📄 মাতা-পিতার আনুগত্যের চূড়ান্ত রূপ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رضـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ أَصْبَحَ مُطِيعًا لِلَّهِ فِي وَالِدَيْهِ أَصْبَحَ لَهُ بَابَانِ مَفْتُوحَانِ مِنَ الْجَنَّةِ وَإِنْ كَانَ وَاحِدًا فَوَاحِدًا وَمَنْ أَمْسَى عَاصِيًّا لِلَّهِ فِي وَالِدَيْهِ أَصْبَحَ لَهُ بَابَانَ مَفْتُوحَانِ مِنَ النَّارِ وَإِنْ كَانَ وَاحِدًا فَوَاحِدًا قَالَ رَجُلٌ وَإِنْ ظَلَمَاهُ قَالَ وَإِنْ ظَلَمَاهُ وَإِنْ ظلَمَاهُ وَإِنْ ظَلَمَاهُ - مشكوة
"হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মাতা-পিতা সম্পর্কিত আল্লাহর নাযিলকৃত হুকুম-আহকাম এবং হেদায়াত মানা অবস্থায় সকাল করলো, সে যেন নিজের জন্য জান্নাতের দুটি দরজা খোলা অবস্থায় সকাল করলো। যদি মাতা-পিতার মধ্যে কোনো একজন হয় তাহলে যেন জান্নাতের একটি দরজা খোলা অবস্থায় পেল। আর যে ব্যক্তি মাতা-পিতা সম্পর্কিত আল্লাহর হুকুম ও হেদায়াত অমান্য করলো, তাহলে তার জন্য জাহান্নামের দুটি দরজা খোলা হবে। যদি মাতা-পিতার মধ্যে কোনো একজন থাকেন, তাহলে যেন জাহান্নামের একটি দরজা খোলা পেল। সে ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! যদি মাতা-পিতা তার সাথে বাড়াবাড়ি করে তাহলেও? তিনি বললেন, যদি বাড়াবাড়ি করে থাকেন তাহলেও। যদি বাড়াবাড়ি করে থাকেন তাহলেও। যদি বাড়াবাড়ি করে থাকেন তাহলেও।”-মিশকাত
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতা-পিতার সাথে সুন্দর আচরণের তাকিদ দানের জন্য এ ধরনের বর্ণনা পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। ফলে একজন মুমিনের সামনে এ তাৎপর্য প্রতিভাত হয় যে, আনুগত্য শুধু আল্লাহর জন্যই হওয়া উচিত। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য বৈধ নয়। মাতা-পিতার আনুগত্য এবং তাদের সাথে সুন্দর আচরণও এজন্য যে, আল্লাহ মাতা-পিতার অধিকার বর্ণনা করেছেন এবং তা মেনে চলার ও খিদমতের নির্দেশ দিয়েছেন। মুমিন ব্যক্তি এমন কোনো ব্যাপারে অবশ্যই মাতা-পিতার আনুগত্য করবে না যাতে আল্লাহর নাফরমানী হয়।
মাতা-পিতার বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও সুন্দর আচরণের অর্থ হলো, যদি মাতা- পিতা কঠোর মেজাজের কারণে এমন সব দাবী করতে থাকেন, যা পূরণ করা সন্তানের জন্য কঠিন হয় অথবা সন্তানদের সহ্যের সীমার কথা চিন্তা না করে বেশী বেশী পরিশ্রম করাতে থাকেন অথবা সন্তানদের সামর্থ্যের বাইরে অতিরিক্ত আর্থিক দাবী করতে থাকেন তাহলেও সন্তানদের উচিত নিজেদের আবেগ কাবুতে রেখে এবং জোর করে তাদের খিদমত ও সুন্দর আচরণ অব্যাহত রাখা।
এ অবস্থায় যদিও সন্তানের উপর আনুগত্য ওয়াযিব নয়। কেননা আল্লাহ কারোর উপর সাধ্য বা সামর্থ্যের বেশী বোঝা আরোপ করেন না, তবুও মাতা-পিতার আনুগত্যের এটাই চূড়ান্ত রূপ। সন্তান নিজের সামর্থ্যের বাইরে মাতা-পিতার খিদমতে নিজের জীবন বিলিয়ে দেবে এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখা ও আরাম প্রদানের জন্য সব কিছুই ত্যাগ করবে।
হ্যাঁ, যদি এমন দাবী করেন যাতে অন্যের অধিকার খর্ব হয়, অথবা তার বিস্বাদপূর্ণ প্রভাব অন্যের উপর আপতিত হয় অথবা আল্লাহর কোনো হুকুমের বিরোধিতা হয় তাহলে অবশ্যই আনুগত্য করতে হবে না। উদাহরণ স্বরূপ, তারা কারোর অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ে বাধা দান করে অথবা নীরেট ব্যক্তিগত শত্রুতা অথবা জিদের বশবর্তী হয়ে কন্যাকে বিনা কারণে এমন স্বামী থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বনে বাধ্য করতে চায় যে স্ত্রীর শরীয়তের অধিকার আদায়ে কার্পণ্য করে না। অথবা এ ধরনের স্বামীর খিদমত ও আনুগত্যে বাধা দেয়। তাহলে এ ধরনের মাতা-পিতার আনুগত্য অবশ্যই ওয়াযিব নয়। কেননা অন্যের অর্থনৈতিক অধিকার আদায় করা ফরয এবং তা না করা মারাত্মক গুনাহর কাজ। হকদার যদি ক্ষমা করে তাহলেই শুধু আল্লাহ এ ধরনের গুনাহ মাফ করে থাকেন।
স্বামীর খিদমত ও আনুগত্য অথবা তার সম্পর্ক রাখার প্রশ্নেও একটি জিনিস সামনে রাখতে হবে। তাহলো, বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা এবং তাদের সুন্দর সম্পর্ক আল্লাহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত পসন্দনীয় কাজ। আর ইসলাম যে কোনো মূল্যে এ সম্পর্ক কায়েম রাখার তাকিদ দেয়।
নিসন্দেহে মাতা-পিতার আনুগত্য করা ফরয কিন্তু এ আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের অধীন। এটা কোনো স্বাধীন আনুগত্য নয়। দীনের হেদায়াত, আহকাম, দাবী এবং মুসলিহাত থেকে পিছপা হয়ে মাতা-পিতার আনুগত্য। আল্লাহর আনুগত্য নয় বরং এটা আল্লাহর নাফরমানী। এ ধরনের আনুগত্য করে কোনো মুমিন সওয়াবের আশা করতে পারেন না। শাস্তিই তার প্রাপ্য হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "যদি একজনের আনুগত্য হয় তাহলে জান্নাতের এক দরজা খোলা থাকে। এর অর্থ এই নয় যে, মাতা-পিতার মধ্যে যদি কেউ ইন্তিকাল করেন এবং এখন আর তার আনুগত্যের ও খিদমতের সুযোগ নেই, তাহলে এ ধরনের সন্তানের জন্য ব্যাস একটি দরজাই খোলা রয়েছে, বরং তার মর্মার্থ হলো, যদি মাতা-পিতার মধ্য থেকে একজনের আনুগত্য করছে এবং অন্যজনকে অসন্তুষ্ট রেখেছে তাহলে একজনের আনুগত্যের জন্য বেহেশতের দরজা খোলা রয়েছে এবং অন্যের নাফরমানীর জন্য দোযখের দরজা খোলা রাখা হয়েছে। যদি উভয়ের মধ্য থেকে একজন দুনিয়া থেকে বিদায় নেন এবং জীবিতাবস্থায় তার আনুগত্য করা হয়েছে তাহলে এ আনুগত্যের বিনিময়ে খোলা দরজা খোলাই থাকবে তা বন্ধ করা হবে না।
হাদীসটিতে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে যে, যদি কেউ একজনের আনুগত্য করে এবং অন্যজনকে নিজের কাজের মাধ্যমে অসন্তুষ্ট রাখে তাহলে তা সঠিক নয়। 'একজনের আনুগত্যের কারণে আল্লাহ জান্নাতের দরজা খুলে রাখেন। কিন্তু অন্যজনের নাফরমানীর কারণে স্বয়ং জাহান্নামের দরজা খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। একজনের আনুগত্য করে অন্যজনের খিদমত ও আনুগত্য প্রশ্নে নিশ্চিত থাকা কোনো মুমিনের সঠিক পদ্ধতি হতে পারে না। সেতো উভয়ের খিদমত ও আনুগত্য করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়
📄 মাতা-পিতার ইন্তেকালের পর করণীয়
عَنْ أَبِي أُسَيْدٍ قَالَ كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللهِ هَلْ بَقِيَ مِنْ بِرَابَوَى شَيْءٍ بَعْدَ مَوْتِهِمَا أَبَرَّهُمَا قَالَ نَعَمْ . خِصَالُ أَرْبَعُ الدُّعَاءُ لَهُمَا ، وَالْاسْتِغْفَارُ لَهُمَا وَإِنْفَاذُ عَهْدِهِمَا وَأَكْرِمُ صَدِيقِهِمَا وَصَلَةُ الرَّحْمِ الَّتِي لَأَرَحِمَ لَكَ إِلَّا مِنْ قَبْلِهِمَا -
"হযরত আবু উসাইদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলো হে আল্লাহর রাসূল! মাতা-পিতার মৃত্যুর পরও কি এমন কোনো পদ্ধতি সম্ভব যে, আমি তাদের সাথে সুন্দর আচরণ অব্যাহত রাখতে পারি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, জ্বী হাঁ। চারটি সুরত রয়েছে-(১) মাতা-পিতার জন্য দোয়া এবং ইসতিগফার, (২) তাদের কৃত ওয়াদাসমূহ এবং বৈধ ওসিয়ত পূরণ, (৩) পিতার বন্ধু-বান্ধব এবং মাতার বান্ধবীদের ইজ্জত ও খাতিরদারী ও (৪) তাঁদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় ও সুন্দর আচরণ করা, যারা মাতা-পিতার দিক থেকে তোমাদের আত্মীয় হন।"-আল আদাবুল মাফরুজ
মাতা-পিতা শিশু লালন-পালন এবং প্রশিক্ষণের জন্য কষ্ট স্বীকার করেন এবং দিবা-রাত্রি তত্ত্বাবধান করেন। আসল কথা হলো: আপনি যদি জীবনভরও দাস-দাসীর মতো তাঁদের খিদমত করতে থাকেন, তবুও তাঁদের খিদমতের হক আদায় হতে পারে না। এ কারণেই একজন মুমিন সারা জীবন মাতা-পিতার সাথে সুন্দর আচরণ করে থাকে। কিন্তু যখন মাতা-পিতা দুনিয়া থেকে বিদায় নেন তখনো চিন্তা করতে থাকেন যে, হায় আমি তো কিছুই করতে পারিনি। আর এজন্যেই তিনি তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের রূহকে খুশী করার জন্য কোনো পন্থা কামনা করেন। এ ধরনের মুমিনের প্রাণের আবেগ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট প্রশ্ন করেছিলেন জনৈক ব্যক্তি। তিনি জবাবে বলেছিলেন, ওফাতের পরও তাঁদের সাথে সুন্দর আচরণ করা যায় এবং এ আচরণের পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা করে দেন।
এক: দোয়া ও ইসতিগফার: নামাযের পর এবং অন্য সময় আল্লাহর নিকট কেঁদে কেঁদে দোয়া করুন যে, হে আল্লাহ! আমার মাতা-পিতাকে ক্ষমা করুন। তাঁদের গুনাহসমূহকে ঢেকে দিন এবং তাঁদেরকে আপনি তাই দান করুন যা আপনি নেক বান্দাহ-বান্দীকে দিয়ে থাকেন। হে আল্লাহ! যখন আমরা তাঁদের সাহায্য, স্নেহ ও লালন-পালনের মুখাপেক্ষী ছিলাম তখন তারা সবকিছু আমাদের জন্য ত্যাগ করেছিলেন। দিনে আয়েশ এবং রাতের আরাম আমাদের জন্য পরিত্যাগ করেছিলেন। পরওয়াদিগার! এখন তাঁরা তোমার নিকট সমুপস্থিত। শৈশবকালে অসহায় অবস্থায় আমরা তাঁদের মুখাপেক্ষী ছিলাম। এখন তাঁরা সেই সময়ের চেয়ে বেশী তোমার রহমাত ও সুদৃষ্টির মুখাপেক্ষী। পরওয়ারদিগার! তুমি তাঁদেরকে নিজের রহমাতের ছায়া দান করো এবং নিজের সন্তুষ্টির ঘর জান্নাতে তাঁদের আশ্রয় দাও।
হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে, মৃত্যুর পর যখন মাইয়েতের মর্যাদা বুলন্দ হয় তখন সে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে এটা কেমন করে হলো? তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে বলা হয় যে, তোমার সন্তানরা তোমার জন্য দোয়া ও মাগফিরাত কামনা অব্যাহত রেখেছে এবং আল্লাহ তা কবুল করে নিয়েছেন। হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুই বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তি মারা যান তখন তার আমলের সুযোগ শেষ হয়ে যায়। শুধু তিনটি বিষয় এমন যা তার মৃত্যুর পরও উপকার করতে থাকে। প্রথম, ছাদকায়ে জারিয়া। দ্বিতীয়, তার বিস্তৃত সেই ইলম বা জ্ঞান যা থেকে মানুষ উপকৃত হয় এবং তৃতীয়, সেই নেক সন্তান যারা তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।
হযরত ইবনে শিরীন রাহমাতুল্লাহ আলাই একজন মশহুর বুজর্গ তাবেয়ী ছিলেন। তিনি একটি কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, এক রাতে আমরা হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিদমতে উপস্থিত ছিলাম। তিনি দোয়ার জন্য হাত তুললেন এবং বিনয়ের সাথে বললেন, হে পরওয়ারদিগার! আবু হুরাইরাকে ক্ষমা করো এবং হে পরওয়ারদিগার! আবু হুরাইরার মাতাকে ক্ষমা করো এবং হে পরওয়ারদিগার! তাদের সবাইকে ক্ষমা করো, যারা আবু হুরাইরাহ এবং তার মাতার ক্ষমার জন্য দোয়া করে। হযরত ইবনে শিরীন রাহমাতুল্লাহ আলাই বলেন, আমরা আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং মাতার পক্ষে ক্ষমার দোয়া করতে থাকি যাতে আমরা আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর দোয়ায় শামিল থাকি।
দুই: মাতা-পিতার ওয়াদা ও ওসিয়ত পূরণ করা: মাতা-পিতা জীবিত অবস্থায় অনেক লোকের সাথে ওয়াদা করে থাকতে পারেন। বিভিন্ন ব্যাপারে কিছু ওয়াদা করতে পারেন। মৃত্যুর সময় কিছু ওসিয়ত করতে পারেন।
মাতা-পিতার ইন্তেকালের পর সন্তানের জন্য তাঁদের সাথে সুন্দর বা নেক আচরণের একটি পন্থা অবশিষ্ট থাকে। তাহলো তাঁদের কৃত ওয়াদাসমূহ ও ওসিয়ত পূরণ করা। আর এভাবেই তাঁদের রূহকে খুশী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু তাঁদের জায়েয বা বৈধ ওসিয়তই পূরণ করতে হবে। যদি তাঁদের অবৈধ ওসিয়তও পূরণ করা হয় তাহলে এটা তাঁদের সাথে নেক আচরণ হবে না বরং খারাপ আচরণ হবে।
মাতা-পিতা যদি কারোর সাথে আর্থিক সাহায্য দানের ওয়াদা করে থাকেন অথবা কাউকে কিছু দান করতে চেয়ে থাকেন। আর জীবনে যদি তার সুযোগ না পান অথবা তাঁরা কোনো মানত করেছিলেন, কিন্তু তা পূরণের আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেছেন। অথবা তিনি ঋণী ছিলেন অথবা ওসিয়াত করার সুযোগ পাননি, অথচ আপনি বুঝেন যে, সুযোগ পেলে তিনি অবশ্যই এ ওসিয়াত করতেন অথবা তিনি কোনো ওসিয়ত করেননি। আপনি যদি তাঁদের পক্ষ থেকে সাদকাহ করেন তাহলে এসবই তাঁদের সাথে নেক আচরণ হবে। আর এভাবেই তাঁদের ওফাতের পরও আপনি জীবনভর তাঁদের সাথে সুন্দর আচরণ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মাতা ইন্তেকাল করেছেন এবং তিনি কোনো ওসিয়াত করে যাননি। আমি যদি তাঁর তরফ থেকে কিছু সাদকাহ করি তাহলে কি তাঁর কোনো উপকারে আসবে? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। কেন নয়।
এ হযরত আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুই বর্ণনা করেছেন, হযরত আসয়াদ ইবনে উবাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মাতা মানত মেনেছিলেন। কিন্তু এ মানত আদায়ের পূর্বেই তিনি ওফাত পেয়েছেন। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে এ মানত পুরো করতে পারি? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, কেন নয়। তুমি তাঁর পক্ষ থেকে মানত পুরো করে দাও।
তিন: মাতার বান্ধবী এবং পিতার বন্ধুদের সাথে আচরণ: মাতা- পিতার ওফাতের পর তাঁদের সাথে আচরণের তৃতীয় পন্থা হলো, মাতার বান্ধবী এবং পিতার বন্ধুদের সাথে নেক বা সুন্দর আচরণ করা। সামাজিক জীবনে বুজর্গ ব্যক্তিদের মতো তাঁদেরকেও শ্রদ্ধা করতে হবে। তাঁদের মতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। বিভিন্ন প্রশ্নে পরামর্শের সময় তাঁদেরকে শরীক করা এবং সবসময় শ্রদ্ধা প্রদর্শন পূর্বক তাঁদের সাথে সুন্দর আচরণ করা আবশ্যক।
একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, পিতার বন্ধুদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা সবচেয়ে সুন্দর আচরণ।
সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের আমল
একবার হযরত আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং অসুস্থতা বৃদ্ধিই পেতে থাকলো। এমনকি জীবিত থাকার আর আশা রইলো না। এ সময় হযরত ইউসুফ ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু দূর-দূরান্ত থেকে সফর করে তাঁর সেবার জন্য উপস্থিত হলেন। হযরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখানে কি করে এলে? ইউসুফ ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হযরত! শুধু আপনার সেবার জন্যই আমি এখানে হাজির হয়েছি। কেননা শ্রদ্ধেয় পিতা এবং আপনার মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিলো।
০ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার সফরে ছিলেন। এ সময় মক্কার এক বুদ্দুর সাথে তাঁর সাক্ষাত হলো। বুদ্দু হযরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে খুব ভালোভাবে দেখলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি হযরত ওমরের পুত্র? হযরত ইবনে ওমর জবাব দিলেন, জ্বী হাঁ। আমি তাঁরই পুত্র। এ সময় তিনি নিজের মাথা থেকে পাগড়ী খুলে তাঁকে দিলেন এবং নিজের গাধার উপর সম্মানের সাথে বসালেন। হযরত ইবনে দিনার বললেন, আমরা সবাই ধিস্ময়ের সাথে এসব দেখতে লাগলাম এবং পরে বললাম, হে হযরত! সে তো একজন বুদ্দু অথবা গ্রামবাসী। আপনি যদি দু দেরহাম দিয়ে দিতেন তাই তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট হতো। হযরত আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ভাই তাঁর পিতা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বন্ধু ছিলেন এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, পিতার বন্ধুদেরকে সম্মান করো ও এ সম্পর্ক নিঃশেষ হতে দিও না। নচেত আল্লাহ তাআলা তোমাদের আলো নির্বাপিত করে দেবেন।
০ হযরত আবু বুরদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি যখন মদীনায় এলাম তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার নিকট উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলেন, আবু বুরদাহ! তোমার নিকট কেন এসেছি তা কি তুমি জান? আবু বুরদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হযরত! আমি তো তা জানি না। হযরত আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কবরে অবস্থিত নিজের পিতার সাথে সুন্দর আচরণ করতে চায় তার উচিত পিতার মৃত্যুর পর তার বন্ধু-বান্ধবের সাথে সুন্দর আচরণ করা। এরপর তিনি বললেন, ভাই! আমার পিতা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং আপনার পিতার মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। আমি সেই বন্ধুত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনপূর্বক তাঁর হক আদায় করতে চাই। -ইবনে হাব্বান
চার : মাতা-পিতার আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুন্দর আচরণ : মাতা-পিতার ওফাতের পর আচরণের চতুর্থ পন্থা হলো, মাতা-পিতার আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুন্দর আচরণ করা। মাতামহের পক্ষের আত্মীয় যেমন খালা, মামু, নানী, নানা প্রভৃতি এবং পিতামহের পক্ষের আত্মীয় যেমন চাচা, ফুফু, দাদা-দাদী ইত্যাদি। এ সকল আত্মীয় থেকে মুখাপেক্ষীহীনতা থাকা এবং বেপরোয়া ভাব প্রদর্শন প্রকৃতপক্ষে মাতা-পিতার প্রতি মুখাপেক্ষীহীন থাকার নামান্তর এবং একজন মুমিন ও মুমিনা মাতা-পিতার সাথে বেপরোয়ামূলক আচরণ করতে পারে না। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এরশাদ হলো, তোমরা তোমাদের পিতা ও পিতামহের সাথে কখনও বেপরোয়ামূলক আচরণ করবে না। মাতা-পিতার সাথে বেপরোয়ামূলক আচরণ করা আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়ার শামিল।
📄 মাতা-পিতার জন্য দোয়া করার সওয়াব
عَنْ أَنَسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ الْعَبْدَ لَيَمُوتُ وَالِدَاهُ أَوْ أَحَدُهُمَا وَإِنَّهُ لَهُمَا لَعَاقٌ فَلَا يَزَالُ يَدْعُولَهُمَا وَيَسْتَغْفِرْ لَهُمَا حَتَّى يَكْتُبَهُ اللَّهُ بَارًا -
"হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি আজীবন মাতা-পিতার নাফরমানী করে এবং তার মাতা-পিতা অথবা তাঁদের উভয়ের কেউ ইন্তেকাল করেন তাহলে তার উচিত অব্যাহতভাবে মাতা-পিতার জন্য দোয়া ও ক্ষমা চাওয়া। ফলে আল্লাহ নিজের রহমাতে তাকে নেক লোকদের মধ্যে লিখে দেন।"
আজীবন মাতা-পিতার আনুগত্য, তাঁদের সাথে সুন্দর আচরণ এবং তাঁদের সন্তুষ্ট রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা আবশ্যক। কিন্তু সামগ্রিক প্রচেষ্টার পরও যদি তাঁরা সন্তুষ্ট না হন এবং অসন্তুষ্ট অবস্থাতেই দুনিয়া থেকে বিদায় নেন তাহলেও আল্লাহর রহমাতের দরজা খোলা থাকে ও ক্ষতিপূরণ সম্ভব। অব্যাহতভাবে তাঁদের জন্য দোয়া ও মাগফিরাত কামনার ফলশ্রুতিতে আল্লাহ পাক ভুল ক্ষমা করে দিতে পারেন বলে আশা করা যায় ও আপনাকে উত্তম বান্দাদের মধ্যে পরিগণিত করতে পারেন। আল্লাহর রহমত থেকে কোনো মুমিন বান্দারই নিরাশ হওয়া উচিত নয়। বান্দাহর অন্তরে যখনই তাওবার আবেগ সৃষ্টি হয় তখনই তিনি অগ্রসর হয়ে তা কবুল করে নেন এবং সেই আবেগকে অগ্রসর করানো ও জীবনের উপর তার প্রভাব ফেলার যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করেন কিন্তু এ হাদীস থেকে ভুল ধারণা নেয়া অবশ্যই ঠিক নয় যে, মাতা-পিতা জীতি থাকা অবস্থায় অবাধ্য থেকে তাঁদের মৃত্যুর পর দোয়া এবং ইসতিগফার করে আল্লাহর রহমাত লাভ করা যাবে। সঠিক কথা হলো, জীবিতাবস্থায় তাঁদের খিদমত এবং সন্তুষ্ট রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান করা।
📄 মাতা-পিতার প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টি
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَض أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَا مِنْ وَلَدٍ بَارٍ يَنْظُرُ إِلَى وَالِدَيْهِ نَظَرَةَ رَحْمَةٍ إِلَّا كَتَبَ اللَّهُ لَهُ بِكُلِّ نَظَرَةٍ حِجَّةً مَبْرُورَةً قَالُوا إِنْ نَظَرَ كُلَّ يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ قَالَ نَعَمْ وَاللَّهُ أَكْبَرُ وَأَطْيَبُ - مسلم
"হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, যে সুসন্তানই মাতা-পিতার প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টিতে একবার তাকাবে তার বদলায় আল্লাহ তাকে এক হজ্জ কবুলের সওয়াব দান করেন। লোকজন জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! যদি কেউ একদিনে শতবার রহমাত ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখে। তিনি বললেন, জ্বী হাঁ যদি কেউ শতবার দেখে তবুও। আল্লাহ (তোমাদের ধারণায়) অনেক বড় এবং সম্পূর্ণ পবিত্র।"
মর্মার্থ হলো আল্লাহর রহমাত এবং ব্যাপকতা এতো বড়ো যে, তিনি তা থেকেও বেশী প্রদান করতে পারেন। যদি কোনো সন্তান দিন ভর শতবার মাতা-পিতার প্রতি রহমাত ও মুহাব্বাতের দৃষ্টিতে দেখে তাহলে আল্লাহ শত হজ্জের সওয়াবও দিতে পারেন। মানুষ আল্লাহ সম্পর্কে যাকিছু চিন্তা করতে পারে তিনি তা থেকেও বেশী বড়ো এবং মর্যাদাবান।
মানুষ নিজের সামর্থ্যকে সামনে রেখে চিন্তা করে থাকে। ফলে এতো বড়ো সওয়াব প্রাপ্তি অসম্ভব বলে মনে হয় এবং ভুল ধারণার শিকার হয়। কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে এ ভুল ধারণা পোষণ সঠিক নয়। তিনি প্রত্যেক ভুল ধারণা থেকে পবিত্র। সেই দয়াশীল সত্তা এতো দান করতে পারেন যে, মানুষের ধারণা সে পর্যন্ত পৌঁছতেই সক্ষম নয়।