📄 মানুষকে বিপথগামী করার শয়তানি কৌশল : রসূলুল্লাহ সা.-এর বাণীর আলোকে
শয়তানের ধোকা, প্রতারণা ও বিভ্রান্তির কৌশল সম্পর্কে হাদিসে ব্যাপক বক্তব্য এসেছে। আমরা সেগুলোর সার সংক্ষেপ নিম্নে তুলে ধরছি :
০১. শয়তান মানুষকে সালাতের মধ্যে অন্যমনস্ক করে তোলে। একথা ও কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সালাতের রাকাত সংখ্যা ভুলিয়ে দেয়।
০২. হক কথা, সত্য কথা বলা থেকে বিরত রাখে। এরা হলো বোবা শয়তান।
০৩. স্বামী স্ত্রীর গোপন বিষয় প্রকাশ করায় (স্ত্রীর মাধ্যমে এবং স্বামীর মাধ্যমে)। অশ্লীল কথা প্রকাশ করায়।
০৪. দীন সম্পর্কে অজ্ঞ দীনদারদেরকে দীনদারির নাম করিয়ে শিরক, বিদআত ও আল্লাহর নাফরমানির কাজে লিপ্ত করিয়ে দেয়।
০৫. কোনো ব্যক্তিকে মানুষের অজানা টুকিটাকি কথা ধরিয়ে দিয়ে সে ব্যক্তি গায়েব জানে বলে প্রচার করে এবং দীন সম্পর্কে অজ্ঞ ধর্মভীরুদেরকে বিভ্রান্ত করে।
০৬. স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে ঝগড়া বিবাদ লাগিয়ে দেয়।
০৭. মানুষের মধ্যে ঝগড়া ফ্যাসাদ ও হানাহানি উস্কে দেয়।
০৮. মানুষের শরীরে উল্কি চিহ্ন লাগায়।
০৯. মানুষকে দিয়ে অশ্লীল গান কবিতা লেখায় ও শোনায়।
১০. মানুষকে দিয়ে জ্যোতিষবিদ্যা শিখায় এবং মানুষকে জ্যোতিষীদের দারস্থ হতে উদ্বুদ্ধ করে।
১১. সে মানুষকে খাবার শুরুতে এবং অন্যান্য কাজে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে ভুলিয়ে দেয়।
১২. সে মানুষকে মাদক ও নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণে উদ্বুদ্ধ ও আসক্ত করে।
১৩. সে বিভিন্ন বাহানা, অজুহাত ও যুক্তি দেখিয়ে মানুষকে মিথ্যা কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করে।
১৪. গোসলখানা সহ মানুষের গোপনীয় স্থানে গিয়ে মানুষকে মন্দ চিন্তা ও অশ্লীল কাজে উদ্বুদ্ধ করে।
১৫. অসৎ নারীদেরকে সে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে।
১৬. সে মানুষকে বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আসক্ত করে তোলে।
১৭. হাট, বাজার ও বাণিজ্যিক শহরগুলোকে সে তার ধোকা, প্রতারণা ও প্রলুব্ধকরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে।
১৮. সে অপচয় ও অপব্যয়ে উদ্বুদ্ধ করে।
১৯. ভালো কাজে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সে কৃপণ হতে উদ্বুদ্ধ করে।
২০. সে মানুষকে আত্মহনন ও ধ্বংসাত্মক কাজে উদ্বুদ্ধ ও আসক্ত করে।
২১. সে মানুষের মনে আল্লাহ সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি করে দেয়।
২২. সে ফজর নামাযের সময় আরামে ঘুম পাড়িয়ে রাখার চেষ্টা করে।
২৩. সে সালাতে, সভায়-বৈঠকে এবং কর্মস্থলে মানুষের হাই তোলার ব্যবস্থা করে।
২৪. সে মানুষকে বিভ্রান্তিকর ভয়ানক স্বপ্ন দেখায়।
২৫. সে অজ্ঞ লোকদেরকে স্বপ্নে এসে বলে: আমি আল্লাহর রসূল বলছি, তুমি এই কাজ ঐ কাজ করো।
২৬. সে মানুষকে উলঙ্গ করায় এবং সেসব দৃশ্য দেখে অট্টহাসি হাসে।
২৭. সে ফাসিক লোকদেরকে দিয়ে মুমিন মুসলিমদের গালাগাল করায়।
২৮. সে অসতর্ক নামাযীদের অন্যমনস্ক করে এদিকে সেদিকে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করে।
২৯. শয়তান চুরি করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং চুরি শিখায়।
৩০. শয়তান সুযোগ পেলে শিশুদের ক্ষতি করে, বিশেষ করে সাঁঝের বেলায়।
৩১. শয়তান মানুষের মনে কু-ধারণা সৃষ্টি করে দেয়।
৩২. শয়তান মানুষকে রাগান্বিত করে তোলে। ক্রোধ সৃষ্টি করে দেয়।
৩৩. সুযোগ পেলে সে মানুষকে পাগল ও অজ্ঞান করে ছাড়ে।
৩৪. সে প্রমাণিত সত্যের বিপক্ষে মানুষকে যুক্তি ও বুদ্ধির অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সে কুতর্কে লিপ্ত করিয়ে দেয়।
৩৫. সে মিথ্যা চালবাজির খবর ও গুজব ছড়িয়ে দেয়।
৩৬. সে মানুষকে, বিশেষ করে যুবক যুবতীদেরকে বেহুদা ও নিষ্ফল কাজে ব্যস্ত রাখে এবং সুফলদায়ক কাজ থেকে গাফিল করে রাখে।
📄 আল কুরআন শয়তানের সবচেয়ে বড় জালার কারণ
আল কুরআন নাযিল হবার পর কিয়ামত পর্যন্ত একমাত্র কুরআন মজিদই মানবজাতির হিদায়াত ও মুক্তির সন্ধান লাভের মূল উৎস। তাই আল কুরআন থেকে এবং কুরআন অনুধাবন, অনুসরণ ও বাস্তবায়ন থেকে মানব সমাজকে দূরে রাখার জন্যেই নিয়োজিত থাকে শয়তান, তার দলবল ও চেলা চামুন্ডাদের সর্বাধিক চেষ্টা। তাদের ধোকা, প্ররোচনা, প্রলোভন, বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও প্রতারণার জাল বিস্তার প্রধানত মানুষকে কুরআন থেকে দূরে রাখার জন্যেই নিয়োজিত থাকে। সে জন্যেই মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:
فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ .
অর্থ: যখনই তুমি আল কুরআন অধ্যয়নের সংকল্প করবে, তখন ধিকৃত অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে নিও। (সূরা ১৬ আন নহল : আয়াত ৯৮)
এ আয়াতের তফসির প্রসঙ্গে বিখ্যাত তফসির তাফহীমুল কুরআনে বলা হয়েছে :
“এর মর্ম কেবল এতটুকুই নয় যে, মুখে শুধুমাত্র أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ উচ্চারণ করলেই হয়ে যাবে। বরং সেই সাথে কুরআন পড়ার সময় যথার্থই শয়তানের বিভ্রান্তিকর প্ররোচনা থেকে মুক্ত থাকার বাসনাও পোষণ করতে হবে এবং কার্যত তার প্ররোচনা থেকে নিষ্কৃতি লাভের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। ভুল ও অনর্থক সন্দেহ-সংশয়ে লিপ্ত হওয়া যাবেনা। কুরআনের প্রত্যেকটি কথাকে তার সঠিক মর্মের আলোকে দেখতে হবে। নিজের মনগড়া মতামত বা বাইরে থেকে আমদানি করা চিন্তার মিশ্রণে কুরআনের শব্দাবলীর এমন অর্থ করা যাবেনা, যা আল্লাহর ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থি। সাথে সাথে মানুষের মনে এ চেতনা এবং উপলব্ধিও জাগ্রত থাকতে হবে যে, মানুষ যাতে কুরআন থেকে কোনো পথ নির্দেশনা লাভ করতে না পারে সে জন্যেই শয়তান সবচেয়ে বেশি তৎপর থাকে। এ কারণে মানুষ যখনই এ কিতাবটির প্রতি মনোনিবেশ করে, তখনি শয়তান তাকে বিভ্রান্ত করার এবং পথ নির্দেশনা লাভ থেকে বাধা দেবার এবং তাকে ভুল চিন্তার পথে পরিচালিত করার জন্যে উঠে পড়ে লাগে। তাই এ কিতাবটি অধ্যয়ন করার সময় মানুষকে অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে, যাতে শয়তানের প্ররোচনা ও সূক্ষ্ম অনুপ্রবেশের কারণে সে এ হেদায়েতের উৎসটির কল্যাণকারিতা থেকে বঞ্চিত না হয়ে যায়। কারণ, যে ব্যক্তি এ কিতাব থেকে সঠিক পথের সন্ধান লাভ করতে পারেনি, সে অন্য কোথাও থেকে সৎপথের সন্ধান পাবেনা। আর যে ব্যক্তি এ কিতাব থেকে ভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে দুনিয়ার অন্য কোনো জিনিস তাকে বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেনা। এ আয়াতটি একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে নাযিল করা হয়েছে। সে উদ্দেশ্যটি হচ্ছে এই যে, সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে এমন সব আপত্তির জবাব দেয়া হয়েছে যেগুলো মক্কার মুশরিকরা কুরআন মজিদের বিরুদ্ধে উত্থাপন করতো। তাই প্রথমে ভূমিকা স্বরূপ বলা হয়েছে, কুরআনকে তার যথার্থ আলোকে একমাত্র সে ব্যক্তিই দেখতে পারে, যে শয়তানের বিভ্রান্তিকর প্ররোচনা থেকে সজাগ-সতর্ক থাকে এবং তা থেকে নিজেকে সংরক্ষিত রাখার জন্যে আল্লাহর কাছে পানাহ্ চায়। অন্যথায় শয়তান কখনো সোজাসুজি কুরআন ও তার বক্তব্যসমূহ অনুধাবন করার সুযোগ মানুষকে দেয়না।”
টিকাঃ
১১. আল উস্তায আবুল আ'লা মওদূদী: তাফহীমুল কুরআন, সূরা আন নহল, টীকা ১০১।
📄 শয়তান ইসলামের অনুসারীদের বিরুদ্ধে তার ভক্ত বন্ধুদের লেলিয়ে দেয়
যেসব লোক ইসলামের প্রচলন, অনুসরণ ও বাস্তবায়নকে পছন্দ করেনা, শয়তান তাদের বন্ধু হয়ে যায়। সে তাদেরকে ইসলামের অনুসারীদের শত্রুতা ও বিরুদ্ধাচরণে উস্কে দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন :
وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ.
অর্থ: নিশ্চয়ই শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হতে (to dispute with you) অহি করে (উস্কে দেয়)। তোমরা যদি তাদের আনুগত্য করো, তবে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে। (সূরা ৬ আল আনআম : আয়াত ১২১)
প্রত্যেক নবী ও তাঁর খাঁটি অনুসারীদের বিরুদ্ধেই জিন শয়তান ও মানুষ শয়তান দুশমনিতে লিপ্ত হয়েছে। তারা পরস্পরকে নবী ও নবীর অনুসারীদের বিরুদ্ধে দুশমনি করতে উস্কে দেয়, লেলিয়ে দেয়:
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا .
অর্থ: এভাবে আমরা প্রত্যেক নবীর বিরুদ্ধে মানুষ শয়তান ও জিন শয়তানদের শত্রুতা করার অবকাশ দিয়েছি। তারা পরস্পরকে মনোহরী কথা বলে প্রতারণার উদ্দেশ্যে লেলিয়ে দেয়। (সূরা ৬ আল আনআম: আয়াত ১১২)
📄 শয়তান আল্লাহর নাফরমানি করিয়ে এবং হানাহানি বাধিয়ে দিয়ে কেটে পড়ে
শয়তান মানুষের বন্ধু ও কল্যাণকামী সেজে মানুষকে প্ররোচনা দেয়। আর শয়তানের প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে কেউ যখন আল্লাহর হুকুম অমান্য করে এবং অপরাধ সংঘটিত করে বসে, তখন শয়তান তাকে ফেলে কেটে পড়ে:
كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنسَانِ اكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِنكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ . فَكَانَ عَاقِبَتَهُمَا أَنَّهُمَا فِي النَّارِ.
অর্থ: তাদের উপমা হলো শয়তান। শয়তান মানুষকে (প্ররোচনা দিয়ে) বলে : 'কুফুরি (আল্লাহর হুকুম অমান্য) করো।' অতপর সে যখন কুফুরি করে বসে, তখন শয়তান তাকে বলে 'তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই, আমি তো আল্লাহ রব্বুল আলামীনকে ভয় করি।' ফলে উভয়ের পরিণতিই হবে জাহান্নাম। (সূরা ৫৯ হাশর: আয়াত ১৬-১৭)
শয়তান কিভাবে পরস্পরের মধ্যে বিবাদ ও হানাহানি উস্কে দিয়ে কেটে পড়ে, কুরআন মজিদে আরেক স্থানে মহান আল্লাহ সেকথা এভাবে উল্লেখ করেছেন :
وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّasِ وَإِنِّي جَارٌ لَّكُمْ ۖ فَلَمَّا تَرَاءَتِ الْفِئَتَانِ نَكَصَ عَلَى عَقِبَيْهِ وَقَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِّنكُمْ إِنِّي أَرَى مَا لَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ ۚ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ .
অর্থ: স্মরণ করো, শয়তান তাদের দুষ্টকর্মসমূহ তাদের কাছে চমৎকার ও শোভনীয় করে তুলে ধরেছিল। সে (বদরযুদ্ধ উপলক্ষে কুরাইশদের বলেছিল : '(ঝাপিয়ে পড়ো ওদের বিরুদ্ধে), আজ কোনো মানুষই তোমাদের উপর বিজয়ী হবেনা। আমি তোমাদের পাশেই থাকবো।' তারপর উভয় দল যখন পরস্পরের সম্মুখীন হলো, সে পেছন দিক থেকে কেটে পড়লো এবং তাদের (তার অনুসারী কুরাইশদের) বললো: 'তোমাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা দেখতে পাওনা। আমি আল্লাহকে ভয় করি। আর আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।' (সূরা ৮ আল আনফাল: আয়াত ৪৮)