📄 ব্যয়ভার ও দীনি দায়িত্ব
আল্লাহ পাক পিতার অন্তরে পিতৃত্ব সুলভ ভালোবাসার সীমাহীন আবেগ সৃষ্টি করে তার এবং সন্তানের উপর বিরাট ইহসান করেছেন। এ স্বভাবজাত মায়া-মমতা ছাড়া শুধুমাত্র কর্তব্য হিসেবে সন্তানের খরচ বহন করা খুব কঠিন কাজ ছিলো এবং খুব কম মানুষই এ দায়িত্ব পালনে সক্ষম হতো। ফলে সন্তান প্রতিপালন মানব সমাজে এক কঠিন সমস্যায় রূপ নিতো এবং সাধারণত সন্তান প্রতিপালন থেকে বঞ্চিত থাকতো। সন্তানের উপর আল্লাহরও বিরাট ইহসান যে, তিনি মাতা-পিতার অন্তরে স্নেহ ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করে তাদের প্রতিপালনের জন্য অত্যন্ত সুন্দর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।
মুসলমান পিতা সন্তানের ব্যয় ভার সহজাত ভালোবাসার কারণে বহন করে থাকে। কিন্তু সাথে সাথে সে এ ধারণাও করে যে, সন্তান প্রতিপালনের জন্য ব্যয় ভার বহন দীনি দায়িত্বও বটে। আল্লাহ সন্তানের অভিভাবকত্ব করার জন্য তার দায়িত্বে ন্যস্ত করেছেন। সন্তানের ব্যয় ভার বহন করে সে একদিকে যেমন পিতৃত্বের আবেগ পূরণ করে, তেমনি আখেরাতে সে এ উত্তম কাজের অফুরন্ত প্রতিদান পাবার আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর নিকট প্রকাশ করে।
সন্তানের প্রতি স্বভাবজাত ভালোবাসার সাথে সাথে যখন এ শক্তিশালী বিষয় মিলিত হয় তখন সন্তান প্রতিপালনের ব্যয়ভার বহন পরকালীন সফলতার মাধ্যম হয়ে ওঠে। অতএব সন্তান প্রতিপালনে ব্যয়ভার বহনের অর্থ যখন এ সুন্দর লক্ষ্যে সুষমামণ্ডিত হয়ে উঠে তখন এ দায়িত্ব পালন খুব সহজ হয়ে যায়। মুসলমান পিতা পরকালীন মুক্তি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এ দায়িত্বকে ফরয মনে করে আনজাম দিয়ে থাকে। সন্তান প্রতিপালনের জন্য কঠিনতম শ্রম স্বীকার করে এবং বিরাট কুরবানী দিয়ে আল্লাহ তার উপর যে আমানত ন্যস্ত করেছিলেন তা নষ্ট হয়নি বলে সে আনন্দ অনুভব করে। সন্তান প্রতিপালনে অর্থ ব্যয় করে মনে করে যে আল্লাহর নির্দেশে সে আল্লাহর পথে খরচ করেছে।
হযরত আবু মাসউদ-উল-বদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
إِذَا أَنفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ نَفَقَةً يَحْسِبُهَا فَهِيَ لَهُ صَدَقَةٌ - متفق عليه، رياض الصالحين সঃ ১৫২
"যখন কোনো ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান এবং পরকালে সওয়াব পাওয়ার জন্যে পরিবার-পরিজনের উপর ব্যয় করে তাহলে তার এ ব্যয় (আল্লাহর দৃষ্টিতে) সাদকা হিসেবে পরিগণিত হয়।" -বুখারী ও মুসলিম
ইহতিসাবের সাথে কোনো কাজ করার অর্থ হলো শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পরকালীন সওয়াবের জন্য কাজ করা এবং অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তা না করা।
📄 উত্তম আদর্শ
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে যখন সবচেয়ে ছোট ছেলে হযরত ইবরাহীম ভূমিষ্ঠ হলেন তখন তার গোলাম আবু রাফে তাকে এ সুসংবাদ শুনালো। তিনি আনন্দে তৎক্ষণাৎ একটি গোলাম আযাদ করে দিলেন। সাত দিনের দিন আকীকা করলেন এবং শিশুর চুল কাটালেন। তিনি চুলের সমান রৌপ্য আল্লাহর রাস্তায় দান করলেন।
দুধ খাওয়ানোর জন্য আনসারের অনেক মহিলা প্রস্তাব দিলেন। তিনি তাদের মধ্য থেকে খাওলা বিনতে যায়েদ আনসারীকে এ খিদমতের জন্য বাছাই করলেন এবং ইবরাহীমকে তার হাওয়ালা করে দিলেন। এ খেদমতের বিনিময়ে তাঁকে কতিপয় খেজুর বৃক্ষ দেয়া হলো।
📄 আকীকা
সন্তানের আকীকা করা সুন্নাত। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামনিজের সন্তানের আকীকা করেছেন এবং আকীকা করার জন্য অন্যদেরকেও উৎসাহিত করেছেন। কিন্তু এটা আবিশ্যিকভাবে দৃষ্টি রাখতে হবে যে, আকীকা নীরেট একটি মুসতাহাব সাদকা। এটা কোনো আবশ্যিক ফরয নয়। যদি কেউ আকীকা না করে তাহলে তাতে তার কোনো গুনাহ নেই। পিতা যদি সচ্ছল হয়, তাহলে আকীকা করা উত্তম। আকীকা সন্তানের জীবনের সাদকা। আকীকা করায় বালা-মুসিবত দূর হয়ে যায় এবং আপদ-বিপদ থেকে সন্তান রক্ষা পায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
كُلُّ غُلَامٍ رَهِيْنُ بِعَقِيقَتِهِ تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ سَابِعِهِ وَيُسَمَّى فِيْهِ وَيُخْلَقُ رَأْسُهُ - জামে' তিরমিযী
“প্রত্যেক শিশুই আকীকার বিনিময়ে রেহেন পেয়েছে। সপ্তম দিনে তার তরফ থেকে পশু যবেহ করতে হবে। সে দিনই তার নাম রাখতে হবে এবং তার মাথার চুল কাটাতে হবে।”-তিরমিজী
আকীকা প্রকৃতপক্ষে সে পশুকে বলা হয় যা নবজাতকের জন্মের সপ্তম দিনে সাদকা হিসেবে যবেহ করা হয়। সম্ভব হলে পুত্রের পক্ষ থেকে দুটি বকরা অথবা বকরী এবং কন্যার পক্ষ থেকে একটি যবেহ করতে হবে। কিন্তু পুত্রের আকীকা দু বকরী যবেহ করা আবিশ্যক নয়। এক বকরী অথবা এক বকরাও যবেহ করা যায়। বস্তুত এটা হলো সন্তানের জীবনের সাদকা এবং সন্তানের জীবন তার বিনিময়ে রেহেন থাকে। এজন্য আকীকা করা উত্তম কাজ। কিন্তু শর্ত হলো আর্থিক অবস্থা সচ্ছল হতে হবে।
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ قَالَ عَقَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْحَسَنِ بِشَاةٍ وَقَالَ يَا فَاطِمَةُ : اخْلِقِي رَأْسَهُ وَتَصَدَّقِي بِزَنَةِ شَعْرِهِ فِضَّةً فَوَزَنَّاهُ فَكَانَ وَزْنُهُ دِرْهَمَا أَوْ بَعْضَ دِرْهَم - جامع ترمذی
“আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ইবনে আবি তালিব থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেছেন, হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহুর তরফ থেকে আকীকায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বকরী যবেহ করেছিলেন এবং বলেছিলেন ফাতিমা! তার চুল কাটাও এবং চুল ওজন করে সমপরিমাণ রৌপ্য দান করো। আমরা তার চুল ওজন করলাম এবং তা এক দিরহাম অথবা তার থেকে কিছু কম হয়েছিলো।”-তিরমিযী
এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, ছেলের পক্ষ থেকে একটি ছাগল যবেহ করাও জায়েয। আল্লাহ কাউকে সম্পদ দিয়েছেন এবং সে যদি দুটি পশু যবেহ করতে চায় তাহলে সে আনন্দের সাথে তা করতে পারে। কিন্তু এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, ছেলের পক্ষ থেকে দুটি পশু যবেহ করা আবশ্যিক নয়। একটাও করা যায়।
আকীকা জন্মের সপ্তম দিনে করা উচিত। যদি কোনো কারণে সপ্তম দিনে করা না যায় তাহলে চতুর্দশ দিন অথবা একুশতম দিনেও করা যায় এবং তার পরেও করা যায়।
আকীকা একটি সুন্নাত উৎসব। সুন্নাত অনুসরণের নিয়তে অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে এ উৎসব পালন করতে হবে। প্রদর্শনী, গর্ব-অহংকার এবং রসম ও রেওয়াজের বেষ্টনীতে যাতে এ সুন্নাতের রীতি অপবিত্র না হয় তা বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। যারা এ সুন্নাত উৎসবে বিভিন্নমুখী অপচয় করে গান-বাজনার ব্যবস্থা করে তারা নিজেরাও ধোঁকা খায় এবং নিজের রবকেও ধোঁকা দিতে চায়। সুন্নাতের নামে সুন্নাত মিটিয়ে দেয়া জঘন্যতম অপরাধ। এ ধরনের আকীকায় সওয়াব প্রাপ্তির আশাতো দুরূহ ব্যাপার। বরং এ কাজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরে কষ্ট লাগে এবং আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।
📄 খাতনা
খাতনা সকল নবী আলাইহিমাস সালামের সুন্নাত এবং ইসলামী রীতি। হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
الْفِطْرَةُ خَمْسُ الخَتَانُ وَالاسْتِحْدَادُ، وَنَتَفُ الإِبِطِ، وَقَصُّ الشَّارِبِ وَتَعْلِيمُ الأظفار - الادب المفرد ص ۱۸۸
"পাঁচটি কাজ সুন্দর স্বভাবের মধ্যে পরিগণিত। খাতনা করা, নাভির নীচের চুল পরিষ্কার করা, বগলের চুল উঠানো, মোচ কাটা এবং নখ কাটা।"
আল ফিতরাত অর্থ হলো সুন্দর প্রকৃতি বা স্বভাব। অর্থাৎ পাঁচটি বস্তু পবিত্রতার নিদর্শন। এ পাঁচটি জিনিস প্রাচীনকাল থেকে নবীদের সুন্নাত হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। সকল নবীই এগুলো পালন করেছেন এবং সকলের শরীয়াতেই ঐকমত্য হিসেবে তা পালিত হয়েছে।
শিশু যদি খুব দুর্বল না হয় তাহলে জন্মের সপ্তম দিনেই খাতনা করা উচিত। এতে দু ধরনের কল্যাণ রয়েছে। প্রথমত সে সময় শিশুর চামড়া নরম এবং পাতলা থাকে এবং তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে সপ্তম দিনে খাতনার যে ইঙ্গিত রয়েছে তা পালিত হয়। হযরত সালমান বিন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি:
معَ الغُلام عَقِيقَةُ فَاهْرٍ قُوا عَنْهُ دَمًا وَأَمِيطُوا عَنْهُ الْآذِى - بخاری
"শিশু ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথে আকীকাহ। অতপর তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত করো এবং তার থেকে ময়লা ইত্যাদি দূর করো।"-বুখারী
ময়লা ইত্যাদি দূর করার অর্থ হলো চুল কাটানো এবং গোসল করানো ইত্যাদি। কতিপয় আলেমের নিকট খাতনাও এ নির্দেশের মধ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কেননা খাতনাও ময়লা দূর করা এবং পবিত্রতা অর্জনের জন্য।
এজন্য সপ্তম দিনে খাতনা করিয়ে নেয়া দরকার। যদি কোনো কারণে তা না হয় তাহলেও ৪০ দিনের মধ্যে করিয়ে নিতে হবে। অথবা যে কোনো সময় করাতে হবে। এতে কোনো অসুবিধা নেই। অবশ্য দুটি ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে।
প্রথমতঃ খুব বেশী দেরী যেন না হয়ে যায়। সাত বছরের মধ্যে খাতনা করিয়ে নেয়া ভালো। কেননা এরপর চামড়া মোটা হয়ে যায়। ফলে বেশী কষ্ট হয়। দ্বিতীয়তঃ এ সুন্নাতকে বিরাট জাঁকজমক ছাড়া অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে পালন করতে হবে। অবস্থা অনুকূল হলে এ সুন্নাত আদায়ের খুশীতে নিজের বন্ধু-বান্ধবকে দাওয়াত করে খাওয়ানো যায়। কিন্তু একে একটা স্থায়ী উৎসবে পরিণত করা এবং প্রদর্শনীর জন্য খরচ করাকে প্রয়োজন মনে করা ইসলামের প্রকৃতির সাথে মিল খায় না। অকারণে নিজের উপর কোনো কিছুকে আবশ্যক করে নেয়া, অতপর জেরবার হওয়া এবং নিজের জন্য পেরেশানী সৃষ্টি করা শরীয়াতের নাফরমানীর সমতুল্য।
হযরত ওসমান বিন আবিল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কোনো এক ব্যক্তি নিজের বাড়ীতে খাতনার উৎসবে যোগদানের জন্য দাওয়াত করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাতে যোগ দেননি। যখন তাকে সেখানে না যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করা হলো তখন বললেন : “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে আমরা কোনো খাতনার উৎসবে যোগ দিতাম না এবং ডাকাও হতো না।”
এ সুন্নাত অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে পালন করাই উত্তম। যাতে এটা খামাখাই মানুষের উপর বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। অবশ্য শিশুর পিতা যদি সচ্ছল হয় এবং আল্লাহ তাকে এ সুন্নাত পালনের তাওফিক দিয়েছেন এ ধারণায় কিছু লোককে খানা-পিনা করাতে চায় অথবা কিছু মিষ্টি বিতরণ করতে চায় তাহলে তাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু এটা যাতে কোনো প্রথা হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে সবিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।