📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 সন্তান প্রতিপালনের অর্থ দুটি দায়িত্ব

📄 সন্তান প্রতিপালনের অর্থ দুটি দায়িত্ব


সন্তান প্রতিপালনে মাতা-পিতার দায়িত্ব সমান এবং উভয়ে মিলেমিশেই দায়িত্ব পালন করে থাকে। সন্তান প্রতিপালনের অর্থ হলো দু ধরনের দায়িত্ব পালন করা।
এক: শিশু লালন-পালনের খিদমত।
দুই: শিশু প্রতিপালনে খরচের মাল প্রদান।
প্রথম দায়িত্বের অর্থ হলো শিশুদের প্রবৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টি রাখা এবং তাদের হিফাযত ও তত্ত্বাবধান করা। তাদের স্বাস্থ্য এবং আরামের ব্যবস্থা করা। যতদিন পর্যন্ত তারা খানাপিনার যোগ্য না হবে ততদিন তাদের এ খিদমত করতে হবে। মাতা শিশুকে নিজের দুধ খাওয়াবে এবং তত্ত্বাবধান করবে। দুধ ছাড়ানোর পরও বয়োপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত তার তত্ত্বাবধান, শারীরিক ও নৈতিক প্রয়োজনীয়তার চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। যাতে সে লালিত-পালিত হয়ে মানবীয় দায়িত্বানুভূতি লাভে সক্ষম হয় এবং তার পালনের যোগ্য হয়।
দ্বিতীয় দায়িত্বের অর্থ হলো, ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে বালেগ হওয়া পর্যন্ত সন্তানের সকল খরচ বহন করতে হবে। তার খানাপিনা, পরিধান এবং বাসস্থানের সকল ব্যয় ও তার খিদমত, শরীর-স্বাস্থ্যের তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের যাবতীয় ব্যয় বহন করতে হবে।

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 দায়িত্ব বণ্টন

📄 দায়িত্ব বণ্টন


প্রথম দায়িত্ব অর্থাৎ শিশু প্রতিপালনের খিদমত যদিও মাতা-পিতার উভয়ের মধ্যে তবুও স্বাভাবিকভাবে এর বেশী বোঝা মায়ের উপরই বর্তায়। ইসলামও এ অধিকার মাকেই দান করেছে। এটাও মার দায়িত্ব যে, সে সাধারণ অবস্থায় দু বছর পর্যন্ত নিজের শিশুকে দুধ খাওয়াবে।
দ্বিতীয় দায়িত্ব অর্থাৎ ব্যয় নির্বাহের দায়িত্ব একক পিতার উপর ন্যস্ত। আল্লাহ মাতাকে এ দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন। কারণ সে যাতে সবসময় শিশুদের সাথে থেকে একাগ্রতার সাথে নিজের অংশের দায়িত্ব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে আদায়ে সক্ষম হয়।

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 শিশু প্রতিপালনে মা’র খিদমতই প্রকৃত কৃতিত্ব

📄 শিশু প্রতিপালনে মা’র খিদমতই প্রকৃত কৃতিত্ব


মাতার প্রচেষ্টার প্রকৃত ক্ষেত্র হলো তার গৃহ এবং তার আসল কৃতিত্ব হলো শিশুর দেখাশোনা ও তার প্রতিপালনের সুন্দর সেবা দান। ইসলাম এ খিদমতই তার দায়িত্বে অর্পণ করেছে। এটাই তার সাফল্যের প্রকৃত ময়দান এবং এটাই তার আসল কৃতিত্ব। এ প্রসঙ্গে কিয়ামতের দিন তাকে জবাবদিহি করতে হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا - بخاری، مسلم "মহিলা স্বামীর ঘরের তত্ত্বাবধায়ক এবং জিম্মাদার। যেসব ব্যক্তি ও বস্তুর তত্ত্বাবধায়ক তাকে বানানো হয়েছে সে ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে।"-বুখারী ও মুসলিম
যখনই ও যেখানেই মহিলাকে তার প্রকৃত ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে বাইরের ময়দানে টেনে আনা হয়েছে এবং অস্বাভাবিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়ে সহজাত দায়িত্বের অতিরিক্ত বাইরের দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে তখনই পারিবারিক জীবন ধ্বংস হয়েছে। বাইরের জীবনেও কিয়ামতের মতো বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে এবং সন্তানের জীবনও বিরাণ ও বরবাদ হয়ে গেছে। অথচ এ দায়িত্ব আল্লাহ পাক তাদের উপর অর্পণ করেননি। উন্নতির স্বপ্নিল আকাঙ্ক্ষায় মহিলা দ্বিবিধ দায়িত্ব কবুল করে নিয়েছে।

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 মহিলাদের সবচেয়ে উঁচু মর্যাদার কাজ

📄 মহিলাদের সবচেয়ে উঁচু মর্যাদার কাজ


যেসব দেশে এ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনো শেষ হয়নি, সেসব দেশে মহিলারা অন্তরের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য গলদঘর্ম রয়েছেন এবং সমাজ অন্ধের মতো এ রাস্তায় দৌড়াচ্ছে। কিন্তু যারা এ ভয়াবহ সভ্যতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করেছে তারা তার তেতো ফল ভোগ করছে। তারা কৃতকর্মের উপর লজ্জিত হয়ে ফিরে আসার চিন্তা করছে। আধুনিক যুগের পাশ্চাত্যের মহান চিন্তানায়ক আর্নল্ড টয়েনবি লিখেছেন:
"মানব ইতিহাসের সেসব যুগই পতনের শিকার হয়েছে যে যুগে মহিলা নিজের কদমকে গৃহের চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে গেছে।"
ডঃ জুড লিখেছেনঃ "যদি মহিলারা নিজের গৃহে দেখা-শুনা এবং সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব পালনেই সন্তুষ্ট থাকে তাহলে আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে যে, এ দুনিয়া বেহেশতের প্রতীক হয়ে যাবে।"
সর্বশ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বহু পূর্বেই নিজের উম্মাতকে সাবধান করে দিয়েছিলেন যে, সে যুগ তোমাদের জন্য খুবই খারাপ যুগ হবে, যে যুগে তোমরা বেগমদের করায়ত্তে চলে যাবে এবং তোমাদের সামষ্টিক কাজকর্মের বাগডোর তাদের হাতে ন্যস্ত হবে। উপরন্তু তিনি বলেছেন:
إِذَا كَانَ أُمَرَاؤُكُمْ شِرَارُكُمْ وَأَغْنِيَاؤُكُمْ بُخَلاتُكُمْ وَأَمُرُكُمْ إِلَى نِسَاءِكُمْ فَبَطْنُ الْأَرْضِ خَيْرٌ لَّكُمْ مِنْ ظَهْرِهَا - مشكوة باب تغير الناس
"যখন তোমাদের শাসক এবং দায়িত্বশীলরা খারাপ লোক হবে, তোমাদের ধনীরা বখিল হবে এবং তোমাদের কার্যাবলী বেগমদের উপর ন্যস্ত হবে, তখন জমিনের পিঠের চেয়ে জমিনের কোল তোমাদের জন্যে উত্তম হবে।”-মিশকাত
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলা উম্মাতকে বলেছেন, তোমরা যদি তোমাদের সহজাত দায়িত্ব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পালন করতে থাকা তাহলে তোমরা বেহেশতে আমার সাথে থাকবে। অর্থাৎ তোমাদের সহজাত এবং গৃহের দায়িত্ব আল্লাহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান দায়িত্ব। কোনোভাবেই এ দায়িত্বকে খাটো করে দেখা যাবে না। সে সকল মহিলাইতো সফল যারা নিজেদের এ আসল দায়িত্বকে নিষ্ঠার সাথে পালন করে। সেসব মহিলা কখনই সফল হতে পারে না যারা বাইরের দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি থাকতে চায়। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
أَيُّمَا امْرَأَةٍ قَعَدَتْ عَلَى بَيْتِ أَوْلَادِهَا فَهِيَ مَعِيَ فِي الْجَنَّةِ - كنز العمال
“যে মহিলা নিজের সন্তান দেখা-শুনার জন্যে গৃহে বসে থাকে সে বেহেশতে আমার সাথে থাকবে।"-কানজুল উম্মাল
মহিলাদের জন্য এর চেয়ে বড়ো সৌভাগ্য এবং সফলতা আর কি হতে পারে যে, তারা বেহেশতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থাকবেন। আর এ সৌভাগ্য প্রত্যেক মহিলাই অর্জন করতে পারে যদি সে সন্তান দেখাশুনা ও গৃহের কাজ আনজাম এবং নিজের আসল দায়িত্ব পালন করে।
প্রকৃতপক্ষে মহিলার শারীরিক গঠন, তার বিশেষ পবিত্র আবেগ- অনুভূতি, তার বিশেষ নৈতিক গুণাবলী এবং তার বিশেষ মেযাজ আল্লাহ পাক সে কাজের উপযোগী করেই তৈরি করেছেন। এ স্বভাবজাত কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার থেকে অন্য কাজ নেয়া যুলুম ছাড়া আর কিছুই নয়।
গৃহের কাজকে খারাপ মনে করা, শিশু প্রতিপালনকে অমর্যাদাকর মনে করা এবং বাইরের সামষ্টিক কাজে অংশ নেয়াকে প্রগতি মনে করা একটি ভুল ধারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। ইসলাম কিছু সীমারেখা টেনে আপনাকে সামষ্টিক কাজে অংশগ্রহণের অধিকার অবশ্যই প্রদান করেছে। কিন্তু এ অধিকার আপনাকে প্রদান করেনি যে, আপনি আপনার সহজাত দায়িত্বকে অমর্যাদাকর মনে করবেন এবং তা ত্যাগ করে বাইরের দায়িত্ব পালনকে প্রগতি মনে করবেন। মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নয়ন বলতে এ বুঝায় যে, আপনাকে উন্নত মানব সমাজ গড়তে হবে। আর উন্নত মানব সমাজ গড়তে হলে অত্যাবশ্যক ব্যাপার হলো আপনাকে সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব পালন এবং উন্নত চরিত্র ও পবিত্র স্বভাবের মানুষ তৈরি করতে হবে। কেননা, পবিত্র সমাজ ভালো মানুষ দিয়েই তৈরি সম্ভব। এ কাজ মহিলারা ছাড়া কেউই আনজাম দিতে পারে না। ভালো মানুষ ভালো কোলেই প্রতিপালিত হয়ে থাকে। এ কারণেই ইসলাম আপনার এ কাজকে সবচেয়ে মর্যাদাকর কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আপনার এ কাজ ইসলামের দৃষ্টিতে জিহাদ এবং জিহাদকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীনের শীর্ষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মাআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছেন:
اَلَا أَدُلُّكَ بِرَأْسِ الْأَمْرِ وَعُمُودِهِ وَذُرْوَةِ سَنَامِهِ ؟ قُلْتُ بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ ! قَالَ رَأْسُ الْأَمْرِ الْإِسْلَامُ وَعُمُودُهُ الصَّلوةُ وَذَرُوَةُ سَنَامِهِ الْجِهَادُ - ترمذى
“আমি কি তোমাদেরকে দীনের মাথা, স্তম্ভ এবং তার শীর্ষ সম্পর্কে বলে দেবো? আমি বললাম, অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, দীনের মাথা হলো আনুগত্য করা, তার স্তম্ভ হলো নামায এবং তার শীর্ষ হলো জিহাদ।”
এ শিক্ষার আলোকে আপনি যদি গৃহ দেখাশুনা এবং সন্তান লালন- পালনের কাজে লেগে থাকেন তাহলে আপনি জিহাদের ময়দানে রয়েছেন এবং আল্লাহর দৃষ্টিতে আপনার আর মুজাহিদের মর্যাদা সমান।
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
عَلَيْكُنَّ بِالْبَيْتِ فَإِنَّهُ جِهَادُكُنَّ - مسند احمد ج ۲
“গৃহ দেখাশুনা করা তোমাদের দায়িত্ব। আর এটাই তোমাদের জিহাদের কাজ।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00