📘 মানুষের চিরশত্রু শয়তান 📄 চিরতরে ধিকৃত ও অভিশপ্ত হলো শয়তান

📄 চিরতরে ধিকৃত ও অভিশপ্ত হলো শয়তান


এসব গুরুতর অপরাধের ফলে শয়তান চিরতরে অভিশপ্ত হলো এবং অনিবার্যভাবে সাব্যস্ত হলো জাহান্নামের জ্বালানি :
قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَحِيمٌ ، وَإِنَّ عَلَيْكَ اللَّعْنَةَ إِلَى يَوْمِ الدِّينِ .
অর্থ : আল্লাহ বললেন : তুই এখান থেকে বের হয়ে যা, তুই ধিকৃত (outcast)। আর বিচার দিবস পর্যন্ত তোর উপর অভিশাপ (curse)। (সূরা ১৫ আল হিজর : আয়াত ৩৪-৩৫; সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ৭৭-৭৮)
সাথে সাথে তাকে একথাও বলে দেয়া হলো:
فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ •
অর্থ: বেরিয়ে যা, এখন থেকে তুই নিচুদের অন্তর্ভুক্ত।' (সূরা আ'রাফ: আয়াত ১৩)
قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَدْءُومًا مَّدْحُورًا .
অর্থ : তিনি বললেন: তুই ওখান থেকে বেরিয়ে যা অপমানিত ও ধিকৃত হয়ে।' (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৮)

📘 মানুষের চিরশত্রু শয়তান 📄 আদম সন্তানদের আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার অঙ্গীকার

📄 আদম সন্তানদের আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার অঙ্গীকার


শয়তানকে চিরতরে ধিকৃত ও অভিশপ্ত ঘোষণা করার পর সে চিরতরে নিরাশ হয়ে গেলো। কিন্তু সে নিজের অপরাধের জন্যে নত না হয়ে আরো ঔদ্ধত্যে মেতে উঠলো। সে আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করে আদম এবং আদম সন্তানদের বিপথগামী করার জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ (সুযোগ) প্রার্থনা করলো:
قَالَ أَنظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ . قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ .
অর্থ : সে বললো: 'পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।' তিনি (আল্লাহ) বললেন : যা তুই অবকাশ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। (আল কুরআন, সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৪-১৫; সূরা ১৫ হিজর: আয়াত ৩৬-৩৭; সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ৭৯-৮০)
মহান আল্লাহ তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তার সে প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। আল্লাহ তার অবকাশ মঞ্জুর করার সাথে সাথে সে অংগিকার এবং চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করে বললো:
فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنْ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ • ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ •
অর্থ : তুমি যেমন আমাকে বিপথগামী করেছো, তেমনি আমিও এখন থেকে তাদের (আদম ও তার সন্তানদের বিপথগামী করার জন্যে) তোমার সিরাতুল মুস্তাকিমে ওঁৎ পেতে বসে থাকবো। সামনে পেছনে, ডানে বাঁয়ে সবদিক থেকে তাদের ঘেরাও করে নেবো। ফলে তাদের অধিকাংশকেই তুমি কৃতজ্ঞ (তোমার অনুগত) পাবেনা। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৬-১৭)
قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ * إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ .
অর্থ : সে (ইবলিস) বললো: আপনার ক্ষমতার শপথ (By Your Might) আমি তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়বো, আপনার একান্ত অনুগত দাসদের ছাড়া। (আল কুরআন, সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ৮২-৮৩)
ইবলিসের চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ তাকে জানিয়ে দিলেন : তুই যাকে যাকে পারিস পদস্খলনের দিকে ডাক, অশ্বারোহী পদাতিক বাহিনীর আক্রমণ চালা, ধন সম্পদ সন্তান সন্তুতিতে তাদের সাথে শরিক হয়ে যা এবং তাদেরকে প্রতিশ্রুতির জালে আটকে ফেল- তোর সব প্রতিশ্রুতিই তো ধোকাবাজি আর প্রতারণা। জেনে রাখ :
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ ، وَكَفَى بِرَبِّكَ وَكِيلاً .
অর্থ : আমার প্রকৃত দাসদের উপর তোর কোনো কর্তৃত্ব অর্জিত হবেনা। (হে মুহাম্মদ!) ভরসা করার জন্যে তোমার প্রভুই যথেষ্ট। (সূরা ১৭ ইসরা : আয়াত ৬৫)
আল্লাহ শয়তানকে আরো বলে দিলেন :
لَمَن تَبِعَكَ مِنْهُمْ لَأَمْلَأَنْ جَهَنَّمَ مِنكُمْ أَجْمَعِينَ •
অর্থ : আদম সন্তানদের মধ্যে যারাই তোর অনুসরণ করবে, তোর সাথে তাদেরকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভর্তি করবো। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৮)

📘 মানুষের চিরশত্রু শয়তান 📄 ইবলিস মানুষের সামনে পিছে ও ডানেবামে থেকে আসবে- একথার অর্থ কী?

📄 ইবলিস মানুষের সামনে পিছে ও ডানেবামে থেকে আসবে- একথার অর্থ কী?


এটা ছিলো শয়তানের অংগিকার। আদম সন্তানদের বিপথগামী করার জন্যে সে সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর ওঁৎ পেতে বসে থাকবে। সিরাতুল মুস্তাকিম হলো, মানুষের জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন যাপনের সহজ-সরল সত্য পথ ইসলাম। অর্থাৎ সে মানুষকে ধোকা দেয়ার জন্যে ইসলামের রাজপথের উপর ওঁৎ পেতে বসে থাকার অংগীকার করে।
ইসলামের রাজপথে ওঁৎ পেতে বসে থেকে সে কী করবে? -যখনই কেউ ইসলামের রাজপথে পা বাড়াবে, তখনই তাকে চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলবে। সে এবং তার দলবল ঐ ব্যক্তিকে ধোকা, প্রতারণা ও প্ররোচনা দেয়ার জন্যে তার সামনে থেকে আসবে, পিছনে থেকে আসবে, ডানে থেকে আসবে, বামে থেকে আসবে।
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, শয়তান মানুষের সামনে থেকে আসবে মানে- আখিরাত সম্পর্কে তার মনে সংশয় সৃষ্টির চেষ্টা করবে। পেছনে থেকে আসবে মানে- পার্থিব জীবনের প্রতি তাকে আকৃষ্ট করবে। ডানে থেকে আসবে মানে- তার দীন সম্পর্কে তার মধ্যে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি করে দেবে। বামে থেকে আসবে মানে- আল্লাহর হুকুম আহকাম অমান্য করাকে আনন্দের বিষয় বানিয়ে দেবে।'
খ্যাতনামা তাবেয়ী মুফাস্সির কাতাদা, ইবরাহিম নখয়ী, সুদ্দি এবং ইবনে জুরাইজ (রাহেমাহুমুল্লাহ) বলেছেন: ইবলিসের এ বক্তব্যের মর্ম অনেক গভীর। সে আদম সন্তানদের সামনে থেকে আসবে বলে বুঝাতে চেয়েছে, সে তাদের প্ররোচনা দিয়ে বলবে: পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম এগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই, এগুলো কিছুই ঘটবেনা। পেছনে থেকে আসবে মানে- সে পৃথিবীটাকে লোভনীয়, জমকালো ও মনোহরী করে মানুষের সামনে তুলে ধরবে এবং শুধু এটাকেই অর্জন ও ভোগ করার কাজে মনোনিবেশ করার আহবান জানাবে। ডানে থেকে আসার অর্থ- তার ভালো, উত্তম ও পূণ্য কর্মসমূহের দিক থেকে এসে সেগুলোকে তার কাছে নিষ্ফল কাজ হিসেবে তুলে ধরবে এবং সেগুলো থেকে তাকে নিরাশ ও নিস্পৃহ করে তুলবে। বামে থেকে আসবে মানে- তার মন্দ ও পাপ কর্মসমূহের দিক থেকে আসবে এবং সেগুলোকে তার কাছে চমৎকার, শোভনীয় ও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
এভাবে সামনে পেছনে, ডানে বামে থেকে এসে ইবলিস প্ররোচনার জালে মানুষকে ঘেরাও করে ফেলবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর থেকে তাকে বিচ্যুত ও বিপথগামী করার প্রানান্তকর সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ সা.-এর একটি হাদিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ হাদিসে একটি রূপক উপমার মাধ্যমে তিনি সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে মানুষের বিচ্যুত হবার পন্থা বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি নাওয়াস ইবনে সামআন রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সা. বলেছেন: আল্লাহ সিরাতুল মুস্তাকিমের একটি উপমা দিয়েছেন। (সেটি হলো:) একটি সোজা সরল সুদৃঢ় পথ। সেই পথের দুই ধারে রয়েছে দেয়াল। দেয়ালগুলোতে রয়েছে অনেক উন্মুক্ত দরজা। দরজাগুলোতে রয়েছে ঝালরের পর্দা। আর রাস্তার মাথায় আছেন একজন আহবায়ক। তিনি আহবান করে বলছেন: 'হে মানুষ! তোমরা সবাই মিলে সোজা রাস্তার উপর দিয়ে এগিয়ে চলো, রাস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়োনা।' আরেকজন আহবায়ক আহবান করছে রাস্তার উপর থেকে। যখনই কোনো ব্যক্তি রাস্তার পার্শবর্তী দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে তাকাতে বা ঢুকতে চায়, তখনই এই আহবায়ক তাকে সতর্ক করে বলে উঠে : 'সাবধান! পর্দা সরাবেনা, পর্দা উন্মুক্ত করলে ধ্বংসে নিমজ্জিত হবে।' (অতপর রসূলুল্লাহ সা. বললেন :) সরল পথটি হলো: 'ইসলাম।' দুই পাশের দেয়ালগুলো হলো: 'আল্লাহর নির্ধারিত সীমানা।' উন্মুক্ত দরজাগুলো হলো : 'আল্লাহর নিষিদ্ধ পথ ও বিষয় সমূহ।' রাস্তার মাথার আহবায়ক হলো : 'আল্লাহ্ কিতাব (আল কুরআন)।' রাস্তার উপরের আহবায়ক হলো: প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির অন্তরে অবস্থিত উপদেশ দাতা বা বিবেক।
ইসলামের সরল সঠিক রাজপথে ওঁৎ পেতে বসে থেকে মানুষকে প্রলুব্ধ ও বিভ্রান্ত করে দুই পাশের পাপের গলিতে ঢুকিয়ে দেয়াই শয়তানের কাজ।

টিকাঃ
৯. তফসিরে ইবনে কাছির: সূরা ৭ আল আ'রাফের ১৭ আয়াতের ব্যাখ্যা থেকে উদ্ধৃত।
১০. তিরমিযি, আহমদ। ইমাম যাহাবি এবং নাসিরুদ্দিন আলবানি বলেছেন, হাদিসটি সহীহ্।

📘 মানুষের চিরশত্রু শয়তান 📄 শয়তানের প্রতারনার পয়লা শিকার আদম আ.

📄 শয়তানের প্রতারনার পয়লা শিকার আদম আ.


আদমকে সৃষ্টি করার পর মহান আল্লাহ আদম থেকে বা আদমের পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করেন তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে। তাদের বসবাস করতে দেন জান্নাতে। পৃথিবীতে খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পূর্বে অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ লাভের উদ্দেশ্যেই তাদের কিছু কাল জান্নাতে রাখা হয়। একটি বৃক্ষের ফল ভক্ষণ ছাড়া জান্নাতে পানাহার ও চলা ফেরার অবাধ স্বাধীনতা তাদের দেয়া হয়।
শয়তান, তার দৃষ্টিতে যার কারণে সে চিরতরে অভিশপ্ত হলো, সেই আদমকেই সে তার টার্গেট বানায়। সে আদমকে প্রতারিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আদমের কাছে গিয়ে হাযির হয়। সে তাঁদের কুমন্ত্রণা দিয়ে বলে :
مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ .
অর্থ : তোমাদের প্রভু যে তোমাদেরকে এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করেছেন, তার কারণ হলো, তোমরা যেনো ফেরেশতা না হয়ে যাও, অথবা চিরদিন যেনো জান্নাতে থাকতে না পারো। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২০)
শয়তান নিজের এই বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যে কসম খেয়ে বলে :
وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ .
অর্থ: এবং সে (ইবলিস) কসম খেয়ে তাদের বললো: আমি তোমাদের ভালো চাই, আমি তোমাদের কল্যাণকামী। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২১)
এভাবে প্ররোচনা দিয়ে ধীরে ধীরে সে তাদের দু'জনকে তার প্রতারণার জালে আটকে ফেলে। তাঁরা নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করেন। এভাবে অসতর্ক হয়ে তাঁরা সাময়িকভাবে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে বসেন :
فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ
অর্থ : এভাবে সে তাদের দুজনকে প্রতারণার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করলো। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২২)
কিন্তু তাঁরা শয়তানের অনুকরণ করলেন না। শয়তান আল্লাহর হুকুম অমান্য করে অহংকার, হঠকারিতা এবং সীমালংঘনের দিকে অগ্রসর হয়। পক্ষান্তরে আদম ও হাওয়া আল্লাহর হুকুম অমান্য করার সাথে সাথে অনুতপ্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা তওবা করেন, নিজেদের ভুল স্বীকার করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন:
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ •
অর্থ: তারা প্রার্থনা করলো: আমাদের প্রভু! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছি। এখন তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের প্রতি করূণা না করো, তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শামিল হয়ে যাবো! (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ২৩)
ফলে আল্লাহ পাক তাঁদের ক্ষমা করে দেন। তারা পবিত্র হয়ে যান।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية