📄 মা’র আশা-আকাঙ্ক্ষা
যে মহিলা বার বার নিজের জীবনকে বিপদসংকুল করে, শরীর ও জীবনী শক্তিকে ঘুলিয়ে ঘুলিয়ে সন্তান জন্ম দেয় ও লালন-পালন করে সে স্বাভাবিকভাবেই সে সন্তানের নিকট কিছু আশা করে। আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা থাকে যে, তার সন্তানদের ভবিষ্যত শানদার হোক, ভাগ্যবান হোক, খিদমত গুজার হোক, মা'র চিন্তাধারা ও আদর্শ অনুযায়ী উত্তম ভবিষ্যত গঠনকারী হোক, মাতা-পিতার দীন ও সভ্যতার সংরক্ষক হোক, নজীরবিহীন অনুগত হোক। যখন সে অবলোকন করে যে, সন্তানরা তার স্বপ্ন-সাধকে বাস্তবে রূপায়িত করছে ও ইচ্ছানুযায়ী লালিত পালিত হচ্ছে এবং আল্লাহ তাদেরকে উৎকর্ষের চরম পর্যায়ে উত্থিত করেছে তখন তার আনন্দ ও গৌরবের সীমা-পরিসীমা থাকে না।
📄 সন্তানদের সম্পর্কে সাধারণ অভিযোগ
কিন্তু এ সন্তান যাদের খিদমতে দুর্বল মা রাত-দিন ব্যস্ত থেকে শরীর ও জীবনের শক্তি ব্যয় এবং হাত প্রসারিত করে সবসময় দোয়া করে থাকে, তারাই যদি মায়ের স্বপ্ন-সাধ ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দেয় এবং নাফরমান ও বিদ্রোহী হয় তাহলে সে মা'র কি অবস্থা দাঁড়ায়। তার মানসিক ও অন্তরের জ্বালা এবং যাতনা কথা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না।
বর্তমান যুগে কতিপয় ভাগ্যবান পরিবার ছাড়া প্রতিটি পরিবারে একই ক্রন্দন এবং হা-হুতাশ। সকলেরই একই বক্তব্য সন্তানদের অবস্থা অবর্ণনীয়। পুত্র হোক অথবা কন্যা হোক মাতা-পিতার অধিকার সম্পর্কে তারা গাফেল। মাতা-পিতার প্রতি সম্মান ও সম্ভ্রম প্রদর্শন এবং আনুগত্য প্রকাশ একদমই তাদের ধাঁতে নেই। মনে হয় মাতা-পিতার সাথে আচরণ, সন্তুষ্টি, খিদমত, সম্মান প্রদর্শন, আবেগ-অনুভূতির প্রতি দৃষ্টি রাখা ইত্যাদি যেন অর্থহীন কথা। একটি সাধারণ অভিযোগ হলো, সন্তানরা অকৃতজ্ঞ ও বিদ্রোহী হয়ে উঠছে। যে মজলিশেই বসুন, যে গৃহেই যান একই কথা শুনতে পাবেন এবং মাতা-পিতাকে একই ব্যাপারে ক্রন্দনরত দেখতে পাবেন। অতপর কিছু বয়স্ক বৃদ্ধা নিজেদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে থাকবেন, আরে বেটি! আমাদের সময়ে কি সন্তানরা মাতা-পিতার সামনে উঁচু স্বরে কথা বলতে পারতো! এরপর খারাপ পারিপার্শ্বিকতা, রঙিন কাল, ভুল ও খারাপ চিন্তাধারার প্রসার, অশ্লীল সাহিত্য, নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষা ইত্যাদির লম্বা কাহিনী শুরু হয়ে যায়। প্রত্যেক মহিলা এক ধরনের শান্তি অনুভব করে চিন্তা করতে থাকে যে, এ অবস্থায় এছাড়া আর কি হতে পারে। মাতা-পিতার আর কি করণীয় থাকতে পারে। এ পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক।
📄 মাতা-পিতার চিন্তার বিষয়
নিসন্দেহে মাতা-পিতার সামর্থ্যে সবকিছু থাকে না। কিন্তু নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার সামর্থ্য তো তাদের আছে। আল্লাহর দীনের আলোকে নিজেদের কাজ পর্যালোচনা করে দেখতে হবে যে, সন্তানদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও লালন-পালনের ব্যাপারে আল্লাহ মা'র উপর যে দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন তা পালনে কোনো ত্রুটি হচ্ছে নাতো? সন্তানদের ভবিষ্যত জীবন সম্পর্কে আপনাদের আশা-আকাঙ্ক্ষায় কোনো জটিলতা নেই তো? আল্লাহ তাদের যে অধিকার প্রদান করেছেন তা প্রদানে কোনো কমতি করছেন না তো? সন্তানরা তখনই আপনার আশা- আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে যখন আপনিও তাদের অধিকার সম্পর্কে গাফেল না হন। সন্তানকে আপনি যে নৈতিক চরিত্রে বিভূষিত দেখতে চান, যে ধরনের সৌভাগ্যবান, খিদমত গুজার, অনুগত এবং সুন্দর আচরণের অধিকারী আশা করেন তা পূরণ হতে পারে। আপনি যদি সেসব দায়িত্ব অনুভব করেন এবং তনু-মন-ধন দিয়ে তা পূরণ করেন।
সন্তানের অবাধ্যতা এবং বিদ্রোহ নিসন্দেহে দুঃখের ব্যাপার। কিন্তু এটাও চিন্তার বিষয় যে, তাদের এ অবস্থা মাতা-পিতার গাফলতি ও দায়িত্ব সচেতনতার অভাবের ফলশ্রুতি কিনা। সে সন্তান আপনার অধিকার সম্পর্কে কি করে চিন্তা করবে যাকে আপনি অধিকারের অনুভূতিই দেননি। সে সন্তান মাতা-পিতার খিদমত ও সম্ভ্রমের কথা কিভাবে চিন্তা করতে পারে যাকে কোনো সময় বলাই হয়নি যে, মাতা-পিতার খিদমত ও সম্মান করা সন্তানের উপর ফরয। আপনি যদি তাদের আবেগ ও অনুভূতির কথা খেয়াল না করেন তাহলে তারা আপনার আবেগ ও অনুভূতির খেয়াল রাখা কার কাছ থেকে শিখবে। আপনি যদি তাদের ভালো না বাসেন এবং নিজের আচরণ দিয়ে তাদেরকে এটা বুঝিয়ে থাকেন যে, তাদের লালন- পালনের কষ্টের তুলনায় তাদের মৃত্যুই বেশী পসন্দ করেন; তাহলে তারা আপনাকে ভালোবাসা ও আপনার খিদমত করার কথা কিভাবে চিন্তা করবে। আপনি যদি নিজের আরাম-আয়েশের সবকিছু বুঝে থাকেন এবং তাদের প্রয়োজনের কথা ভুলে গিয়ে থাকেন তাহলে আপনার প্রয়োজনের অনুভূতি তাদের কোথেকে আসবে। আপনি যদি সমাজ সংস্কার, সভ্যতা ও সংস্কৃতি গঠনে কোনো বিশেষ আদর্শের ধারক-বাহক হন, তাহলে সে আদর্শের মর্যাদা তাদের অন্তরে প্রতিষ্ঠা না করে তাদেরকে সে আদর্শের ধারক-বাহক কিভাবে হতে বলেন। সন্তানদের নিকট থেকে সে আশাই করুন যার জন্য তাদেরকে তৈরি করেছেন এবং সে ধরনের আচরণই আশা করুন যে ধরনের আচরণ তাদের সাথে করেছেন।
📄 সন্তানের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা
"হযরত নুমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমার পিতা হযরত বশির রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হলেন এবং আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমি নুমানকে অমুক অমুক জিনিস দিয়ে দিয়েছি। একথার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তোমার সকল সন্তানকে এ ধরনের উপঢৌকন দিয়েছো? তিনি জবাবে বললেন, না। সবাইকে তো দেইনি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে অন্য কাউকে সাক্ষী বানাও। অতপর তিনি বললেন, তুমি কি এটা পসন্দ করো না যে, সকল সন্তান তোমার সাথে একই ধরনের নেক আচরণ করুক। বশির রাদিয়াল্লাহু আনহু জবাব দিলেন, কেন নয়। তিনি বললেন, তাহলে এ ধরনের করো না।"-আল আদাবুল মুফরাদ
এ হাদীসের এ অংশ বিশেষভাবে চিন্তা করার মতো। "তুমি কি এটা পসন্দ করো না যে, সকল সন্তান তোমার সাথে একই ধরনের নেক আচরণ করুক।” অর্থাৎ শিশু আপনার আচরণেই শিক্ষাগ্রহণ করে যে, মাতা-পিতার সাথে কি ধরনের আচরণ করতে হবে।
শিশুর চরিত্র ও চাল-চলন গঠনে মাতা-পিতা ছাড়া অন্যান্য কার্যকারণও সক্রিয় থাকে। শিক্ষা, পারিপার্শ্বিকতা, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা এসবই নিজস্ব সীমায় ভাঙ্গা-গড়ার কাজে দায়িত্বশীল। কিন্তু এখানে শুধু মাতা-পিতার সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে। সন্তানদের ব্যাপারে তাদের দায়িত্বাবলী কি এবং তাদের ব্যাপারে সন্তানদের কি কি অধিকার রয়েছে তা আলোচনা করা হবে।
প্রত্যেক মা'ই এটা চায় যে, তার সন্তান তার অন্তরের শান্তি এবং চক্ষু শীতলকারী হোক। দুনিয়া এবং আখিরাতে তার জন্য ইজ্জত ও আরামের মাধ্যম হোক। তার বংশ ও সমাজের জন্য কল্যাণকর হোক। আপনার এ আকাঙ্ক্ষা নিসন্দেহে মর্যাদা পাবার যোগ্য। কিন্তু কোনো আকাঙ্ক্ষাই শুধু দোয়ার মাধ্যমে পূরণ হয় না। আপনাদের দোয়া পবিত্র, আপনাদের আকাঙ্ক্ষাও পবিত্র; কিন্তু শুধু দোয়া ও আকাঙ্ক্ষা দিয়ে কোনো উদ্দেশ্য সফল হওয়া সম্ভব নয়। নিজের দোয়া ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সঠিকভাবে চেষ্টার হক আদায় না করলে তা কখনো সাফল্যের রূপ দেখবে না।
সন্তানের ভালো এবং উন্নত ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা কে না করে থাকে। কোনো মা এ আশা করে যে, তার সন্তান ভ্রষ্ট পথে চলুক? সন্তানের খারাপ কাজ এবং পথভ্রষ্টতায় কার না অন্তরে বাজে। সন্তান যদি লজ্জিত এবং ব্যর্থ হয় তাহলে কোন্ মা'র চক্ষু দিয়ে রক্তের অশ্রু প্রবাহিত না হয়। আর সন্তানের সার্থক ভবিষ্যত দেখে কোন্ মা খুশীতে বাগ বাগ না হয়। কিন্তু শুধু ভালো আবেগ-অনুভূতি দিয়েই উদ্দেশ্য সফল হতে পারে না। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন হলো তাদেরকে অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়া এবং তাদের অধিকার আদায়ের পুরো চেষ্টা করা। আপনি নিজের দায়িত্ব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পালনের পরই সন্তানদেরকে অধিকার আদায়ের শিক্ষা দিতে পারেন। আপনি যদি তাদের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণাই না রাখেন তাহলে আপনি তাদের অধিকার কিভাবে আদায় করবেন।