📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 মা’র দুধের শরীয়ী ও নৈতিক গুরুত্ব

📄 মা’র দুধের শরীয়ী ও নৈতিক গুরুত্ব


মা'র দুধ শিশুর জন্য প্রাকৃতিক খাদ্য। এ খাদ্য তার জন্য পূর্ণ সুস্থতা ও বলিষ্ঠতা দান করে। কিন্তু তা শুধু শারীরিক খাদ্যই নয় বরং আত্মিক ও নৈতিক খাদ্যও বটে। মাতৃ দুগ্ধ শিশুর অন্তর, আবেগ-অনুভূতি এবং চরিত্র ও কাজের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। মা শিশুকে নিজের দুধ পান করিয়ে শুধুমাত্র সন্তানের পুষ্টিকর খাদ্যই যোগায় না বরং দুধের প্রতিটি ফোটার সাথে নিজের পবিত্র চিন্তা-ভাবনা, মহান আবেগ-অনুভূতি, উঁচু আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং পসন্দনীয় চরিত্র তার শরীর ও আত্মায় প্রবাহিত করে চলেন। প্রকৃতিগতভাবে শিশু মা'র দুধের সাথে সাথে এসব কিছুই শোষণ করতে থাকে। নৈতিক দিক থেকে মা'র দুধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বস্তু। এমনিতেই প্রত্যেক খাদ্যের প্রভাব মানুষের চরিত্র ও কাজের উপর আবশ্যিকভাবে পড়ে। কিন্তু দুধ যেহেতু মানুষের প্রাথমিক খাদ্য এজন্য তার গুরুত্বও বেশী।
কোনো শিশু যদি কোনো কারণে তার আপন মা'র দুধ না পায় এবং তাকে কোনো আজনবী মহিলার দুধ খাওয়াতে হয় তাহলে এটা খেয়াল রাখা উচিত যে, যে মহিলার দুধ খাওয়াবে তার শরীর যেন সুস্থ হয়। পাক-পবিত্রতার দিক থেকেও যেন মহিলাটি সন্তোষজনক হয়। আবেগ-অনুভূতি ও চিন্তার দিক দিয়েও যেন সে পসন্দনীয় হয়। চরিত্র ও কাজের দিক দিয়ে বিশ্বস্ত এবং আদত ও খাছলাতের দিক থেকে ভালো হয়। যাতে শিশু তার নিকট থেকে সুন্দর চরিত্র লাভ করতে পারে।
মায়ের সাথে শিশুর যে অসাধারণ সম্পর্ক ও গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি হয় তার প্রধানতম কারণ হলো দুধ। যেসব মা শিশুদেরকে নিজের দুধ পান করায় না তারা সন্তানের জন্য সে আকর্ষণ অনুভব করে না যা শুধু দুধ পান করানোর কারণেই সৃষ্টি হয়। যদি তারা সন্তানদের সম্পর্কে সম্পর্কহীনতা ও শীতল সম্পর্কের অভিযোগ উত্থাপন করে তাহলে সে জন্যে তারাই দায়ী। কারণ সন্তানের জীবনের প্রথম দু বছরে তারা উত্তপ্ত বুকে লাগিয়ে যখন স্নেহ ভালোবাসা ও আত্মিক সম্পর্ক সঞ্জীবিত করেনি তখন স্বাভাবিকভাবেই পরিণতি এ হবে।
ইসলামী শরীয়াতে দুধের ব্যাপারে শুধু গুরুত্ব স্বীকারই করা হয়নি বরং তাকে এমন গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যে, তার ভিত্তিতে হালাল হারামের আইন প্রণীত হয়েছে।
আরবীতে দুধ খাওয়ানোকে রাদায়াত বলা হয়। ইসলাম এ রাদায়াতকে প্রায় বংশের সমান সমান শ্রদ্ধার যোগ্য মনে করে। কোনো কারণে যদি কোনো শিশু কোনো অপরিচিত মহিলার দুধ পান করে তাহলে সে মহিলার সাথে তার রাদায়াতের সম্পর্ক স্থাপন হয়। দুধ পান করনে ওয়ালী মহিলা তার দুধ মা হয়ে যায়। দুধ মা'র মর্যাদা প্রায় আপন মা'র মতোই হয়। এ দুধ পান করানোর কারণে শুধু মহিলাটিই দুধ মা হয় না বরং তার স্বামী শিশুর দুধ পিতা এবং তার সন্তানসমূহ শিশুর দুই ভাই-বোন হয়ে যায়। শরীয়াতে এ আত্মীয়ের মর্যাদা প্রায় বংশীয় আত্মীয়ের মর্যাদার মতোই হয়। বস্তুত সেসব আত্মীয়ের মধ্যে পারস্পরিক বিয়ে সেভাবেই হারাম হয়ে যায় যেমন রেহেমের আত্মীয়ের মধ্যে হারাম থাকে। কুরআন পাকে ইরশাদ হয়েছে:
وَأُمَّهَاتُكُمُ الَّتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِنَ الرَّضَاعَةِ - النساء : ٢٣ "এবং তোমাদের সেসব মা (তোমাদের জন্য হারাম) যারা তোমাদেরকে দুধ পান করিয়েছেন এবং তোমাদের দুধে অংশীদার বোন সকল।”
অর্থাৎ যে সকল আত্মীয় আপন মাতা-পিতার সম্পর্কের কারণে হারাম হয়ে যায় দুধ মাতা-পিতার সম্পর্কের কারণে তারা হারাম হয়। তারই ভাষ্যকার হিসেবে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিধান বর্ণনা করে বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا حَرَّمَ مِنَ النَّسَبِ - صحيح مسلم "আল্লাহ পাক দুধ খাওয়ানোর কারণেও সে সকল আত্মীয়কে হারাম করে দিয়েছেন যাদেরকে নসবের কারণে হারাম করেছেন।"-মুসলিম
শরীয়াতে দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব এমনভাবে দেয়া হয়েছে যে, যদি কখনো অজ্ঞাত কোনো পুরুষ মহিলার বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু তাদের মধ্যে দুধ খাওয়ানোর সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে এমতাবস্থায় শুধুমাত্র একজন মহিলার স্বাক্ষীতেই সে বিয়ে খতম হয়ে যাবে এবং দুধ খাওয়ানোর সম্পর্ক অবগত হবার পর সে দু ব্যক্তির জন্য এক মুহূর্তের জন্যও স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকাটা বৈধ হবে না।
হযরত উকবাহ বিন হারিস রাদিয়াল্লাহু আনহু এক মহিলাকে বিয়ে করলেন, বিয়ের পর একজন মহিলা আসলেন এবং বললেন, আমি তোমাদের উভয়কেই দুধ পান করিয়েছি। হযরত উকবাহ স্ত্রীর বংশের লোকদের নিকট ঘটনা জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু তারা অজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। অবশেষে হযরত উকবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে সকল ঘটনা খুলে বললেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘটনা শুনে বললেন, এখন তোমরা কি করে এক সাথে থাকতে পারো। হযরত উকবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু সে মহিলাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং সে অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিয়ে করে নিলো। - সহীহ বুখারী

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 দুধ খাওয়ানোর সীমাহীন মূল্য

📄 দুধ খাওয়ানোর সীমাহীন মূল্য


সন্তানকে নিজের দুধ পান করানোর এ অসাধারণ গুরুত্ব এবং বিরাট নৈতিক ও আত্মিক উপকারের প্রক্ষাপটে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যারা দুধ না খাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণের সাথে সাথে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি মুসলমান মহিলাদেরকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, তোমরা অন্তরের টুকরাকে দুধ পান করিয়ে দুনিয়াতেই তার প্রতিদান পাবে না, বরং আখেরাতের জীবনেও তোমাদেরকে অপরিসীম সাওয়াব ও পুরস্কার দেয়া হবে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
وَإِنَّ لَهَا مِنْ أَوَّلِ رَضَعَةٍ تُرْضِعُهُ أَجْرُ حَيَاةِ نَسَمَةٍ - كنز العمال
“এবং মুসলিম মহিলা যে নিজের সন্তানকে দুধের প্রথম ঢোক পান করায়, একটি মানুষের জীবনদানকারীর বরাবর সওয়াব পাবে।” -কানযুল উম্মাল
উপরন্তু দুধ দানকারী মহিলাকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে মুজাহিদের মতো বর্ণনা করেছেন, যে মুজাহিদ আল্লাহর রাস্তায় অব্যাহতভাবে পাহারা দানে রত থাকে। যদি সে মহিলা এ সময়ে মারা যায় তাহলে সে শাহাদাতের সওয়াব পেয়ে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00