📄 মুশরিক মা সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ رَض قَالَتْ : قَدِمَتْ عَلَى أُمِّي وَهِيَ مُشْرِكَةً فِي عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاسْتَفْتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْتُ : قَدِمَتْ عَلَى أُمِّي ، وَهِيَ رَاغِبَةً أَفَاصِلُ أُمِّي ؟ قَالَ : نَعَمُ صلى أُمَّكَ - بخاری
"হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু দুহিতা হযরত আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুবারক যুগে আমার মাতা মুশরিক অবস্থায় আমার নিকট এসেছিলেন। আমি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আরজ করলাম, আমার মা এসেছেন। অথচ তিনি ইসলামের উপর বেজার। আমি কি তার সাথে আত্মীয়তাজনিত ব্যবহার করতে পারি? তিনি বললেন, হাঁ। নিজের মা'র সাথে আত্মীয়তাজনতি ব্যবহার করতে পারো।"-বুখারী
এ হাদীসটি থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মুশরিক মাতা-পিতার সাথেও তেমনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে যেমন মুসলিম মাতা-পিতার সাথে রাখতে হয়। পার্থিব বিষয়াদিতে তাঁদের মান-সম্মান ও খিদমতের প্রতি অবশ্যই দৃষ্টি রাখতে হবে এবং সকলভাবে তাঁদের আরাম দিতে হবে। কিন্তু একজন মুমিন হিসেবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, মাতা- পিতার প্রতি সবচেয়ে বড়ো শুভ আকাঙ্ক্ষা এবং সুন্দর আচরণ হলো নিজের চরিত্র, আচরণ, আলাপ-আলোচনা এবং খিদমতের মাধ্যমে তাঁদেরকে ইসলামের দিকে অগ্রসর করার অব্যাহত প্রচেষ্টা চালানো। তাঁদের হেদায়াতের জন্য মন খুলে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর নিকট দোয়া করা। হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর আম্মাও প্রথমে ইসলাম থেকে মাহরুম ছিলেন। কিন্তু তিনি তার মান-সম্মান প্রদর্শন এবং খিদমতে কোনো কমতি করেননি। সবসময় তাঁর সাথে সুন্দর আচরণ করতে থাকেন এবং ইসলামের দাওয়াতও দিতে থাকেন। সবসময় আল্লাহর নিকট দোয়া করতে থাকেন যে, তিনি যেন হেদায়াত প্রাপ্তা হন। তার এ ঘটনায় স্পষ্টভাবে একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আল্লাহ না করুন কারো মাতা- পিতা যদি অমুসলিম হন, তাহলে তাঁদের সাথে কিভাবে থাকবেন, কিভাবে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা যাবে, কিভাবে তাঁদের সাথে ভালো ব্যবহার ও তাঁদের শুভ কামনা কিভাবে পূরণ করা যাবে।
📄 ইসলাম অস্বীকারকারী মা’র সাথে সুন্দর আচরণের ফল
হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসলমান হবার পর দীর্ঘদিন যাবত তাঁর আম্মা শিরকে নিমজ্জিত ছিলেন। তিনি অব্যাহতভাবে তাঁকে শিরকের পরিণাম এবং ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দিতে থাকেন। কিন্তু যেহেতু তখন পর্যন্ত তাঁর অন্তর হিদায়াত গ্রহণের জন্য খোলেনি, এজন্য তিনি অস্বীকৃতিও অব্যাহত রেখেছিলেন। এ সত্ত্বেও হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ইজ্জত, খিদমত ও আনুগত্যে কমতি করেননি। একদিন যখন তিনি দীনের দাওয়াত পেশ করছিলেন তখন তাঁর আম্মা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে অন্যায় আচরণ করলো।
এতে হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর অন্তর বেদনা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো এবং ক্রন্দনরত অবস্থায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি সবসময় আমার আম্মাকে দীনের কথা বুঝিয়ে থাকি। কিন্তু সে সবসময়ই তা অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু আজ তো গজবই হয়ে গেছে। আজ আমি যখন তার সামনে দীনে তাওহীদের দাওয়াত পেশ করছিলাম তখন তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে আপনার শানে বেয়াদবিই করে বসেন এবং আপনাকে গালমন্দ দিয়ে ফেলেছেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তা সহ্য করতে পারিনি। আমার অন্তর বেদনা বিধূর হয়ে এলো এবং আমার চক্ষু দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আল্লাহর রাসূল! দোয়া করুন, আল্লাহ যেন আমার আম্মার অন্তর ইসলামের জন্য খুলে দেন।" রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তৎক্ষণাত দোয়ার জন্য হাত উঠিয়ে বললেন, “হে আল্লাহ! আবু হুরাইরারর আম্মাকে হেদায়াত দিন।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দোয়া করতে দেখে আমার সকল দুশ্চিন্তা দূর হতে থাকলো এবং আনন্দিত হয়ে সেখান থেকে ফিরে এলাম। বাড়ী পৌঁছে দেখি ঘরের দরজা বন্ধ এবং পানি পড়ার শব্দ আসছে। আমার পায়ের শব্দ শুনে ভেতর থেকে শ্রদ্ধেয় আম্মা বললেন, পুত্র! বাইরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো। বাইরেই আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। পানি পড়ার শব্দ শুনেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে, আম্মাজান গোসল করছেন। আমার অন্তর তখন আনন্দে আত্মহারা! আম্মাজান তাড়াতাড়ি গোসল শেষ করে কাপড় পরে এসে দরজা খুলে দিলেন। তিনি এতো তাড়াতাড়ি করেছিলেন যে, দোপাট্টা ব্যবহার করতেও ভুলে গিয়েছিলেন এবং দরজা খুলেই বললেন, পুত্র আবু হুরাইরা! আল্লাহ তোমার কথা শুনেছেন। তুমি সাক্ষী থেকো। আমি কালেমা পড়ছি। "আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।” আমি এতো আনন্দিত হয়েছিলাম যে, আনন্দে আমার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিলো। চোখে আনন্দাশ্রু সমেত সেই সময়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে সুসংবাদ শুনাতে এসেছি। আল্লাহ তার প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দোয়া কবুল করেছেন এবং আমার আম্মা ঈমানের সম্পদ লাভ করেছেন। একথা শুনে তিনিও খুব খুশী হলেন। আল্লাহর হামদ বা প্রশংসা করলেন এবং আমাকে কয়েকটি নসিহত করলেন।
অতপর আমি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আরো একটি বিষয় নিবেদন করলাম। বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! দোয়া করুন, আল্লাহ যেন আমাকে এবং আমার আম্মাকে সকল মুমিনের প্রিয় বানিয়ে দেন এবং সকল মুমিন আমার ও আমার আম্মার প্রিয় হয়ে যায়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে দোয়াও করলেন। পরওয়ারদিগার! তুমি আবু হুরাইরা ও তার আম্মার প্রতি ভালোবাসা সকল মুমিনের অন্তরে দাও এবং তাদের উভয়ের অন্তরে সকল মুসলমানের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করো।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ মকবুল দোয়ার পর যে মুসলমানই আমাকে দেখেছে অথবা আমার কথা শুনেছে সেই আমাকে ভালোবেসেছে।