📄 শয়তানের পরিচয়
আরবি ভাষায় শয়তান (شَيْطَان) মানে- সীমালংঘনকারী, দাম্ভিক, স্বৈরাচারি। এই বৈশিষ্ট্যের জিন এবং মানুষ উভয়ের জন্যেই শয়তান পরিভাষা ব্যবহার করা হয়। কুরআন মজিদে উভয়ের জন্যে শয়তান পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, সূরা আল বাকারার ১৪ নম্বর আয়াতে ইসলামের বিরুদ্ধাচারী নেতাদের শয়তান বলা হয়েছে। شَيْطَان -এর বহুবচন شَيَاطِينٌ ।
শয়তান শব্দটি একটি পরিভাষা হিসেবে প্রাচীন কাল থেকেই সকল ধর্মের লোকদের কাছে একটি সুপরিচিত শব্দ। এ শয়তান জিনদের অন্তরভুক্ত। শয়তান কথাটি সর্বপ্রথম সেই জিনটির জন্যে ব্যবহার করা হয়েছে, যে আল্লাহ্র নির্দেশ অমান্য করে প্রথম মানুষ আদম আলাইহিস্ সালামকে সাজদা করতে অস্বীকৃতি জানায়। কুরআন মজিদে শয়তান শব্দটি একবচন ও বহুবচনে ৮৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে।
শয়তানকে কুরআন মজিদে ইবলিসও বলা হয়েছে। ابلاَسٌ ও بَلَسٌ শব্দমূল থেকে ابليس শব্দটি এসেছে। এর অর্থ হলো, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাওয়া, ভয়ে ও আতংকে নিথর হয়ে যাওয়া, দুঃখে ও শোকে মনমরা হয়ে যাওয়া, সবদিক থেকে নিরাশ হয়ে সাহস হারিয়ে ফেলা এবং হতাশা ও ব্যর্থতার ফলে মরিয়া (desperate) হয়ে উঠা।
শয়তানকে ইবলিস বলার কারণ হলো, হতাশা ও নিরাশার ফলে তার আহত অহমিকা প্রবল উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং সে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে মরণ খেলায় নেমে সব ধরণের অপরাধ সংঘটনে উদ্যত হয়। কুরআন মজিদে ইবলিস শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১১ বার।
শয়তানকে কুরআন মজিদে খান্নাসও বলা হয়েছে। خَنَّاسِنٌ শব্দটি خُنُوسٌ শব্দমূল থেকে নির্গত হয়েছে। এর অর্থ- সামনে এসে আবার পিছিয়ে যাওয়া, প্রকাশ হয়ে আবার গোপন হয়ে যাওয়া। খান্নাস আধিক্যবোধক শব্দ। সুতরাং এর অর্থ বারবার সামনে আসা এবং পিছিয়ে যাওয়া, বারবার প্রকাশ হওয়া এবং গোপন হয়ে যাওয়া।
শয়তানকে খান্নাস বলা হয়েছে এ কারণে যে, সে বারবার এসে প্ররোচনা দেয় এবং বারবার পিছিয়ে এবং লুকিয়ে যায়। এভাবে সে প্ররোচনা দিতেই থাকে। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: মানুষ যখন গাফিল ও অসতর্ক-অসচেতন হয়, তখনই শয়তান এসে তাকে প্ররোচনা ও ধোকা দেয়; কিন্তু যখনই সে সতর্ক হয় এবং আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন শয়তান পিছিয়ে যায়, লুকিয়ে যায়। এ কারণেই শয়তানকে খান্নাস বলা হয়েছে। কুরআন মজিদে খান্নাস শব্দ ব্যবহার হয়েছে ১ বার।
কুরআন মজিদে শয়তানকে আল গারুর (الْغَرُوْرٌ)ও বলা হয়েছে। এর শব্দমূল হলো গরর (غَرَرٌ)। গরর মানে- ধোকা-প্রতারণা। আল গারূর মানে- মহা ধোকাবাজ, মহাপ্রতারক। কুরআন মজিদে ৩ স্থানে শয়তানকে আল গারূর বলা হয়েছে।
টিকাঃ
১. তফসির তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল বাকারা, টীকা ১৫।
২. আল কুরআন, সূরা ৪৩ যুখরুফ: আয়াত ৫০।
৩. আল কুরআন, সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ৩৪।
৪. তফসির তাফহীমুল কুরআন, সূরা মুমিনুন টীকা ৭৩; সূরা বাকারা টীকা ৪৬।
৫. আল কুরআন, সূরা ১১৪ আন্ নাস : আয়াত ৪।
📄 শয়তানের পূর্ব ইতিহাস
কুরআন মজিদের সূরা কাহাফের ৫০ (পঞ্চাশ) নম্বর আয়াতে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, ইবলিস শয়তান জিন গোত্রীয়। আর জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে। সুতরাং শয়তান আগুনের তৈরি জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত।
মুফাস্সির এবং ঐতিহাসিক ইবনে জারির তাবারি এবং ইবনে কাছির তাঁদের তফসির এবং ইতিহাস গ্রন্থাবলীতে সাহাবী ইবনে আব্বাস রা., ইবনে মাসউদ রা. এবং তাবেয়ী হাসান বসরি, তাউস, সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেব, সা'দ ইবনে মাসউদ, শহর ইবনে হোশেব, কাতাদা প্রমুখ থেকে শয়তান ইবলিসের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। তাঁদের বর্ণনার সংক্ষিপ্ত সার হলো:
মানুষের পূর্বে আল্লাহর পক্ষ থেকে পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো জিন জাতি। তারা ছিলো আগুনের তৈরি এবং দীর্ঘজীবী। একসময় এসে তারা পারস্পারিক বিবাদ বিসম্বাদে পৃথিবীকে চরম বিপর্যস্ত করে তোলে। তাদের দুষ্র্মে ও ফিতনা ফাসাদে ভরে যায় পৃথিবী। তখন মহান আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবীর কর্তৃত্ব থেকে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত নেন। ফেরেশতাদের পাঠান তাদের কর্তৃত্ব ধ্বংস করতে এবং তাদের বিতাড়িত করতে। ফেরেশতারা এসে জিনদের একদলকে ধ্বংস করে দেন, কিছু জিনকে সমুদ্রের দিকে তাড়িয়ে দেন আর কিছু জিনকে তাড়িয়ে দেন পাহাড় পর্বতের দিকে। এভাবে মহান আল্লাহ পৃথিবী পরিচালনার কর্তৃত্ব থেকে জিনদের উচ্ছেদ করেন এবং তাদের কর্তৃত্বের ক্ষমতা বিনাশ করে দেন।
এই ফেরেশতাদল পৃথিবী থেকে ফিরে যাবার সময় আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে একটি জিন শিশুকে সাথে করে নিয়ে যায়। তার নাম ছিলো আযাযিল। সে ফেরেশতাদের সাথে বসবাস করতে থাকে এবং আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদত বন্দেগির ক্ষেত্রে ফেরেশতাদের গুণ বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। এভাবে সে ফেরেশতাদের সাথে মিশে যায়। পরবর্তীকালে এই আযাযিলই শয়তান এবং ইবলিস হিসেবে পরিচিত হয়।
টিকাঃ
৬. তফসিরে ইবনে কাছির, সূরা আন্ নাস এর তফসির।
📄 ইবলিস শয়তান আল্লাহর হুকুম সত্ত্বেও আদমকে সাজদা করেনি
পৃথিবী থেকে জিনদের কর্তৃত্ব বিলুপ্ত করার পর মহান আল্লাহ ঘোষণা করলেন:
إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً .
অর্থ : আমি পৃথিবীতে (নতুন করে) প্রতিনিধি/আরেকটি প্রজন্ম সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ৩০)
অর্থাৎ পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা পরিচালনার জন্যে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্যে আল্লাহ একটি নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করার মনস্থ করলেন। এ প্রজাতির নাম দিলেন তিনি 'মানুষ'। সৃষ্টি করলেন তিনি এ প্রজাতির প্রথম মানুষ আদমকে। পৃথিবীর প্রতিনিধিত্ব করার সব জ্ঞান দান করলেন তিনি আদমকে। পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বের কর্তৃত্ব পরিচালনার জন্যে প্রয়োজন ফেরেশতাদের সহযোগিতা। তাই মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের হুকুম করলেন আদমকে সাজদা করতে। অর্থাৎ আদম ও তার সন্তানদের আনুগত্য করার প্রতীকি প্রমাণ পেশ করতে। ফেরেশতারা সবাই আদমকে সাজদা করে। কিন্তু সাজদা করতে অস্বীকৃতি জানায় ইবলিস :
ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ لَمْ يَكُنْ مِنَ السَّاجِدِينَ •
অর্থ : অতপর আমরা ফেরেশতাদের বললাম : 'আদমের উদ্দেশ্যে সাজদা করো।' তখন সবাই সাজদা করলো ইবলিস ছাড়া। সে সাজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলোনা। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১১)
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ
অর্থ: আমরা যখন ফেরেশতাদের আদেশ করলাম: 'তোমরা সাজদা করো আদমকে।' তখন সাজদা করলো সবাই; ইবলিস্ ছাড়া। (সূরা ০২ আল বাকরা: আয়াত ৩৪; সূরা ১৭ ইসরা: আয়াত ৬১; সূরা ১৮ আল কাহাফ: আয়াত ৫০)
فَسَجَدَ الْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ أَجْمَعُونَ إِلَّا إِبْلِيسَ
অর্থ : তখন সাজদা করলো ফেরেশতারা সকলেই ইবলিস্ ছাড়া। (সূরা ১৫ আল হিজর : আয়াত ৩০-৩১; সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ৭৩-৭৪)
টিকাঃ
৭. দ্রষ্টব্য: তফসিরে তাবারি, তফসিরে ইবনে কাছির এবং ইবনে কাছির-এর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া।
📄 সাজদা করার হুকুম কি শয়তানের উপর বর্তায়?
প্রশ্ন করা যেতে পারে, আল্লাহ তায়ালা সাজদা করার আদেশ তো করেছেন ফেরেশতাদের। শয়তান তো ফেরেশতা ছিলোনা, ছিলো জিন, তাহলে সাজদা করার হুকুম তার উপর বর্তায় কী করে? সে সাজদা না করায় তার কী অপরাধ হলো?
এটি কোনো জটিল প্রশ্ন নয় এবং অবোধগম্য বিষয়ও নয়। মানব জীবনে প্রচলিত ও সংঘটিত বিষয়গুলোই যদি আমরা দেখি, তবে দেখতে পাই একটি বিষয়ের একটি বাহ্যিক অর্থ থাকে, আবার একটি সংশ্লিষ্ট এবং বিবেচ্য অর্থও থাকে। যেমন, বাবুল পিস্তল দিয়ে গুলি করে যায়েদকে হত্যা করলো। তার এই হত্যা কান্ডের বিষয়টি সাক্ষ্য প্রমাণ এবং তার আত্মস্বীকৃতির মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ায় সে খুনি সাব্যস্ত হলো।
কিন্তু এখানে কিছু সংশ্লিষ্ট ও বিবেচ্য বিষয় থেকে যায়। তাহলো, খুন কি সে স্বপ্রণোদিত হয়ে করেছে? নাকি কারো নির্দেশে করেছে? সাক্ষ্য প্রমাণ এবং স্বীকৃতির মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, ফজল শেখের নির্দেশে সে যায়েদকে হত্যা করেছে। ফজল শেখই তাকে পিস্তল সরবরাহ করেছে। তাই ফজল শেখ গুলি না করেও যায়েদের হত্যাকান্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং সেও একজন খুনি।
ঠিক ভালো কাজের ব্যাপারেও এই উদাহরণ প্রযোজ্য। যেমন আবু বকর চাঁদপুরের শাহাপুরে একটি মসজিদ নির্মাণ করলেন। তাই তিনি এ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু মসজিদটি নির্মাণের অর্থ সরবরাহ করেছেন ঢাকার হাজী মুহাম্মদ মাহবুব। সুতরাং এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে হাজী মাহবুবও বিবেচ্য।
যেমন, আহমদ জন্মগতভাবে একজন বাংলাদেশী। ঢাকায় তার জন্ম, এখানেই পড়ালেখা করেছেন। পরে আমেরিকা গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি চাকরি লাভ করেন। একদিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্দেশ ঘোষণা করলেন: হে আমেরিকানরা আগামিকাল থেকে আপনারা সকল ১০টার পরিবর্তে সকাল ৯টায় অফিসে আসবেন। এই নির্দেশটি আমেরিকানদের মতো বাংলাদেশী আহমদ-এর উপরও বর্তাবে। কারণ, তিনি আমেরিকানদের নিয়মকানুন রীতিনীতি অনুসরণ করে আমেরিকায় চাকুরি করেন।
আদমকে সাজদা করার যে নির্দেশ আল্লাহ পাক ফেরেশতাদের দিয়েছিলেন, সে নির্দেশ ফেরেশতাদের মতোই আযাযিল শয়তানের উপরও বর্তিয়েছিল। কারণ :
১. সে ফেরেশতাদের দলভুক্তির মর্যাদা লাভ করেছিল।
২. সে ফেরেশতাদের আইন কানুন ও নিয়মরীতিই মেনে চলছিল।
৩. সে ফেরেশতাদের মতোই আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি ও হুকুম আহকাম পালন করছিল।
৪. সে ফেরেশতা চরিত্র অর্জন করেছিল।
৫. নির্দেশদানের মুহূর্তে সে ফেরেশতাদের মজলিসেই উপস্থিত ছিলো।
সুতরাং আযাযিলও যে এই নিদের্শের আওতাভুক্ত ছিলো তাতে আর কোনো প্রকার সন্দেহ নেই। এ ক্ষেত্রে দুইটি অকাট্য দলিল সকল সংশয়ীর সংশয় নিরসনের জন্যে যথেষ্ট। সেগুলো হলো :
১. মহান আল্লাহ ইবলিসকে বাদ দিয়ে নয়, তাকে সহই ফেরেশতাদের সাজদা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাইতো সাজদা না করার কারণে তিনি ইবলিসকে প্রশ্ন করলেন :
قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ •
অর্থ : আল্লাহ বললেন: (হে ইবলিস) আমি নির্দেশ দেয়া সত্তেও কোন্ জিনিস তোমাকে সাজদা করা থেকে বিরত রেখেছে? (সূরা ৭ আল আরাফ: আয়াত ১২)
قَالَ يَا إِبْلِيسُ مَا لَكَ أَلَّا تَكُونَ مَعَ السَّاجِدِينَ •
অর্থ আল্লাহ বললেন: হে ইবলিস! তোমার কী হলো যে, তুমি সাজদা কারীদের অন্তর্ভুক্ত হলেনা? (সূরা ১৫ আল হিজর : আয়াত ৩২)
قَالَ يَا إِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ أَسْتَكْبَرْنَ أَمْ كُنتَ مِنَ الْعَالِينَ .
অর্থ : আল্লাহ বললেন: হে ইবলিস! আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি, তাকে সাজদা করতে কিসে তোমাকে বাধা দিলো? তুমি কি ঔদ্ধত্য দেখালে, নাকি তুমি উচু মর্যাদার কেউ? (সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ৭৫)
এখন একথা পরিষ্কার হয়ে গেলো, মহান আল্লাহ ইবলিসকে সহই ফেরেশতাদেরকে সাজদা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তা না হলে ইবলিসের কাছে সাজদা না করার কৈফিয়ত তলব করার কোনো কারণ ছিলনা।
২. দ্বিতীয় যে বিষয়টি ইবলিসকে সাজদা করার নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত প্রমাণ করে, সেটা হলো স্বয়ং ইবলিসের স্বীকৃতি এবং অস্বীকৃতি।