📄 খাতনা
খাতনা সকল নবী আলাইহিমাস সালামের সুন্নাত এবং ইসলামী রীতি। হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
الْفِطْرَةُ خَمْسُ الخَتَانُ وَالاسْتِحْدَادُ، وَنَتَفُ الإِبِطِ، وَقَصُّ الشَّارِبِ وَتَعْلِيمُ الأظفار - الادب المفرد ص ۱۸۸
"পাঁচটি কাজ সুন্দর স্বভাবের মধ্যে পরিগণিত। খাতনা করা, নাভির নীচের চুল পরিষ্কার করা, বগলের চুল উঠানো, মোচ কাটা এবং নখ কাটা।"
আল ফিতরাত অর্থ হলো সুন্দর প্রকৃতি বা স্বভাব। অর্থাৎ পাঁচটি বস্তু পবিত্রতার নিদর্শন। এ পাঁচটি জিনিস প্রাচীনকাল থেকে নবীদের সুন্নাত হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। সকল নবীই এগুলো পালন করেছেন এবং সকলের শরীয়াতেই ঐকমত্য হিসেবে তা পালিত হয়েছে।
শিশু যদি খুব দুর্বল না হয় তাহলে জন্মের সপ্তম দিনেই খাতনা করা উচিত। এতে দু ধরনের কল্যাণ রয়েছে। প্রথমত সে সময় শিশুর চামড়া নরম এবং পাতলা থাকে এবং তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে সপ্তম দিনে খাতনার যে ইঙ্গিত রয়েছে তা পালিত হয়। হযরত সালমান বিন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি:
معَ الغُلام عَقِيقَةُ فَاهْرٍ قُوا عَنْهُ دَمًا وَأَمِيطُوا عَنْهُ الْآذِى - بخاری
"শিশু ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথে আকীকাহ। অতপর তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত করো এবং তার থেকে ময়লা ইত্যাদি দূর করো।"-বুখারী
ময়লা ইত্যাদি দূর করার অর্থ হলো চুল কাটানো এবং গোসল করানো ইত্যাদি। কতিপয় আলেমের নিকট খাতনাও এ নির্দেশের মধ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কেননা খাতনাও ময়লা দূর করা এবং পবিত্রতা অর্জনের জন্য।
এজন্য সপ্তম দিনে খাতনা করিয়ে নেয়া দরকার। যদি কোনো কারণে তা না হয় তাহলেও ৪০ দিনের মধ্যে করিয়ে নিতে হবে। অথবা যে কোনো সময় করাতে হবে। এতে কোনো অসুবিধা নেই। অবশ্য দুটি ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে।
প্রথমতঃ খুব বেশী দেরী যেন না হয়ে যায়। সাত বছরের মধ্যে খাতনা করিয়ে নেয়া ভালো। কেননা এরপর চামড়া মোটা হয়ে যায়। ফলে বেশী কষ্ট হয়। দ্বিতীয়তঃ এ সুন্নাতকে বিরাট জাঁকজমক ছাড়া অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে পালন করতে হবে। অবস্থা অনুকূল হলে এ সুন্নাত আদায়ের খুশীতে নিজের বন্ধু-বান্ধবকে দাওয়াত করে খাওয়ানো যায়। কিন্তু একে একটা স্থায়ী উৎসবে পরিণত করা এবং প্রদর্শনীর জন্য খরচ করাকে প্রয়োজন মনে করা ইসলামের প্রকৃতির সাথে মিল খায় না। অকারণে নিজের উপর কোনো কিছুকে আবশ্যক করে নেয়া, অতপর জেরবার হওয়া এবং নিজের জন্য পেরেশানী সৃষ্টি করা শরীয়াতের নাফরমানীর সমতুল্য।
হযরত ওসমান বিন আবিল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কোনো এক ব্যক্তি নিজের বাড়ীতে খাতনার উৎসবে যোগদানের জন্য দাওয়াত করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাতে যোগ দেননি। যখন তাকে সেখানে না যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করা হলো তখন বললেন : “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে আমরা কোনো খাতনার উৎসবে যোগ দিতাম না এবং ডাকাও হতো না।”
এ সুন্নাত অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে পালন করাই উত্তম। যাতে এটা খামাখাই মানুষের উপর বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। অবশ্য শিশুর পিতা যদি সচ্ছল হয় এবং আল্লাহ তাকে এ সুন্নাত পালনের তাওফিক দিয়েছেন এ ধারণায় কিছু লোককে খানা-পিনা করাতে চায় অথবা কিছু মিষ্টি বিতরণ করতে চায় তাহলে তাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু এটা যাতে কোনো প্রথা হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে সবিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।
📄 দুধ মাতার দুধের বিনিময়
দুধ পান করানেওয়ালী মহিলার বিনিময় প্রদানের দায়িত্ব পিতার। যদি পিতা শিশুর মা-কে তালাক দিয়ে থাকে অথবা সে খোলা করিয়ে নেয় তাহলে শিশুকে তার মা'র দুধ পান করানোই উত্তম এবং শিশুকে নিজের দুধ থেকে বঞ্চিত না করাই মা'র উচিত। এ অবস্থায় সন্তানের পিতার উপর মাতার ব্যয়ভার বহন ফরয এবং তার খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি মা না থাকে অথবা কোনো কারণে অন্য কোনো মহিলার দুধ পান করাতে হয় তাহলেও তার বিনিময় প্রদান পিতার শরয়ী দায়িত্ব। যদি পিতার মৃত্যু হয় তাহলে শিশুর দাদা অথবা শিশুর যে কোনো অভিভাবককে দুধ পান করানোর বিনিময় প্রদান দায়িত্ব হবে। পবিত্র কালামে পাকে বলা হয়েছে:
وَالْوَالِدَتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ ، وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ، لَا تُكَلَّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا لَاتُضَارَّ وَالِدَةٌ بِوَلَدِهَا وَلَا مَوْلُودٌ لَّهُ بِوَلَدِهِ وَ وَعَلَى الْوَارِثِ مِثْلُ ذَلِكَ ، فَإِنْ أَرَادَا فِصَالاً عَنْ تَرَاضٍ مِّنْهُمَا وَتَشَاوُرٍ فَلا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا ، وَإِنْ أَرَدتُّمْ أَنْ تَسْتَرْضِعُوا أَوْلَادَكُمْ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِذَا سَلَّمْتُم مَّا أَتَيْتُم بِالْمَعْرُوفِ . وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرُ البقرة : ٢٣٣
"এবং মায়েরা নিজের শিশুদেরকে পূর্ণ দু বছর দুধ পান করাবে। যাদের পিতা পূর্ণ মেয়াদের দুধ পান করাতে চায়, এ অবস্থায় শিশুর পিতাকে সুন্দরভাবে তার খাবার ও কাপড় দিতে হবে। কিন্তু কারোর উপর তার সাধ্যের বাইরে বোঝা আরোপ করা যাবে না। সন্তান মায়ের একথা বলে তাকে কষ্ট দেয়া যাবে না। আবার সন্তান পিতার একথা বলে পিতাকেও কষ্ট দেয়া যাবে না। দুধ পান করানেওয়ালীর এ অধিকার যেমন সন্তানের পিতার উপর রয়েছে তেমনি তার উত্তরাধিকারদের প্রতিও রয়েছে। কিন্তু উভয় পক্ষ যদি পারস্পরিক সম্মতি এবং পরামর্শের ভিত্তিতে দুধ ছাড়াতে চায় তাহলে তাতে কোনো বাধা নেই। তুমি যদি অন্য কোনো মহিলার দুধ পান করাতে চাও তাহলে তাতেও কোনো বাধা নেই। কিন্তু শর্ত হলো দুধের বিনিময় যা নির্ধারিত করবে তা সুন্দরভাবে দেবে। আল্লাহভীতি অবলম্বন করো এবং ইয়াকীন রেখো যা কিছু তুমি করছো আল্লাহ তা অবলোকন করছেন।"-সূরা আল বাকারা: ২৩৩
এ আয়াত থেকে দুধ পান করানো সম্পর্কিত ৭টি মৌলিক নির্দেশ পাওয়া যায়ঃ
এক: মায়েরা নিজের সন্তানদেরকে সাধারণত দু বছর দুধ পান করাবেন।
দুই: যে সকল মা কোনো কারণ বশতঃ পিতা থেকে পৃথক হয়ে গেছেন তারাও নিজের শিশুকে পূর্ণ মেয়াদ দুধ পান করাবেন। হ্যাঁ যদি শিশুর পিতা পূর্ণ মেয়াদ দুধ পান করাতে চান তাহলে এটা করতে হবে।
তিন: দুধ পান করার মেয়াদে শিশুর মা'র খাদ্য ও কাপড়-চোপড়ের খরচ শিশুর পিতাকেই বহন করতে হবে।
চার: শিশুর পিতা যদি না থাকে তাহলে দাদা অথবা যে ব্যক্তিই শিশুর ওয়ালি হবেন তারই দায়িত্ব হবে দুধ খাওয়ানোর বিনিময় প্রদান।
পাঁচ: কারোর উপর তার সাধ্যের বেশী বোঝা আরোপ করা যাবে না। একদিকে মা-কে যেমন উত্যক্ত করা যাবে না যে, সে সন্তানের মমতায় বাধ্য হয়ে দুধ খাওয়াবেই। অতএব, তাকে কম বিনিময় দেয়াই যাবে। আবার পিতার নিকট বেশী বিনিময় দাবী করে তাকে পেরেশানও করা যাবে না।
ছয়: যদি শিশুর মাতা-পিতা পারস্পরিক সম্মতি এবং পরামর্শের ভিত্তিতে দু বছরের পূর্বেই দুধ ছাড়াতে চায় তাহলে কোনো অসুবিধা নেই।
সাত: মা যদি কোনো কারণে শিশুকে নিজের দুধ পান করাতে না চায় তাহলে অন্য মহিলার দুধ খাওয়ানো জায়েয। অবশ্যই তার বিনিময় নির্ধারণ করে সুন্দরভাবে তা আদায় করতে হবে।
এ সাতটি মৌলিক নির্দেশ শুধুমাত্র তিলাওয়াতের জন্য নয়, বরং তা আমলের জন্য প্রদান করা হয়েছে এবং এর উপর তারাই সঠিকভাবে আমল করতে পারে যারা দুটি মৌলিক গুণ নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ আল্লহভীতি এবং আল্লাহ সবকিছু দেখেন এ জ্ঞান ও আস্থা যাদের রয়েছে তারাই সাতটি মৌলিক নির্দেশ পালনে সামর্থ্য।
তাকওয়া বা আল্লাহভীতির অর্থ হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচা এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের আবেগ। অর্থাৎ আল্লাহর ভয়ে এমন কোনো কাজ না করা যাতে তার ক্রোধের কারণ হয় এবং আল্লাহর ভালোবাসায় উদ্দীপ্ত হয়ে আন্তরিকতার সাথে প্রতিটি কাজ করা যা আল্লাহর সন্তুষ্টির অবলম্বন হয়।
আল্লাহ সবকিছু অবলোকনকারী হবার ইয়াকিন বা আস্থা হলো একটি বিরাট ঈমানী শক্তির নাম। এশক্তি একদিকে মানুষকে গাফলতি, বেপরোয়া এবং ভুল পথে চলা থেকে হিফাজত করে থাকে। অন্যদিকে আল্লাহর নিকট থেকে সওয়াব ও পুরস্কার পাবার জন্য স্থায়ীভাবে তৎপর রাখে।