📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 মাতা-পিতার গুরুত্ব

📄 মাতা-পিতার গুরুত্ব


عَنْ أَبِي أُمَامَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلاً قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا حَقَ الْوَالِدَيْنِ عَلَى وَلَدِهِمَا ؟ قَالَ هُمَا جَنَّتُكَ وَنَارُكَ ابن ماجه، مشكوة
"হযরত আবি উমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সন্তানের উপর মাতা-পিতার কি অধিকার রয়েছে? তিনি ইরশাদ করলেন, মাতা-পিতা তোমাদের বেহেশত এবং দোযখ।"
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ইরশাদের মর্মার্থ হলো, কোনো ব্যক্তি তাঁদের থেকে মুখাপেক্ষীহীন হতে পারবে না। সামাজিক জীবনে তাঁদের গুরুত্ব ছাড়াও পরকালীন জীবনের মুক্তি ও সাফল্যের দিক থেকেও তাঁদের গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁদের সাথে সুন্দর ব্যবহার ও আনুগত্য করে এবং সন্তুষ্ট রেখে সন্তান জান্নাতে নিজের ঘর তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে তাঁদের অধিকার পদদলিত করে অসন্তুষ্টির কারণে জাহান্নামের ইন্ধনও হতে পারে।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ - وَقَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، رِضا اللهِ فِي رِضَا الْوَالِدِ وَسُخْطُ اللَّهِ فِي سُخْطِ الْوَالِدِ -
"হযরত আবদিল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত রয়েছে।"
মাতা-পিতার অধিকার অস্বীকার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় না। যারা তাঁদেরকে সন্তুষ্ট রাখতে পারে তারাই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারে। তাঁদের ক্রোধ-উদ্রেককারীরা আল্লাহর গযব থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে না এবং যারা তাঁদেরকে অসন্তুষ্ট করবে তারা আল্লাহকেও অসন্তুষ্ট করবে।
عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ جَاهِمَةَ أَنَّ جَاهِمَةَ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ - أَرَدْتُ أَنْ أَغْزُوَ، وَقَدْ جِئْتُ اسْتَشِيرُكَ ؟ فَقَالَ هَلْ لَّكَ مِنْ أُمِّ قَالَ نَعَمْ، قَالَ فَالْزَمَهَا فَإِنَّ الْجَنَّةَ عِنْدَ رِجْلِهَا - ابن ماجه، نسائ
"হযরত জাহিমার রাদিয়াল্লাহু আনহু পুত্র হযরত মাবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে, হযরত জাহিমা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করাই আমার ইচ্ছা। আর এজন্য আপনার সাথে পরামর্শ করতে এসেছি। বলুন এ ব্যাপারে আপনার নির্দেশ কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মাতা কি জীবিত আছেন?
জাহিমা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, জ্বী হ্যাঁ। আল্লাহর শোকর যে, তিনি জীবিত আছেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, তুমি ফিরে যাও এবং তাঁর খিদমতেই লেগে থাকো। কেননা, তাঁর পায়ের তলাতেই বেহেশত।"
"তাঁর পায়ের তলায় বেহেশত” কথাটি ব্যাপক অর্থে বর্ণনা করা হয়েছে। যার অর্থ হলো, তাঁকে পুরোপুরি সম্মান এবং আচার-আচরণে অত্যন্ত বিনয় দেখাতে হবে। মন-প্রাণ দিয়ে তাঁর খিদমত ও খিদমতকেই নিজের মুক্তির মাধ্যম মনে করতে হবে।
উপরের হাদীসে পিতার অনুগত হওয়ার প্রতি গুরুত্ব প্রদান এবং এ হাদীসে মাতার আনুগত্য ও খিদমতের গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। এ হাদীস তিবরণীতে মাতা ও পিতা উভয়ের কথা উল্লেখ করে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত জাহিমা রাদিয়াল্লাহু আনহু স্বয়ং বলেছেন, আমি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হলাম এবং আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জিহাদে অংশগ্রহণ করাই আমার ইচ্ছা। এ ব্যাপারে আমি আপনার মত জানতে চাই। তিনি ইরশাদ করলেন, তোমার মাতা-পিতা (জীবিত) আছেন? আমি আরজ করলাম, জ্বী হাঁ। আল্লাহর শোকর, উভয়েই জীবিত আছেন। তিনি ইরশাদ করলেন, যাও, তাঁদের খিদমতেই লেগে থাকো। কেননা, তাঁদের পায়ের নীচেই বেহেস্ত রয়েছে।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ رَغِمَ أَنْفُهُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ ثُمَّ رَغمَ أَنْفُهُ، قِيلَ مَنْ يَارَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ مَنْ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ عِنْدَ الْكَبَرِ أَوْ أَحَدَهُمَا ثُمَّ لَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ -
"হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সেই ব্যক্তি অপমানিত হোক, পুনরায় অপমানিত হোক, আবারো অপমানিত হোক। লোকজন জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! কোন্ ব্যক্তি? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি নিজের মাতা-পিতা উভয়কেই বৃদ্ধ অবস্থায় পেলো অথবা কোনো একজনকে অতপর (তাঁদের খিদমত করে) জান্নাতে প্রবেশ করলো না।

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 মাতা-পিতার খিদমতের পার্থিব পুরস্কার

📄 মাতা-পিতার খিদমতের পার্থিব পুরস্কার


মাতা-পিতার খিদমত এবং অনুগত হওয়ার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও বেহেশত নসীব হয়। এ তো আখেরাতের পুরস্কার। কিন্তু যারা সাচ্চা অন্তরে মাতা-পিতার খিদমত করে এবং অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখে আল্লাহ পাক এ দুনিয়াতেও তাদেরকে পুরস্কৃত করে থাকেন। বস্তুত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার স্বয়ং নিজের সাথীদেরকে তিন ব্যক্তির চিত্তাকর্ষক কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেন, একবার তিন ব্যক্তি কোথাও সফরে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তাদেরকে মুষলধারে বৃষ্টিতে ঘিরে ধরলো। আশ্রয়ের জন্য তারা এক গুহায় প্রবেশ করে বসে গেলো। আল্লাহর মহিমা! পাহাড় থেকে একটি বড় পাথর ধসে গুহার মুখের উপর এসে পড়লো এবং গুহার মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলো। তিন বন্ধু সাংঘাতিকভাবে ঘাবড়ে গেলো। ঘাবড়ানোর কথাও। পাথর সরানো তাদের সাধ্যের বাইরে ছিলো। সেখানে কোনো মানুষও ছিলো না যে, সাহায্যের জন্য ডাক দেয়। নিরাশ হয়ে তারা বসে রইলো এবং ধারণা করলো যে, জীবিত দাফন হয়ে গেছি এবং সেই গুহাই তাদের কবর। তাদের মধ্যে একজন বললো, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হলে চলবে না। এসো আমরা প্রত্যেকেই জীবনের সবচেয়ে ভালো কাজের উদ্ধৃতি দিয়ে আল্লাহর নিকট দোয়া করি। আশা করি, আল্লাহ নিজের রহমতের মাধ্যমে আমাদেরকে এ মুসিবত থেকে মুক্তি দেবেন।
তাদের মধ্যে একজন মুসাফির বলতে শুরু করলো, হে আল্লাহ! আমার মাতা-পিতা বৃদ্ধ ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট সন্তান ছিলো। আমি দিনে বকরী চরিয়ে ঘরে ফিরতাম এবং দুধ দুইয়ে সর্বপ্রথম মাতা-পিতাকে পান করাতাম। এরপর নিজের শিশুদেরকে দিতাম। ঘটনাক্রমে আমি একদিন অনেক দূরে চলে গেলাম এবং ফিরতে যথেষ্ট দেরী হয়ে গেলো। রাতে যখন আমি ঘরে ফিরলাম তখন মাতা-পিতা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। প্রতিদিনের মতো আমি বকরীর দুধ দোহন করলাম এবং এক পেয়ালায় ভরে মাতা-পিতার শিয়রে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। কখন তাঁরা জাগবে এবং আমি তাঁদের সামনে দুধ পেশ করবো। বেশ খানিক রাত হয়ে গেলো। আমার শিশুরা ক্ষুধায় কাতরাতে লাগলো। তারা বারবার আমার পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়ছিলো এবং দুধ দুধ করছিলো। কিন্তু পিতা-মাতার আগে তাদেরকে দুধ পান করানো আমি সহ্য করতে পারলাম না। মাতা-পিতা অভুক্ত শুয়ে থাকবেন আর আমার শিশুরা পেট পুরে আরাম করবে, এটা হতে পারে না। মোটকথা, সারা রাত আমি তেমনি পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম। মাতা-পিতা ঘুমুতে লাগলেন এবং শিশুরা ক্ষুধায় কেঁদে কেঁদে লুটিয়ে পড়তে লাগলো। এভাবে সারা রাত কেটে গেলো। হে আল্লাহ! আমি যদি মাতা-পিতার সাথে এ আচরণ শুধুমাত্র তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহলে তোমার রহমতের সাহায্যে এ পাথরকে গুহার মুখ থেকে সরিয়ে দাও।
একথা বলতেই পাথর গুহার মুখ থেকে কিছুটা সরে গেলো এবং পরিষ্কারভাবে আকাশ নজরে পড়তে লাগলো। অতপর অন্য মুসাফির দুজনও স্ব স্ব নেক কাজের মাধ্যম দিয়ে দোয়া করলো এবং আল্লাহ স্বীয় রহমতের মাধ্যমে গুহার মুখ খুলে দিলেন।

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 মাতা-পিতার সাথে সুন্দর আচরণ

📄 মাতা-পিতার সাথে সুন্দর আচরণ


عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ ؟ قَالَ : الصَّلوةُ عَلَى وَقْتِهَا . قُلْتُ ثُمَّ أَى ؟ قَالَ : بِرُّ الْوَالِدَيْنِ قُلْتُ، ثُمَّ أَيُّ ؟ قَالَ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
- বুখারী, মুসলিম
"হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন্ নেক আমল আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয়? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যে নামায সময় মতো পড়া হয়। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোন্ কাজ সবচেয়ে বেশী প্রিয়? তিনি বললেন, মাতা-পিতার সাথে সুন্দর আচরণ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরপর? তিনি ফরমালেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।" -বুখারী ও মুসলিম
নামাযের গুরুত্ব এবং ফযিলত সম্পর্কে কোনো মুসলমান অনবহিত নন। তারপরও নামাযের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতের সাথে সাথে প্রিয় নবী আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে নেক আমলের তাকিদ দিয়েছেন, দীনে তার কি ধরনের গুরুত্ব হতে পারে। মাতা-পিতা এবং সন্তানের মধ্যে তো সম্পর্ক বিদ্যমান। তাদের মধ্যে নেক আচরণ ও ভালোবাসার সম্পর্ক তো রক্তের সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রতিটি মুমিন মাতা-পিতাকে ভালোবেসেই থাকে এবং যতদূর সম্ভব মন ও অন্তর দিয়ে তাঁদের খিদমত করে। কিন্তু প্রিয় নবী আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাকিদের অর্থ হলো এ সম্পর্কে শুধু বংশীয় এবং ইহকালের সম্পর্কেই নয়। বরং এটা একটা দীনি ব্যাপারও বটে। আল্লাহর দীন এবং আল্লাহর আনুগত্যের দাবীই হলো মাতা-পিতার সাথে নেক বা সুন্দর আচরণ করা। আল্লাহ ও রাসূল আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ হলো যে, তাঁদের অনুগত থাকা এবং খিদমত করা। তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং বিভিন্নভাবে খুশী রাখার চেষ্টা করা। কোনো মুসলমান যদি মাতা-পিতার অনুগত না হয় তাহলে সে আল্লাহ ও রাসূল আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও অনুগত হয় না। সে শুধু বংশীয় ও ইহকালীন অপরাধীই নয়- বরং সে আল্লাহর নিকটও অপরাধী। আল্লাহর নিকট তাকে জবাবদিহিও করতে হবে।
قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ رض : أَقْبَلَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ أَبَايِعُكَ عَلَى الْهِجْرَةِ وَالْجِهَادِ ابْتَغِي الْأَجْرَ مِنَ اللهِ، قَالَ فَهَلْ مِنْ وَالِدَيْكَ أَحَدٌ حَيَّ ؟ قَالَ نَعَمْ، بَلْ كِلَاهُمَا حَيٌّ، قَالَ فَتَبْتَغِي الْاَجْرَ مِنَ اللَّهِ ؟ قَالَ نَعَمْ، قَالَ فَارْجِعُ إِلَى وَالِدَيْكَ فَأَحْسِنُ صُحْبَتَهُما - مسلم
"হযরত আমর ইবনুল আছ রাদিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, এক ব্যক্তি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে বলতে লাগলো, আমি আপনার নিকট হিজরত ও জিহাদের বাইয়াত করছি এবং আল্লাহর কাছে তার প্রতিদান চাচ্ছি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মাতা-পিতার মধ্যে কেউ জীবিত আছেন কি? সে বললো, জ্বী হাঁ। বরং আল্লাহর শোকর যে, উভয়েই জীবিত আছেন। তিনি বললেন, তুমি কি বাস্তবিকই আল্লাহর নিকট নিজের হিজরত ও জিহাদের প্রতিদান চাও? সে বললো, জ্বী হাঁ। আল্লাহর নিকট প্রতিদান চাই। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, তাহলে মাতা-পিতার নিকট ফিরে যাও এবং তাঁদের সাথে সুন্দর আচরণ করো।"-মুসলিম
দীনে হিজরত ও জিহাদের যে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা কে অস্বীকার করতে পারে? এ সত্ত্বেও যদি মাতা-পিতা বার্ধক্য, দুর্বলতা অথবা কোনো মাজুরীর কারণে সন্তানের সাহায্য ও খিদমতের মুখাপেক্ষী হন, তাহলে সন্তান তাঁদের খিদমত এবং আরাম প্রদান করে আল্লাহর প্রতিদানের আকাঙ্ক্ষী হবে। আর তাতেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। এ ধরনের অসহায় অবস্থায় ইসলামে মাতা-পিতার সান্নিধ্যে থেকে খিদমত করা হিজরত ও জিহাদের মতো উত্তম আমলের চেয়েও অতি উত্তম কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি মাতা-পিতাকে কাঁদায়ে রেখে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হিজরতের বাইয়াত করার জন্য উপস্থিত হলো। এ সময় হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'যাও, মাতা-পিতার নিকট ফিরে যাও এবং তাঁদেরকে সেভাবে খুশী করে এসো যেভাবে কাঁদিয়ে এসেছো।"-আবু দাউদ
তিনি আরো বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট জিহাদে শরীক হওয়ার উদ্দেশ্যে হাজির হলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মাতা-পিতা জীবিত আছেন? সে বললো, জ্বী হাঁ। আল্লাহর শোকর যে, জীবিত আছেন। তিনি বললেন, যাও, তাঁদের খিদমত করতে থাকো। এটাই জিহাদ। -মুসলিম, আবু দাউদ

📘 মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার > 📄 মাতা-পিতার আনুগত্যের চূড়ান্ত রূপ

📄 মাতা-পিতার আনুগত্যের চূড়ান্ত রূপ


عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رضـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ أَصْبَحَ مُطِيعًا لِلَّهِ فِي وَالِدَيْهِ أَصْبَحَ لَهُ بَابَانِ مَفْتُوحَانِ مِنَ الْجَنَّةِ وَإِنْ كَانَ وَاحِدًا فَوَاحِدًا وَمَنْ أَمْسَى عَاصِيًّا لِلَّهِ فِي وَالِدَيْهِ أَصْبَحَ لَهُ بَابَانَ مَفْتُوحَانِ مِنَ النَّارِ وَإِنْ كَانَ وَاحِدًا فَوَاحِدًا قَالَ رَجُلٌ وَإِنْ ظَلَمَاهُ قَالَ وَإِنْ ظَلَمَاهُ وَإِنْ ظلَمَاهُ وَإِنْ ظَلَمَاهُ - مشكوة
"হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মাতা-পিতা সম্পর্কিত আল্লাহর নাযিলকৃত হুকুম-আহকাম এবং হেদায়াত মানা অবস্থায় সকাল করলো, সে যেন নিজের জন্য জান্নাতের দুটি দরজা খোলা অবস্থায় সকাল করলো। যদি মাতা-পিতার মধ্যে কোনো একজন হয় তাহলে যেন জান্নাতের একটি দরজা খোলা অবস্থায় পেল। আর যে ব্যক্তি মাতা-পিতা সম্পর্কিত আল্লাহর হুকুম ও হেদায়াত অমান্য করলো, তাহলে তার জন্য জাহান্নামের দুটি দরজা খোলা হবে। যদি মাতা-পিতার মধ্যে কোনো একজন থাকেন, তাহলে যেন জাহান্নামের একটি দরজা খোলা পেল। সে ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! যদি মাতা-পিতা তার সাথে বাড়াবাড়ি করে তাহলেও? তিনি বললেন, যদি বাড়াবাড়ি করে থাকেন তাহলেও। যদি বাড়াবাড়ি করে থাকেন তাহলেও। যদি বাড়াবাড়ি করে থাকেন তাহলেও।”-মিশকাত
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতা-পিতার সাথে সুন্দর আচরণের তাকিদ দানের জন্য এ ধরনের বর্ণনা পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। ফলে একজন মুমিনের সামনে এ তাৎপর্য প্রতিভাত হয় যে, আনুগত্য শুধু আল্লাহর জন্যই হওয়া উচিত। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য বৈধ নয়। মাতা-পিতার আনুগত্য এবং তাদের সাথে সুন্দর আচরণও এজন্য যে, আল্লাহ মাতা-পিতার অধিকার বর্ণনা করেছেন এবং তা মেনে চলার ও খিদমতের নির্দেশ দিয়েছেন। মুমিন ব্যক্তি এমন কোনো ব্যাপারে অবশ্যই মাতা-পিতার আনুগত্য করবে না যাতে আল্লাহর নাফরমানী হয়।
মাতা-পিতার বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও সুন্দর আচরণের অর্থ হলো, যদি মাতা- পিতা কঠোর মেজাজের কারণে এমন সব দাবী করতে থাকেন, যা পূরণ করা সন্তানের জন্য কঠিন হয় অথবা সন্তানদের সহ্যের সীমার কথা চিন্তা না করে বেশী বেশী পরিশ্রম করাতে থাকেন অথবা সন্তানদের সামর্থ্যের বাইরে অতিরিক্ত আর্থিক দাবী করতে থাকেন তাহলেও সন্তানদের উচিত নিজেদের আবেগ কাবুতে রেখে এবং জোর করে তাদের খিদমত ও সুন্দর আচরণ অব্যাহত রাখা।
এ অবস্থায় যদিও সন্তানের উপর আনুগত্য ওয়াযিব নয়। কেননা আল্লাহ কারোর উপর সাধ্য বা সামর্থ্যের বেশী বোঝা আরোপ করেন না, তবুও মাতা-পিতার আনুগত্যের এটাই চূড়ান্ত রূপ। সন্তান নিজের সামর্থ্যের বাইরে মাতা-পিতার খিদমতে নিজের জীবন বিলিয়ে দেবে এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখা ও আরাম প্রদানের জন্য সব কিছুই ত্যাগ করবে।
হ্যাঁ, যদি এমন দাবী করেন যাতে অন্যের অধিকার খর্ব হয়, অথবা তার বিস্বাদপূর্ণ প্রভাব অন্যের উপর আপতিত হয় অথবা আল্লাহর কোনো হুকুমের বিরোধিতা হয় তাহলে অবশ্যই আনুগত্য করতে হবে না। উদাহরণ স্বরূপ, তারা কারোর অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ে বাধা দান করে অথবা নীরেট ব্যক্তিগত শত্রুতা অথবা জিদের বশবর্তী হয়ে কন্যাকে বিনা কারণে এমন স্বামী থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বনে বাধ্য করতে চায় যে স্ত্রীর শরীয়তের অধিকার আদায়ে কার্পণ্য করে না। অথবা এ ধরনের স্বামীর খিদমত ও আনুগত্যে বাধা দেয়। তাহলে এ ধরনের মাতা-পিতার আনুগত্য অবশ্যই ওয়াযিব নয়। কেননা অন্যের অর্থনৈতিক অধিকার আদায় করা ফরয এবং তা না করা মারাত্মক গুনাহর কাজ। হকদার যদি ক্ষমা করে তাহলেই শুধু আল্লাহ এ ধরনের গুনাহ মাফ করে থাকেন।
স্বামীর খিদমত ও আনুগত্য অথবা তার সম্পর্ক রাখার প্রশ্নেও একটি জিনিস সামনে রাখতে হবে। তাহলো, বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা এবং তাদের সুন্দর সম্পর্ক আল্লাহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত পসন্দনীয় কাজ। আর ইসলাম যে কোনো মূল্যে এ সম্পর্ক কায়েম রাখার তাকিদ দেয়।
নিসন্দেহে মাতা-পিতার আনুগত্য করা ফরয কিন্তু এ আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের অধীন। এটা কোনো স্বাধীন আনুগত্য নয়। দীনের হেদায়াত, আহকাম, দাবী এবং মুসলিহাত থেকে পিছপা হয়ে মাতা-পিতার আনুগত্য। আল্লাহর আনুগত্য নয় বরং এটা আল্লাহর নাফরমানী। এ ধরনের আনুগত্য করে কোনো মুমিন সওয়াবের আশা করতে পারেন না। শাস্তিই তার প্রাপ্য হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "যদি একজনের আনুগত্য হয় তাহলে জান্নাতের এক দরজা খোলা থাকে। এর অর্থ এই নয় যে, মাতা-পিতার মধ্যে যদি কেউ ইন্তিকাল করেন এবং এখন আর তার আনুগত্যের ও খিদমতের সুযোগ নেই, তাহলে এ ধরনের সন্তানের জন্য ব্যাস একটি দরজাই খোলা রয়েছে, বরং তার মর্মার্থ হলো, যদি মাতা-পিতার মধ্য থেকে একজনের আনুগত্য করছে এবং অন্যজনকে অসন্তুষ্ট রেখেছে তাহলে একজনের আনুগত্যের জন্য বেহেশতের দরজা খোলা রয়েছে এবং অন্যের নাফরমানীর জন্য দোযখের দরজা খোলা রাখা হয়েছে। যদি উভয়ের মধ্য থেকে একজন দুনিয়া থেকে বিদায় নেন এবং জীবিতাবস্থায় তার আনুগত্য করা হয়েছে তাহলে এ আনুগত্যের বিনিময়ে খোলা দরজা খোলাই থাকবে তা বন্ধ করা হবে না।
হাদীসটিতে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে যে, যদি কেউ একজনের আনুগত্য করে এবং অন্যজনকে নিজের কাজের মাধ্যমে অসন্তুষ্ট রাখে তাহলে তা সঠিক নয়। 'একজনের আনুগত্যের কারণে আল্লাহ জান্নাতের দরজা খুলে রাখেন। কিন্তু অন্যজনের নাফরমানীর কারণে স্বয়ং জাহান্নামের দরজা খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। একজনের আনুগত্য করে অন্যজনের খিদমত ও আনুগত্য প্রশ্নে নিশ্চিত থাকা কোনো মুমিনের সঠিক পদ্ধতি হতে পারে না। সেতো উভয়ের খিদমত ও আনুগত্য করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00