও ডাকতে পারেন। এজন্য সবসময় অন্যদেরকে সে নামেই ডাকুন যা তার নিকট পসন্দনীয়। এতে সম্বোধক নিজের ইজ্জত বৃদ্ধি অনুভব করবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা অত্যন্ত পসন্দ করতেন যে, যে নাম এবং কুনিয়াত যে ব্যক্তির নিকট সবচেয়ে বেশী পসন্দনীয় তাকে সে নামে এবং কুনিয়াতে ডাকতে হবে।