📄 প্রতিপালন প্রশ্নে মুসলমান মা’র পার্থক্য
সন্তানের প্রতি মমত্ববোধ এবং তার প্রতিপালনের আবেগ অনুভূতি আল্লাহ পাক সকল মা-কেই দান করেছেন। মুসলমান মা এবং ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ মা উভয়েই সহজাত প্রবৃত্তির অধীন সন্তান প্রতিপালন করে থাকে। কিন্তু উভয়ের ধ্যান-ধারণা, শ্রম দানের কারণ, কর্মপদ্ধতি এবং চেষ্টার প্রভাব ও পরিণতি সম্পর্কে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।
ইসলাম থেকে বঞ্চিত মা সন্তান প্রতিপালন সম্পর্কে যা কিছু চিন্তা করে অথবা চিন্তা করতে পারে তা এ নশ্বর দুনিয়া পর্যন্তই সীমিত। মৃত্যুর সীমানা পার হয়ে তার দৃষ্টি অনন্ত জগত পর্যন্ত প্রসারিত হয় না। নিজের সন্তান হওয়ার কারণে সে তার লালন-পালন করে। তার অন্তরে সন্তানের প্রতি মমত্ববোধের সীমাহীন আবেগ রয়েছে। সন্তান প্রতিপালন দুনিয়ায় একটি উত্তম কাজ এবং এ সহজাত আবেগের কারণেই সে তা করে।
সে এ চিন্তা করে যে, সন্তানের মাধ্যমে তার বংশ টিকে থাকবে অথবা সন্তান বড়ো হয়ে তাকে আরাম ও শান্তি দেবে এবং তার সাহায্যকারী হবে। এ ধ্যান-ধারণার বশবর্তী হয়ে সে নিজের সন্তানকে এমনভাবে প্রতিপালন করে যাতে সে পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে স্বার্থক জীবন-যাপন করতে পারে।
মুসলমান মা-ও সন্তানের প্রতি সীমাহীন মমত্ববোধের কারণে লালন-পালন করে থাকে। সন্তান তার বংশের স্থায়ীত্ব টিকিয়ে রাখার মাধ্যম একথাও সে মনে করে। সে তার জীবনের সাহায্যকারী এবং বার্ধক্যকালীন আশ্রয় স্থল। কিন্তু পার্থক্য হলো যে, সে সন্তান প্রতিপালনকে একটি দীনি দায়িত্ব এবং আখেরাতের মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম মনে করে। উপরন্তু মুসলমান মাতা-পিতা সন্তান প্রতিপালনে নিজেকে ইসলামী হুকুম-আহকামের অধীন করে নেয়। সন্তানের জীবনের লক্ষ্য শুধু দুনিয়ার জীবনে সচ্ছলতা ও আরাম-আয়েশে অতিবাহিত করার জন্য মুসলমান মাতা-পিতা সন্তান প্রতিপালন করে না বরং তারা নিজের অভিভাবকত্বে এমন মুজাহিদ তৈরি করে যাদের দৃষ্টি সুদূর প্রসারী হয় যারা দুনিয়া আল্লাহর মর্জি মুতাবেক জীবন কাটানো এবং আখেরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দুনিয়ায় জীবিত থাকে এবং মারা যায়।
মুসলমান মাতার নিকট সন্তান প্রতিপালনের প্রশ্নটি শুধু পার্থিব দুনিয়ার ব্যাপারই নয়, বরং তার ভালো-মন্দের প্রভাব সে জীবনেও প্রতিভাত হবে যাকে পরকালীন জীবন বলা হয়। আর এ পরকালীন জীবনের উপর সে ঈমান রাখে। তার চিন্তার ধরন এ হয় যে, সে যদি সন্তানকে ইসলামী ধ্যান-ধারণায় গড়ে তোলে এবং ইসলামী নির্দেশ মুতাবেক লালন-পালন করে তাহলে তার পরকালীন জীবন সুন্দর হবে। আল্লাহ তার উপর খুশী হবেন এবং তাকে জান্নাত দান ও পুরস্কারের বারি বর্ষণ করবেন। যদি সে এ দায়িত্ব পালনে দুর্বলতা দেখায় অথবা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী সন্তানদের গড়ে না তোলে তাহলে পরকালে লজ্জিত হবে এবং আখেরাত বরবাদ হয়ে যাবে। আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট হবেন এবং শাস্তি দেবেন।
মাতৃত্বের মমতায় বাধ্য হয়েও মুসলমান মাতা সন্তান প্রতিপালন করেন এবং এ দুনিয়াতেও তার ভালো প্রতিদান চান। কিন্তু সাথে সাথে তার বদলা ও প্রতিদানের সেদিনও প্রত্যাশী হবেন যেদিন এ দুনিয়ার তুলনায় প্রতিদানের বেশী মুখাপেক্ষী হবেন। সে প্রতিদান চিরস্থায়ী হবে।
যে মা ইসলামের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত সে কখনো মুসলমান মায়ের মতো সন্তানের প্রতি ভালোবাসার আবেগ অনুভব করতে পারে না। সহজাত আবেগের সাথে সাথে যদি ঈমানী আবেগ যুক্ত হয় তাহলে স্নেহ ও আন্তরিকতার যে গভীরতা সৃষ্টি হয় তা অমুসলিম মায়ের অন্তরে সৃষ্টি হতে পারে না। উপরন্তু মুসলমান মা'র অন্তরে মৌলিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ধ্যান-ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে যে আনন্দ ও শক্তি সৃষ্টি হয় তা অমুসলিম মায়ের অন্তরে সৃষ্টি হতে পারে না।
এ ধরনের চিন্তা ও কর্মের সবচেয়ে বড় উপকারের দিক হলো যে, সকল প্রচেষ্টা ও কুরবানী সত্ত্বেও যদি সন্তান মায়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অক্ষম হয় তাহলেও সে মা লজ্জিত হন না। তিনি নিরাশও হন না এবং তার কাজেও ভাটা পড়ে না। বরং এ আস্থায় তিনি সবসময় বলীয়ান থাকেন যে, দুনিয়ায় যদি সন্তান তার আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থও হয় তবুও তিনি আল্লাহর নিকট যে বদলা ও প্রতিদানের প্রত্যাশী তা তিনি পূরণ করবেন। কেননা আল্লাহ কখনো বান্দাহর কাজের প্রতিদান নষ্ট করেন না। তিনি বড়ো শক্তিশালী। তিনি বান্দাহর সুন্দর কাজের পুরোপুরি প্রতিদান দেন এবং কখনো বান্দাহকে প্রতিদান থেকে মাহরুম করেন না।
إِنَّ هَذَا كَانَ لَكُمْ جَزَاءً وَكَانَ سَعِيكُمْ مَشْكُورًا الدهر : ٢٢ "এটা তোমাদের জন্য (তোমাদের প্রচেষ্টার) প্রতিদান এবং তোমাদের মেহমান এবং প্রচেষ্টা (আল্লাহর নিকট) কবুল হয় (বেকার হয়ে যায় না)।"-সূরা আদ দাহর: ২২
আল্লাহর কুদরাতের অবস্থা হলো তিনি বান্দাহর নেক আমলে নিজের ফযিলত আরো বৃদ্ধি করে দেন এবং প্রতিদান ও পুরস্কারকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে বান্দাহকে দান করেন। বান্দাহর আমলে যদি কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতিও হয় তবুও তিনি প্রতিদানে কমতি না করে ত্রুটি-বিচ্যুতিকে ক্ষমা করে দেন এবং নিজের ফযিলতের মাধ্যমে প্রতিদান বৃদ্ধি করেন।
۲۳ وَمَنْ يَقْتَرِفْ حَسَنَةً نَّزِدُلَهُ فِيهَا حُسْنًا ، إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ شَكُورٌ - الشورى : "যে কেউ কল্যাণময় কাজ করতে চাইবে আমরা তার জন্য এ কল্যাণে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে দিবো। নিসন্দেহে আল্লাহ বড়োই ক্ষমাশীল ও মূল্যদানকারী।"-সূরা আশ শূরা: ২৩
📄 সন্তান প্রতিপালনের অর্থ দুটি দায়িত্ব
সন্তান প্রতিপালনে মাতা-পিতার দায়িত্ব সমান এবং উভয়ে মিলেমিশেই দায়িত্ব পালন করে থাকে। সন্তান প্রতিপালনের অর্থ হলো দু ধরনের দায়িত্ব পালন করা।
এক: শিশু লালন-পালনের খিদমত।
দুই: শিশু প্রতিপালনে খরচের মাল প্রদান।
প্রথম দায়িত্বের অর্থ হলো শিশুদের প্রবৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টি রাখা এবং তাদের হিফাযত ও তত্ত্বাবধান করা। তাদের স্বাস্থ্য এবং আরামের ব্যবস্থা করা। যতদিন পর্যন্ত তারা খানাপিনার যোগ্য না হবে ততদিন তাদের এ খিদমত করতে হবে। মাতা শিশুকে নিজের দুধ খাওয়াবে এবং তত্ত্বাবধান করবে। দুধ ছাড়ানোর পরও বয়োপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত তার তত্ত্বাবধান, শারীরিক ও নৈতিক প্রয়োজনীয়তার চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। যাতে সে লালিত-পালিত হয়ে মানবীয় দায়িত্বানুভূতি লাভে সক্ষম হয় এবং তার পালনের যোগ্য হয়।
দ্বিতীয় দায়িত্বের অর্থ হলো, ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে বালেগ হওয়া পর্যন্ত সন্তানের সকল খরচ বহন করতে হবে। তার খানাপিনা, পরিধান এবং বাসস্থানের সকল ব্যয় ও তার খিদমত, শরীর-স্বাস্থ্যের তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের যাবতীয় ব্যয় বহন করতে হবে।
📄 দায়িত্ব বণ্টন
প্রথম দায়িত্ব অর্থাৎ শিশু প্রতিপালনের খিদমত যদিও মাতা-পিতার উভয়ের মধ্যে তবুও স্বাভাবিকভাবে এর বেশী বোঝা মায়ের উপরই বর্তায়। ইসলামও এ অধিকার মাকেই দান করেছে। এটাও মার দায়িত্ব যে, সে সাধারণ অবস্থায় দু বছর পর্যন্ত নিজের শিশুকে দুধ খাওয়াবে।
দ্বিতীয় দায়িত্ব অর্থাৎ ব্যয় নির্বাহের দায়িত্ব একক পিতার উপর ন্যস্ত। আল্লাহ মাতাকে এ দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন। কারণ সে যাতে সবসময় শিশুদের সাথে থেকে একাগ্রতার সাথে নিজের অংশের দায়িত্ব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে আদায়ে সক্ষম হয়।
📄 শিশু প্রতিপালনে মা’র খিদমতই প্রকৃত কৃতিত্ব
মাতার প্রচেষ্টার প্রকৃত ক্ষেত্র হলো তার গৃহ এবং তার আসল কৃতিত্ব হলো শিশুর দেখাশোনা ও তার প্রতিপালনের সুন্দর সেবা দান। ইসলাম এ খিদমতই তার দায়িত্বে অর্পণ করেছে। এটাই তার সাফল্যের প্রকৃত ময়দান এবং এটাই তার আসল কৃতিত্ব। এ প্রসঙ্গে কিয়ামতের দিন তাকে জবাবদিহি করতে হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا - بخاری، مسلم "মহিলা স্বামীর ঘরের তত্ত্বাবধায়ক এবং জিম্মাদার। যেসব ব্যক্তি ও বস্তুর তত্ত্বাবধায়ক তাকে বানানো হয়েছে সে ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে।"-বুখারী ও মুসলিম
যখনই ও যেখানেই মহিলাকে তার প্রকৃত ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে বাইরের ময়দানে টেনে আনা হয়েছে এবং অস্বাভাবিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়ে সহজাত দায়িত্বের অতিরিক্ত বাইরের দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে তখনই পারিবারিক জীবন ধ্বংস হয়েছে। বাইরের জীবনেও কিয়ামতের মতো বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে এবং সন্তানের জীবনও বিরাণ ও বরবাদ হয়ে গেছে। অথচ এ দায়িত্ব আল্লাহ পাক তাদের উপর অর্পণ করেননি। উন্নতির স্বপ্নিল আকাঙ্ক্ষায় মহিলা দ্বিবিধ দায়িত্ব কবুল করে নিয়েছে।