📄 শিক্ষণীয় কথোপকথন
একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে অভিযোগ করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা খারাপ মেযাজের মানুষ। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: 'ন মাস পর্যন্ত অব্যাহতভাবে যখন সে তোমাকে পেটে ধারণ করে ঘুরে বেড়িয়েছে, তখনতো সে খারাপ মেযাজের ছিলো না।" সেই ব্যক্তি বললো, "হযরত! আমি সত্য বলছি সে খারাপ মেযাজের।"
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: "তোমার খাতিরে সে যখন রাতের পর রাত জাগতো এবং নিজের দুধ পান করাতো, সে সময়তো সে খারাপ মেযাজের ছিলো না।"
সেই ব্যক্তি বললোঃ "আমি আমার মাতার সেই সব কাজের প্রতিদান দিয়ে ফেলেছি।"
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন: “তুমি কি সত্যিই প্রতিদান দিয়ে ফেলেছ?"
সে বললোঃ "আমি আমার মাকে কাঁধে চড়িয়ে তাঁকে হজ্জ করিয়েছি।" প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিদ্ধান্তমূলক জবাব দিয়ে বললেন: “তুমি কি তাঁর সেই কষ্টের বদলা বা প্রতিদান দিতে পারো, যা তোমার ভূমিষ্ঠ হবার সময় সে স্বীকার করেছে?"
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَض قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ! مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي، قَالَ أُمُّكَ قَالَ ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ أُمُّكَ : قَالَ : ثُمَّ مَنْ قَالَ : أُمُّكَ - قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ أَبُوكَ -
"হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সুন্দর আচরণের সবচেয়ে বেশী হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে জিজ্ঞেস করলো, অতপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে জিজ্ঞেস করলো, অতপর কে? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, তোমার মা। সে বললো, অতপর কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা।"
এ হাদীস সুস্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, সুন্দর আচরণ, খিদমত এবং আনুগত্য প্রাপ্তির দিক থেকে মাতার মর্যাদা পিতার থেকে বেশী। সাহাবী বার বার একই প্রশ্ন করলেন। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ একই জবাব দিতে থাকলেন যে, তোমাদের মাতাই তোমাদের সুন্দর আচরণ প্রাপ্তির বেশী যোগ্য। চতুর্থবারে তিনি বললেন, তোমাদের নেক আচরণের যোগ্য তোমাদের পিতা। হযরত ইবনে বাত্তাল অত্যন্ত সুন্দর কথা বলেছেন, খিদমত ও আচরণে মাতার হক পিতার থেকে তিন গুণ বেশী। কেননা শিশুর ক্ষেত্রে মাতা এমন তিনটি কাজ আনজাম দেন যা কোনো পিতার পক্ষে চিন্তা করাও দুষ্কর। গর্ভাবস্থায় মাতা শিশুকে পেটে ধারণ করে নিয়ে বেড়ায়। অতপর জন্মদানের কষ্ট স্বীকার করেন এবং নিজের দুধ পান করান। পবিত্র কুরআনেও তাঁর এ তিন গুরুত্বপূর্ণ খিদমত ও কষ্টের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করানো হয়েছে। অতপর প্রশিক্ষণ ও লালন পালনে মাতা-পিতা উভয়েই সমান সমান। এজন্য উভয়ের সাথে সুন্দর আচরণের তাকিদ এবং হেদায়াত দিয়ে বলা হয়েছে যে, দুজনের সাথেই আদব, তাজিম, খিদমত, আনুগত্য ও বিনয়মূলক আচরণ করতে হবে। জমহুর উলামা বা অধিকাংশ আলেম এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, মাতার হক পিতার চেয়ে বেশী। কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে, সর্বসময় মাতার খিদমত এবং আনুগত্য এবং পিতার প্রতি ভ্রূক্ষেপও করতে হবে না। আদব শিষ্টাচার প্রশ্নে পিতাই বেশী হকদার এবং পিতার থেকে সম্পর্কহীন হয়ে যাওয়া কোনোক্রমেই সঠিক নয়। উভয়ের সাথেই সুন্দর আচরণের তাকিদ দেয়া হয়েছে। অবশ্যই কর্মক্ষেত্রে একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, মাতার দুর্বল প্রকৃতিই বেশী ইহসানের দাবীদার। আর এ ইহসানের দাবীই হলো মাতাকে বেশী বেশী আরামের ব্যবস্থা করা। মাতার আনুগত্যে কখনো কমতি করা যাবে না। তার মমতাভরা অন্তরে কখনো দুঃখ দেয়া যাবে না। মাতা যেমন সন্তানের শৈশবকালে সব ধরনের আবেগের প্রতি খেয়াল রাখেন তেমনি কোনো সময়ই তাঁর আবেগের অমর্যাদা করা যাবে না।
📄 মাতার মমতার প্রতি খেয়াল রাখা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে একজন সাহাবী কোনো কথার কারণে নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং শিশু সন্তানকে তার কাছ থেকে নিয়ে নিতে চাইলেন। মায়ের অবস্থা হয়ে দাঁড়ালো নাজুক। একদিকে স্বামীর নিকট থেকে বিচ্ছিন্নতার দুঃখ, অন্যদিকে কলিজার টুকরা এবং দুশ্চিন্তা হরণকারী সন্তানও ছিনিয়ে নেয়ার মতো অবস্থা। দুঃখ ভারাক্রান্ত ও পেরেশান মনে সে রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হলো এবং নিজের সমগ্র দুঃখপূর্ণ কাহিনী অত্যন্ত দরদপূর্ণ ভাষায় ব্যক্ত করলো। সে বললো:
“হে আল্লাহর রাসূল! আমার স্বামী আমাকে তালাক দিয়েছেন। এভাবে আমি তার অভিভাবকত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছি। হে আল্লাহর রাসূল! এখন তিনি আমার নিকট থেকে এ শিশু সন্তানও ছিনিয়ে নিতে চান। হে আল্লাহর রাসূল! হে রহমতে আলম! এটা আমার আদরের সন্তান। আমার গর্ভ তার আরামস্থল। আমার বুকের ছাতি তার পানের মশক এবং আমার কোল তার ঘরসদৃশ। সে আমার আরামের আধার। সে আমার জন্য কূপ থেকে পানি আনে। হে আল্লাহর রাসূল! আমি এ দুঃখ কি করে বরদাশত করবো।"
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, লটারী করে নাও। পিতা অগ্রসর হয়ে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! এটাতো আমার বাচ্চা। আমার সন্তানের দাবীদার আর কে হতে পারে! নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশু ছেলেটিকে সম্বোধন করে বললেন, ইনি তোমার পিতা এবং ইনি তোমার মাতা। বেটা! যাকে ইচ্ছা তার হাত ধর। ছেলেটা মায়ের হাত ধরলো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছেলেটির মাকে বললেন, যাও। যতদিন তোমার দ্বিতীয় বিয়ে না হবে ততদিন কেউ তাকে তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
📄 মাতার আদেশের প্রতি খেয়াল রাখা
হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনকালে খেজুরের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছিলো। একদিন মানুষজন দেখলো যে, হযরত উসামাহ ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু খেজুরের গাছ কেটে মাথি বের করছেন। এতে সকলেই আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো : হযরত! এ আক্রার বাজারে আপনি এভাবে খেজুরের গাছটি নষ্ট করছেন। আজকালতো খেজুরের গাছ অত্যন্ত মূল্যবান বস্তু। তিনি বললেন, "ভাইসব! তোমাদেরকে কি বলবো। আমার মা আমাকে খেজুর গাছের মাথি নেয়ার আদেশ করেছেন। মায়ের আদেশ কি কখনো অবজ্ঞা করা যায়?"
📄 মাতার প্রতি আদব প্রদর্শন
হযরত মুহাম্মদ ইবনে শিরীন রাহমাতুল্লাহ আলাই একজন মশহুর তাবেয়ী। তাঁকে ফিকাহ ও হাদীসের ইমাম হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর মাতা হিজাজের অধিবাসী ছিলেন। তিনি মাতার আদব ও সম্মান এবং ইচ্ছার প্রতি খুব খেয়াল রাখতেন। যখন মায়ের জন্য কাপড় কিনতেন তখন নরম ও সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টি রাখতেন। ঈদের জন্য নিজের হাতে মায়ের কাপড় রং করতেন। মায়ের প্রতি এতো ভক্তি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন যে, কখনো মায়ের সামনে উঁচু গলায় কথা বলতেন না। মায়ের সাথে এমনভাবে কথা বলতেন যেন কোনো গোপন কথা বলছেন।