📄 মানুষ সমস্ত সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ
এ বিশ্ব চরাচরে মানুষের জানা অজানা অসংখ্য সৃষ্টির অস্তিত্ব বিদ্যমান। সৃষ্টি লোকের এ মহাসমুদ্রে অনেক কিছু চোখে দেখা যায়। আবার অনেক কিছুই এমন রয়েছে যাদের অস্তিত্ব চোখে দেখা যায় না। এগুলোর অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্যে ধরা পড়ে। আবার কোন কোনটার অস্তিত্ব নিরীক্ষণের মাধ্যমে, আবার কোনটা উপলব্ধির উপর নির্ভরশীল হয়ে মহান স্রষ্টার এক অপূর্ব সৃষ্টি কৌশলের সাক্ষ্য দেয়। গভীর সমুদ্র তলদেশের বালুকারাজি, ঝিনুক অথবা প্রস্তর খন্ডের মাঝে কোন কিছুর অস্তিত্ব থেকে শুরু করে, সৌর জগত তথা মহাশূন্যের বিভিন্ন বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে সসীম জ্ঞানের অধিকারী মানুষ আজ নব নব আবিষ্কার করে চলেছে। শুধু তাই নয় এ ধরাপৃষ্ঠের মানুষ আজ চাঁদে পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এ বিশ্বজগতের সমস্ত সৃষ্টিই মানুষের সেবায় নিয়োজিত। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনিস থেকে শুরু করে অতি বড় এবং প্রকান্ড সৃষ্ট বস্তুকে মানুষ তার কল্যাণে ব্যবহার করছে। একটি মৃত গরুর অস্থিমাংস থেকে শুরু করে গাছপালা, বৃক্ষ-লতা, সমস্ত পার্থিব প্রাণী ও প্রাণহীন বস্তু এবং চন্দ্র, সূর্য, আলো, বায়ু সব কিছুই মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। বিজ্ঞান ও বুদ্ধির ক্রম বিকাশের সাথে সাথে বহু অজানা জিনিষকেও আজ মানুষ তার নিজের কল্যাণে ব্যবহার করার প্রয়াস পাচ্ছে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ তাইতো হলো মানুষ। মানুষ হলো আশরাফুল মাখলুকাত। আল্লাহতায়ালা আল-কোরআনে ঘোষণা করেছেন-
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَهُمْ فِي الْبَرِّرَ الْبَحْرِ وَرَزَقْنَهُمْ
منَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً -
“আমরা বনী আদমকে ইজ্জত দান করেছি এবং স্থল ও জলে সওয়ারীর ব্যবস্থা করে দিয়েছি এবং তাকে পবিত্র জিনিস দ্বারা রিযক দান করেছি এবং বহু জিনিসের উপর যা আমরা পয়দা করেছি- তাকে একরূপ শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।” (বানী ইসরাঈল ৭০ নং আয়াত)
আল কোরআনের আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেছেন-
اَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ
“হে মানুষ তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, দুনিয়ায় যা কিছু রয়েছে আল্লাহ তার সবকিছুই তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন"। (আলহাজ্জ ৬৫ নং আয়াত)
এছাড়াও আল কুরআনের আরো অনেক আয়াতে মানুষকে এ কথা আল্লাহতায়ালা বলে দিয়েছেন যে, আসমান এবং জমিনে যত জিনিস আছে তার সবই মানুষের খেদমত ও কল্যাণের জন্য তাদের অধীন করে দেয়া হয়েছে। এই গাছপালা, এই পাহাড়, এই জীবজন্তু, রাতদিন, আলো অন্ধকার, চন্দ্র সূর্য, তারকারাজি অর্থাৎ সবই তাদের কল্যাণে নিয়োজিত এবং তাদের কার্যোপযোগী করে তৈরী করা হয়েছে এবং এসব কিছুর খেদমত পাওয়ার যোগ্য করেই তাকে পয়দা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন-
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا
“তিনিই আল্লাহ যিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।” (আল বাকারা ২৯ আয়াত)
আল্লাহতায়ালার এই সকল বাণীর যথার্থতা নিরূপণ করতে অন্তর্চক্ষু খোলার প্রয়োজন হয়না- মানুষ তার চর্মচক্ষুর ক্ষুদ্র দৃষ্টি নিজের স্বাভাবিক জীবনের ওপর নিবদ্ধ করলেই এ কথার প্রমাণ পায়।
📄 প্রত্যেক সৃষ্টিরই উদ্দেশ্য আছে
বিজ্ঞান, দর্শন অথবা কলা সবকিছুই এ অভিমত ব্যক্ত করে যে কারণ ছাড়া কোন কিছু সংগঠিত হয়না। তেমনিভাবে অন্য দিকে উদ্দেশ্য ছাড়া কোন সৃষ্টির অস্তিত্ব অকল্পনীয়। এখন প্রশ্ন জাগে এই যে মহা বিশ্বের সৃষ্টি, এই যে জানা-অজানা অসংখ্য মাখলুকাত যারা সকলেই সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি “মানুষের” সেবায় নিয়োজিত সেই 'মানুষ' সৃষ্টির কারণ বা উদ্দেশ্য কী?
এই মানুষ সৃষ্টির নিশ্চয়ই একটা উদ্দেশ্য আছে। আর এই উদ্দেশ্য শুধু তিনিই বলতে পারেন যিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টজীব মানুষ তার মস্তিষ্ক দিয়ে তার স্রষ্টা সম্পর্কে নানারূপ অবান্তর কল্পনার জাল বুনতে পারে, নানাজন নানারূপে অর্থহীন কিছু সংলাপ পেশ করতে পারে বটে- অথবা সসীম মগজের খোঁড়া যুক্তিতে স্রষ্টার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসতে পারে কিন্তু স্রষ্টার উদ্দেশ্যকে জানা হবে না। মানুষ যার সৃষ্টি তার কাছেই এ প্রশ্নের সঠিক জওয়াব জানতে হবে।
মহান আল্লাহতায়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং এই মহাবিশ্বকে বৈচিত্রময় করে গড়ে তুলেছেন। পৃথিবীর মাঝে জীবজন্তু, বৃক্ষ-তরুলতা, শূন্যলোকে গ্রহ, উপগ্রহ, তারকারাজি এক অপূর্ব সৌন্দর্যে সুষমামন্ডিত এবং সুসামঞ্জস্যশীল করে তৈরী করে একমাত্র মানবকুল সৃষ্টির মাধ্যমেই তার সৃষ্টির যথার্থতা সার্থক করে তুলতে চেয়েছেন। মানবকূলকে সবকিছুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা প্রধান করে সৃষ্টি করে বাকি সকল কিছুই মানুষের অধীন এবং সেবায় নিয়োজিত করে মহান আল্লাহতায়ালা তার উদ্দেশ্যকে পরিপূর্ণ করে তুলতে চেয়েছেন। মনুষ্যজাতির কর্মকান্ডের মাঝ দিয়ে তিনি তার সৃষ্টির যথার্থতা নিরূপণ করতে চান।
📄 মানুষের সাথে অন্যান্য সৃষ্টির পার্থক্য
তাই আমরা দেখি দুনিয়ার অন্য কোন প্রাণীর জন্য মহান আল্লাহতায়ালার কোন নির্দেশনামা নেই- নেই কোন আসমানী কিতাব। কোন জীবজন্তু বা পক্ষীকুলের জন্য তিনি কখনো কোন পয়গাম্বর বা নবী-রসূল পাঠান নাই। কিন্তু মানুষের জন্য তিনি পাঠিয়েছেন নবী-রাসূল, দিয়েছেন গাইড লাইনস এবং হেদায়াত।
মানুষ ছাড়া বিশ্বের আর যত সৃষ্টি আছে সবকিছুই আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত সুনির্দিষ্ট এবং সুনির্ধারিত নিয়ম মোতাবেকই চলছে। আম গাছে কখনো লিচু ফল ধরেনা, পূর্বের সূর্য কখনো পশ্চিমে উদয় হয়না। আগুন দহন করে, পানি করে ঠান্ডা। আল্লাহতায়ালা যেভাবে তাদের হুকুম করেছেন তারা সেভাবেই চলছে সৃষ্টিলগ্ন থেকে। কিন্তু মানুষকে তিনি সেভাবে সৃষ্টি করে ছেড়ে দেননি। আল্লাহতায়ালা মানুষকে বুদ্ধি দিয়ে, বিবেক দিয়ে এবং সীমিত স্বাধীনতা দিয়ে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা মানুষের Animality র-সাথে সাথে দান করেছেন Rationality কারণ তিনি দেখতে চান যে মানুষ হক এবং বাতিল পার্থক্য করতে পারে কিনা, মানুষ তার বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে আল্লাহকে চিনে আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলে, না কি শয়তানের পদাংক অনুসরণ করে পশুর মত ন্যায় অন্যায় বিচার না করে অনৈতিকভাবে জীবন যাপন করে, কিংবা ইতর প্রাণীর মত পশুর চেয়েও নিকৃষ্টভাবে এ দুনিয়ার জীবন কাটায়?
📄 মানুষের চলার পথ চেনার উপায়
আল্লাহতায়ালা তাই মানুষকে সৃষ্টি করে অন্ধকারে ছেড়ে দেননি। এই দুনিয়ায় মানুষের সঠিক চলার পথ কী এবং কোনটি তা জানা এবং বুঝার জন্য যুগে যুগে মানব জাতির জন্য তিনি পাঠিয়েছেন নবী-রাসূল (আ) ও ঐশী গ্রন্থ। অনুরূপভাবে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর নিকট হযরত জিব্রাইল (আ) এর মাধ্যমে সমগ্র মানব জাতির জন্য পাঠিয়েছেন মহাগ্রন্থ আল-কোরআন।
সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) তার জীবনের প্রতিটি কাজ এবং কথা দিয়ে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নির্দেশিত পথই বাস্তবভাবে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন- যাতে মানুষ এই পথ চিনতে ভুল না করে।