📄 মুমিনদের পরিচয়
অথচ এ দুনিয়ায় যে সমস্ত মানুষ আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস করে এবং তার পরিপূর্ণ হুকুম আহকাম প্রতিপালন করে দুনিয়ায় এই পথে চলার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ- তাদেরকেইতো বলা হয় মুমিন বা মুসলিম। কেবল এরাই আল্লাহর ইবাদাতের মাধ্যমে খাঁটি বান্দাহ হিসাবে জীবন যাপন করে। আল্লাহতায়ালা বলেছেনঃ
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ -
"আল্লাহ বিশ্বাসীদের নিকট থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন- তাদের জন্য জান্নাত আছে এর বিনিময়ে।” (সূরা আত্-তাওবা ১১১)
যারা ঈমানদার, যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে তারা কখনো এ দাবী করতে পারেনা যে তাদের জীবন ও সম্পদের মালিক তারা নিজেরাই। এখানে দর্শনটা কী লক্ষ্য করুন। মূলতঃ জীবন ও ধন-সম্পদের মালিক আল্লাহতায়ালাই। অথচ তিনি বলেছেন তিনি এগুলো খরিদ করেছেন। এগুলো খরিদ করে তিনি আবার কোথাও নিয়েও যাননি বরং তাদের কাছেই গচ্ছিত রেখেছেন। আল্লাহতায়ালাই যে জীবন ও সম্পদের মালিক এবং সে আল্লাহতায়ালাই জীবন ও সম্পদ আপনার আমার কাছে আমানত রেখেছেন। আমরা তারই বান্দা হিসেবে কতটুকু তার গোলামী করছি তাই দেখতে হবে। এখন চিন্তা করতে হবে এই জীবন এবং সম্পদ কি আমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করছি না নিজেদের স্বার্থে ব্যয় করছি? ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী অথবা পার্থিব কোন আরাম আয়েশের জন্য আল্লাহর গচ্ছিত আমানত ব্যয় করা হচ্ছে নাকি অন্য কোনভাবে নফসের খায়েশ পূর্ণ করাবার জন্য ব্যয় করা হচ্ছে- তাই চিন্তা করে দেখতে হবে। আর তাই যদি করা হয় তাহলে মহান রাব্বুল আলামীনের আমানতের যে চরম খেয়ানত করা হচ্ছে- এবং এই খিয়ানতের বিনিময়ে পরকালে যে কী পুরস্কার পাওয়া যাবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
আল্লাহর উপর ঈমান আনার অর্থই হচ্ছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে তার নিজের জান-মাল বিক্রি করে দেয়া। একমাত্র আল্লাহর দান বেহেশত ছাড়া দুনিয়াতে এবং আখিরাতের আর অন্য কিছুই সে প্রত্যাশা করতে পারেনা। তাই মুমিনের জীবনের লক্ষ্য দুনিয়া নয় বরং আখিরাত। দুনিয়াতে সে একমাত্র আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ লাভের প্রত্যাশা করবে অন্য কারো কাছে কোন প্রয়োজনের জন্যই ধর্না দেবে না এবং তার সমস্ত কাজের উদ্দেশ্যই হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
يَبْتَغُونَ فَضْلاً مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا -
“তারা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি চায়।” (সূরা আল ফাতহ)
জীবনের এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী বান্দাহ মুজাহিদ ফী সাবীলিল্লাহর 'ভূমিকা পালন করবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
ياَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيْكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ - تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ -
“হে লোকেরা যারা ঈমান এনেছো, আমি কি তোমাদের সেই ব্যবসার কথা বলবো যা তোমাদের পীড়াদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে? তোমরা ঈমান আনো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি আর জিহাদ করো আল্লাহর পথে, নিজেদের ধন-সম্পদ ও নিজেদের জান-প্রাণ দ্বারা-এটাই অতীব উত্তম যদি তোমরা জান।” (সূরা আসসাফ- ১০,১১)
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহতায়ালা পরিষ্কার করে ঘোষণা করেছেন যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমান আনার পরই আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে জেহাদ করতে হবে এবং এর মধ্যেই মানুষের জন্য কল্যাণ ও উত্তম ফল নিহিত রয়েছে।
📄 দ্বীন কায়েমের প্রচেষ্টাই জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ
আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে যুদ্ধ করা অর্থাৎ জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ-র মানে আল্লাহর দ্বীন আল্লাহর দুনিয়ায় কায়েমের জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ সংগ্রামও আল্লাহর পথে জিহাদ। আর এই প্রচেষ্টা এবং সংগ্রাম বিভিন্ন ভাবে হতে পারে। তবে এর চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে সশস্ত্র যুদ্ধ। আল্লাহতায়ালা বলেছেন-
الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا -
“যারা ঈমানদার তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে আর যারা কাফের ও অবাধ্য তারা জুলুম ও অন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করে। অতএব তোমরা শয়তানের অনুচরদের বিরুদ্ধে লড়াই কর। নিশ্চয়ই শয়তানের চক্রান্ত খুবই দুর্বল।” (আন নিসা- ৭৬)
এখানে স্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে যুলুম এবং অন্যায়ের পক্ষে যারা যুদ্ধ করে তারা শয়তানের অনুচর আর যারা এ ধরনের যালেম ও অত্যাচারীর মোকাবিলায় মযলুমদের সমর্থনে প্রতিরোধ যুদ্ধে এগিয়ে আসে, যারা দুনিয়া থেকে যুলুম ও অত্যাচার নির্মূল করে ইনসাফ ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে শান্তিতে জীবন যাপন করার সুযোগ করে দিতে চায় তাদের যুদ্ধই আল্লাহর পথে যুদ্ধ।
আল্লাহতায়ালা আরো বলেছেন:
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُمْ بُنْيَانٌ مَرْصُوصُ -
“আল্লাহ সেই সব মুজাহিদকে অত্যধিক ভালবাসেন যারা আল্লাহর পথে সীসা ঢালা-প্রাচীরের মত কাতারবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে।” (সূরা আসসাফ-৪)
📄 মুজাহিদদের মর্যাদা এবং সফলতা
আল্লাহর পথে যারা লড়াই করে তাদের লড়াইয়ের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য আল্লাহতায়ালা এভাবে বর্ণনা করেছেন:
أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ وَ جَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ طَ لَا يَسْتَوْنَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ - اَلَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ اَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللهِ ، وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ -
“তোমরা কি হাজীদের পানি পান করানো এবং মসজিদুল হারামের সেবা ও তত্ত্বাবধান করাকে আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের কাজের সমমর্যাদা সম্পন্ন মনে করছো? আল্লাহর কাছে এ দু'গোষ্ঠি সমান নয়। আল্লাহ যালিমদের সুপথে চালিত করেন না। যারা ঈমান এনেছে সত্যের জন্য বাস্তুভিটা ত্যাগ করেছে এবং জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে লড়াই করেছে তাদের মর্যাদা আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠতর। তারাই প্রকৃতপক্ষে সফলকাম।” (আত তাওবা- ১৯,২০)
বস্তুতঃ একেই বলা হয়েছে সত্যের লড়াই। এ লড়াইয়ে এক রাত জাগা হাজার রাত জেগে ইবাদাত করার চেয়েও উত্তম। এতে ইস্পাত কঠিন দৃঢ় শপথ নিয়ে শত্রুর সামনে রুখে দাঁড়ানো ঘরে বসে ৬০ বছর নামাজ পড়ার চেয়েও বড় পুণ্যের কাজ। এর জন্য যে চোখ নিদ্রাহীনভাবে প্রহরায় রত তার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম। এই লড়াইয়ের পথে ধূলিমলিন হয়েছে যে পদদ্বয় তাকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ঠেলে দেয়া হবেনা। কিন্তু যারা লড়াইয়ের ডাক শুনেও ঘরে বসে থাকে এবং লড়াইয়ে অংশ নিতে গড়ি-মসি করে তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহতায়ালা বলেছেন:
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيْرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ نِ اقْتَرَفْتُمُوْهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَ مَسكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ -
“হে নবী, আপনি ওদের বলে দিন তোমাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, স্ত্রী ও আত্মীয় স্বজন তোমাদের সঞ্চিত সম্পদ ও বাণিজ্য যাতে অচলাবস্থা দেখা দেবার আশংকা কর এবং তোমাদের প্রাণপ্রিয় ঘর বাড়ী এসব যদি আল্লাহ, রাসূল (সা) ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয়ে থাকে তাহলে অপেক্ষা কর আল্লাহ স্বীয় কার্য সমাধা করবেন। জেনে রেখ, আল্লাহ অবাধ্য লোকদেরকে কখনো সুপথে চালিত করেন না।” (আত্-তাওবা- ২৪)
উপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কারভাবে যেটা ভেসে উঠে তা হলো আল্লাহতায়ালা চাননা যে পৃথিবীতে প্রতারণা, জুলুম, বে-ইনসাফি, হত্যাকান্ড, লুটতরাজ চলুক। সবলেরা দুর্বলদের গ্রাস করুক। তাদের শাস্তি ও স্বস্তিতে বিঘ্ন ঘটুক, তাদের নৈতিক আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিক। আল্লাহ এটা কখনোই বরদাস্ত করবেন না, যে দুনিয়ার মানুষ আল্লাহর দাসত্ব ছেড়ে সৃষ্ট জীবের দাসত্ব করে তাদের মানবীয় মর্যাদাকে এবং তাদের শ্রেষ্ঠত্বকে অপমানিত ও কলংকিত করুক।
তাই এই মানবজাতি যখন দুনিয়ার সর্ব প্রকার লোভ-লালসা, ব্যক্তিগত স্বার্থ, ধন-দৌলতের আশা-আকাংখা এবং দুনিয়ার জীবনে উচ্চাভিলাষকে পদাঘাত করে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পৃথিবী থেকে জুলুম, অবিচার, অন্যায় ও বাতিলকে উৎখাত করে সুবিচার, ন্যায়নীতি ও দ্বীনে হককে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং যারা নিজেদের জান-মাল, ব্যবসা-বাণিজ্য, আত্মীয়-স্বজন, ভাই-বোন, স্ত্রী-পুত্র পরিজনের মায়া-মমতা, আরাম-আয়েশ ও বিলাসব্যসনকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থাৎ খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রাণান্তকরভাবে কাজ করে তার চেয়ে আল্লাহর ভালবাসা ও সন্তুষ্টি লাভের অধিকারী আর কে হতে পারে? বস্তুতঃ আল্লাহতায়ালা এই সব বান্দাদের উপর রাজী থাকেন এবং এই বান্দাদেরকেই কবুল করেন ও তাদেরকেই অফুরন্ত কল্যাণ দান করেন। এরাই কামিয়াব হয়। শুধু আখিরাতের সাফল্য নয় বরং পার্থিব সাফল্যও প্রকৃতপক্ষে তাদেরই প্রাপ্য, যারা নিঃস্বার্থভাবে কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ও আল্লাহর বান্দাদের কল্যাণের জন্য জিহাদ করে।
📄 শেষ কথা
উপরোল্লিখিত আলোচনায় আমাদের সামনে যা এসেছে তা হলো এই যে মানুষকে আল্লাহতায়ালা এ দুনিয়ায় খলীফা করে পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ মানুষ দুনিয়াতে আল্লাহর খিলাফত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করবে। এ দুনিয়ায় মানুষ একমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব ও গোলামী করবে। অর্থাৎ আল্লাহর যা হুকুম তাই পালন করবে এবং আল্লাহর যা নিষেধ তা সে বর্জন করবে। মানুষ যখন এ দুনিয়ায় আল্লাহর খিলাফত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করবে এবং পরিপূর্ণভাবে আল্লাহরই ইবাদাত করতে সক্ষম হবে তখনই মানুষ যে 'সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি'- এই উদ্দেশ্য সফল হবে। হবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত এবং লাভ করবে পূর্ণতা।