📄 এক মা’র ঘটনা
নির্ধারিত সময়ের ৬ সপ্তাহ পূর্বেই এক মহিলার শিশু ভূমিষ্ঠ হলো। হাসপাতালের নার্স তার শরীরের উপর কসে পট্টি বাঁধলো। মহিলাটি নার্সকে জিজ্ঞেস করলো, "আপনি এ পট্টি কেন বাঁধলেন।"
নার্স বললো, "আপনার দুধ যাতে না আসে, সেজন্য পট্টি বাঁধা হলো। "কিন্তু আমি তো শিশুকে আমার দুধ খাওয়াতে চাই।" "আপনি আপনার দুধ খাওয়াতে পারবেন না। নার্স বললো, নির্ধারিত সময়ের পূর্বে আপনার শিশু জন্মগ্রহণ করায় দুর্বল হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আপনাকে তার থেকে পৃথক থাকতে হবে।"
ডাক্তার! মহিলাটি নার্সের প্রতি নিরাশ হয়ে বললো, "আপনি আমাকে সাহায্য করতে পারেন? আমি শিশুকে আমার দুধ পান করাতে চাই।"
ডাক্তার ধমকের সুরে বললো, “আপনি জানেন, আপনার সন্তান কিছুদিন আগে ভূমিষ্ঠ হয়েছে।”
"এ কারণেই তো আমি তাকে নিজের দুধ পান করাতে চাই। আমি চাই, ঐ দুর্বল দেহে অবিলম্বে শক্তি সঞ্চার হোক এবং সে জীবিত থাকুক।"
"এ প্রশ্নই উঠতে পারে না।
“আপনি যদি তাকে আপনার দুধ পান করাতে চান, তাহলে আমাদেরকে কিছুর মাধ্যমে আপনার দুধ বের করতে হবে। আপনি কি সে জন্যে প্রস্তুত রয়েছেন?”
মায়ার কারণে মা সে জন্য প্রস্তুত ছিলো। বস্তু একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র দিয়ে তার দুধ বের করা হলো। কোনো কোনো সময় ১১ আউন্স পর্যন্ত দুধ বের হতো। এ দুধ হাসপাতালের অন্য শিশুও পান করতো। যখন মাকে হাসপাতাল থেকে বিদায় করা হলো, তখন শিশুকে সেখানেই রাখা হলো। কারণ তার ওজন ৬ পাউণ্ড থেকে কম ছিলো। মা গৃহে এক পাম্পের সাহায্যে নিজের দুধ বের করে শিশুর জন্য হাসপাতালে প্রেরণ করতে লাগলেন। ইত্যবসরে তার বয়স পাঁচ সপ্তাহ হলো এবং তাকে বাড়ী নিয়ে এলো।
আমাদের ফ্যাশন প্রিয় শ্রেণীতে খুব কম মহিলাই এমন পাওয়া যাবে যে, উল্লিখিত মহিলার মতো শিশুকে নিজের দুধ পান করানোর জন্য পীড়াপীড়ি করে থাকেন। এ মহিলা নিজের বান্ধবীদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখেছিলেন। তিনি জানতেন, বোতলে দুধ পানকারী শিশু সবসময় পেটের ব্যথায় আক্রান্ত থাকে, তার সন্তান নির্ধারিত সময়ের পূর্বে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও খুব শীঘ্র সাধারণ অবস্থায় এসে গেলো এবং প্রথমে যে দুর্বলতা অনুভব করা হয়েছিলো তা অবিলম্বে দূর হয়ে গেলো।
📄 মাতৃদুগ্ধ এবং স্বাস্থ্য
যেসব দেশে সভ্যতার আধুনিক দাবীর প্রেক্ষিতে মায়েরা শিশুকে নিজের দুধ পান করানোয় অনীহা প্রকাশ করছেন সেখানে স্বাস্থ্যের মাপকাঠি নিম্নগামী হচ্ছে এবং সন্তানরা মাতা-পিতার চরিত্র থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
প্রথম দিকে কিছুদিন মায়ের দুধে কোলোস্ট্রাম নামক এক ধরনের বস্তু মিশ্রিত থাকে। এ কোলোস্ট্রাম শিশুর মজবুত জীবনী শক্তি দান করে। তাতে যে পরিমাণ ভিটামিন “এ” পাওয়া যায় পরবর্তীতে তা আর পাওয়া যায় না। তার পরিমাণ আস্তে আস্তে কমে আসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম দিকে মা-কে নিজের দুধ অবশ্যই পান করাতে হবে। শিশু মায়ের পেটে এ ভিটামিন লাভ করে না। সুতরাং জীবনের প্রথম দিকে তাকে তা অবশ্যই পেতে হবে। কোলোস্ট্রাম সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুদেরকে বাইরের জীবাণু আক্রমণ থেকেও রক্ষা করে থাকে।
সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুদের কাশি এবং নিউমোনিয়ার ভয় থাকে। যদি তারা কোলোস্ট্রাম পেতে থাকে তাহলে এ রোগে আক্রান্ত হবার আশংকা কমে যায়। ভূমিষ্ঠ হবার এক মাসের মধ্যে যেসব শিশু মারা যায় তাদের অধিকাংশই কোলোস্ট্রাম ঘাটতিজনিত কারণে মারা যায়।
📄 আধুনিক গবেষণা
গবেষকরা এ ব্যাপারে একমত যে, সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুদেরকে সব ধরনের কষ্ট থেকে নিরাপদ রাখার সর্বোত্তম পন্থা হলো তাদেরকে মায়ের দুধ পান করানো। এ খাদ্য তাদের জন্য ওষুদের প্রয়োজন পূরণ করে। জীবনের প্রথম দিকে শিশুদের যে সকল রোগ হয় তার অধিকাংশ খাবারের কারণেই হয়ে থাকে।
চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, পশুদের ব্যাপারটি মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। গাভীর দুধ তার বাছুরের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কেননা তাকে খুব তাড়াতাড়ি নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতে হয়। মস্তিষ্কের যোগ্যতার তুলনায় শারীরিক শক্তির প্রয়োজন তার একটু বেশী। মানুষের শিশু ভূমিষ্ঠ হবার পর পরই চলা-ফেরা করার প্রয়োজন হয় না। তার মস্তিষ্কের যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। মায়ের দুধ এসব যোগ্যতা অর্জনের জন্য মোক্ষম বস্তু হিসেবে কাজ করে।
মায়ের দুধ চর্বির পরিমাণ থাকে ৪ ভাগ। কিন্তু শীল মাছের দুধে চর্বির পরিমাণ থাকে ৪০ ভাগ। ব্যাপারটি স্পষ্ট। কারণ, শীল মাছের শরীরে শীঘ্রই চর্বির একটি পর্দার প্রয়োজন হয়। এ চর্বির সাহায্যে সে বরফ এবং বরফ যুক্ত পানির শীতলতা মুকাবিলা করে বেঁচে থাকে। পক্ষান্তরে খরগোশের দুধে প্রোটিনের অংশ কিছু বেশী থাকে। মানুষের দুধের চেয়ে ১০ গুণ বেশী। এ কারণেই খরগোশের বাচ্চা তীব্র গতিতে বৃদ্ধি পায়। মাত্র ৬ দিনে তার ওজন ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন থেকে দ্বিগুণ হয়ে যায়। মানব শিশুর ওজন দ্বিগুণ হতে ছ' মাস লাগে। এ হলো প্রকৃতির নিয়ম।
📄 মা’র ছাড়া অন্য দুধ খাওয়ানোর কুফল
আধুনিক ধারণা মতে উচ্চ রক্তচাপ রোগ বেশী বয়সে হয় না। বরং শিশুকালেই তা শুরু হয়। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো গাভীর দুধের বর্ধিত সোডিয়াম। ফ্যাশন প্রিয় জাতির হৃদরোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো মাতৃদুগ্ধ ছাড়া অন্য দুধ পান করা। এক জরিপ অনুযায়ী জানা গেছে যে, আমেরিকায় নিজের দুধ পান করনেওয়ালী মায়ের সংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেছে। বৃটেনের একটি শহরে এ সংখ্যা ৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৩৬ শতাংশ হয়েছে এবং পাঁচ বছরে ফ্রান্সে মায়ের দুধ পান করেনি এমন শিশুর সংখ্যা ৩১ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫১ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তব কথা হলো, প্রকৃতি প্রত্যেক জীবের স্তন্যপায়ী দুধ শুধুমাত্র তার সন্তানের জন্য উপযোগী করে রেখেছে।