📄 খলীফা বা প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য
এ দুনিয়ায় মানুষের মর্যাদা হচ্ছে সে আল্লাহর খলীফা- অর্থাৎ আল্লাহর প্রতিনিধি। প্রতিনিধির কাজ এই যে সে যার প্রতিনিধি তারই আনুগত্য ও অনুসরণ করে চলবে। সে নিজের মনিব ব্যতীত অন্য কারো যেমন আনুগত্য করতে পারেনা, তেমনি মনিবের প্রজাদেরকে নিজের প্রজা বা খাদেম বানাতে পারেনা। প্রতিনিধি কখনো কোন অবস্থাতেই নিজে মনিব সেজে বসতে পারেনা। প্রতিনিধি তার মনিবের প্রদত্ত সকল সুযোগ সুবিধাদি মনিবের হুকুম মত পরিচালনা করতে পারে কিন্তু নিজে কখনোও মনিবের আমানতের খেয়ানত করতে পারেনা।
এখন যদি কোন প্রতিনিধি মনিবের হুকুম না মেনে নিজের ইচ্ছামত প্রজাদের উপর শাসন চালায় অথবা কোন শক্তির অধীনস্থ হয়, মনিবের আমানত খেয়ানত করে, মনিবের নির্দেশ অমান্য করে এবং তাঁর দেয়া বিধান লংঘন করে, মনিবের দেয়া ধন-সম্পদে মনিবের ইচ্ছামত আইন-কানুন প্রণয়ন না করে- অর্থাৎ মনিবের হুকুম মত প্রতিটি কাজ সম্পন্ন না করে তাহলে সে প্রতিনিধি হতে পারেনা- সে হবে মনিবের বিদ্রোহী এবং বিরোধী। সে ব্যক্তি কখনো মনিবের নিকট থেকে পুরস্কার আশা করতে পারেনা। বরং মনিবের হুকুমের বিরোধী কাজ করার পরিণামে তাকে ভীষণ শাস্তি ভোগ করতে হবে। এমনিভাবে এ দুনিয়ায় প্রতিটি কার্যকলাপের জন্য মানুষকে প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর মনিব অর্থাৎ আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে, কারণ এ দুনিয়ায় সে ছিল আল্লাহর প্রতিনিধি। এ জীবন অবসানের পর আল্লাহতায়ালা দেখবেন যে সেই প্রতিনিধি- তার দেয়া মালমাত্তার সঠিক ব্যবহার করেছে কিনা, তাঁর দেয়া আইনে দেশ চালিয়েছে কিনা, তাঁর দেয়া অর্থ-ব্যবস্থায় অর্থসম্পদের ব্যবহার হয়েছে কিনা, তাঁর দেয়া বিধান মোতাবেক ইহজগতের কাজ সেই প্রতিনিধি পালন করেছে কিনা- আল্লাহতায়ালা তার কাছে সব জানতে চাইবেন- সে যদি তাঁর হুকুম মতই সবকিছু করে থাকে নিঃসন্দেহে মনিব খুশি হবেন এবং তাকে পুরস্কৃত করবেন। আল্লাহতায়ালা বলেন:
فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنّى هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ - وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِأَيْتِنَا أُولَئِكَ اَصْحٰبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خُلِدُونَ -
"আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়াত আসবে যারা আমার দেয়া হেদায়াতের অনুসরণ করবে, তাদের জন্য কোনরূপ শাস্তির ভয় এবং কোন দুশ্চিন্তার কারণ নাই, আর যারা নাফরমানি করবে এবং আমার বাণী ও নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে যাবে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” (আল বাকারা ৩৮-৩৯)
তাই প্রতিনিধির সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো সে যার প্রতিনিধি- তার আজ্ঞানুবর্তিতা, তার শাসন এবং সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেয়া। সে যদি এটা করতে রাজী না হয় তাহলে প্রথমেই সে বিদ্রোহী হয়েছে- সে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে বলে ধরে নিতে হবে। সে যদি কোন সৎকাজ করেও তা অর্থহীন হয়ে যাবে- কারণ সে মূলতই প্রতিনিধিত্বের সঠিক দাবী পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
📄 খিলাফত প্রতিষ্ঠার দায়িত্বের কারণেই মানুষ সবার সেরা
মানুষের সৃষ্টি তত্ত্ব আলোচনা করলে দেখা যায় যে মানুষ নিকৃষ্টভাবে সৃষ্টি হয়েছে। এক ফোঁটা অপবিত্র পানি থেকেই তার সৃষ্টি। এদিক দিয়ে সে অতি তুচ্ছ। আল্লাহতায়ালার ফুঁকে দেয়া রূহ সম্বলিত দেহ নিয়ে কোন বান্দা যদি শয়তানের পদাংক অনুসরণ করে তাহলে তার মর্যাদা রক্ষিত হতে পারেনা, বরং সে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্তরে চলে যাবে- কারণ একমাত্র আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্ব সঠিকভাবে করার উপরই তার ইজ্জত হেফাজত করা সম্ভব।
তাহলে দেখা যাচ্ছে আল্লাহর প্রতিনিধি হবার কারণেই মানুষের মর্যাদা দুনিয়ার সকল সৃষ্টির চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং উন্নত। দুনিয়ায় প্রতিটি বস্তুই তার অধীন এবং তার ব্যবহারের জন্য নিয়োজিত। আল্লাহর নির্ধারিত পন্থায় তা থেকে সে খেদমত গ্রহণ করার অধিকারী।
খলীফা হিসাবে খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে হলে এবং পরকালে আল্লাহর আযাব থেকে নাজাত পেতে হলে আল্লাহর দ্বীন বা বিধানকে এ দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ও বিজয়ী করে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। কারণ এই দুনিয়ায় খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই আল্লাহ মানুষকে এত বেশী মর্যাদা দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ করে পয়দা করেছেন। তাদের এই মর্যাদা একমাত্র খিলাফত প্রতিষ্ঠার উপরই নির্ভরশীল এবং এই উদ্দেশ্যেই আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে নবী রাসূল (সা) পাঠিয়েছেন যেন আল্লাহর সেই মহান উদ্দেশ্য পালনের জন্য তাঁরা বান্দাদেরকে পথ দেখিয়ে দেন।
📄 নবী ও রাসূল (সাঃ) দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করেছেন
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِيْنِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُله -
“তিনিই তাঁর রাসূল প্রেরণ করেছেন পথ নির্দেশ ও সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীনের উপর তাকে বিজয়ী করে তোলার জন্য।” (সূরা আস সাফ- ৯ নং আয়াত)
এখানে এই আয়াতের আলোকে দেখা যায় যে, এ দুনিয়ায় খিলাফত প্রতিষ্ঠার মহান লক্ষ্যে সমাজে বিদ্যমান অন্যান্য বিধান বা ব্যবস্থাকে উৎখাত করে আল্লাহর দ্বীনকে পুরোপুরি কায়েম করতে হবে। নবী রাসূলদের ইতিহাস তাঁদের জীবন চরিত এ কথারই উজ্জ্বল নিদর্শন। আল্লাহতায়ালার তরফ থেকে প্রত্যেক নবী ঐ একই কাজ করে গেছেন।
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّيْنِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ -
“তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের নিয়ম বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যার হুকুম তিনি নূহকে দিয়েছিলেন। আর যা (হে মুহাম্মাদ) এখন তোমার প্রতি আমরা ওহির সাহায্যে পাঠিয়েছি। আর যার হেদায়াত ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে দিয়েছিলাম। এই তাকিদ সহকারে যে, কায়েম কর এই দ্বীনকে এবং এতে ছিন্ন-ভিন্ন হয়োনা।” (সূরা আশুরা, ১৩ আয়াত)।
আল্লাহ এ দুনিয়াতে যত নবী রাসূল পাঠিয়েছেন সকলের উপর একই দায়িত্ব ছিল। সকলেরই উদ্দেশ্য ছিল দ্বীন কায়েম করা। এমনিভাবে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর নবুয়ত প্রাপ্তির পর থেকে মক্কায় ১৩ বছর এবং মদীনায় ১০ বছর এই ২৩ বছরের জিন্দেগী আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মানবজাতির জন্য একমাত্র পথিকৃত। এ দুনিয়ার খিলাফত প্রতিষ্ঠার যে পথ তা মহামানব রাসূলেরই (সা) প্রদর্শিত পথ। এ পথ ছাড়া খিলাফত বা আল্লাহতায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠার অন্যকোন পথ নেই। আল্লাহ প্রদত্ত আদর্শ একমাত্র রাসূল প্রদর্শিত পথেই বাস্তবায়ন সম্ভব-আল্লাহর রাসূল এ পথই দেখিয়ে গেছেন, যে পথ ধরে আমাদের চলতে হবে। সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার অর্থাৎ জীবনের সার্বিক বিভাগ ও দিকের উপর আল্লাহর বিধানকে পুরোপুরি কার্যকর ও বাস্তবায়ন করার মধ্যেই মানুষের খিলাফতের দায়িত্ব পালনের যথার্থতা নিহিত।
📄 মানুষের ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা
আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কিন্তু তাদেরকে পুরোপুরি স্বাধীনতা দিয়ে ছেড়ে দেননি। সর্বত্রই মানুষ আল্লাহতায়ালার অধীন। কোন অবস্থাতেই এবং কোনক্রমেই মানুষ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণমুক্ত হতে পারেনা। আল্লাহ মানুষকে সীমিত স্বাধীনতা দিয়ে পয়দা করেছেন। আর সেই সীমিত স্বাধীনতাই হলো "FREEDOM OF CHOICE" ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা। আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্য রাসূলদের (আ) মাধ্যমে ভালো ও মন্দ পথ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিয়েছেন। মানুষ ভাল কাজ করতে পারে অথবা মন্দ কাজও করতে পারে। ভাল কাজের পুরষ্কার লাভ এবং খারাপ কাজের পরিণতিতে শাস্তি পাওয়ার কথাও আল্লাহতায়ালা বলে দিয়েছেন। এখন এই সীমিত স্বাধীনতা পাওয়ার পর মানুষ কিভাবে তা ব্যবহার করে তাই আল্লাহতায়ালা দেখবেন।