📄 সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা
সন্তানের সাধ কার না হয়। এমন গৃহ নেই যেখানে সন্তানের চাহিদা নেই। বাস্তব ব্যাপার হলো, সন্তানের উপস্থিতিতে গৃহে বরকত আসে এবং সন্তানই গৃহের শোভা বর্ধন করে। সে গৃহতো শোভা সৌন্দর্যহীন যে গৃহে নিষ্পাপ শিশুদের কল-কাকলি নেই। বিশেষ করে যে গৃহে শিশুর কল-গুঞ্জন থাকে না সে গৃহকে মহিলারা ভীতিপ্রদ বলে মনে করে। মহিলারা তো শিশুর আশায় জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটিয়ে থাকে। কল্পনা রাজ্যে তারা কখন কোল আলোকিত করে শিশুর শুভাগমন ঘটাবে সে জন্য ইনতিজার বা অপেক্ষা করতে থাকে। কখন সে শিশু আম্মু আম্মু বলে ডাকবে তার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠে। শিশুর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের খুশী ও আনন্দ অবলোকের জন্য সে ব্যস্ত হয়। এ খুশীর জন্য সে দিন গুণতে থাকে এবং নিজের আত্মিক আনন্দের বদৌলতে অভ্যন্তরীণ সুস্থতা অনুভব করে। কখনো কখনো সে কল্পনা জগতে প্রাণ প্রিয় সন্তানের সুন্দর বা অসাধারণ সাফল্যমণ্ডিত ভবিষ্যত এবং হাসি-খুশীপূর্ণ বসন্তের কথা চিন্তা করে নিজের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে। অতপর কৃতজ্ঞতার আবেগে আল্লাহর নিকট মস্তক অবনত করে দেয়। সে ভাবতে থাকে যে, তার মতো দুর্বল অস্তিত্বের উপর আল্লাহ কত বড়ো ইহসান করেছেন এবং তার অস্তিত্বকে মানব সমাজের জন্য কতো অমূল্য ও প্রয়োজনীয় হিসেবে চিন্তা করা হয়েছে। আল্লাহ মহিলাদের প্রকৃতিই কিছুটা এমন করে তৈরি করেছেন যে, তারা জীবনটাই সন্তানের জন্য মনে করে এবং সন্তানের জন্য জীবনটা কুরবানী করে অগাধ শান্তি ও খুশী অনুভব করে। একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সে নিজের কলিজার টুকরাকে শরীর ও মনের শরীক রেখে একদিন একদিন করে সময় গুণতে থাকে এবং যখন আল্লাহ পাক নিজের ফযিলতের মাধ্যমে একটি শিশু উপহার দিয়ে তার কোল ভরে দেন এবং তখন স্নেহের দৃষ্টিতে সে নবজাতকের প্রতি দৃষ্টি ফেলে। এ সময় সে চিন্তার জগত থেকে সে সব দুঃখ-কষ্টের চিত্র ঝেড়ে মুছে ফেলে দেয় যা শিশুর জন্মদান পর্যন্ত স্বীকার করে থাকে। অতপর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়। এ পর্যায় হলো শিশুর লালন-পালনের জন্য ত্যাগ স্বীকারের পর্যায়। প্রকৃত ঘটনা হলো, আল্লাহ পাক তার প্রতি মহান সেবার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। এজন্য আল্লাহ পাক উদারতার সাথে, তাদের অসাধারণ আবেগ, দুঃখ-কষ্ট স্বীকারের নজীরবিহীন হিম্মত ও ধৈর্য এবং সন্তান লালন-পালনের জন্য মহিলাদের মধ্যে সুউচ্চ নৈতিক যোগ্যতাবলীও দান করেছেন।
📄 মুসলমান মহিলাদের স্বাতন্ত্র্য
মহিলাদের চিন্তাধারা যদি ইসলামী হয়, তাহলে দুঃখ-কষ্ট সহ্যের প্রতিটি স্তরে সে আল্লাহর পথে জিহাদে লিপ্ত বলে চিন্তা করে থাকে। সর্বোপারি সে মনে করে যে, সে ইবাদাতে মশগুল আছে। ইসলাম প্রতিটি মহিলার অন্তরে এ আস্থা সৃষ্টি করে যে, মহিলাদের এ শারীরিক ও প্রকৃতিগত কাজ, প্রতিদান এবং তার উপকারিতা শুধুমাত্র এ নশ্বর জগতেই সীমাবদ্ধ নয় এবং তার দুঃখ-কষ্ট, ত্যাগ ও কুরবানীর প্রতিটি কাজ আল্লাহর দৃষ্টিতে ইবাদাত ও জিহাদের সমতুল্য। প্রত্যেক মহিলা যারা এসব মুসিবত সহ্য করে এবং সন্তানদের জন্য কুরবানী প্রদান করে প্রকৃতপক্ষে তারা জিহাদে তৎপর এবং আল্লাহর ইবাদাতে ব্যাপৃত থাকে। এ জিহাদ ও ইবাদাতের পার্থিব ফায়দাও আছে। কিন্তু মুসলমান মহিলাদের দৃষ্টি চিরকালীন নেয়ামতসমূহের প্রতিও নিবন্ধ থাকে। আর এ সকল নেয়ামত পরকালীন জীবনে লাভ হবে। মুসলমান মহিলার স্বাতন্ত্র হলো, সন্তানদের জন্য বিভিন্ন দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে, নিজের সাধ-আহলাদ, আবেগ এবং রূপ-যৌবন কুরবানী করে, বদলায় সে শুধু পার্থিব উপকারই লাভ করে না (এ পার্থিব লাভ কখনো হয়, আবার কখনো হয় না) বরং পরকালের চিরকালীন জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভ করবে। জান্নাতও সে জান্নাত যেখানে তার প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ করা হবে। প্রত্যেকটি আবেগ পূরণের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে এবং তাকে এমন রূপ ও যৌবন দান করা হবে যা কখনো নষ্ট হবে না। আর এ রূপ-যৌবন বার্ধক্যের আশংকামুক্ত থাকবে।
ইসলামী ধ্যান-ধারণার একটি উত্তম দিক হলো, মুসলমান মহিলা যদিও সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালনের পর দুর্ভাগ্যবশত পার্থিব মঙ্গল থেকে বঞ্চিতও হয় তাহলেও সে নিরাশ হয় না এবং দায়িত্ব পালনেও কুণ্ঠাবোধ করে না। সে অত্যন্ত হৃষ্টচিত্তে শান্তি ও আন্তরিক আবেগের সাথে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখে। সন্তানদের জন্য সকল ধরনের দুঃখ সহ্য এবং ত্যাগ স্বীকারের পরও যদি সে সন্তানদের নিকট থেকে কোনো সুখ না পায় ও সন্তানরা যদি তার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে ভেঙ্গে খান খানও করে দেয়, তবুও সে নিরাশার শিকারে পরিণত হয়ে নিজের কাজে লজ্জিত হয় না। এ প্রশ্নে ভবিষ্যতের জন্যেও সে ভুল চিন্তা করে না। কেননা সে অবগত যে, মুমিন মহিলার আসল এবং প্রকৃত সাফল্য হলো পরকালীন সাফল্য। একথা ভেবে সে সবসময় সান্ত্বনা পায় যে, আল্লাহ আখেরাতে তার কাজের বদলা দেবেন। আর এ বদলা এতো পরিমাণ হবে যে, তাতে পস্তানোর কোনো প্রশ্নই নেই। সেখানকার প্রতিদান ছিনিয়ে নেয়ারও কোনো আশংকা থাকবে না। এজন্য সারাটা জীবনে সে সকল কাজকে ইবাদাত ও আল্লাহর পথে জিহাদ মনে করে তৎপর থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
الْمَرْأَةُ إِذَا حَمِلَتْ كَانَ لَهَا أَجْرُ الصَّائِمِ الْقَائِمِ الْمُخْبِتِ الْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَإِذَا ضَرَبَهَا الطَّلَقُ فَلَا تَدرِى الْخَلَائِقُ مَا لَهَا مِنَ الْأَجْرِ وَإِذَا وَضَعَتْ كَانَ لَهَا بِكُلِّ مَضَةٍ أَوْرَضْعَةٍ أَجْرُ نَفْسٍ تُحْيِيهَا وَإِذَا أَفْطَمَت ضَرَبَ الْمَلِكِ عَلَى مَنْكَبِهَا وَقَالَ إِسْتَائِفِي الْحَمَلَ - كنز العمال
"মহিলা যখন আশায় থাকে, তখন গর্ভ ধারণের পুরো সময়টাই সে প্রতিদান ও সওয়াব পায় যেমন সওয়াব ও প্রতিদান একজন রোযাদার, রাত জাগরণকারী, আনুগত্যকারী এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী বান্দাহ পেয়ে থাকে। এবং শিশু ভূমিষ্ঠ হবার সময়কার কষ্টের বিনিময়ে যে প্রতিদান ও সওয়াব তা আন্দাজ সৃষ্টজীব করতে পারে না। সে সওয়াব যে কি এবং কতো তা ধারণাই করা যায় না। মহিলার চীৎকারের পর যখন শিশু জন্ম নেয় (এবং সে তাকে নিজের দুধ পান করিয়ে পালন করে) তখন দুধের প্রতিটি ঢোকে সে সেই সওয়াব ও প্রতিদান পায় যা একজনকে জীবনদানের জন্য পাওয়া যায়। এবং যখন (নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দুধ পান করিয়ে) দুধ ছাড়ানো হয় তখন আল্লাহর ফেরেশতা (সম্মান ও ভালোবাসায়) তার কাঁধে হাত রেখে তাকে বলতে থাকে (আল্লাহর দাসী!) এখন দ্বিতীয়বার গর্ভ ধারণের জন্য প্রস্তুতি নাও।"
📄 মা’র আশা-আকাঙ্ক্ষা
যে মহিলা বার বার নিজের জীবনকে বিপদসংকুল করে, শরীর ও জীবনী শক্তিকে ঘুলিয়ে ঘুলিয়ে সন্তান জন্ম দেয় ও লালন-পালন করে সে স্বাভাবিকভাবেই সে সন্তানের নিকট কিছু আশা করে। আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা থাকে যে, তার সন্তানদের ভবিষ্যত শানদার হোক, ভাগ্যবান হোক, খিদমত গুজার হোক, মা'র চিন্তাধারা ও আদর্শ অনুযায়ী উত্তম ভবিষ্যত গঠনকারী হোক, মাতা-পিতার দীন ও সভ্যতার সংরক্ষক হোক, নজীরবিহীন অনুগত হোক। যখন সে অবলোকন করে যে, সন্তানরা তার স্বপ্ন-সাধকে বাস্তবে রূপায়িত করছে ও ইচ্ছানুযায়ী লালিত পালিত হচ্ছে এবং আল্লাহ তাদেরকে উৎকর্ষের চরম পর্যায়ে উত্থিত করেছে তখন তার আনন্দ ও গৌরবের সীমা-পরিসীমা থাকে না।
📄 সন্তানদের সম্পর্কে সাধারণ অভিযোগ
কিন্তু এ সন্তান যাদের খিদমতে দুর্বল মা রাত-দিন ব্যস্ত থেকে শরীর ও জীবনের শক্তি ব্যয় এবং হাত প্রসারিত করে সবসময় দোয়া করে থাকে, তারাই যদি মায়ের স্বপ্ন-সাধ ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দেয় এবং নাফরমান ও বিদ্রোহী হয় তাহলে সে মা'র কি অবস্থা দাঁড়ায়। তার মানসিক ও অন্তরের জ্বালা এবং যাতনা কথা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না।
বর্তমান যুগে কতিপয় ভাগ্যবান পরিবার ছাড়া প্রতিটি পরিবারে একই ক্রন্দন এবং হা-হুতাশ। সকলেরই একই বক্তব্য সন্তানদের অবস্থা অবর্ণনীয়। পুত্র হোক অথবা কন্যা হোক মাতা-পিতার অধিকার সম্পর্কে তারা গাফেল। মাতা-পিতার প্রতি সম্মান ও সম্ভ্রম প্রদর্শন এবং আনুগত্য প্রকাশ একদমই তাদের ধাঁতে নেই। মনে হয় মাতা-পিতার সাথে আচরণ, সন্তুষ্টি, খিদমত, সম্মান প্রদর্শন, আবেগ-অনুভূতির প্রতি দৃষ্টি রাখা ইত্যাদি যেন অর্থহীন কথা। একটি সাধারণ অভিযোগ হলো, সন্তানরা অকৃতজ্ঞ ও বিদ্রোহী হয়ে উঠছে। যে মজলিশেই বসুন, যে গৃহেই যান একই কথা শুনতে পাবেন এবং মাতা-পিতাকে একই ব্যাপারে ক্রন্দনরত দেখতে পাবেন। অতপর কিছু বয়স্ক বৃদ্ধা নিজেদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে থাকবেন, আরে বেটি! আমাদের সময়ে কি সন্তানরা মাতা-পিতার সামনে উঁচু স্বরে কথা বলতে পারতো! এরপর খারাপ পারিপার্শ্বিকতা, রঙিন কাল, ভুল ও খারাপ চিন্তাধারার প্রসার, অশ্লীল সাহিত্য, নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষা ইত্যাদির লম্বা কাহিনী শুরু হয়ে যায়। প্রত্যেক মহিলা এক ধরনের শান্তি অনুভব করে চিন্তা করতে থাকে যে, এ অবস্থায় এছাড়া আর কি হতে পারে। মাতা-পিতার আর কি করণীয় থাকতে পারে। এ পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক।