📄 ইবলিস মানুষের সামনে পিছে ও ডানেবামে থেকে আসবে- একথার অর্থ কী?
এটা ছিলো শয়তানের অংগিকার। আদম সন্তানদের বিপথগামী করার জন্যে সে সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর ওঁৎ পেতে বসে থাকবে। সিরাতুল মুস্তাকিম হলো, মানুষের জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন যাপনের সহজ-সরল সত্য পথ ইসলাম। অর্থাৎ সে মানুষকে ধোকা দেয়ার জন্যে ইসলামের রাজপথের উপর ওঁৎ পেতে বসে থাকার অংগীকার করে।
ইসলামের রাজপথে ওঁৎ পেতে বসে থেকে সে কী করবে? -যখনই কেউ ইসলামের রাজপথে পা বাড়াবে, তখনই তাকে চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলবে। সে এবং তার দলবল ঐ ব্যক্তিকে ধোকা, প্রতারণা ও প্ররোচনা দেয়ার জন্যে তার সামনে থেকে আসবে, পিছনে থেকে আসবে, ডানে থেকে আসবে, বামে থেকে আসবে।
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, শয়তান মানুষের সামনে থেকে আসবে মানে- আখিরাত সম্পর্কে তার মনে সংশয় সৃষ্টির চেষ্টা করবে। পেছনে থেকে আসবে মানে- পার্থিব জীবনের প্রতি তাকে আকৃষ্ট করবে। ডানে থেকে আসবে মানে- তার দীন সম্পর্কে তার মধ্যে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি করে দেবে। বামে থেকে আসবে মানে- আল্লাহর হুকুম আহকাম অমান্য করাকে আনন্দের বিষয় বানিয়ে দেবে।'
খ্যাতনামা তাবেয়ী মুফাস্সির কাতাদা, ইবরাহিম নখয়ী, সুদ্দি এবং ইবনে জুরাইজ (রাহেমাহুমুল্লাহ) বলেছেন: ইবলিসের এ বক্তব্যের মর্ম অনেক গভীর। সে আদম সন্তানদের সামনে থেকে আসবে বলে বুঝাতে চেয়েছে, সে তাদের প্ররোচনা দিয়ে বলবে: পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম এগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই, এগুলো কিছুই ঘটবেনা। পেছনে থেকে আসবে মানে- সে পৃথিবীটাকে লোভনীয়, জমকালো ও মনোহরী করে মানুষের সামনে তুলে ধরবে এবং শুধু এটাকেই অর্জন ও ভোগ করার কাজে মনোনিবেশ করার আহবান জানাবে। ডানে থেকে আসার অর্থ- তার ভালো, উত্তম ও পূণ্য কর্মসমূহের দিক থেকে এসে সেগুলোকে তার কাছে নিষ্ফল কাজ হিসেবে তুলে ধরবে এবং সেগুলো থেকে তাকে নিরাশ ও নিস্পৃহ করে তুলবে। বামে থেকে আসবে মানে- তার মন্দ ও পাপ কর্মসমূহের দিক থেকে আসবে এবং সেগুলোকে তার কাছে চমৎকার, শোভনীয় ও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
এভাবে সামনে পেছনে, ডানে বামে থেকে এসে ইবলিস প্ররোচনার জালে মানুষকে ঘেরাও করে ফেলবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর থেকে তাকে বিচ্যুত ও বিপথগামী করার প্রানান্তকর সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ সা.-এর একটি হাদিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ হাদিসে একটি রূপক উপমার মাধ্যমে তিনি সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে মানুষের বিচ্যুত হবার পন্থা বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি নাওয়াস ইবনে সামআন রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সা. বলেছেন: আল্লাহ সিরাতুল মুস্তাকিমের একটি উপমা দিয়েছেন। (সেটি হলো:) একটি সোজা সরল সুদৃঢ় পথ। সেই পথের দুই ধারে রয়েছে দেয়াল। দেয়ালগুলোতে রয়েছে অনেক উন্মুক্ত দরজা। দরজাগুলোতে রয়েছে ঝালরের পর্দা। আর রাস্তার মাথায় আছেন একজন আহবায়ক। তিনি আহবান করে বলছেন: 'হে মানুষ! তোমরা সবাই মিলে সোজা রাস্তার উপর দিয়ে এগিয়ে চলো, রাস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়োনা।' আরেকজন আহবায়ক আহবান করছে রাস্তার উপর থেকে। যখনই কোনো ব্যক্তি রাস্তার পার্শবর্তী দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে তাকাতে বা ঢুকতে চায়, তখনই এই আহবায়ক তাকে সতর্ক করে বলে উঠে : 'সাবধান! পর্দা সরাবেনা, পর্দা উন্মুক্ত করলে ধ্বংসে নিমজ্জিত হবে।' (অতপর রসূলুল্লাহ সা. বললেন :) সরল পথটি হলো: 'ইসলাম।' দুই পাশের দেয়ালগুলো হলো: 'আল্লাহর নির্ধারিত সীমানা।' উন্মুক্ত দরজাগুলো হলো : 'আল্লাহর নিষিদ্ধ পথ ও বিষয় সমূহ।' রাস্তার মাথার আহবায়ক হলো : 'আল্লাহ্ কিতাব (আল কুরআন)।' রাস্তার উপরের আহবায়ক হলো: প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির অন্তরে অবস্থিত উপদেশ দাতা বা বিবেক।
ইসলামের সরল সঠিক রাজপথে ওঁৎ পেতে বসে থেকে মানুষকে প্রলুব্ধ ও বিভ্রান্ত করে দুই পাশের পাপের গলিতে ঢুকিয়ে দেয়াই শয়তানের কাজ।
টিকাঃ
৯. তফসিরে ইবনে কাছির: সূরা ৭ আল আ'রাফের ১৭ আয়াতের ব্যাখ্যা থেকে উদ্ধৃত।
১০. তিরমিযি, আহমদ। ইমাম যাহাবি এবং নাসিরুদ্দিন আলবানি বলেছেন, হাদিসটি সহীহ্।
📄 শয়তানের প্রতারনার পয়লা শিকার আদম আ.
আদমকে সৃষ্টি করার পর মহান আল্লাহ আদম থেকে বা আদমের পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করেন তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে। তাদের বসবাস করতে দেন জান্নাতে। পৃথিবীতে খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পূর্বে অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ লাভের উদ্দেশ্যেই তাদের কিছু কাল জান্নাতে রাখা হয়। একটি বৃক্ষের ফল ভক্ষণ ছাড়া জান্নাতে পানাহার ও চলা ফেরার অবাধ স্বাধীনতা তাদের দেয়া হয়।
শয়তান, তার দৃষ্টিতে যার কারণে সে চিরতরে অভিশপ্ত হলো, সেই আদমকেই সে তার টার্গেট বানায়। সে আদমকে প্রতারিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আদমের কাছে গিয়ে হাযির হয়। সে তাঁদের কুমন্ত্রণা দিয়ে বলে :
مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ .
অর্থ : তোমাদের প্রভু যে তোমাদেরকে এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন, তার কারণ হলো, তোমরা যেনো ফেরেশতা না হয়ে যাও, অথবা চিরদিন যেনো জান্নাতে থাকতে না পারো। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২০)
শয়তান নিজের এই বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যে কসম খেয়ে বলে :
وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ .
অর্থ: এবং সে (ইবলিস) কসম খেয়ে তাদের বললো: আমি তোমাদের ভালো চাই, আমি তোমাদের কল্যাণকামী। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২১)
এভাবে প্ররোচনা দিয়ে ধীরে ধীরে সে তাদের দু'জনকে তার প্রতারণার জালে আটকে ফেলে। তাঁরা নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করেন। এভাবে অসতর্ক হয়ে তাঁরা সাময়িকভাবে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে বসেন :
فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ
অর্থ : এভাবে সে তাদের দুজনকে প্রতারণার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করলো। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২২)
কিন্তু তাঁরা শয়তানের অনুকরণ করলেন না। শয়তান আল্লাহর হুকুম অমান্য করে অহংকার, হঠকারিতা এবং সীমালংঘনের দিকে অগ্রসর হয়। পক্ষান্তরে আদম ও হাওয়া আল্লাহর হুকুম অমান্য করার সাথে সাথে অনুতপ্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা তওবা করেন, নিজেদের ভুল স্বীকার করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন:
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ •
অর্থ: তারা প্রার্থনা করলো: আমাদের প্রভু! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছি। এখন তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের প্রতি করূণা না করো, তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শামিল হয়ে যাবো! (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২৩)
ফলে আল্লাহ পাক তাঁদের ক্ষমা করে দেন। তারা পবিত্র হয়ে যান।
📄 মানুষকে বিপথগামী করার জন্যে শয়তানের কৌশল : কুরআনের বর্ণনা
মহান আল্লাহ মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়ার জন্যে শয়তানকে সুযোগ ও অবকাশ দিয়েছেন বটে; কিন্তু শয়তানের প্রতারণা ও বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার জন্যে মানুষকে শয়তানি প্রতারণার যাবতীয় কুটকৌশল জানিয়ে দিয়েছেন এবং বাঁচার উপায় বলে দিয়েছেন। শয়তানি প্রতারণার কুটকৌশল সমূহ যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, তেমনি রসূলুল্লাহ সা. কুরআন উপস্থাপনের সাথে সাথে কুরআনের ব্যাখ্যা হিসেবে নিজের বাণীতেও সেগুলো জানিয়ে দিয়ে গেছেন। প্রথমে আমরা কুরআনে বর্ণিত শায়তানি প্রতারণার কুটকৌশল সমূহ এখানে উল্লেখ করছি:
০১. শয়তান মানুষের মনে কুপ্ররোচনা সৃষ্টি করে :
يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ .
অর্থ: সে (খান্নাস হয়ে) কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে। (সূরা ১১৪ নাস : আয়াত ৫)
০২. সে খান্নাসি কৌশল অবলম্বন করে :
مِنْ شَرِّ الْوَسْوَسِ الْخَنَّاسِ
অর্থ : 'আমি আশ্রয় চাই খান্নাসের কুমন্ত্রণার ক্ষতি থেকে।' অর্থাৎ সে এতোটা বদ যে, বারবার সামনে এসে কুমন্ত্রণা দেয় এবং পিছিয়ে যায়, বারবার প্রকাশ হয়ে কুমন্ত্রণা দেয় এবং গোপন হয়ে যায়। (সূরা ১১৪ আন্ নাস: আয়াত ৪)
০৩. শয়তান মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং মানুষের মনে মিথ্যা আশা-বাসনা সৃষ্টি করে :
يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيهِمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا .
অর্থ : সে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং মানুষের মনে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে। আসলে শয়তান তাদের যে ওয়াদা দেয় তা প্রতারণা মাত্র। (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ১২০)
০৪. শয়তান মানুষের মন্দ কাজকে তাদের কাছে শোভনীয় ও মনোহরী (fair seeming) করে তোলে:
وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ •
অর্থ : শয়তান তাদের মন্দ কাজসমূহকে তাদের দৃষ্টিতে চমৎকার ও মনোহরী করে তোলে এবং এভাবে তাদের সরল সঠিক পথ অবলম্বনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। (সূরা ২৯ আনকাবুত : আয়াত ৩৮)
০৫. মানুষ যেনো দান না করে সেজন্যে শয়তান মানুষকে দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং কার্পণ্যে উদ্বুদ্ধ করে :
اَلشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ .
অর্থ : শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং কৃপণতার আদেশ করে। (সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ২৬৮)
০৬. শয়তান মানুষকে মাদক, জুয়া, আস্তানা এবং ভাগ্য নির্ণয়ের খেলায় লিপ্ত করে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ .
অর্থ : হে ঈমানওয়ালা লোকেরা! জেনে রাখো, মদ (মাদক), জুয়া, আস্তানা (বেদী), ভাগ্য নির্ণয়ের শর-এসবই শয়তানের নোংরা কর্ম। সুতরাং তোমরা এগুলো বর্জন করো, সফলতা অর্জন করবে। (সূরা ৫ আল মায়িদা: আয়াত ৯০)
০৭. শয়তান মানুষের মধ্যে পারস্পারিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে :
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ.
অর্থ: শয়তান মাদক ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত আদায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চায়। তবু কি তোমরা (এসব শয়তানি কর্ম থেকে) নিবৃত হবেনা। (সূরা ৫ আল মায়িদা: আয়াত ৯১)
০৮. শয়তান সুদী কারবারে লিপ্ত করে :
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِ .
অর্থ: যারা সুদ খায়, তারা অবশ্যি ঐ ব্যক্তির মতো দাঁড়াবে, যাকে শয়তান তার স্পর্শ দ্বারা সুস্থ জ্ঞান-বুদ্ধি শূন্য করে দিয়েছে। (সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ২৭৫)
০৯. শয়তান মানুষকে আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত করে:
وَمِنَ النَّاسِ مَن يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّبِعُ كُلِّ شَيْطَانٍ مَّرِيدِه
অর্থ: কতক লোক এমন আছে যারা অজ্ঞতা নিয়ে আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয় এবং অনুসরণ করে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের। (সূরা ২২ হজ্জ: আয়াত ৩)
১০. শয়তান মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কর্মে প্রলুব্ধ করে :
وَمَن يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ •
অর্থ: যে শয়তানের পদাংক অনুসরণ করে, সে জেনে রাখুক, শয়তান অশ্লীল ও মন্দ কর্মের আদেশ দেয় (প্রলুব্ধ করে)। (সূরা ২৪ আন নূর: আয়াত ২১)
১১. যারা হিদায়াতের পথ দেখতে পেয়েও তা পরিত্যাগ করে, শয়তান তাদের কাজকে শোভন করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়:
إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَى لَهُمْ .
অর্থ: হিদায়াত সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত ও প্রমাণিত হবার পর যারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, শয়তান তাদেরকে তাদের এ আচরণ শোভন ও চমৎকার করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা আকাংখায় লিপ্ত করে রাখে। (সূরা ৪৭ মুহাম্মদ: আয়াত ২৫)
১২. শয়তান মানুষকে কানকথায় লিপ্ত করে এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয়:
إِنَّمَا النَّجْوَى مِنَ الشَّيْطَانِ لِيَحْزُنَ الَّذِينَ آمَنُوا •
অর্থ: কানকানি ফিসফিসানি শয়তানের কাজ। সে এটা করায় মুমিনদের ব্যথিত করার জন্যে। (সূরা ৫৮ মুজাদালা: আয়াত ১০)
১৩. শয়তান মানুষের মন-মস্তিষ্কের উপর প্রভাব বিস্তার করে আল্লাহর কথা ভুলিয়ে দেয় :
اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنسَاهُمْ ذِكْرَ اللهِ أُولَئِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ
অর্থ : শয়তান তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে নিয়েছে; এভাবে সে তাদের ভুলিয়ে দিয়েছে আল্লাহর কথা। মূলত এরাই শয়তানের দলের লোক। (সূরা ৫৮ মুজাদালা : আয়াত ১৯)
১৪. শয়তান মানুষকে দিয়ে অপব্যয় এবং অপচয় করায় :
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا
অর্থ: যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রভুর প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। (সূরা ১৭ ইসরা: আয়াত ২৭)
১৫. শয়তান মন্দ কাজে প্রবলভাবে প্রলুব্ধ করে :
أَلَمْ تَرَ أَنَّا أَرْسَلْنَا الشَّيَاطِينَ عَلَى الْكَافِرِينَ تَؤُزُّهُمْ أَنَّا •
অর্থ: তুমি কি লক্ষ্য করোনি, আমি কাফিরদের জন্যে শয়তানদের ছেড়ে রেখেছি তাদেরকে মন্দ কাজে প্রলুব্ধ করার জন্যে? (সূরা ১৯ মরিয়ম : আয়াত ৮৩)
📄 মানুষকে বিপথগামী করার শয়তানি কৌশল : রসূলুল্লাহ সা.-এর বাণীর আলোকে
শয়তানের ধোকা, প্রতারণা ও বিভ্রান্তির কৌশল সম্পর্কে হাদিসে ব্যাপক বক্তব্য এসেছে। আমরা সেগুলোর সার সংক্ষেপ নিম্নে তুলে ধরছি :
০১. শয়তান মানুষকে সালাতের মধ্যে অন্যমনস্ক করে তোলে। একথা ও কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সালাতের রাকাত সংখ্যা ভুলিয়ে দেয়।
০২. হক কথা, সত্য কথা বলা থেকে বিরত রাখে। এরা হলো বোবা শয়তান।
০৩. স্বামী স্ত্রীর গোপন বিষয় প্রকাশ করায় (স্ত্রীর মাধ্যমে এবং স্বামীর মাধ্যমে)। অশ্লীল কথা প্রকাশ করায়।
০৪. দীন সম্পর্কে অজ্ঞ দীনদারদেরকে দীনদারির নাম করিয়ে শিরক, বিদআত ও আল্লাহর নাফরমানির কাজে লিপ্ত করিয়ে দেয়।
০৫. কোনো ব্যক্তিকে মানুষের অজানা টুকিটাকি কথা ধরিয়ে দিয়ে সে ব্যক্তি গায়েব জানে বলে প্রচার করে এবং দীন সম্পর্কে অজ্ঞ ধর্মভীরুদেরকে বিভ্রান্ত করে।
০৬. স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে ঝগড়া বিবাদ লাগিয়ে দেয়।
০৭. মানুষের মধ্যে ঝগড়া ফ্যাসাদ ও হানাহানি উস্কে দেয়।
০৮. মানুষের শরীরে উল্কি চিহ্ন লাগায়।
০৯. মানুষকে দিয়ে অশ্লীল গান কবিতা লেখায় ও শোনায়।
১০. মানুষকে দিয়ে জ্যোতিষবিদ্যা শিখায় এবং মানুষকে জ্যোতিষীদের দারস্থ হতে উদ্বুদ্ধ করে।
১১. সে মানুষকে খাবার শুরুতে এবং অন্যান্য কাজে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে ভুলিয়ে দেয়।
১২. সে মানুষকে মাদক ও নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণে উদ্বুদ্ধ ও আসক্ত করে।
১৩. সে বিভিন্ন বাহানা, অজুহাত ও যুক্তি দেখিয়ে মানুষকে মিথ্যা কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করে।
১৪. গোসলখানা সহ মানুষের গোপনীয় স্থানে গিয়ে মানুষকে মন্দ চিন্তা ও অশ্লীল কাজে উদ্বুদ্ধ করে।
১৫. অসৎ নারীদেরকে সে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে।
১৬. সে মানুষকে বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আসক্ত করে তোলে।
১৭. হাট, বাজার ও বাণিজ্যিক শহরগুলোকে সে তার ধোকা, প্রতারণা ও প্রলুব্ধকরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে।
১৮. সে অপচয় ও অপব্যয়ে উদ্বুদ্ধ করে।
১৯. ভালো কাজে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সে কৃপণ হতে উদ্বুদ্ধ করে।
২০. সে মানুষকে আত্মহনন ও ধ্বংসাত্মক কাজে উদ্বুদ্ধ ও আসক্ত করে।
২১. সে মানুষের মনে আল্লাহ সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি করে দেয়।
২২. সে ফজর নামাযের সময় আরামে ঘুম পাড়িয়ে রাখার চেষ্টা করে।
২৩. সে সালাতে, সভায়-বৈঠকে এবং কর্মস্থলে মানুষের হাই তোলার ব্যবস্থা করে।
২৪. সে মানুষকে বিভ্রান্তিকর ভয়ানক স্বপ্ন দেখায়।
২৫. সে অজ্ঞ লোকদেরকে স্বপ্নে এসে বলে: আমি আল্লাহর রসূল বলছি, তুমি এই কাজ ঐ কাজ করো।
২৬. সে মানুষকে উলঙ্গ করায় এবং সেসব দৃশ্য দেখে অট্টহাসি হাসে।
২৭. সে ফাসিক লোকদেরকে দিয়ে মুমিন মুসলিমদের গালাগাল করায়।
২৮. সে অসতর্ক নামাযীদের অন্যমনস্ক করে এদিকে সেদিকে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করে।
২৯. শয়তান চুরি করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং চুরি শিখায়।
৩০. শয়তান সুযোগ পেলে শিশুদের ক্ষতি করে, বিশেষ করে সাঁঝের বেলায়।
৩১. শয়তান মানুষের মনে কু-ধারণা সৃষ্টি করে দেয়।
৩২. শয়তান মানুষকে রাগান্বিত করে তোলে। ক্রোধ সৃষ্টি করে দেয়।
৩৩. সুযোগ পেলে সে মানুষকে পাগল ও অজ্ঞান করে ছাড়ে।
৩৪. সে প্রমাণিত সত্যের বিপক্ষে মানুষকে যুক্তি ও বুদ্ধির অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সে কুতর্কে লিপ্ত করিয়ে দেয়।
৩৫. সে মিথ্যা চালবাজির খবর ও গুজব ছড়িয়ে দেয়।
৩৬. সে মানুষকে, বিশেষ করে যুবক যুবতীদেরকে বেহুদা ও নিষ্ফল কাজে ব্যস্ত রাখে এবং সুফলদায়ক কাজ থেকে গাফিল করে রাখে।