📄 মাতা-পিতার ঋণের চিন্তা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ ছিলেন। এ সত্ত্বেও তিনি মাতা-পিতার খিদমত এবং অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা করেননি। জীবিতাবস্থায় যেমন খেয়াল রাখতেন তেমনি মৃত্যুর পরও তিনি মাতা-পিতার অধিকারের প্রতি পুরোপুরিই দৃষ্টি রেখেছিলেন। হযরত যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত সচ্ছল ব্যক্তি ছিলেন। সাধারণত যখন কোনো বিত্তশালী ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন তখন মৃত্যুর পর পরই তার উত্তরাধিকাররা নিজেদের অংশের চিন্তায় পড়ে যায়। কিন্তু সাধারণ দুনিয়াদারদের মতো তিনি নিজের অংশের জন্য বিন্দুমাত্র চিন্তাগ্রস্ত হননি। অথচ মিরাছ সূত্রে তাঁর প্রাপ্য ছিলো কোটি কোটি পরিমাণের। অবশ্য তাঁর চিন্তা একটিই ছিলো যে, পিতা কারোর নিকট ঋণগ্রস্ত রয়ে যাননি তো? বস্তুত তিনি সর্বপ্রথম রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে পিতার ঋণ পরিশোধ করেন। ঋণ পরিশোধের পর অন্যান্য উত্তরাধিকাররা মিরাছ বণ্টনের তাগাদা প্রদান এবং দাবী উত্থাপন শুরু করলো। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ মিরাছ বণ্টনে বাধা দিলেন। তিনি বললেন, চার বছর অব্যাহতভাবে হজ্জের মওসুমে পিতার ঋণের ব্যাপারে তিনি ঘোষণা দিতে থাকবেন। যদি কোনো পাওনাদার থাকে তাহলে সে তা আদায় করে দেবে। কোনো পাওনাদার থাকতেও তো পারে! চার বছর এভাবে ঘোষণা দানের পর তিনি মিরাছ বণ্টন করবেন।
এভাবে তিনি অন্যান্যদেরকে মিরাছ বণ্টনে চার বছর বিলম্ব করার প্রশ্নে সম্মত করিয়ে নিলেন এবং হজ্জের মওসুমে ঘোষণা দিয়ে পিতার জন্য হাজার হাজার মানুষ দিয়ে দোয়া ও মাগফিরাত করিয়ে নিতে থাকেন।
📄 মাতা-পিতার খিদমতের বরকত
عَنْ أَنَسِ بْن مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُمِدَّ لَهُ فِي عُمُرِهِ وَيُزَادُ لَهُ فِي رِزْقِهِ فَلْيَبَرَ وَالِدَيْهِ وَلِيَصل رحمه - احمد، الترهيب والترغيب
"হযরত আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরমিয়েছেন, যদি কোনো ব্যক্তি নিজের হায়াত দারাজ এবং প্রশস্ত রুজী কামনা করে তাহলে সে যেন নিজের মাতা-পিতার সাথে ভালো আচরণ এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে।"
এ বিশ্ব কর্মক্ষেত্র। পরকালীন জীবনকে সফল করার জন্য বেশী বেশী কামাই করার অবকাশ এখানে মানুষের রয়েছে। পিতা-মাতার খিদমতের বিনিময়ে দীর্ঘ জীবন লাভ এবং সচ্ছলতা আল্লাহর এক বিরাট নেয়ামত। মানুষ যাতে আরো কিছু ভালো কাজ করে নেকী বৃদ্ধি এবং মাতা-পিতার খিদমত করে আল্লাহর রহমাতের হকদার হয় তারই সুযোগ এ দুনিয়ায় করে দেয়া হয়েছে।
عَنْ مُعَانِبْنِ أَنَسٍ رَض أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ بَرَّ وَلِدَيْهِ طُوبَى لَهُ زَادَ اللَّهُ فِي عُمُرِهِ (الترغيب والترهيب ج (۳)
"হযরত মুয়াজ বিন আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মাতা- পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করলো তার জন্য সুসংবাদ হলো যে, আল্লাহ পাক তার হায়াত দারাজ করবেন।"
দীর্ঘায়ু লাভ একজন মুমিনের জন্য এ অর্থে সুসংবাদ যে, সে পরকালীন জীবনকে সফল করে তোলার লক্ষ্যে আরো পবিত্র আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করার সুযোগ পেলো।
📄 দুধ মাতার সাথে আচরণ
عَنْ أَبِي الطُّفَيْلِ رضـ قَالَ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقْسِمُ لَحْمًا بِالْجَعْرَانَةِ إِذَا أَقْبَلَتْ امْرَأَةٌ حَتَّى دَنَتْ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَبَسَطَ لَهَا رِدَاءَهُ فَجَلَسَتْ عَلَيْهِ فَقُلْتُ مَنْ هِيَ ؟ قَالُوا : هِيَ أُمُّهُ الَّتِي ارضعته - (ابو داود)
"হযরত আবিত তোফায়েল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমি জিয়রানা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গোশত ভাগ করতে দেখলাম। ইত্যবসরে একজন মহিলা এলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্পূর্ণ নিকটে চলে গেলেন। তিনি তাঁর জন্য নিজের চাদর বিছিয়ে দিলেন এবং মহিলাটি তার উপর বসলেন। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলাম মহিলাটি কে? তারা বললেন, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাতা। তিনি তাঁকে দুধ পান করিয়েছিলেন।
আপন মা ছাড়া শিশু যে মায়ের দুধ পান করে তাকে দুধ মা বলা হয়। শুধু দুধ পান করানোর জন্য কোনো মহিলা আপন মা হতে পারে না। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সে সেই মর্যাদাই লাভ করেন যা আপন মা পান। বিয়ে এবং পর্দার ব্যাপারে ইসলাম আপন মা'র যে মর্যাদা দিয়েছে দুধ মা'রও সেই একই মর্যাদা নির্ধারণ করেছে। আর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ঘটনাতেও এটা স্পষ্ট যে, দুধ মা'র সাথে আপন মায়ের মতোই আচরণ করতে হবে। তার খিদমত ও সব ধরনের সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।
📄 এক নজরে মাতা-পিতার সাথে ভালো আচরণের ফল
এক: আল্লাহর নেয়ামতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো নেয়ামত হলো মাতা-পিতা, মানুষের জন্মগ্রহণ ও লালন-পালনে আল্লাহর পরেই মাতা-পিতার বড়ো অবদান। আপনি তাঁদের ইহসানের স্বীকৃতি জানালে আল্লাহর ইহসানের স্বীকৃতি জানালেন। আর তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকলে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকলেন।
দুই: মাতা-পিতাকে সন্তুষ্ট রাখুন-তাহলে আল্লাহ আপনার উপর সন্তুষ্ট থাকবেন। আপনার কোনো অবহেলা বা নাফরমানীর কারণে তাঁরা নাখোশ হলে আল্লাহ আপনার উপর নাখোশ হবেন। মাতা-পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, মাতা-পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।
তিন: মাতা-পিতার সাথে ভালো আচরণ ও তাঁদের খিদমত করা জিহাদ করার সমতুল্য বরং কোনো কোনো সময় তার থেকেও বড়ো কাজ। আপনি তাদের খিদমতে রত থাকলে মুজাহীদিনের ন্যায় আপনিও দীন প্রতিষ্ঠাকারীদের দলে গণ্য হবেন। আল্লাহর দৃষ্টিতে ময়দানে জিহাদে অংশ গ্রহণকারীদের সমতুল্য মর্যাদার অধিকারী আপনিও।
চার: মাতা-পিতার সন্তুষ্টি বেহেশতের চাবিকাঠি। মাতা-পিতাকে সন্তুষ্ট করার কাজ করতে থাকলে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে।
পাঁচ: যাকে আল্লাহ তাআলা মাতা-পিতার খিদমত করার সুযোগ দিয়েছেন তাকে আসলে বেহেশতের পথে চলারই সুযোগ করে দিয়েছেন। যে এ সুযোগ কাজে লাগাবে তাকে আল্লাহ জান্নাত দেবেন। আর যে এ সুযোগ গ্রহণ করবে না সে ধ্বংস হবে।
ছয়: আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করা, হজ্জ ও ওমরা করা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। কেউ যদি মাতা-পিতার খিদমত করতে থাকে আল্লাহ তাকে হজ্জ ও ওমরাকারীর সমতুল্য সাওয়াব দেবেন।
সাত: আপনি আপনার মাতা-পিতার আদব ও সম্মান করলে আপনার সন্তানও আপনাকে সম্মান করবে। আপনি আপনার মাতা-পিতার ভালো করলে আল্লাহ তাআলা আপনার সন্তানদেরকেও সে শিক্ষাই দেবেন।
আট: মাতা-পিতার খিদমতে সমস্ত মসিবত ও দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে যায়।
নয়: মাতা-পিতার আনুগত্য, আদব ও সম্মান প্রদর্শন হতে কখনও দূরে থাকবেন না। এতে হায়াতে বরকত এবং রুজি-রোজগারের পথ প্রশস্ত হবে।