📘 মানুষের চিরশত্রু শয়তান > 📄 ইবলিস জেনে বুঝেই আল্লাহর হুকুম পালন করতে অস্বীকার করে

📄 ইবলিস জেনে বুঝেই আল্লাহর হুকুম পালন করতে অস্বীকার করে


অর্থাৎ এ নির্দেশ যে ইবলিসের উপরও বর্তিয়েছিল, সেটা ইবলিস নিজেও স্বীকার করে নিয়েছিল। সে আল্লাহর কৈফিয়ত তলবের জবাবে একথা বলে নাই যে, নির্দেশ তো আমাকে দেন নাই, দিয়েছেন ফেরেশতাদেরকে।
তাছাড়া নির্দেশ পালনে তার অস্বীকৃতিও প্রমান করে যে, তাকেও সাজদা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সে আল্লাহর নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জানায় এবং যুক্তি প্রদর্শন করে। দেখুন আল্লাহ্র কৈফিয়ত তলবের জবাবে তার বক্তব্য :
قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ •
অর্থ : সে (জবাবে) বললো: (আমি তাকে সাজদা করতে পারিনা, কারণ) আমি তার চাইতে উত্তম-শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন দিয়ে আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি দিয়ে। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১২; সুরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ৭৬)
قَالَ أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا ؟
অর্থ: (জবাবে ইবলিস) বললো: আমি কি এমন একজনকে সাজদা করবো যাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি দিয়ে? (সূরা ১৭ ইসরা : আয়াত ৬১)
قَالَ لَمْ أَكُن لِأَسْجُدَ لِبَشَرٍ خَلَقْتَهُ مِن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ .
অর্থ : সে বললো: গন্ধযুক্ত কাদার ঠনঠনে মাটি দিয়ে আপনি যে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আমি তাকে সাজদা করতে পারিনা। (সূরা ১৫ হিজর: আয়াত ৩৩)
এখন একথা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার হয়ে গেলো, ইবলিস কোনো প্রকার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়াই একেবারে সহজ সরলভাবে বুঝে নিয়েছিল, সেও সাজদা করার নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। সুতরাং যার ব্যাপারে প্রশ্ন, তারই যখন কোনো প্রশ্ন নেই, তখন আমি আপনি প্রশ্ন তোলার কে?
একথা পরিষ্কার, ইবলিসও সাজদা করার হুকুমের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। জেনে বুঝেই সে আল্লাহর আদেশ পালন করেনি এবং আল্লাহর আদেশ পালন করতে অস্বীকার করে। তার এই অস্বীকৃতির ধরণ কেমন ছিলো? এ প্রসঙ্গে দেখুন আল্লাহর বাণী :
أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ •
অর্থ : সে (আল্লাহ্র নির্দেশমতো আদমকে সাজদা করতে) অস্বীকৃতি জানায়, অহংকার ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করে এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ৩৪; সূরা ৩৮ সোয়াদ : আয়াত ৭৪)

📘 মানুষের চিরশত্রু শয়তান > 📄 শয়তানের গুরুতর অপরাধ সমূহ

📄 শয়তানের গুরুতর অপরাধ সমূহ


আদমকে সাজদা করার ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে শয়তান তার মর্যাদার আসনে থেকে এমন সব গুরুতর অপরাধ করে বসলো, যা চরম অমার্জিত ও ক্ষমাহীন। তার সেই গুরুতর অপরাধ সমূহ হলো :
১. সে আল্লাহ্ হুকুম পালন করতে অস্বীকার করে এবং
২. সে অহংকার, দাম্ভিকতা ও হঠকারীতা প্রদর্শন করে:
أَبَى وَاسْتَكْبَرَ .
অর্থ : সে আল্লাহর আদেশ পালন করতে অস্বীকার (refuse) করে, অহংকার-দাম্ভিকতা-হঠকারিতা প্রদর্শন করে। (সূরা ২ বাকারা: আয়াত ৩৪)
৩. সে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে সীমালংঘন করে এবং অবাধ্য হয় :
فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ .
অর্থ: সে তার প্রভুর হুকুম অমান্য করে সীমালংঘন করে। (সূরা ১৮ কাহাফ : ৫০)
৪. সে নিজেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করে :
قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ .
অর্থ : সে বলে: আমি তার (আদমের) চাইতে শ্রেষ্ঠ। (সূরা ৭ আ'রাফ : আয়াত ১২)
৫. সে অনুশোচনা করেনি; বরং নিজের হঠকারিতার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে:
قَالَ أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا •
অর্থ : সে বলে : আমি কি এমন একজনকে সাজদা করবো, যাকে তুমি সৃষ্টি করেছো কাদামাটি থেকে? (সূরা ১৭ ইসরা: আয়াত ৬১)
নিজের অবাধ্যতার পক্ষে সে আরো যুক্তি প্রদর্শন করে :
خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ •
অর্থ: তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছো আগুন থেকে আর তাকে সৃষ্টি করেছো কাদামাটি থেকে। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১২)
قَالَ لَمْ أَكُن لِأَسْجُdَ لِبَشَرٍ خَلَقْتَهُ مِن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُونٍ .
অর্থ: সে বলে: মানুষকে সাজদা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, যাকে তুমি সৃষ্টি করেছো শুকনো ঠনঠনে পঁচা মাটি থেকে। (সূরা ১৫ আল হিজর: আয়াত ৩৩)
৬. সে আল্লাহ্র হুকুমের বিপক্ষে যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োগ করে: আল্লামা ইবনে জারির তাবারি এবং আল্লামা ইবনে কাছির তাঁদের তফসিরে উল্লেখ করেছেন, প্রখ্যাত তাবেয়ী মুফাস্সির হাসান বসরি রহ. বলেছেন:
قَاسَ إِبْلِيسُ وَهُوَ أَوَّلَ مَنْ قَاسَ .
অর্থ: ইবলিস তার যুক্তি বুদ্ধি প্রয়োগ করে (নিজেকে শ্রেষ্ঠ ধারণা করে) এবং ইবলিসই সর্বপ্রথম দলিল (evidence)-এর বিপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে।
প্রখ্যাত তাবেয়ী ইবনে সীরিন বলেন:
أَوَّلَ مَنْ قَاسَ إِبْلِيسُ وَمَا عَبَدَتِ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ إِلَّا بِالْمَقَائِسِ
অর্থ: (দলিল-প্রমাণের বিপক্ষে) সর্বপ্রথম যুক্তি বুদ্ধি প্রয়োগকারী হলো ইবলিস। আর যুক্তি বুদ্ধি প্রয়োগ করেই লোকেরা চন্দ্র সূর্যের উপাসনা করে।
আল্লামা ইবনে কাছির বলেন:
قَاسَ ابْلِيسُ قِيَاسًا فَاسِدًا فِي مُقَابَلَةِ النَّصِ
অর্থ: এভাবেই দলিল-প্রমাণ (evidence)-এর বিপক্ষে ইবলিস তার ভ্রান্ত যুক্তি বুদ্ধি প্রয়োগ করে।
৭. সে কুফুরির পথকে আঁকড়ে ধরে: শয়তান ফেরেশতাদের সাথে অবস্থান করে ভালোভাবেই এ জ্ঞান অর্জন করেছিল যে, আল্লাহর হুকুম অমান্য করা মানেই কুফুরি। ফলে সে জেনে বুঝেই কুফুরির পথ অবলম্বন করে:
إِلَّا إِبْلِيسَ اسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ .
অর্থ: তবে সাজদা করেনি ইবলিস। সে হঠকারিতা প্রদর্শন করে এবং কাফিরদের অন্তরভুক্ত হয়ে যায়। (সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ৭৪; সূরা ২ বাকারা: আয়াত ৩৪)
৮. সে নিজের ভ্রষ্টতার জন্যে আল্লাহকে দায়ী করে: শয়তানের সবচেয়ে বড়, জঘন্য ও ঘোরতর অপরাধ হলো, সে যে উপরোক্ত অপরাধগুলো সংঘটিত করে ভ্রষ্টতার পথ অবলম্বন করলো, এজন্যে সে নিজের অপরাধ স্বীকার না করে আল্লাহকে দায়ী করে (নাউযুবিল্লাহ):
قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنْ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ .
অর্থ: সে বলে, যেহেতু তুমি আমাকে ভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছো, সে জন্যে আমিও এখন থেকে তাদের (আদম সন্তানদের) বিপথগামী করার জন্যে তোমার সিরাতুল মুস্তাকিম-এ ওঁৎ পেতে বসে থাকবো। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৬)

টিকাঃ
৮. তফসিরে ইবনে কাছির: সূরা আ'রাফ আয়াত ১২-এর তফসির দ্রষ্টব্য।

📘 মানুষের চিরশত্রু শয়তান > 📄 চিরতরে ধিকৃত ও অভিশপ্ত হলো শয়তান

📄 চিরতরে ধিকৃত ও অভিশপ্ত হলো শয়তান


এসব গুরুতর অপরাধের ফলে শয়তান চিরতরে অভিশপ্ত হলো এবং অনিবার্যভাবে সাব্যস্ত হলো জাহান্নামের জ্বালানি :
قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَحِيمٌ ، وَإِنَّ عَلَيْكَ اللَّعْنَةَ إِلَى يَوْمِ الدِّينِ .
অর্থ : আল্লাহ বললেন : তুই এখান থেকে বের হয়ে যা, তুই ধিকৃত (outcast)। আর বিচার দিবস পর্যন্ত তোর উপর অভিশাপ (curse)। (সূরা ১৫ আল হিজর : আয়াত ৩৪-৩৫; সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ৭৭-৭৮)
সাথে সাথে তাকে একথাও বলে দেয়া হলো:
فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ •
অর্থ: বেরিয়ে যা, এখন থেকে তুই নিচুদের অন্তর্ভুক্ত।' (সূরা আ'রাফ: আয়াত ১৩)
قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَدْءُومًا مَّدْحُورًا .
অর্থ : তিনি বললেন: তুই ওখান থেকে বেরিয়ে যা অপমানিত ও ধিকৃত হয়ে।' (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৮)

📘 মানুষের চিরশত্রু শয়তান > 📄 আদম সন্তানদের আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার অঙ্গীকার

📄 আদম সন্তানদের আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার অঙ্গীকার


শয়তানকে চিরতরে ধিকৃত ও অভিশপ্ত ঘোষণা করার পর সে চিরতরে নিরাশ হয়ে গেলো। কিন্তু সে নিজের অপরাধের জন্যে নত না হয়ে আরো ঔদ্ধত্যে মেতে উঠলো। সে আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করে আদম এবং আদম সন্তানদের বিপথগামী করার জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ (সুযোগ) প্রার্থনা করলো:
قَالَ أَنظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ . قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ .
অর্থ : সে বললো: 'পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।' তিনি (আল্লাহ) বললেন : যা তুই অবকাশ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। (আল কুরআন, সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৪-১৫; সূরা ১৫ হিজর: আয়াত ৩৬-৩৭; সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ৭৯-৮০)
মহান আল্লাহ তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তার সে প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। আল্লাহ তার অবকাশ মঞ্জুর করার সাথে সাথে সে অংগিকার এবং চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করে বললো:
فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنْ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ • ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ •
অর্থ : তুমি যেমন আমাকে বিপথগামী করেছো, তেমনি আমিও এখন থেকে তাদের (আদম ও তার সন্তানদের বিপথগামী করার জন্যে) তোমার সিরাতুল মুস্তাকিমে ওঁৎ পেতে বসে থাকবো। সামনে পেছনে, ডানে বাঁয়ে সবদিক থেকে তাদের ঘেরাও করে নেবো। ফলে তাদের অধিকাংশকেই তুমি কৃতজ্ঞ (তোমার অনুগত) পাবেনা। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৬-১৭)
قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ * إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ .
অর্থ : সে (ইবলিস) বললো: আপনার ক্ষমতার শপথ (By Your Might) আমি তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়বো, আপনার একান্ত অনুগত দাসদের ছাড়া। (আল কুরআন, সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ৮২-৮৩)
ইবলিসের চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ তাকে জানিয়ে দিলেন : তুই যাকে যাকে পারিস পদস্খলনের দিকে ডাক, অশ্বারোহী পদাতিক বাহিনীর আক্রমণ চালা, ধন সম্পদ সন্তান সন্তুতিতে তাদের সাথে শরিক হয়ে যা এবং তাদেরকে প্রতিশ্রুতির জালে আটকে ফেল- তোর সব প্রতিশ্রুতিই তো ধোকাবাজি আর প্রতারণা। জেনে রাখ :
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ ، وَكَفَى بِرَبِّكَ وَكِيلاً .
অর্থ : আমার প্রকৃত দাসদের উপর তোর কোনো কর্তৃত্ব অর্জিত হবেনা। (হে মুহাম্মদ!) ভরসা করার জন্যে তোমার প্রভুই যথেষ্ট। (সূরা ১৭ ইসরা : আয়াত ৬৫)
আল্লাহ শয়তানকে আরো বলে দিলেন :
لَمَن تَبِعَكَ مِنْهُمْ لَأَمْلَأَنْ جَهَنَّمَ مِنكُمْ أَجْمَعِينَ •
অর্থ : আদম সন্তানদের মধ্যে যারাই তোর অনুসরণ করবে, তোর সাথে তাদেরকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভর্তি করবো। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৮)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00