📄 মাতা-পিতার প্রতি আল্লাহর ইহসান
সন্তান প্রতিপালন অত্যন্ত কঠিন কাজ। এজন্য সীমাহীন ধৈর্য, ত্যাগ ও কুরবানী, আন্তরিক স্নেহ ও ভালোবাসা প্রয়োজন। আল্লাহ পাক মাতা-পিতার অন্তরে সন্তানের প্রতি অসীম ভালোবাসা সৃষ্টি করে এবং তার প্রতিপালনের শক্তিশালী ইচ্ছা দিয়ে এ কঠিন দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে দিয়েছেন। সন্তান প্রতিপালনকালে বিভিন্নমুখী কষ্ট সহ্য করে মাতা-পিতা কখনই বিতৃষ্ণ ভাব পোষণ করে না বরং এ দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও অন্তরে অন্তরে শান্তি অনুভব করেন। দুঃখ-কষ্ট স্বীকার করে এবং বিভিন্ন ধরনের দুঃখ সয়ে যখন শিশুর দিকে একবার স্নেহের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তখন গৌরব ও খুশীর বান ডাকে। মাতা-পিতার অন্তরে এমন আত্মিক আনন্দ ও খুশীর উদ্ভব হয় যে, প্রতিপালনের শত দুঃখ-কষ্টের অনুভূতি আর অবশিষ্ট থাকে না। শিশুর প্রতি এ অসাধারণ আন্তরিক স্নেহ দিয়ে আল্লাহ পাক মাতা- পিতার প্রতি বড্ড ইহসান করেছেন। এ আবেগ ও উচ্ছ্বাস যদি না হতো তাহলে সম্ভবত সন্তান প্রতিপালনের অধিকার আদায় করা মাতা-পিতার জন্য এক বিরাট পরীক্ষার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতো এবং খুব কমসংখ্যক লোকই এ দুঃখ-কষ্টের কর্তব্য পালনে সক্ষম হতো।
সে দুর্বল ও পরিশ্রান্ত মায়ের কথা চিন্তা করুন যিনি নির্দিষ্ট কয়েক মাস নিজের শরীর ও জীবনী শক্তি ঘুলিয়ে ঘুলিয়ে একটি শিশুর অস্তিত্বের শক্তি দান করেন অতপর নিজের জীবনকে বাজি রেখে একটি নবজাতকের জন্ম দেয়। সেই নবজাতকের কথাই চিন্তা করুন। গোশতের একটি অসহায় টুকরা। না তার আছে কথা বলার শক্তি। আর সে অসুস্থ মা নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে তার প্রতিপালনের কষ্ট হাসিমুখে বরণ করে থাকেন।
📄 সন্তান প্রতিপালন একটি স্বভাবজাত প্রবণতা
শিশুর অব্যাহত ক্রন্দনে সে সামান্যতম অস্বস্তিও অনুভব করে না। সে বার বার পেশাব-পায়খানা করে। শুধু বিছানাতেই নয় বরং প্রায়ই তাঁর শরীর ও কাপড়-চোপড়ে। কিন্তু তাতেও সে কিছু মনে করে না। উপরন্তু শিশুর যদি কোনো কষ্ট হয় তাহলে দুর্বল মা কোলে নিয়ে সারা রাত বিনিদ্র রজনী যাপন করে। এতে সে সামান্যতম কষ্টও অনুভব করে না। বরং বাচ্চাকে কষ্টে দেখে এমনভাবে ছটফট করতে থাকে যে, সম্ভব হলে কষ্ট নিজের উপর নিয়ে শিশুকে আরামদানের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেন। এ অবস্থা পিতারও। পিতা ঘামের আয় এ তুলতুলে শিশুর জন্য খরচ করতে মোটেই দ্বিধা করেন না। তার জন্মের খুশী হোক অথবা আকীকার আনন্দ। সবসময়ই সে আনন্দে আনন্দে নিজের সম্পদ খরচ করে। শরীর ঝলসানো গরমে কষ্ট সহ্য করে, কঠিন লু হাওয়ার বারি খেয়ে, কাঠ ফাটানো রৌদ্রে প্রচণ্ড পরিশ্রম করে এবং রক্ত জমে যাওয়া ঠাণ্ডায় সময়ে অসময়ে দৌড়-ঝাপ পেরে অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে যা কিছু কামাই করে তা সন্তানদের জন্যই কামাই করে। অতপর তা সন্তানদের জন্য খরচ করে অন্তরে কষ্ট পায় না, বরং প্রচণ্ড আত্মিক শান্তি অনুভব করে। মাতা-পিতার অন্তরে যদি সে শিশুর জন্য সীমাহীন স্নেহ-ভালোবাসা ও তার প্রতিপালনের প্রচণ্ড স্পৃহাই না থাকতো তাহলে এসব কেমন করে সম্ভব হতো।
সন্তানের প্রতি ভালোবাসা এবং তার প্রতিপালনের আবেগ একটি সহজাত প্রবৃত্তি। আল্লাহ পাক এ প্রবৃত্তি প্রত্যেক মাতা-পিতার অন্তরেই সৃষ্টি করেছেন। মাতা-পিতা মুসলমান হোক বা না হোক, কোনো ধর্ম বা আল্লাহতে বিশ্বাসী হোক বা না হোক, তাতে কোনো তারতম্য নেই।
মানব বংশের স্থায়ীত্ব এবং এ দুনিয়া আবাদ রাখার অতীব প্রয়োজনেই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সন্তান প্রতিপালনের প্রবৃত্তি এবং স্পৃহা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাক এজন্য কোনো পার্থক্য ছাড়া প্রত্যেক মাতা-পিতাকে সহজাত আবেগ দান করেছেন। স্বাভাবিক কারণেই প্রত্যেক মানুষের মনে সাধ জাগে যে, তারপর তার সন্তান তার স্থান দখল করুক। তার নাম জীবিত রাখুক। তার সহায়-সম্পদের উত্তরাধিকার হোক এবং তার ইতিহাস, তাহজীব এবং নিয়ম প্রথারও উত্তরাধিকার হোক। সন্তান নিজের শরীর এবং আত্মারই একটি অংশ। এজন্য প্রকৃতিগতভাবেই তার জীবন মাতা-পিতার নিকট প্রিয় হওয়া প্রয়োজন। যেসব মানুষ সন্তান প্রতিপালনের এবং তার আবেগ-অনুভূতির সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন তারাও সহজাত স্নেহ-ভালোবাসার অধীন সন্তান প্রতিপালন উত্তম কর্তব্য এবং ভালো কাজ হিসেবেই মনে করে। শিশুর খাতিরে সব ধরনের কষ্ট সহ্য করা এবং অব্যাহত ত্যাগ ও কুরবানীর জন্য একজন মহিলার এ বন্ধনই যথেষ্ট যে, সে শিশুর মা। সে ইসলামের উপর ঈমান আনুক অথবা ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মে বিশ্বাসী হোক অথবা কোনো ধর্ম সম্পূর্ণ নাই মানুক, তাতে কিছু আসে যায় না।
📄 প্রতিপালন প্রশ্নে মুসলমান মা’র পার্থক্য
সন্তানের প্রতি মমত্ববোধ এবং তার প্রতিপালনের আবেগ অনুভূতি আল্লাহ পাক সকল মা-কেই দান করেছেন। মুসলমান মা এবং ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ মা উভয়েই সহজাত প্রবৃত্তির অধীন সন্তান প্রতিপালন করে থাকে। কিন্তু উভয়ের ধ্যান-ধারণা, শ্রম দানের কারণ, কর্মপদ্ধতি এবং চেষ্টার প্রভাব ও পরিণতি সম্পর্কে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।
ইসলাম থেকে বঞ্চিত মা সন্তান প্রতিপালন সম্পর্কে যা কিছু চিন্তা করে অথবা চিন্তা করতে পারে তা এ নশ্বর দুনিয়া পর্যন্তই সীমিত। মৃত্যুর সীমানা পার হয়ে তার দৃষ্টি অনন্ত জগত পর্যন্ত প্রসারিত হয় না। নিজের সন্তান হওয়ার কারণে সে তার লালন-পালন করে। তার অন্তরে সন্তানের প্রতি মমত্ববোধের সীমাহীন আবেগ রয়েছে। সন্তান প্রতিপালন দুনিয়ায় একটি উত্তম কাজ এবং এ সহজাত আবেগের কারণেই সে তা করে।
সে এ চিন্তা করে যে, সন্তানের মাধ্যমে তার বংশ টিকে থাকবে অথবা সন্তান বড়ো হয়ে তাকে আরাম ও শান্তি দেবে এবং তার সাহায্যকারী হবে। এ ধ্যান-ধারণার বশবর্তী হয়ে সে নিজের সন্তানকে এমনভাবে প্রতিপালন করে যাতে সে পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে স্বার্থক জীবন-যাপন করতে পারে।
মুসলমান মা-ও সন্তানের প্রতি সীমাহীন মমত্ববোধের কারণে লালন-পালন করে থাকে। সন্তান তার বংশের স্থায়ীত্ব টিকিয়ে রাখার মাধ্যম একথাও সে মনে করে। সে তার জীবনের সাহায্যকারী এবং বার্ধক্যকালীন আশ্রয় স্থল। কিন্তু পার্থক্য হলো যে, সে সন্তান প্রতিপালনকে একটি দীনি দায়িত্ব এবং আখেরাতের মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম মনে করে। উপরন্তু মুসলমান মাতা-পিতা সন্তান প্রতিপালনে নিজেকে ইসলামী হুকুম-আহকামের অধীন করে নেয়। সন্তানের জীবনের লক্ষ্য শুধু দুনিয়ার জীবনে সচ্ছলতা ও আরাম-আয়েশে অতিবাহিত করার জন্য মুসলমান মাতা-পিতা সন্তান প্রতিপালন করে না বরং তারা নিজের অভিভাবকত্বে এমন মুজাহিদ তৈরি করে যাদের দৃষ্টি সুদূর প্রসারী হয় যারা দুনিয়া আল্লাহর মর্জি মুতাবেক জীবন কাটানো এবং আখেরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দুনিয়ায় জীবিত থাকে এবং মারা যায়।
মুসলমান মাতার নিকট সন্তান প্রতিপালনের প্রশ্নটি শুধু পার্থিব দুনিয়ার ব্যাপারই নয়, বরং তার ভালো-মন্দের প্রভাব সে জীবনেও প্রতিভাত হবে যাকে পরকালীন জীবন বলা হয়। আর এ পরকালীন জীবনের উপর সে ঈমান রাখে। তার চিন্তার ধরন এ হয় যে, সে যদি সন্তানকে ইসলামী ধ্যান-ধারণায় গড়ে তোলে এবং ইসলামী নির্দেশ মুতাবেক লালন-পালন করে তাহলে তার পরকালীন জীবন সুন্দর হবে। আল্লাহ তার উপর খুশী হবেন এবং তাকে জান্নাত দান ও পুরস্কারের বারি বর্ষণ করবেন। যদি সে এ দায়িত্ব পালনে দুর্বলতা দেখায় অথবা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী সন্তানদের গড়ে না তোলে তাহলে পরকালে লজ্জিত হবে এবং আখেরাত বরবাদ হয়ে যাবে। আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট হবেন এবং শাস্তি দেবেন।
মাতৃত্বের মমতায় বাধ্য হয়েও মুসলমান মাতা সন্তান প্রতিপালন করেন এবং এ দুনিয়াতেও তার ভালো প্রতিদান চান। কিন্তু সাথে সাথে তার বদলা ও প্রতিদানের সেদিনও প্রত্যাশী হবেন যেদিন এ দুনিয়ার তুলনায় প্রতিদানের বেশী মুখাপেক্ষী হবেন। সে প্রতিদান চিরস্থায়ী হবে।
যে মা ইসলামের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত সে কখনো মুসলমান মায়ের মতো সন্তানের প্রতি ভালোবাসার আবেগ অনুভব করতে পারে না। সহজাত আবেগের সাথে সাথে যদি ঈমানী আবেগ যুক্ত হয় তাহলে স্নেহ ও আন্তরিকতার যে গভীরতা সৃষ্টি হয় তা অমুসলিম মায়ের অন্তরে সৃষ্টি হতে পারে না। উপরন্তু মুসলমান মা'র অন্তরে মৌলিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ধ্যান-ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে যে আনন্দ ও শক্তি সৃষ্টি হয় তা অমুসলিম মায়ের অন্তরে সৃষ্টি হতে পারে না।
এ ধরনের চিন্তা ও কর্মের সবচেয়ে বড় উপকারের দিক হলো যে, সকল প্রচেষ্টা ও কুরবানী সত্ত্বেও যদি সন্তান মায়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অক্ষম হয় তাহলেও সে মা লজ্জিত হন না। তিনি নিরাশও হন না এবং তার কাজেও ভাটা পড়ে না। বরং এ আস্থায় তিনি সবসময় বলীয়ান থাকেন যে, দুনিয়ায় যদি সন্তান তার আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থও হয় তবুও তিনি আল্লাহর নিকট যে বদলা ও প্রতিদানের প্রত্যাশী তা তিনি পূরণ করবেন। কেননা আল্লাহ কখনো বান্দাহর কাজের প্রতিদান নষ্ট করেন না। তিনি বড়ো শক্তিশালী। তিনি বান্দাহর সুন্দর কাজের পুরোপুরি প্রতিদান দেন এবং কখনো বান্দাহকে প্রতিদান থেকে মাহরুম করেন না।
إِنَّ هَذَا كَانَ لَكُمْ جَزَاءً وَكَانَ سَعِيكُمْ مَشْكُورًا الدهر : ٢٢ "এটা তোমাদের জন্য (তোমাদের প্রচেষ্টার) প্রতিদান এবং তোমাদের মেহমান এবং প্রচেষ্টা (আল্লাহর নিকট) কবুল হয় (বেকার হয়ে যায় না)।"-সূরা আদ দাহর: ২২
আল্লাহর কুদরাতের অবস্থা হলো তিনি বান্দাহর নেক আমলে নিজের ফযিলত আরো বৃদ্ধি করে দেন এবং প্রতিদান ও পুরস্কারকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে বান্দাহকে দান করেন। বান্দাহর আমলে যদি কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতিও হয় তবুও তিনি প্রতিদানে কমতি না করে ত্রুটি-বিচ্যুতিকে ক্ষমা করে দেন এবং নিজের ফযিলতের মাধ্যমে প্রতিদান বৃদ্ধি করেন।
۲۳ وَمَنْ يَقْتَرِفْ حَسَنَةً نَّزِدُلَهُ فِيهَا حُسْنًا ، إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ شَكُورٌ - الشورى : "যে কেউ কল্যাণময় কাজ করতে চাইবে আমরা তার জন্য এ কল্যাণে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে দিবো। নিসন্দেহে আল্লাহ বড়োই ক্ষমাশীল ও মূল্যদানকারী।"-সূরা আশ শূরা: ২৩
📄 সন্তান প্রতিপালনের অর্থ দুটি দায়িত্ব
সন্তান প্রতিপালনে মাতা-পিতার দায়িত্ব সমান এবং উভয়ে মিলেমিশেই দায়িত্ব পালন করে থাকে। সন্তান প্রতিপালনের অর্থ হলো দু ধরনের দায়িত্ব পালন করা।
এক: শিশু লালন-পালনের খিদমত।
দুই: শিশু প্রতিপালনে খরচের মাল প্রদান।
প্রথম দায়িত্বের অর্থ হলো শিশুদের প্রবৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টি রাখা এবং তাদের হিফাযত ও তত্ত্বাবধান করা। তাদের স্বাস্থ্য এবং আরামের ব্যবস্থা করা। যতদিন পর্যন্ত তারা খানাপিনার যোগ্য না হবে ততদিন তাদের এ খিদমত করতে হবে। মাতা শিশুকে নিজের দুধ খাওয়াবে এবং তত্ত্বাবধান করবে। দুধ ছাড়ানোর পরও বয়োপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত তার তত্ত্বাবধান, শারীরিক ও নৈতিক প্রয়োজনীয়তার চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। যাতে সে লালিত-পালিত হয়ে মানবীয় দায়িত্বানুভূতি লাভে সক্ষম হয় এবং তার পালনের যোগ্য হয়।
দ্বিতীয় দায়িত্বের অর্থ হলো, ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে বালেগ হওয়া পর্যন্ত সন্তানের সকল খরচ বহন করতে হবে। তার খানাপিনা, পরিধান এবং বাসস্থানের সকল ব্যয় ও তার খিদমত, শরীর-স্বাস্থ্যের তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের যাবতীয় ব্যয় বহন করতে হবে।