📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 কন্যার সাথে ভালো আচরণ

📄 কন্যার সাথে ভালো আচরণ


নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের কন্যার ব্যাপারে বলতেন : “ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা আমার শরীরের একটি অংশ। যে তাকে নাখোশ করবে সে আমাকে নাখোশ করবে।”-বুখারী
বিয়ের পর যখনই হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাত করতে আসতেন তখনই তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাতেন। তাঁর কপালে চুমু খেতেন এবং নিজের স্থানে হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বসাতেন। -আবু দাউদ
যদি কখনো হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দুঃখিত দেখতেন তখন স্বয়ং দুঃখিত হয়ে পড়তেন। একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহে প্রবেশ করলেন। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে অত্যন্ত হাসি খুশী অবস্থায় বের হয়ে এলেন। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আপনি যখন কন্যার ঘরে ঢুকলেন তখন ছিলেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং যখন ঘর থেকে বের হয়ে এলেন তখন হাসি খুশী অবস্থায় বের হয়ে এলেন ব্যাপার কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি উভয়ের পারস্পরিক মনোমালিন্য দূর করে দিয়েছি। তারা উভয়েই আমার অত্যন্ত প্রিয়।"
মদীনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু আইউব আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহুর গৃহে অবস্থান করছিলেন। হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহ তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গৃহ থেকে বেশ দূরে ছিলো। একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যার গৃহে তাশরীফ নিলেন। কথায় কথায় বললেন, বেটি! তুমি আমার কাছ থেকে অনেক দূরে রয়েছ। আমি তোমাকে নিজের নিকটে কোনো বাড়ীতে নিয়ে যেতে চাই।
হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, আব্বাজান! হারিস বিন নুমানের কয়েকটি বাড়ী আছে। আপনি যদি তাঁকে বলেন, তাহলে তিনি কোনো বাড়ী অবশ্যই দিয়ে দেবেন। আব্বাজান! আপনি তাঁকে বলুন! প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, বেটি! তাঁকে বলতে আমি লজ্জা পাই।
কোনোভাবে একথা হারিস বিন নুমান জানতে পেলেন। তিনি স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি শুনেছি যে, আপনি আপনার কন্যা হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নিজের নিকট কোনো বাড়ীতে আনতে চান। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মাতা-পিতা আপনার উপর কুরবান হোক! আমার সকল বাড়ী আপনার নিকট হাজির করলাম। যে বাড়ীতে ইচ্ছা, আপনি খুশীর সাথে তাঁকে নিয়ে আসুন। আল্লাহর কসম! যে জিনিসই আপনি আমার নিকট থেকে নেবেন, তা আপনার নিকট থাকা আমার নিকট থাকার চেয়ে আমি বেশী পসন্দ করি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি ঠিক বলেছ। আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন এবং তোমার উপর রহমত নাযিল করুন। অতপর তিনি প্রিয় কন্যা হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নিয়ে হারিস বিন নুমানের একটি বাড়ীতে নিজের নিকটে নিয়ে এলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই সফরে যেতেন তখন সর্বশেষ ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে তাশরীফ রাখতেন এবং তাঁর সাথে সাক্ষাত করে সফরে রওয়ানা হয়ে যেতেন। এমনিভাবে তিনি যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন তখন মসজিদে নফল নামায থেকে ফারিগ হয়ে সর্বপ্রথম হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার নিকট তাশরীফ নিতেন।
নাতীদেরকেও গভীরভাবে ভালোবাসতেন। হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার নিকট যখনই যেতেন তখনই বলতেন, ফাতেমা! আমার শিশুদেরকে আনো। ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার পুত্রদেরকে তাঁর নিকট আনতেন। তিনি তাঁদেরকে শুঁকতেন এবং বুকের সাথে চেপে ধরতেন।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক কন্যার নাম ছিলো হযরত যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি সবার বড়ো ছিলেন। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো খালাতো ভাই আবুল আছের সাথে। হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা বিয়েতে তাঁকে ইয়েমেনী আকিক পাথরের একটি মূল্যবান হার দিয়েছিলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন হযরত যয়নাব রাদিয়াল্লাহু আনহা নিজের শ্বশুর বাড়ীতে ছিলেন। তাঁর স্বামী তখনো ঈমান আনেননি। বরং কাফেরদের সাথে বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং গ্রেফতার হয়েছিলেন। নিজের মুক্তির জন্য তিনি বাড়ীতে ফিদইয়ার অর্থ প্রেরণের কথা বলে পাঠালেন। বস্তুত হযরত যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা সে হার প্রেরণ করেছিলেন যে হার তার আম্মা বিয়েতে দিয়েছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নিজের কন্যার এ হার দেখলেন তখন ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। অতপর তিনি সাহাবীদেরকে বললেন, তোমরা সম্মত হলে এ হার যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহাকে ফিরিয়ে দিতে পার এবং তাঁর স্বামীকেও মুক্তি দিতে পার। সাহাবীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ আবেদন হৃষ্টচিত্তে মঞ্জুর করলেন। আবুল আছকে মুক্ত করে দেয়া হলো। এবং তাঁর স্ত্রীর হারও তার হাওয়ালা করা হলো। কিন্তু শর্ত দেয়া হলো যে, সে মক্কা গিয়ে হযরত যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পাঠিয়ে দেবে। সুতরাং হযরত যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা পিতার নিকট এসে গেলেন।
কিছুদিন পর আবুল আছও মদীনা এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। আবুল আছের ইসলাম গ্রহণের পর হযরত যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা সোয়া বছর জীবিত ছিলেন এবং ৮ম হিজরীতে এ নশ্বর জগত থেকে বিদায় গ্রহণ করেন।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজের পবিত্র হাতে তাঁকে কবরে নামান। কবরে নামানোর সময় তিনি অত্যন্ত শোকাতুর এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। অতপর আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন, পরওয়ারদিগার! এ বড়ো দুর্বল ছিল। পরওয়ারদিগার তুমি তার মুশকিলকে আসান করো এবং তার কবরকে প্রশস্ত করে দাও। -উসুদুল গাব্বাহ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00