📄 শয়তান কাদের বিপথগামী করে এবং সে কাদের বন্ধু ও অভিভাবক?
আমরা এখানে আল কুরআনের কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করছি। এ আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে শয়তান কাদেরকে বিপথগামী করে। সে কাদের অভিভাবকত্ব করে এবং কারা তার ভক্ত বন্ধু ও অনুসারী? মহান আল্লাহ বলেন :
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَن تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ • تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَاكَ أَثِيمٍ . يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ
অর্থ: (হে মানুষ!) আমি কি তোমাদের সংবাদ দেবো, শয়তানরা কাদের উপর নাযিল হয় (কাদের ঘাড়ে চেপে বসে)? -তারা চেপে বসে ঘোরতর মিথ্যাবাদী পাপাসক্তদের ঘাড়ে; যারা কান পেতে থাকে এবং মিথ্যা কথা ছড়ায়। (সূরা ২৬ আশ্ শোয়ারা : আয়াত ২২১-২২৩)
أَلَمْ تَرَ أَنَّا أَرْسَلْنَا الشَّيَاطِينَ عَلَى الْكَافِرِينَ تَؤُزُّهُمْ أَنَّا .
অর্থ: তুমি কি দেখোনা, আমি শয়তানদের ছেড়ে রেখেছি; তারা কাফিরদের উপর সওয়ার হয় এবং তাদেরকে মন্দ কর্মে প্রলুব্ধ করে? (সূরা মরিয়ম : ৮৩)
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ . وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ .
অর্থ: তুমি তাদেরকে ঐ ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শুনাও যার কাছে আমি আমার আয়াত পাঠিয়েছিলাম; কিন্তু সে তা বর্জন করে। অতএব শয়তান তার পেছনে লাগে এবং সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আমি চাইলে তা (আমার আয়াত) দ্বারা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করতে পারতাম; কিন্তু সে (তা বর্জন করে) দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। (সূরা ৭: ১৭৫-১৭৬)
إِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ وَالَّذِينَ هُم بِهِ مُشْرِكُونَ .
অর্থ : শয়তান তো কেবল তাদের উপরই কর্তৃত্ব ও আধিপত্য করে, যারা তাকে বন্ধু ও অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে, আর যারা আল্লাহ্র সাথে শরিক করে। (সূরা ১৬ আন নহল: আয়াত ১০০)
وَلِتَصْغَىٰ إِلَيْهِ أَفْئِدَةُ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ وَلِيَرْضَوْهُ وَلِيَقْتَرِفُوا مَا هُم مُّقْتَرِفُونَ .
অর্থ: যারা আখিরাতে বিশ্বাস করেনা, তাদেরকে নিজের প্রতি অনুরক্ত ও পরিতুষ্ট করা এবং নিজেরা যেসব অপকর্ম করে, তাদেরকে দিয়েও সেসব অপকর্ম করানোর উদ্দেশ্যেই শয়তান কুমন্ত্রণা দেয়। (সূরা আনআম: আয়াত ১১৩)
لِيَجْعَلَ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ فِتْنَةٌ لِلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ وَالْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُمْ .
অর্থ: তিনি এমনটি করেন শয়তানের উদ্ভাবিত সন্দেহকে ঐসব লোকদের জন্যে ফিতনা (পরীক্ষা) বানানোর জন্যে, যাদের অন্তরে রয়েছে ব্যধি এবং যারা পাষন্ড। (সূরা ২২ আল হজ্জ: আয়াত ৫৩)
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ . وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ . حَتَّىٰ إِذَا جَاءَنَا قَالَ يَا لَيْتَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ بُعْدَ الْمَشْرِقَيْنِ فَبِئْسَ الْقَرِينُ . وَلَن يَنفَعَكُمُ الْيَوْمَ إِذْ ظَلَمْتُمْ أَنَّكُمْ فِي الْعَذَابِ مُشْتَرِكُونَ . أَفَأَنتَ تُسْمِعُ الصُّمَّ أَوْ تَهْدِي الْعُمْيَ وَمَن كَانَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ .
অর্থ: যে কেউ আল্লাহর যিকর (কুরআন এবং আল্লাহ্ ইবাদত) থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, আমরা তার সাথি-বন্ধু হিসেবে শয়তানকে নিয়োগ করি। তখন তারাই ঐ লোকদেরকে আল্লাহর পথে চলা থেকে বিরত রাখে; অথচ তারা মনে করে তারা সঠিক পথেই চলছে। অবশেষে যখন (কিয়ামতের দিন) আমার কাছে উপস্থিত হবে, তখন সে শয়তানকে বলবে : 'হায়, (পৃথিবীতে) আমার ও তোমার মধ্যে যদি পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব থাকতো।' কতইনা নিকৃষ্ট সাথি এই শয়তান। (তখন তাদের বলা হবে:) আজ তোমাদের অনুতাপ তোমাদের কোনো কাজেই আসবেনা। যেহেতু তোমরা তো যুলুম-সীমালংঘন করে এসেছো, তাই তোমরা সকলেই আযাবের শরিকদার। (হে নবী!) তুমি কি শুনাতে পারবে বধিরকে? কিংবা পথ দেখাতে পারবে কি অন্ধকে? আর ঐ ব্যক্তিকে যে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত? (সূরা ৪৩ যুখরুফ : আয়াত ৩৬-৪০)
অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন: “তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করোনি, যারা আল্লাহর গযব প্রাপ্ত লোকদের (ইহুদি ও অন্যান্যদের) বন্ধু ও অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে? আসলে এরা তাদের দলভুক্তও নয়, তোমাদের দলভুক্তও নয়। তারা জেনে শুনেই মিথ্যা শপথ করে ... ... ...।" ו
অতপর এ লোকদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন :
اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنسَاهُمْ ذِكْرَ اللَّهِ أُولَئِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَاسِرُونَ .
অর্থ: "শয়তান তাদের উপর প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করে নিয়েছে। ফলে সে তাদের ভুলিয়ে দিয়েছে আল্লাহর স্মরণ। এরাই শয়তানের দল। সাবধান হও, শয়তানের দল অবশ্যি পরাস্ত-ক্ষতিগ্রস্ত হবে।" (সূরা ৫৮ মুজাদালা: আয়াত ১৪-১৯)
শয়তান কাদের বিপথগামী করে? কাদের উপর আধিপত্য করে? কাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে? কাদেরকে ধোকা ও প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে রাখে? কোন্ ধরনের লোকেরা তার সাথি-বন্ধু? শয়তানই বা কাদের বন্ধু, কাদের অভিভাবক? কাদের পরিচালক? উপরোল্লেখিত আয়াত সমূহের আলোকে এসব প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব হলো ঐসব লোকদের:
০১. যারা মিথ্যাবাদী, মিথ্যা কথা বলে এবং ছড়ায়।
০২. যারা পাপকর্ম করে বেড়ায়, যারা পাপাসক্ত।
০৩. যারা গোপন কথা শুনে, রঙ ছড়িয়ে গোপন কথা প্রচার করে।
০৪. যারা কুফুরি এবং আল্লাহদ্রোহীতায় লিপ্ত।
০৫. যারা আল্লাহর আয়াত ও হুকুম বিধান জানতে পেরেও বর্জন করে।
০৬. যারা দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং আখিরাতের চাইতে দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়।
০৭. যারা প্রবৃত্তি তথা কামনা বাসনার অনুসরণ করে, আত্মার দাসত্ব করে।
০৮. যারা শয়তানকে সাথি, বন্ধু ও অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে এবং শয়তানের তাবেদারি করে।
০৯. যারা শিরক-বিদআতে লিপ্ত হয়।
১০. যারা আখিরাতের প্রতি উদাসীন, যারা আখিরাতে বিশ্বাস করেনা।
১১. যারা শয়তানের কুমন্ত্রণায় তার প্রতি অনুরক্ত, পরিতুষ্ট হয় এবং তার প্ররোচনায় কুকর্মে লিপ্ত হয়।
১২. যাদের অন্তরে ব্যাধি (মোনাফেকি, বিদ্বেষ, কুধারণা, অহংকার) আছে।
১৩. যারা পাষন্ড, যাদের অন্তর মানবতাবোধ ও দয়ামায়া শূন্য।
১৪. যারা কুরআন থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, কুরআন অনুধাবন ও অনুসরণ করেনা।
১৫. যারা আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে গাফিল।
১৬. যারা সব কাজে আল্লাহকে স্মরণ করেনা।
১৭. যারা ভ্রান্ত পথে চলেও ঠিক পথে আছে বলে মনে করে, যারা সত্য মিথ্যা ও ন্যায় অন্যায় যাচাই করেনা।
১৮. যারা সত্যকে শুনার ও বুঝার ক্ষেত্রে বধিরের মতো ভূমিকা পালন করে।
১৯. সত্যকে দেখা ও মূল্যায়ণ করার ক্ষেত্রে অন্ধের মতো ভূমিকা গ্রহণ করে।
২০. যারা ইহুদি, (খৃষ্টান) ও আল্লাহর গযবে নিমজ্জিত লোকদের বন্ধু, পৃষ্ঠপোষক ও অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে।
২১. যারা মিথ্যা শপথ করে, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়।
২২. যারা শয়তানের দলভুক্ত হয়েছে।
-এসব লোকদের ঘাড়েই সওয়ার হয় শয়তান। সে তাদের গলায় রশি আর নাকে লাগাম লাগিয়ে ঘুরাতে থাকে আল্লাহদ্রোহীতা ও পাপ পংকিলতার অলিতে গলিতে। তাদের চোখে সে পার্থিব জীবনকে করে তোলে কেবলই ভোগের বস্তু। তাদের প্রতিটি অপকর্মকেই তাদের সামনে তুলে ধরে চমৎকার ও শোভনীয় করে। অবশেষে তাদেরকে সে উপযুক্ত করে গড়ে তুলে জাহান্নামে তার শরিকদার হিসাবে।
📄 শয়তান কাদের উপর কর্তৃত্ব চালাতে পারেনা?
শয়তান সব মানুষের উপর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য চালাতে পারেনা। যারা খাঁটি ঈমানদার, আল্লাহর নিষ্ঠাবান দাস, যারা আল্লাহর পথে অটল অবিচল থাকে, যারা নির্ভীক -আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করেনা এবং যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা করে, শয়তান তাদের উপর কর্তৃত্ব চালাতে পারেনা। দেখুন মহান আল্লাহর বাণী :
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ وَكَفَى بِرَبِّكَ وَكِيلًا
অর্থ : আমার যারা নিষ্ঠাবان দাস নিশ্চয়ই তাদের উপর তোর কোনো প্রকার কর্তৃত্ব- আধিপত্য চলবেনা। (হে মুহাম্মদ!) উকিল হিসেবে আল্লাহই তোমার জন্যে যথেষ্ট। (সূরা ১৭ ইসরা: আয়াত ৬৫)
إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ .
অর্থ: জেনে রাখো, যারা ঈমান আনে, ঈমানের পথে চলে এবং তাদের মহান প্রভু আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে, তাদের উপর শয়তানের কোনো প্রভাব, আধিপত্য ও কর্তৃত্বই চলেনা। (সূরা ১৬ আন নহল : আয়াত ৯৯)
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
অর্থ : যারা সতর্ক সচেতন লোক, শয়তানের পক্ষ থেকে যখনই তারা কোনো কুচিন্তা, কুমন্ত্রনা ও প্ররোচনা অনুভব করে, তখনই তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং সাথে সাথে তাদের চোখ খুলে যায়, তারা সজাগ সতর্ক হয়ে যায় এবং সত্য পথ ও সঠিক কর্মপন্থা স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। (সূরা ৭ আ'রাফ: ২০১)
قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ وَ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ . قَالَ هَذَا صِرَاطٌ عَلَيَّ مُسْتَقِيمٌ . إِنْ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ ، وَإِنْ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ .
অর্থ: ইসলিস বললো: 'হে প্রভু! আপনি যেহেতু আমাকে বিপথগামী করলেন, তাই পৃথিবীতে আমি মানুষের কাছে তাদের পাপ কর্মসমূহকে শোভনীয় ও চমৎকার করে তুলবো এবং আমি তাদের সবাইকে বিপথগামী করে ছাড়বো- কেবল তাদের মধ্যকার ঐলোকদের ছাড়া, যারা আপনার মনোনীত নিষ্ঠাবান সুপথ প্রাপ্ত।' আল্লাহ বললেন: হ্যা, এটাই আমার কাছে পৌছার সরল সঠিক পথ-নিষ্ঠার সাথে সরল সঠিক পথে চলা আমার দাসদের উপর তোর কোনো প্রভাব-কর্তৃত্ব-আধিপত্য চলবেনা; তবে বিপথগামীদের যারা তোর অনুসরণ করবে, তাদের কথা ভিন্ন। জাহান্নামই তাদের সবার প্রতিশ্রুত আবাস। (সূরা ১৫ আল হিজর : আয়াত ৩৯-৪৩)
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا ، إِنَّمَا يَدْعُو حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِيرِ • الَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ .
অর্থ : শয়তান তোমাদের চিরশত্রু; সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ। সে তো তার দলকে (অনুসারীদেরকে) জাহান্নামী হবার দিকেই দাওয়াত দেয় (প্রলুদ্ধ করে)। যারা তার দাওয়াতে (প্ররোচনায় পড়ে) কুফুরির পথ অবলম্বন করে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। আর যারা ঈমান আনে এবং আমলে সালেহ করে (ঈমানের পথে চলে এবং পূণ্য কর্ম করে) তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। (সূরা ৩৫ ফাতির: আয়াত ৬-৭)
وَإِمَّا يَتَزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ .
অর্থ: তুমি যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার প্ররোচনা অনুভব করো, তবে সাথে সাথে তার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাও। তিনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞানী। (সূরা ৪১ হামিম আস্সাজদা: আয়াত ৩৬)
শয়তান কোন্ ধরনের লোকদের উপর কর্তৃত্ব এবং আধিপত্য চালাতে পারেনা, উল্লেখিত আয়াতগুলো থেকে তার একটা সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। সংক্ষেপে সাজিয়ে বললে বলা যায় যে, শয়তান যাদের উপর তার কর্তৃত্ব, আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার করতে পারেনা, তারা হলো :
১. যারা আল্লাহর নিষ্ঠাবান দাস। যারা আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্বে এবং তাঁর ইবাদতে নিষ্ঠাবান।
📄 শয়তানের ব্যাপারে মহান আল্লাহর মর্মস্পর্শী উপদেশ
এযাবতকার আলোচনা থেকে পরিষ্কার হলো, মানুষের মূল দুশমন হলো শয়তান। সে মানুষের স্বঘোষিত সুস্পষ্ট দুশমন। তার সর্বসাধনা হলো, মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য বানিয়ে জাহান্নামের পথে পরিচালিত করা। এ উদ্দেশ্যে সে মানুষের বিরুদ্ধে ধোকা, প্রতারণা ও বিভ্রান্তির জাল বিস্তার করে।
অপরদিকে মানুষও অজ্ঞতা, অন্ধতা, অহমিকা, লোভ লালসা, কামনা বাসনা ও দুনিয়ার মোহের কারণে শয়তানের প্রতারণা ও বিভ্রান্তির জালে আটকা পড়ে।
মানুষ যেনো সতর্ক হয়, শয়তানের প্রতারণার জালে আঁটকা না পড়ে, সে উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ কুরআন মজিদে মানুষকে অনেক মর্মস্পর্শী উপদেশ দিয়েছেন। শয়তানের ব্যাপারে মহান আল্লাহর কয়েকটি উপদেশ উল্লেখ করা হলো:
يَا بَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُم مِّنَ الْجَنَّةِ يَنزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآتِهِمَا إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ .
অর্থ: হে আদম সন্তান! শয়তান যেনো তোমাদেরকে তেমনিভাবে ফিতনায় না ফেলে, যেমন করে সে তোমাদের আদি পিতা মাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল এবং তাদের শরীর থেকে তাদের পোষাক খসিয়ে ফেলেছিল, যাতে তাদের লজ্জাস্থান একে অপরের সামনে খুলে যায়। সে এবং তার সাথি তোমাদেরকে এমন জায়গা থেকে দেখতে পায় যেখান থেকে তোমরা তাকে দেখতে পাওনা। যারা ঈমান আনেনা তাদের জন্যে আমি শয়তানদের অলি (অভিভাবক) বানিয়ে দিয়েছি। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২৭)
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ . وَإِنْ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ . لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابٍ لِّكُلِّ بَابٍ مِنْهُمْ جُزْءٌ مَّقْسُومٌ . إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ . ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ آمِنِينَ . وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلَّ إِخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُّتَقَابِلِينَ . لَا يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ نَبِي عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ . وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الْأَلِيمُ .
অর্থ: নিশ্চয়ই যারা আমার নিষ্ঠাবান দাস তাদের উপর তোর কোনো আধিপত্য খাটবেনা। তোর কর্তৃত্ব শুধু ঐ সব ভ্রষ্ট লোকদের উপরই চলবে, যারা তোকে মেনে চলে। তাদের সবার জন্যে দোযখের শাস্তির ওয়াদা রইলো, যার রয়েছে সাতটি দরজা। প্রতিটি দরজার জন্যে তাদের মধ্য থেকে একটি অংশকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। অপরদিকে মুত্তাকি (সতর্ক) লোকেরা থাকবে বাগানে ও ঝরণাসমূহের মধ্যে। তাদেরকে বলা হবে, 'তোমরা এতে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে প্রবেশ করো।' তাদের অন্তরে একে অপরের প্রতি কোনো প্রকার কুণ্ঠাভাব থাকলে তা আমি দূর করে দেবো। তারা ভাই ভাই হয়ে সামনা-সামনি আসনে বসবে। যেখানে কোনো রকম কষ্ট তাদের স্পর্শ করবেনা এবং সেখান থেকে তাদেরকে বেরও করে দেয়া হবেনা। (হে নবী!) আমার দাসদের জানিয়ে দাও আমি ক্ষমাশীল ও মেহেরবান, কিন্তু সেই সংগে আমার আযাবও ভয়ানক যন্ত্রণাদায়ক। (সূরা ১৫ হিজর: আয়াত ৪২-৫০)
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلًا .
অর্থ : স্মরণ করো, যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, 'আদমকে সাজদা করো,' তখন তারা সাজদা করলো, কিন্তু ইবলিস করলোনা। সে ছিলো জিন। সে তার প্রভুর হুকুম অমান্য করলো। তোমরা কি আমাকে বাদ দিয়ে তাকে ও তার বংশধরদেরকেই তোমাদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে? অথচ তারা তোমাদের দুশমন। এটা কতইনা মন্দ বদল, যা যালিমরা (আল্লাহর বদলে) গ্রহণ করেছে। (সূরা ১৮ আল কাহাফ: আয়াত ৫০)
وَقُل لِّعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَتَرَغُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنسَانِ عَدُوًّا مُّبِينًا .
অর্থ: (হে নবী!) আমার নিষ্ঠাবান দাসদের বলে দাও, তারা যেনো এমন কথা বলে যা খুব ভালো। আসলে শয়তানই মানুষের মধ্যে কুমন্ত্রণা দিয়ে ফাসাদ সৃষ্টি করে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের জন্যে প্রকাশ্য দুশমন। (সূরা ১৭ ইসরা : ৫৩)
সূরা আন্ নিসায় মহান আল্লাহ বলেন : আল্লাহ শুধু শিরকের গুনাহ্ই মাফ করেন না, এছাড়া আর সব গুনাহ্ই মাফ করেন, যার বেলায় তিনি ইচ্ছা করেন। যে আল্লাহর সাথে শরিক করে সে তো গুমরাহিতে বহুদূর চলে গেছে। ওরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে দেবীদের মা'বুদ বানায়। আর ওরা ঐ বিদ্রোহী শয়তানকে মা'বুদ বানায়, যার উপর আল্লাহ লা'নত করেছেন। (ওরা ঐ শয়তানকে মেনে চলে) যে আল্লাহকে বলেছিল, 'আমি তোমার বান্দাহদের মধ্য থেকে এক নির্দিষ্ট হিস্যা দখল করেই ছাড়বো। (সে আরো বলেছিল) অবশ্যি আমি তাদেরকে গুমরাহ করবো, আশার ছলনায় ভুলাবো, তাদের আমি হুকুম করবো এবং আমার হুকুম মতো তারা পশুর কানে ছিদ্র করবে, আমি তাদেরকে হুকুম করবো এবং তারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে বিকৃতি ঘটাবে। যে কেউ আল্লাহ্ বদলে শয়তানকে অলি বানাবে, সে সুস্পষ্ট ক্ষতির মধ্যে পড়বে। শয়তানতো তাদের সাথে ওয়াদা করে এবং তাদেরকে আশা দিয়ে ভুলায়। অথচ শয়তানের ওয়াদা ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। এদের ঠিকানা হলো দোযখ, যেখান থেকে মুক্তির কোনো উপায় ওরা পাবেনা। আর যারা ঈমান আনবে এবং নেক আমল করবে তাদেরকে আমি এমন বাগানে দাখিল করবো, যার নিচে নদী সমূহ প্রবহমান থাকবে এবং তারা সেখানে থাকবে চিরকাল। এটা আল্লাহর খাঁটি ওয়াদা। আর আল্লাহর চেয়ে নিজের কথায় আর কে বেশি সত্যবাদী হতে পারে? (সূরা ৪ আন নিসা: আয়াত ১১৬-১২২)
وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ .
অর্থ : অনেক জিন ও মানুষকেই আমি দোযখের জন্যে সৃষ্টি করেছি। (কারণ,) তাদের দিল আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা চিন্তা করেনা। তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখেনা। তাদের কান আছে, কিন্তু তার সাহায্যে তারা শুনেনা। তারা পশুর মতো; বরং তার চেয়েও অধম। এরাই ঐ সব লোক যারা গাফলতির মধ্যে পড়ে আছে। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৭৯)
আল্লাহ পাক সূরা আল ফুরকানে বলেন: ঐদিন একটি মেঘ আসমানকে ভেদ করে এগিয়ে আসবে এবং ফেরেশতাদের একের পর এক নাযিল করা হবে। সেদিন সত্যিকারের কর্তৃত্ব হবে শুধু রহমানের। কাফিরদের জন্যে সে দিনটি হবে বড়ই কঠিন। যালিম লোকেরা সেদিন নিজেদের দু'হাত কামড়াতে কামড়াতে বলবে: হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি রসূলের সাথে এক পথে চলতাম! হায় আমার পোড়া কপাল! আমি যদি অমুক লোকটিকে বন্ধু না বানাতাম! তারই ধোকায় পড়ে আমি ঐ উপদেশ মেনে চলিনি, যা আমার কাছে এসেছিল। মানুষের জন্যে শয়তান বড়ই বিশ্বাসঘাতক। (সূরা ২৫ ফুরকান: আয়াত ২৫-২৯)
الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنْ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا
অর্থ : যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর পথে লড়ে যায়, আর যারা কুফরি করেছে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। তাই শয়তানের সাথিদের বিরুদ্ধে লড়ে যাও। জেনে রাখো, শয়তানের চাল বড়ই দুর্বল। (সূরা ৪ নিসা : আয়াত ৭৬)
📄 শয়তানের কুমন্ত্রণা ও বিভ্রান্তি থেকে বাঁচার উপায় : কুরআনের বাণী
কুরআন মজিদে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার উপায় বলে দেয়া হয়েছে। সেসব উপায় ও প্রক্রিয়া অবলম্বন করলেই শয়তানের প্রতারণা থেকে আত্মরক্ষা করা সম্ভব। সেগুলো হলো:
১. শয়তানের প্ররোচনা অনুভব করলেই আল্লাহর আশ্রয় চাইতে হবে :
وَإِمَّا يَتَزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
অর্থ: যদি কোনো সময় শয়তান তোমাকে উস্কানি দেয় তাহলে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাও। তিনি সবকিছু শুনেন ও জানেন। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২০০)
২. শয়তানের প্ররোচনা অনুভব করার সাথে সাথে আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে :
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
অর্থ : যারা সতর্ক-মুত্তাকি, শয়তানের কারণে কোনো মন্দ ভাব তাদের মনে জাগার সাথে সাথেই তারা সাবধান সতর্ক হয়ে যায়। তখন তারা স্পষ্ট দেখতে পায় (তাদের জন্যে সঠিক পথ কোন্টি)। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২০১)
৩. শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে কুরআন পাঠ শুরু করতে হবে :
فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ •
অর্থ : যখন তোমরা কুরআন পড়তে শুরু করো তখন ধিকৃত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও। (সূরা ১৬ নহল : আয়াত ৯৮)
৪. শয়তানকে দুশমন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে :
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا •
অর্থ : নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের দুশমন। তাই তোমরাও তাকে তোমাদের দুশমন হিসেবে গ্রহণ করো। (সূরা ৩৫ ফাতির : আয়াত ৬)
৫. শয়তানের প্ররোচনা থেকে সবসময় এভাবে দোয়া করতে থাকুন :
رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ . وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ .
অর্থ : প্রভু! শয়তানের প্ররোচনা থেকে আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। প্রভু! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি আমার নিকট তাদের (শয়তানদের) উপস্থিতি থেকে। (সূরা ২৩ আল মুমিনূন: আয়াত ৯৭-৯৮)
টিকাঃ
১২. শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার পদ্ধতি হলো: 'আউযুবিল্লাহি মিনাশ্ শাইতানির রাজিম' বলা, অথবা নিম্নে (৫নম্বরে) উদ্ধৃত দোয়াটি পড়া।