📄 নিষ্পাপ কন্যার হৃদয়বিদারক ঘটনা
বনু তামিম গোত্রে কন্যা জীবিত দাফন করার নির্যাতনমূলক প্রথা একটু বেশীই ছিলো। এ গোত্রের সরদার কায়েস বিন আছেম যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন তিনি নিজের নিষ্পাপ কন্যাকে স্বহস্তে জীবন্ত দাফন করার হৃদয়বিদারক ঘটনা শুনিয়ে বললেন : ....
“ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি সফরে বাইরে গিয়েছিলাম। এ সময় আমার একটি কন্যা সন্তান জন্ম নিলো। আমি বাড়ী থাকলে কণ্ঠস্বর শুনতেই তাকে মাটিতে পুঁতে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিতাম। তার মা যেমন তেমন করে কিছুদিন পাললো। কিছুদিন লালন-পালনের জন্য মায়ের মমতা প্রচণ্ড আকার ধারণ করলো। পিতা তাকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলার এ ধারণায় সে কম্পিত হলো। বস্তুত আমার ভয়ে ভীত হয়ে সে নিজের প্রিয় কন্যাকে তার খালার নিকট পাঠিয়ে দিলো। ধারণা ছিলো যে, সে সেখানে লালিত-পালিত হয়ে যখন বড়ো হবে তখন পিতার অন্তরেও দয়ার উদ্রেক হবে। আমি যখন সফর থেকে বাড়ী ফিরলাম তখন জানতে পেলাম যে, আমার গৃহে মৃত শিশু জন্ম নিয়েছিলো। এভাবেই ঘটনার ইতি ঘটলো। কন্যা খালার কাছে লালিত-পালিত হতে থাকলো। এমনকি সে বেশ বড়ো হলো। আল্লাহর ইচ্ছা, কোনো প্রয়োজনে আমি একদিন বাইরে গেলাম। মা মনে করলো, আজ মেয়ের পিতা বাড়ী নেই। অতএব কন্যাকে বাড়ী নিয়ে আসলে কি অসুবিধা? সুতরাং সে কন্যাকে বাড়ী নিয়ে এলো।
দুর্ভাগ্য, কিছুদিন পর আমিও বাড়ী পৌছে গেলাম। পৌছে দেখি একটি অনিন্দ সুন্দর শিশু কন্যা বাড়ীর এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত দৌড়ে খেলে বেড়াচ্ছে। আমার অন্তরেও এক অজ্ঞাত ভালোবাসা উথলে উঠলো। স্ত্রীও আমার দৃষ্টির অবস্থা দেখে আঁচ করে নিলো যে, সুপ্ত পিতৃস্নেহ জেগে উঠেছে এবং রক্তের প্রভাব রং নিয়েছে। আমি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, নেক বখত! এটা কার বাচ্চা? অত্যন্ত সুন্দর মেয়ে তো!
এ প্রশ্নের জবাবে স্ত্রী সব কাহিনী শুনিয়ে দিলো। আমি অবলীলাক্রমে মেয়েকে গলায় জড়িয়ে নিলাম। মা তাকে বললো, এ তোমার পিতা। মেয়ে আমাকে ঝাপটে ধরলো। পিতার স্নেহ পেয়ে সে এতো আনন্দিত হলো যে, আব্বা আব্বা বলে সে মুখে মুখ লাগাতো এবং যখন সে আব্বা আব্বা বলে দৌড়ে আমার নিকট আসতো তখন আমি তাকে গলায় জড়িয়ে ধরে আশ্চর্য ধরনের শান্তি অনুভব করতাম।
এভাবেই দিন যেতে লাগলো এবং কন্যা স্নেহ-ভালোবাসায় নির্ভাবনায় লালিত-পালিত হতে লাগলো। কিন্তু তাকে দেখে দেখে কখনো কখনো আমি চিন্তা করতাম, তার কারণে আমাকে শ্বশুর হতে হবে। আমাকে এ জিল্লতী বা অবমাননাও সহ্য করতে হবে যে, আমার কন্য কারো বৌ বা স্ত্রী হবে। আমি জনসমক্ষে কি করে মুখ দেখাবো। আমার মান-ইজ্জততো মাটিতে মিশে যাবে। অবশেষে আমার মর্যাদাবোধ আমাকে উচ্চকিত করে তুললো। আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো এবং সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এ অবমাননাকর বস্তু দাফন করেই ছাড়বো। স্ত্রীকে বললাম, কন্যাকে তৈরি করে দাও। তাকে এক দাওয়াতে সাথে করে নিয়ে যাবো। স্ত্রী তাকে গোসল করালো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরালো এবং সাজিয়ে-গুজিয়ে তৈরি করে দিলো। শিশু কন্যাও বাপের সাথে বেড়াতে যাবার আনন্দে টুইটম্বুর। আমি তাকে নিয়ে এক নির্জন জঙ্গলের দিকে রওয়ানা দিলাম। কন্যা মনের আনন্দে নাচতে নাচতে আমার সাথে যাচ্ছিল এবং আমার পাষাণ মনে তখন একই ভাবনা যে, কতো তাড়াতাড়ি এ লজ্জার পুটলীকে মাটিতে পুঁতে ফেলা যায়। তারতো কিছু জানা ছিলো না, নিষ্পাপ কন্যা কখনো আমার হাত ধরে কখনো আমার থেকে আগে দৌড়ে, কখনো আনন্দে আত্মহারা হয়ে কথা বলতে বলতে যেতে লাগলো। অবশেষে আমি এক জায়গায় গিয়ে থেমে গেলাম। অতপর সেখানে গর্ত খোঁড়া শুরু করলাম। শিশু কন্যাতো হয়রান হয়ে গেলো যে, আব্বাজান নির্জন জঙ্গলে গর্ত কেন খুঁড়ছেন এবং জিজ্ঞেস করলো, আব্বা গর্ত কেন খুঁড়ছো। সেতো জানতো না যে, নিষ্ঠুর পিতা তার জন্যই কবর খুঁড়ছে এবং চিরদিনের জন্য তাকে স্তব্ধ করে দেবে। গর্ত খুঁড়ার সময় যখন আমার পা ও কাপড়ের উপর মাটি পড়লো তখন নিষ্পাপ কন্যা নিজের ছোট ছোট ও প্রিয় নাজুক হাত দিয়ে মাটি ঝেড়ে দিলো এবং তোতলা ভাষায় বললো আব্বু তোমার কাপড় নষ্ট হচ্ছে। আমি যখন গভীর গর্ত খোঁড়া শেষ করলাম তখন সে পুতপবিত্র নিষ্পাপ ও হাসিখুশী কন্যাকে উঠিয়ে সে গর্তে নিক্ষেপ করলাম এবং অতি তাড়াতাড়ি করে তার উপর মাটি নিক্ষেপ করতে শুরু করলাম। কন্যাটি আমার দিকে বেদনার্ত হয়ে তাকিয়ে চীৎকার দিয়ে বলতে লাগলো, আব্বাজান, আমার আব্বাজান, এ তুমি কি করছো? আব্বু, তুমি কি করছো? আব্বু আমিতো কিছু করিনি। আব্বু, তুমি কেন আমাকে মাটিতে পুঁতে ফেলছো? এবং আমি বোবা, অন্ধ এবং কালা হিসেবে নিজের কাজ করে যেতে লাগলাম। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার যালেম ও পাষাণ হৃদয়ে কোনো দয়া মায়ার উদ্রেক হলো না এবং কন্যাকে জীবিত দাফন করে আরামের নিশ্বাস টানতে টানতে ফিরে এলাম।
নিষ্পাপ কন্যার উপর এ নির্যাতন এবং তার অসহায়ত্বের বেদনা-বিধূর কাহিনী শুনে রহমাতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তর দুঃখে বেদনার্ত হয়ে গেলো। তাঁর পবিত্র চক্ষু দিয়ে টপটপ করে অশ্রু পড়তে লাগলো। তিনি কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, "এটা চরম পাষাণ হৃদয়ের কাজ। যে মানুষ অন্যের উপর দয়া প্রদর্শন করতে পারে না, আল্লাহ তার উপর কি করে রহম করবে?"
📄 শিক্ষণীয় কাহিনী
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে এক ব্যক্তি নিজের জাহেলী যুগের এক কাহিনী শুনালো এবং তার চিত্র এমনভাবে পেশ করলো যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেদনা বিদুর হয়ে গেলেন।
"ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা অজ্ঞ ছিলাম। আমাদের কোনো খবর ছিলো না। পাথরের মূর্তি পূজা করতাম এবং নিজের প্রিয় সন্তানকে নিজের হাতে মৃত্যুর কুলে নিক্ষেপ করতাম। হে আল্লাহর রাসূল, আমার একটি অত্যন্ত স্নেহের কন্যা ছিলো। আমি যখনই তাকে ডাক দিতাম তখনই সে দৌড়ে আমার নিকট আসতো। একদিন আমি তাকে ডাকলাম। সে খুশীতে টগবগ করতে করতে দৌঁড়ে আমার নিকট এলো। আমি তাকে সাথে নিয়ে চললাম। আমি আগে আগে চললাম। আর সে পিছে পিছে দৌঁড়ে আসতে লাগলো। আমার গৃহ থেকে সামান্য দূরে একটি গভীর কূপ ছিলো। আমি সে কূপের নিকট পৌঁছে থেমে গেলাম। মেয়েটিও আমার নিকটে এসে গেলো। অতপর হে আল্লাহর রাসূল! আমি মেয়েটির হাত ধরে উঠিয়ে সে কূপে নিক্ষেপ করলাম। নিষ্পাপ মেয়ে কূপের ভেতরে চেঁচাতে লাগলো এবং অত্যন্ত দরদমাখা কণ্ঠে আমাকে আব্বা আব্বা বলে ডাকতে লাগলো। ইয়া রাসূলাল্লাহ! জীবনের সর্বশেষ আওয়াজ তার এটিই ছিলো।"
এ দরদভরা কাহিনী শুনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তর বেদনাপ্লুত হয়ে পড়লো এবং চক্ষু দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। এক সাহাবী তাকে গাল-মন্দ দিলেন এবং বললেন, তুমি অহেতুক এ দুঃখজনক কাহিনী শুনিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ব্যথা দিয়েছো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা শুনে বললেন, না তাকে কিছু বলো না। তাকে কিছু বলো না। তার উপর যে মুসিবত অর্পিত হয়েছে তার প্রতিবিধান শুনতে সে এসেছে। অতপর তাকেই সম্বোধন করে বললেন, তুমি পুনরায় তোমার কাহিনী শুনাও। সাহাবী দ্বিতীয়বার সে দুঃখভরা কাহিনী শুনালেন। কাহিনী শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক আশ্চর্যজনক অবস্থার সৃষ্টি হলো। ক্রন্দন করতে করতে তাঁর দাড়ি মোবারক অশ্রুসিক্ত হয়ে গেলো। অতপর তিনি তাঁকে বললেন, "তোমরা ইসলাম গ্রহণ করেছো এর বরকতে জাহেলী যুগের সকল গুনাহ মাফ হয়ে গেছে? যাও এখন ভালো কাজ করো।"-মুসনাদে দারেমী
কত নিষ্পাপ এবং অসহায় মেয়ে এ যুলুমের শিকার হয়েছে এবং কতদিন যাবত মেয়েরা নিজেরা মাতা-পিতার হাতে জীবিত দাফন হয়েছে তা আল্লাহই ভালো জানেন। যদিও সে যুগেও কিছু রহম দিল এবং আল্লাহ প্রেমিক মানুষ অবশ্যই ছিলেন। তারা মেয়েদেরকে এ যুলুম ও বর্বরতার হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের এ ব্যক্তিগত চেষ্টা সে ভয়াবহ প্রথা খতম করতে পারেনি।
📄 মেয়েদেরকে জীবন্ত দাফন থেকে বাঁচানোর শুভ চেষ্টা
ফারাযদাক আরবের একজন প্রখ্যাত কবি ছিলেন। একটি ব্যাপারে তাঁর বড়ো অহংকার ছিলো। তাঁর দাদা হযরত ছা' ছা' কত মেয়েকেই না জীবন্ত দাফন হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। হযরত ছা' ছা' নিজেই নিজের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন:
“একবার আমি আমার দুটি নিখোঁজ উটের সন্ধানে বের হলাম। দূরে আগুন নজরে এলো। কখনো আগুনের শিখা লেলিহান হয়ে উঠতো আবার কখনো তা নিভে যেতো। আমি চিন্তা করলাম গিয়েই দেখি না ঘটনা কি। সম্ভবত কোনো মুসিবতে পতিত মানুষ এ আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে। আমি রওয়ানা দিলাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম যে, কোনো মুসিবত পতিত লোক হলে এবং তার উপকারে আসলে অবশ্যই তার বিপদ দূর করার চেষ্টা চালাবো। কিন্তু আমি দ্রুত উট চালালাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বনী আনমারের মহল্লায় পৌঁছলাম। গিয়ে দেখি, লম্বা চুলওয়ালা এক বৃদ্ধ নিজের গৃহের সামনে বসে শোক প্রকাশ করছে এবং অনেক মহিলা একজন মহিলাকে ঘিরে বসে আছে। এ মহিলাটি প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে। সালাম ও দোয়ার পর পরিস্থিতি জানতে চাইলে তারা আমাকে জানালো যে, তিনদিন যাবত মহিলাটি প্রসব বেদনায় কাতর। বড়ো মিয়ার সাথে একথা হচ্ছিল এমন সময় মহিলারা বলে উঠলো বাচ্চা জন্ম নিয়েছে বৃদ্ধ চেঁচিয়ে উঠলো, পুত্র হলে ভালো। আর যদি কন্যা হয় তাহলে তার আওয়াজ শ্রবণ করতে চাই না। এক্ষণই তাকে হত্যা করবো। আমি অত্যন্ত মিষ্টিভাবে বললাম শেখ! এটা করবেন না। আপনারই কন্যা। বলো, রুজীর প্রশ্ন। তার রুজীদাতা হলেন আল্লাহ। বৃদ্ধ পুনরায় গর্জে উঠলো। না, তাকে জীবিত রাখবো না। তাকে হত্যা করেই ছাড়বো। আমি বিনয়ের সাথে পুনরায় পীড়াপীড়ি করায় তার ভেতর কিছুটা পরিবর্তন ঘটলো এবং বললো, তুমি যদি এতোই রহমদিল হও তাহলে তার মূল্য দাও এবং নিয়ে গিয়ে প্রতিপালন করো। নির্দ্বিধায় বললাম, আমি ক্রয়ের জন্য প্রস্তুত আছি এবং নবজাত কন্যাকে ক্রয় করে খুশীর সাথে ফিরে এলাম এবং আল্লাহর নিকট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলাম যে, এ শিশু কন্যাকে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে পালন করবো। আমি আল্লাহর সাথে এ ওয়াদাও করলাম যে, যখনই কোনো পাষাণ হৃদয় কোনো নিষ্পাপ কন্যাকে হত্যা করতে চাইবে আমি কখনই তা করতে দিবো না। দাম দিয়ে সে কন্যা নিয়ে আসবো এবং অত্যন্ত স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে তাকে লালন-পালন করবো। অতপর এ সিলসিলা অব্যাহত রইলো। অবশেষে আল্লাহ পাক হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করলেন। সে সময় পর্যন্ত, আমি ৯৪জন শিশু কন্যাকে যালেম পিতা-মাতাদের খপ্পর থেকে বাঁচিয়েছিলাম। অতপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ অভিশাপ চিরদিনের জন্য শেষ করে দেন।"
ইসলাম সন্তান হত্যার সকল নির্যাতনমূলক প্রথা থেকে সমাজকে পবিত্র করে এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দার পরিচিত হিসেবে উল্লেখ করে যে, সে আল্লাহর নিকট সন্তানকে চক্ষু শীতলকারী বানিয়ে দেয়ার জন্য দোয়া করে থাকে:
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنِ - الفرقان : ٧٤
"এবং (আল্লাহর বান্দা) সে বলে থাকে যে, হে আমার প্রভু! আমাদের স্ত্রী এবং সন্তানদেরকে আমাদের চক্ষু শীতলকারী বানিয়ে দাও।” -সূরা আল ফুরকান: ৭৪