📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


পূবের্ অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখেছি যে, মাযহাবগুলো মূলত চারটি মৌলিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। নেপথ্যে রয়েছে নিম্নোক্ত কারণগুলো:
১. ঐক্যবদ্ধ বা বিশৃঙ্খল বিভিন্ন অবস্থায় মুসলিম রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি
২. দীনি নেতৃত্বের অবস্থা (একীভূত ও রক্ষণশীল, বিচ্ছিন্ন ও অরক্ষণশীল)
৩. বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যোগাযোগ。
প্রাথমিক যুগে ইসলামি রাষ্ট্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ। তখন নেতৃত্বও ছিল একীভূত এবং শাসকগণ ছিলেন ধর্মপরায়ণ। সে সময় মুসলিম বিশেষজ্ঞগণও একে অপরের কাছাকাছি ছিলেন। ফলে তখন যোগাযোগ ছিল অনেক সহজ। এ কারণেই তখন কেবল একটি মাযহাবই বিদ্যমান ছিল; আর তা ছিল নাবি -এর মাযহাব অথবা ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার মাযহাব। তারপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে ভাঙন ধরে। শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞগণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নিবাস স্থাপন করেন। যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতার কারণে বিশেষজ্ঞগণ পারস্পরিক পরামর্শের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করতে বাধ্য হন।
এভাবে একসময় গড়ে উঠে অসংখ্য মাযহাব। তবে অধিক নির্ভরযোগ্য হাদীসভিত্তিক অন্যের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তৎক্ষণাৎ নিজের মত পরিত্যাগে এই বিশেষজ্ঞগণ মোটেও দ্বিধা করতেন না। ফলে তারা পূর্ববর্তী যুগের বিশেষজ্ঞদের উদার মানসিকতার ধারাকে অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে 'আব্বাসি খিলাফাতের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে ভাঙনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশেষজ্ঞগণও অনেকটা জড়িয়ে পড়েন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত দরবারি বিতর্ক এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। এই অবাঞ্ছিত বিতর্কে বিজয়ী ব্যক্তি ও তাদের মাযহাবকে বিশেষ রাজকীয় আনুকূল্য এনে দেয়। মূলত এটি ছিল গোঁড়ামিপূর্ণ দলাদলিরই আরেকটি ধাপ। আর এর মাধ্যমে বিদ্যমান চারটি মাযহাবের অনুসারীদের অনেকেই ব্যক্তিগত সুখ্যাতি লাভ করেছেন।
গতিশীল ফিক্‌হ
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থা মূলত পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোরই একটি সংমিশ্রণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি পুনরায় মুসলিম 'আলিমদের পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এর বহু আগেই মুসলিম বিশ্ব বিভিন্ন আর্থ-রাজনৈতিক সরকার পদ্ধতির ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদী সত্তায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পরিণতিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে। বর্তমান পৃথিবীর মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় দুই বিলিয়ন। কেবল আল্লাহ ও তাঁর নাবি -এর প্রতি বিশ্বাসই এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একটি অন্যরকম ঐক্যের সূত্রে আবদ্ধ করে রেখেছে। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র চার মাযহাবের যেকোনো একটি দিয়ে ধর্মীয় শাসনতন্ত্রের আইন পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। এই প্রচেষ্টা পূর্বের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কিছুটা কম গোঁড়া। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানেও মাযহাবকেন্দ্রিক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে এখনও রয়ে গিয়েছে। এ কারণেই শাসনতন্ত্রের এই ব্যবস্থাও মুসলিম সমাজের মধ্যে বিভিন্ন রকম বিভেদ সৃষ্টি করছে।
তবে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর দীনকে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে একটি আশাব্যঞ্জক প্রেরণা জেগে উঠেছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু সংস্কৃতি বিদ্যমান। উপরন্তু, দ্রুত পরিবর্তনশীল এ বিশ্বে প্রাত্যহিক জীবন থেকে উদ্ভূত সমস্যা ও বিষয়াবলি ক্রমবর্ধমান হারে বৈচিত্র্য লাভ করছে। ফলে অনেক মুসলিম বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন থেকে উপলব্ধি করছেন যে, কেবল গতিশীল-ফিক্‌হ-চর্চার-ধারা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই মুসলিমদের জীবনবিধান হিসেবে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। এ বিষয়টি আমরা ইতিপূর্বেও "বিকাশ পর্যায়” শিরোনামে উল্লেখ করেছি। সব ধরনের গোঁড়ামি ও দলীয় চিন্তা দূরীভূত করে মাযহাবগুলোর পুনরায় একত্রীকরণ এবং ফিক্‌হশাস্ত্রকে গতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে ইজতিহাদের দ্বার পুনরায় খুলে দেওয়া আবশ্যক। এতে করে মুসলিম আইনজ্ঞগণ এমন বস্তুনিষ্ঠ আইন প্রণয়নে সক্ষম হবেন যেগুলো দিয়ে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শারী'আহ আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এরূপ সংস্কারের সম্ভাব্য প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেবল ইসলামে নবদীক্ষিত লোকদের উপরই নয় বরং মুসলিম হিসেবে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের উপরও এর প্রভাব পড়বে। নতুন ইসলাম গ্রহণকারীরা বিভিন্ন মাযহাবের মতপার্থক্যের জটিলতা থেকে রেহাই পাবে। আর মুসলিম সমাজে জন্ম নেওয়া মুসলিমদের নতুন প্রজন্ম মাযহাবগুলোর মতপার্থক্যের কারণে সৃষ্ট হতাশা থেকে মুক্তি পাবে। তখন তাঁরা সকল মাযহাব ও প্রথম যুগের বিশেষজ্ঞদের অসাধারণ অবদানকে বর্জন করার অদূরদর্শী চিন্তাধারাও পরিহার করতে পারবে।

পূবের্ অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখেছি যে, মাযহাবগুলো মূলত চারটি মৌলিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। নেপথ্যে রয়েছে নিম্নোক্ত কারণগুলো:
১. ঐক্যবদ্ধ বা বিশৃঙ্খল বিভিন্ন অবস্থায় মুসলিম রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি
২. দীনি নেতৃত্বের অবস্থা (একীভূত ও রক্ষণশীল, বিচ্ছিন্ন ও অরক্ষণশীল)
৩. বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যোগাযোগ。
প্রাথমিক যুগে ইসলামি রাষ্ট্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ। তখন নেতৃত্বও ছিল একীভূত এবং শাসকগণ ছিলেন ধর্মপরায়ণ। সে সময় মুসলিম বিশেষজ্ঞগণও একে অপরের কাছাকাছি ছিলেন। ফলে তখন যোগাযোগ ছিল অনেক সহজ। এ কারণেই তখন কেবল একটি মাযহাবই বিদ্যমান ছিল; আর তা ছিল নাবি -এর মাযহাব অথবা ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার মাযহাব। তারপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে ভাঙন ধরে। শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞগণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নিবাস স্থাপন করেন। যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতার কারণে বিশেষজ্ঞগণ পারস্পরিক পরামর্শের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করতে বাধ্য হন।
এভাবে একসময় গড়ে উঠে অসংখ্য মাযহাব। তবে অধিক নির্ভরযোগ্য হাদীসভিত্তিক অন্যের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তৎক্ষণাৎ নিজের মত পরিত্যাগে এই বিশেষজ্ঞগণ মোটেও দ্বিধা করতেন না। ফলে তারা পূর্ববর্তী যুগের বিশেষজ্ঞদের উদার মানসিকতার ধারাকে অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে 'আব্বাসি খিলাফাতের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে ভাঙনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশেষজ্ঞগণও অনেকটা জড়িয়ে পড়েন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত দরবারি বিতর্ক এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। এই অবাঞ্ছিত বিতর্কে বিজয়ী ব্যক্তি ও তাদের মাযহাবকে বিশেষ রাজকীয় আনুকূল্য এনে দেয়। মূলত এটি ছিল গোঁড়ামিপূর্ণ দলাদলিরই আরেকটি ধাপ। আর এর মাধ্যমে বিদ্যমান চারটি মাযহাবের অনুসারীদের অনেকেই ব্যক্তিগত সুখ্যাতি লাভ করেছেন।
গতিশীল ফিক্‌হ
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থা মূলত পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোরই একটি সংমিশ্রণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি পুনরায় মুসলিম 'আলিমদের পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এর বহু আগেই মুসলিম বিশ্ব বিভিন্ন আর্থ-রাজনৈতিক সরকার পদ্ধতির ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদী সত্তায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পরিণতিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে। বর্তমান পৃথিবীর মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় দুই বিলিয়ন। কেবল আল্লাহ ও তাঁর নাবি -এর প্রতি বিশ্বাসই এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একটি অন্যরকম ঐক্যের সূত্রে আবদ্ধ করে রেখেছে। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র চার মাযহাবের যেকোনো একটি দিয়ে ধর্মীয় শাসনতন্ত্রের আইন পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। এই প্রচেষ্টা পূর্বের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কিছুটা কম গোঁড়া। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানেও মাযহাবকেন্দ্রিক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে এখনও রয়ে গিয়েছে। এ কারণেই শাসনতন্ত্রের এই ব্যবস্থাও মুসলিম সমাজের মধ্যে বিভিন্ন রকম বিভেদ সৃষ্টি করছে।
তবে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর দীনকে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে একটি আশাব্যঞ্জক প্রেরণা জেগে উঠেছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু সংস্কৃতি বিদ্যমান। উপরন্তু, দ্রুত পরিবর্তনশীল এ বিশ্বে প্রাত্যহিক জীবন থেকে উদ্ভূত সমস্যা ও বিষয়াবলি ক্রমবর্ধমান হারে বৈচিত্র্য লাভ করছে। ফলে অনেক মুসলিম বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন থেকে উপলব্ধি করছেন যে, কেবল গতিশীল-ফিক্‌হ-চর্চার-ধারা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই মুসলিমদের জীবনবিধান হিসেবে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। এ বিষয়টি আমরা ইতিপূর্বেও "বিকাশ পর্যায়” শিরোনামে উল্লেখ করেছি। সব ধরনের গোঁড়ামি ও দলীয় চিন্তা দূরীভূত করে মাযহাবগুলোর পুনরায় একত্রীকরণ এবং ফিক্‌হশাস্ত্রকে গতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে ইজতিহাদের দ্বার পুনরায় খুলে দেওয়া আবশ্যক। এতে করে মুসলিম আইনজ্ঞগণ এমন বস্তুনিষ্ঠ আইন প্রণয়নে সক্ষম হবেন যেগুলো দিয়ে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শারী'আহ আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এরূপ সংস্কারের সম্ভাব্য প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেবল ইসলামে নবদীক্ষিত লোকদের উপরই নয় বরং মুসলিম হিসেবে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের উপরও এর প্রভাব পড়বে। নতুন ইসলাম গ্রহণকারীরা বিভিন্ন মাযহাবের মতপার্থক্যের জটিলতা থেকে রেহাই পাবে। আর মুসলিম সমাজে জন্ম নেওয়া মুসলিমদের নতুন প্রজন্ম মাযহাবগুলোর মতপার্থক্যের কারণে সৃষ্ট হতাশা থেকে মুক্তি পাবে। তখন তাঁরা সকল মাযহাব ও প্রথম যুগের বিশেষজ্ঞদের অসাধারণ অবদানকে বর্জন করার অদূরদর্শী চিন্তাধারাও পরিহার করতে পারবে।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 প্রস্তাবিত পদক্ষেপ

📄 প্রস্তাবিত পদক্ষেপ


একটি কার্যকর মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ মাযহাব, একটি কার্যকর সংস্থা এবং একটি প্রাণবন্ত ফিকহশাস্ত্র প্রয়োজন। এর মাধ্যমে গোটা মুসলিম জাতি সম্মিলিতভাবে মানবজাতির সার্বজনীন স্বার্থ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামি জীবনব্যবস্থার বাস্তবমুখিতা তুলে ধরবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মাযহাবগুলোর পুনরেকত্রীকরণ ও একটি গতিশীল ফিক্হশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই অনস্বীকার্য। এখন প্রশ্ন হলো, এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে? প্রথমত, প্রথম যুগের মহান ইমাম ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। মাযহাবগুলোর বর্তমান অবস্থার সাথে এর প্রধান বিশেষজ্ঞদের অবস্থানের যে ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা বাস্তবসম্মত উপায়ে দূর করতে হবে।
উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জ্ঞানী-গুণী বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে যোগ্য নেতৃত্বের জন্য আহ্বান জানাতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তন সাধনে উৎসাহী ও উদ্যমী ব্যক্তিবর্গকে এ লক্ষ্যে অন্যান্য আগ্রহী পক্ষের সাথে যোগাযোগ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। সমস্যা নিরসনের এসব পদক্ষেপের মধ্যে থাকবে:
১. সমাধানের নেপথ্য প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, ২. সর্বাধিক উপযোগী সমাধান নির্বাচন, ৩. বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পন্থা নির্ধারণ, ৪. সর্বাধিক উপযোগী পদ্ধতি নির্বাচন, এবং ৫. সমাধান বাস্তবায়ন।
এ ধরনের পরিকল্পনার প্রত্যেকটি স্তরে পদক্ষেপগুলোকে বাস্তবসম্মত পদ্ধতিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তাত্ত্বিক পর্যায়ে মাযহাবগুলোর মধ্যকার বিভিন্ন মতপার্থক্য নিরসনের পরামর্শ দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। তবে এটা একটি অনস্বীকার্য সত্য যে, গতিশীল ফিশাস্ত্রের পুনরুজ্জীবন ও মাযহাবগুলোর পুনরেকত্রীকরণের এ কাজ মোটেই কোনো সহজসাধ্য বিষয় নয়। তবে কষ্টসাধ্য হলেও তা নিশ্চয়ই সম্ভব। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রথম যুগের ইমামদের প্রণীত পদ্ধতিভিত্তিক নিম্নোক্ত কাঠামোটি বিভিন্ন সময়ে অনেক উদার মানসিকতার বিশেষজ্ঞগণ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

একটি কার্যকর মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ মাযহাব, একটি কার্যকর সংস্থা এবং একটি প্রাণবন্ত ফিকহশাস্ত্র প্রয়োজন। এর মাধ্যমে গোটা মুসলিম জাতি সম্মিলিতভাবে মানবজাতির সার্বজনীন স্বার্থ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামি জীবনব্যবস্থার বাস্তবমুখিতা তুলে ধরবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মাযহাবগুলোর পুনরেকত্রীকরণ ও একটি গতিশীল ফিক্হশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই অনস্বীকার্য। এখন প্রশ্ন হলো, এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে? প্রথমত, প্রথম যুগের মহান ইমাম ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। মাযহাবগুলোর বর্তমান অবস্থার সাথে এর প্রধান বিশেষজ্ঞদের অবস্থানের যে ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা বাস্তবসম্মত উপায়ে দূর করতে হবে।
উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জ্ঞানী-গুণী বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে যোগ্য নেতৃত্বের জন্য আহ্বান জানাতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তন সাধনে উৎসাহী ও উদ্যমী ব্যক্তিবর্গকে এ লক্ষ্যে অন্যান্য আগ্রহী পক্ষের সাথে যোগাযোগ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। সমস্যা নিরসনের এসব পদক্ষেপের মধ্যে থাকবে:
১. সমাধানের নেপথ্য প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, ২. সর্বাধিক উপযোগী সমাধান নির্বাচন, ৩. বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পন্থা নির্ধারণ, ৪. সর্বাধিক উপযোগী পদ্ধতি নির্বাচন, এবং ৫. সমাধান বাস্তবায়ন।
এ ধরনের পরিকল্পনার প্রত্যেকটি স্তরে পদক্ষেপগুলোকে বাস্তবসম্মত পদ্ধতিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তাত্ত্বিক পর্যায়ে মাযহাবগুলোর মধ্যকার বিভিন্ন মতপার্থক্য নিরসনের পরামর্শ দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। তবে এটা একটি অনস্বীকার্য সত্য যে, গতিশীল ফিশাস্ত্রের পুনরুজ্জীবন ও মাযহাবগুলোর পুনরেকত্রীকরণের এ কাজ মোটেই কোনো সহজসাধ্য বিষয় নয়। তবে কষ্টসাধ্য হলেও তা নিশ্চয়ই সম্ভব। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রথম যুগের ইমামদের প্রণীত পদ্ধতিভিত্তিক নিম্নোক্ত কাঠামোটি বিভিন্ন সময়ে অনেক উদার মানসিকতার বিশেষজ্ঞগণ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 বহুমুখী ও বিপরীতমুখী মতপার্থক্য

📄 বহুমুখী ও বিপরীতমুখী মতপার্থক্য


মাযহাবগুলোর মতপার্থক্যগুলো প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত:
প্রথমত, বহুমুখী মতপার্থক্য বা ইখতিলাফ তানাওউ'। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে 'আলিমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত থাকলেও এগুলোর বিভিন্নতা গ্রহণযোগ্য এবং এদের সহাবস্থানও সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, সলাতে নাবি-এর বিভিন্নভাবে বসার পদ্ধতি। হয়তো একটি বসার ধরণকে একটি মাযহাব অপরটির উপর প্রাধান্য দিয়েছে।
বেশ কিছু বিষয়ে কুর'আন, সুন্নাহ ও সহাবিগণের ইজমা' কিংবা কিয়াস সমর্থিত একাধিক সমাধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী সিদ্ধান্তগুলোকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্যবহার উপযোগী বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আর এগুলো হচ্ছে উল্লিখিত যৌক্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য মতপার্থক্যের একটি অংশ। এই ধরনের বিষয়কে দ্বন্দ্ব সংঘাত ও বিরোধের উৎসে পরিণত করা একেবারেই অনুচিত। কারণ, সকল বর্ণনাই স্বয়ং নাবি-এর কাছ থেকে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, পরস্পর বিপরীতমুখী মতপার্থক্য বা ইখতিলাফ তাদাঁদ। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে এমন বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত দেখা যায়, যার সবগুলো যৌক্তিকভাবে একই সময়ে সঠিক হতে পারে না। যেমন, কিছু জিনিষকে এক মাযহাব হয়তো হালাল ঘোষণা করছে, আর অপর মাযহাব তাকে হারাম সাব্যস্ত করছে। এই ধরনের মতপার্থক্য নিরসনে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত:
১. শব্দের অর্থ ও ব্যাকরণগত ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে উদ্ভূত অধিকাংশ মতপার্থক্য নিরসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশুদ্ধ হাদীস অনুসরণ করতে হবে। হাদীসকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করলে উক্ত শব্দটির বাঞ্ছিত অর্থ সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা সম্ভব। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অর্থকে অন্য সব ব্যাখ্যার উপর প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
২. একইভাবে হাদীসভিত্তিক নয় কিংবা দুর্বল তথা অনির্ভরযোগ্য হাদীসের ভিত্তিতে দেওয়া আইনগত সিদ্ধান্তকে পরিত্যাগ করে নির্ভরযোগ্য হাদীসের ভিত্তিতে দেওয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।
৩. বিতর্কিত মূলনীতি কিংবা কিয়াসের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোকে কুর'আঁন, সুন্নাহ ও ইজমা'র আলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। তারপর এগুলোর সাথে সংগতিপূর্ণ সিদ্ধান্তকে গ্রহণ ও অসংগতিপূর্ণগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত।
মাযহাবগুলোর মতপার্থক্য নিরসনের এই তাত্ত্বিক রূপরেখা ফিক্ শাস্ত্রের বস্তুনিষ্ঠ অধ্যয়নে নিবেদিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধিক কার্যকর। এধরনের শিক্ষাকেন্দ্র হলো এমন প্রতিষ্ঠান যেখানে কোনো মাযহাবকেই অন্য মাযহাবের উপর প্রাধান্য দেওয়া হবে না; বরং কোনো বিষয়কে গ্রহণ বা বর্জনের একমাত্র মানদণ্ড হবে বিশুদ্ধ দলিল। এ অবস্থায় ইসলামি আইনকে এর মূল উৎস থেকে অধ্যয়ন করা যাবে এবং বিভিন্ন মাযহাবের মতকে যৌক্তিক ও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে। এসব শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার মান উন্নত হলে, মাযহাবগুলো পুনরেকত্রীতকরণের মহৎ পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত সাফল্যের প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করা যাবে। দলীয় চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও বিশুদ্ধ জ্ঞানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি ঐক্যবদ্ধ মাযহাবই মুসলিম বিশ্বের জন্য বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। একই সাথে বিশ্বব্যাপী শারী'আহ আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলনগুলোকেও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।
মাযহাবগুলোর একীভূত করা ও ইসলামি আইনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সফলতা এলে, আমরা তখন উম্মাহর পুনরেকত্রীকরণ ও সত্যিকারের খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে দৃষ্টি দিতে পারব। আল্লাহ চাইলে এ উদ্যোগ বিশ্বের সর্বত্র আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ভিত্তি ও দিকনির্দেশনা প্রদানে সক্ষম হবে।

মাযহাবগুলোর মতপার্থক্যগুলো প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত:
প্রথমত, বহুমুখী মতপার্থক্য বা ইখতিলাফ তানাওউ'। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে 'আলিমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত থাকলেও এগুলোর বিভিন্নতা গ্রহণযোগ্য এবং এদের সহাবস্থানও সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, সলাতে নাবি-এর বিভিন্নভাবে বসার পদ্ধতি। হয়তো একটি বসার ধরণকে একটি মাযহাব অপরটির উপর প্রাধান্য দিয়েছে।
বেশ কিছু বিষয়ে কুর'আন, সুন্নাহ ও সহাবিগণের ইজমা' কিংবা কিয়াস সমর্থিত একাধিক সমাধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী সিদ্ধান্তগুলোকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্যবহার উপযোগী বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আর এগুলো হচ্ছে উল্লিখিত যৌক্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য মতপার্থক্যের একটি অংশ। এই ধরনের বিষয়কে দ্বন্দ্ব সংঘাত ও বিরোধের উৎসে পরিণত করা একেবারেই অনুচিত। কারণ, সকল বর্ণনাই স্বয়ং নাবি-এর কাছ থেকে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, পরস্পর বিপরীতমুখী মতপার্থক্য বা ইখতিলাফ তাদাঁদ। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে এমন বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত দেখা যায়, যার সবগুলো যৌক্তিকভাবে একই সময়ে সঠিক হতে পারে না। যেমন, কিছু জিনিষকে এক মাযহাব হয়তো হালাল ঘোষণা করছে, আর অপর মাযহাব তাকে হারাম সাব্যস্ত করছে। এই ধরনের মতপার্থক্য নিরসনে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত:
১. শব্দের অর্থ ও ব্যাকরণগত ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে উদ্ভূত অধিকাংশ মতপার্থক্য নিরসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশুদ্ধ হাদীস অনুসরণ করতে হবে। হাদীসকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করলে উক্ত শব্দটির বাঞ্ছিত অর্থ সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা সম্ভব। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অর্থকে অন্য সব ব্যাখ্যার উপর প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
২. একইভাবে হাদীসভিত্তিক নয় কিংবা দুর্বল তথা অনির্ভরযোগ্য হাদীসের ভিত্তিতে দেওয়া আইনগত সিদ্ধান্তকে পরিত্যাগ করে নির্ভরযোগ্য হাদীসের ভিত্তিতে দেওয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।
৩. বিতর্কিত মূলনীতি কিংবা কিয়াসের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোকে কুর'আঁন, সুন্নাহ ও ইজমা'র আলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। তারপর এগুলোর সাথে সংগতিপূর্ণ সিদ্ধান্তকে গ্রহণ ও অসংগতিপূর্ণগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত।
মাযহাবগুলোর মতপার্থক্য নিরসনের এই তাত্ত্বিক রূপরেখা ফিক্ শাস্ত্রের বস্তুনিষ্ঠ অধ্যয়নে নিবেদিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধিক কার্যকর। এধরনের শিক্ষাকেন্দ্র হলো এমন প্রতিষ্ঠান যেখানে কোনো মাযহাবকেই অন্য মাযহাবের উপর প্রাধান্য দেওয়া হবে না; বরং কোনো বিষয়কে গ্রহণ বা বর্জনের একমাত্র মানদণ্ড হবে বিশুদ্ধ দলিল। এ অবস্থায় ইসলামি আইনকে এর মূল উৎস থেকে অধ্যয়ন করা যাবে এবং বিভিন্ন মাযহাবের মতকে যৌক্তিক ও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে। এসব শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার মান উন্নত হলে, মাযহাবগুলো পুনরেকত্রীতকরণের মহৎ পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত সাফল্যের প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করা যাবে। দলীয় চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও বিশুদ্ধ জ্ঞানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি ঐক্যবদ্ধ মাযহাবই মুসলিম বিশ্বের জন্য বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। একই সাথে বিশ্বব্যাপী শারী'আহ আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলনগুলোকেও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।
মাযহাবগুলোর একীভূত করা ও ইসলামি আইনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সফলতা এলে, আমরা তখন উম্মাহর পুনরেকত্রীকরণ ও সত্যিকারের খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে দৃষ্টি দিতে পারব। আল্লাহ চাইলে এ উদ্যোগ বিশ্বের সর্বত্র আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ভিত্তি ও দিকনির্দেশনা প্রদানে সক্ষম হবে।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 পরিশিষ্ট

📄 পরিশিষ্ট


পরিশিষ্ট ক: 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আয-যুবাইর
খলীফা ইয়াযীদ ইবন মু'আউইয়াহর শাসনামলের (৬০-৬৪ হিজরি; ৬৮০-৬৮৩ সাল) শেষ দিকে 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আয-যুবাইরকে হিজায অঞ্চলের খলীফা ঘোষণা করা হয়। হিজাযের এ বিদ্রোহের কথা জানতে পেরে ইয়াযীদ তা দমন করার জন্য তার সেনাপতি মুসলিম ইবন 'উকবাহর নেতৃত্বে একদল সৈনিক প্রেরণ করেন। ৬৪ হিজরিতে (৬৮৩ সাল) খলীফার প্রেরিত সেই সেনাবাহিনী মাক্কা যাওয়ার পথে মাদীনায় ব্যাপক লুটতরাজ চালায়। তবে মাক্কা পৌঁছার পূর্বে তাদের বাহিনী প্রধান মারা যায় এবং হুসাইন ইবন নুমাইর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়।
এ সেনাবাহিনী পবিত্র মাক্কা নগরী অবরোধ করে ও শহরের চারপাশে পাহাড়ের উপর ভারী প্রস্তর নিক্ষেপক কামান স্থাপন করে। এমনকি বৃষ্টির মতো তাঁদের এ পাথর নিক্ষেপের কারণে কা'বার দেওয়ালের কিয়দংশ ভেঙে পড়ে এবং কা'বার কালো পাথরে (হাজ্ব আসওয়াদ) ফাটল ধরে। তবে অবরোধকালে ইয়াযীদের মৃত্যু হওয়ায় উমাইয়া সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তারপর উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে ইব্‌ন আয-যুবাইরের বিদ্রোহে ইরাকিরাও একাত্মতা ঘোষণা করে। ইব্‌ন আয-যুবাইরের ভাই মুস'আবকে ইরাকের আমীর নিয়োগ করা হয়। তার অল্প কিছুদিন পর দক্ষিণ আরব, মিশর ও সিরিয়ার কিছু অংশও খলীফা ইব্‌ন আয-যুবাইরের সাথে যোগ দেয় এবং তার নেতৃত্বকে সুসংহত করার জন্য তাকে মাক্কা ছাড়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু ইব্‌ন আয-যুবাইর পবিত্র মাক্কা নগরী ত্যাগ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন।
মারওয়ান ইবন আল-হাকাম (৬৪-৬৫ হিজরি; ৬৮৩-৬৮৫ সাল) উমাইয়া খিলাফাতের দায়িত্ব নেওয়ার পর দামাস্কাস ও সিরিয়াকে আবারও উমাইয়া শাসনের অধীনে নিয়ে আসে। মারওয়ানের পুত্র 'আবদুল-মালিকের (৬৫-৮৬ হিজরি; ৬৮৫-৭০৫ সাল) শাসনামলের প্রায় মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হিজায ছিল খলীফা ইন্ন আয-যুবাইরের শাসনাধীন। পরিশেষে 'আবদুল-মালিক তার লৌহহস্ত সেনাপতি হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের নেতৃত্বে একটি বিশাল সিরীয় সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। তারা হিজাযের উপর সর্বশেষ আঘাত হানে।
৭২ হিজরির ১ জুল-কাদা (২৫ মার্চ ৬৯২ সাল) থেকে হাজ্জাজ সাড়ে ছয় মাসের জন্য মাক্কা অবরোধ করে রাখে। আবু বাক্রের কন্যা ও 'ইশাহ এর বোন আসমা ছিলেন ইন্ন আয-যুবাইরের মা। তার বীরোচিত উপদেশে উদ্বুদ্ধ হয়েই ইব্‌ন আয-যুবাইর শহীদ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যান। তার মস্তক বিচ্ছিন্ন করে দামাস্কাস পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং দেহটি প্রকাশ্য স্থানে কিছু সময় ঝুলিয়ে রাখার পর তার বৃদ্ধ মা'র নিকট হস্তান্তর করা হয়। ইব্‌ন আয-যুবাইরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রথম যুগের সর্বশেষ বীরপুরুষদের একজনের বিদায় ঘটে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্ব উমাইয়াদের লৌহমুষ্টিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
পরিশিষ্ট খ: কিছু বিপথগামী উপদল
খাওয়ারিজ (একবচনে খারিজি; আক্ষরিক অর্থ বিচ্ছিন্নতাবাদী)। এরা ছিল মূলত খলীফা 'আলি ইবন আবি তালিবের সেনাবাহিনীরই একটি অংশ। ৩৭ হিজরিতে (৬৫৭ সাল) 'আলি ও মু'আঁউইয়াহ (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) ইন আবি সুফিয়ান এর মধ্যে সিফফীনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। খিলাফাহকে কেন্দ্র করে 'আলি ও মু'আউইয়াহর মধ্যকার ভুল বোঝাবোঝি এক পর্যায়ে যুদ্ধের রূপ নেয়। এই যুদ্ধের সময়ই এই ফিরকা 'আলির সেনাবাহিনী থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। রক্তপাত বন্ধ করার লক্ষ্যে যখন দুপক্ষের মধ্যে সালিশ অনুষ্ঠিত হলো তখন 'আলি-এর অনুসারীদের একটি বিশাল অংশ প্রধানত তামীম গোত্রের লোকেরা সালিশের বিরোধিতা করে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন ওয়াহহ্ রাসিবীকে তাদের নেতা নির্বাচিত করে। তারা 'আলি ও মু'আউইয়াহ উভয়কে কাঁফির ঘোষণা করে। কারণ তাদের মতে, তারা উভয়ে ওয়াহয়ির আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত ফায়সালা বাদ দিয়ে মানবীয় সালিশের আশ্রয় নিয়েছেন। যারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নেয়নি এবং 'আলি ও মু'আউইয়াহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি এমন প্রত্যেককে তারা কাফির আখ্যায়িত করেছে।
খাওয়ারিজদের মতে সকল বিচার ফয়সালা সরাসরি কুর'আঁন থেকে আসা উচিত। তারা তাদের এ অবস্থানের বিরোধিতাকারী যেকোনো মুসলিমের রক্তপাত ও তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করাকে বৈধ মনে করত। খাওয়ারিজরা অন্য মুসলিমকে বিয়ে করা ও তাদের থেকে উত্তরাধিকার লাভ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী যে ব্যক্তি ব্যভিচার, মিথ্যাচার, নেশাগ্রহণ ইত্যাদি কাবীরা গুনাহে লিপ্ত হয় সে একজন মুরতাদ (ধর্মত্যাগী)।
তাদের চরমপন্থী শাখা আজরাকীদের ধারণা অনুযায়ী, এভাবে যে একবার কাফির হয়েছে সে কখনো ঈমানে পুনঃপ্রবেশ করতে পারবে না; তাকে তার স্ত্রী ও সন্তানাদিসহ হত্যা করতে হবে। খলীফা 'আলি বাধ্য হয়ে তাদের শিবিরে আক্রমণ করেন ও তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। ৩৭ হিজরির (৬৫৭ সাল) সে আক্রমণে ইন্ন ওয়াব ও তার অধিকাংশ অনুসারী নিহত হয়। এটি নাহরাওয়ানের যুদ্ধ নামে পরিচিত। তবে এ বিজয়ের বিনিময়ে 'আলি-কে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। বিদ্রোহ দমন হওয়া তো দূরের কথা, এর ফলে বরং পরের দুবছরে আরও বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। আব্দুর-রহমান ইবন মুলযিম নামক এক খারিজির ছুরিকাঘাতে 'আলি নিহত হন। মুলযিম ছিল এমন এক মহিলার স্বামী যার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য নাহরাওয়ানের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল।
মু'তাযিলা একটি দার্শনিক মতবাদ, এটি সাধারণত যুক্তিবাদ নামে পরিচিত। হিজরি দ্বিতীয় শতকে ওয়াসিল ইবন 'আতা' ও 'আম্ম ইবন 'উবাইদ এ মতবাদটি প্রচার শুরু করেন। পরবর্তীকালে 'আব্বাসি শাসকরা এ দর্শন দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এমনকি তৎকালীন সকল বিশেষজ্ঞকে এ মতবাদ মেনে চলতে বাধ্য করার লক্ষ্যে একটি সরকারি তদন্ত বাহিনী তৈরি করা হয়। অবশ্য খলীফা মুতাওয়াক্কিল (৫৭২-৫৮৮ হিজরি; ১১৭৭-১১৯২ সাল) মতবাদটি পরিত্যাগ করেন এবং এ তদন্ত প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেন। এদের উল্লেখযোগ্য বিচ্যুত আকীদাগুলো হলো: আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান, কুর'আঁন একটি সৃষ্ট বস্তু এবং তার অর্থগুলোই কেবল ঐশী, জান্নাতি লোকেরা আল্লাহকে দেখবে না, ঐশী হস্তক্ষেপ ছাড়াই মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি রয়েছে এবং কাবীরা গুনাহ সম্পাদনকারী ব্যক্তি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থানে চলে যায়।
শী'আহ (বাংলায় এদের শিয়া বলা হয়)। ইয়াযীদ ইবন মু'আউইয়াহর শাসনামলের শুরুতে চতুর্থ খলীফা 'আলি ইবন আবি তালিবের পুত্র হুসাইন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। 'আলি ইবন আবি তালিবের ইরাকি অনুসারীরা তাকে ইরাকে এসে নেতৃত্ব দেওয়ার নিমন্ত্রণ জানায়। তবে পরবর্তীকালে তারা তাকে পরিত্যাগ করে এবং এর পরিণতিতে কারবালায় ইয়াযীদের সৈনিকদের হাতে (৬১ হিজরি; ৬৮০ সাল) তিনি শাহাদাত বরণ করেন। 'আলি-এর অনুসারীদের অনেকেই এই নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় ইসলামের মূল স্রোত থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। 'আলি-এর প্রতি তাদের ভালোবাসা ও তাঁর বিরোধীদের প্রতি তাদের ঘৃণা প্রকাশে তারা মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাদের ধারণা প্রথম তিন খলীফা আবু বাক্স, 'উমার ও 'উসমান, 'আলির কাছ থেকে ইমামের পদ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। তাই তাদেরকে এরা প্রথমে জবরদখলকারী ও পরে কাফির বলে আখ্যায়িত করে। প্রথম তিন খলীফার খিলাফআহকে মেনে নেওয়ার কারণে নাবি-এর সকল সহাবিকে মুরতাদ ঘোষণা করা হয়। কেবল সালমান আল-ফারিসি, আবু জার আল-গিফারি ও মিকদাদ ইবন আল-আসওয়াদ কিন্দকে এ গুরুতর অভিযোগ থেকে ছাড় দেওয়া হয়। অবশ্য কিছু কিছু বর্ণনায় আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়। কারণ তাদের ব্যাপারে ধারণা করা হয় যে, তারা নাবি-এর মৃত্যুর পর 'আলির খিলাফাহ লাভের অধিকারকে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছিলেন। এ দাবির সমর্থনে কিছু জাল হাদীস উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব জাল হাদীসের ভিত্তিতে দাবি করা হয় যে, নাবি তাঁর সকল সহাবিদের কাছ থেকে এই মর্মে আনুগত্যের একটি শপথ পাঠ করিয়েছিলেন, নাবি -এর মৃত্যুর পর 'আলীই হবেন তাদের নেতা। তাদের ধারণা অনুযায়ী, ১০ম হিজরীর জুল-হিজ্জাহ মাসের ১৮ তারিখে বিদায় হাজ্জের পর মাক্কা থেকে মাদীনায় ফেরার পথে গাদীর খুম নামক স্থানে এ শপথ গ্রহণ করা হয়েছিল। তারা আরও দাবি করে যে, 'আলি ও নাবি কন্যা ফাতিমার বংশধরদের কয়েকজনই কেবল মুসলিম উম্মাহর ইমাম হওয়ার অধিকার রাখতেন। এমনকি তারা যাদেরকে ইমাম উপাধি দিয়েছে তাদের প্রতি তারা আল্লাহর কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যও আরোপ করেছে। তাদেরকে আল্লাহর নবীদের চেয়েও উপরে স্থান দিয়েছে। এসব বিশ্বাসকে আঁয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি নিম্নোক্ত ভাষায় ব্যক্ত করেছেন:
"ইমামের রয়েছে একটি সম্মানিত অবস্থান, একটি সমুন্নত পদমর্যাদা এবং একটি সৃষ্টিশীল প্রতিনিধিত্ব বা খিলাফাহ। তার সার্বভৌমত্ব ও রাজত্বের সামনে মহাবিশ্বের সকল পরমাণু আনুগত্য করে। আর আমাদের (শী'আহ) মাযহাবের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস হলো, ইমামদের এমন একটি স্থান রয়েছে যেখানে কোনো নৈকট্যশীল ফেরেশতা কিংবা কোনো নবীও পৌঁছাতে পারেন না। অধিকন্তু আমাদের নিকট যেসব বর্ণনা ও হাদীস রয়েছে সেগুলোর ভিত্তিতে জানা যায় যে, এ পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে সর্বশ্রেষ্ঠ নাবি মুহাম্মাদ ও বারো জন ইমাম আলো আকারে বিদ্যমান ছিলেন। তাদের দিয়ে আল্লাহ পাক তাঁর সিংহাসন পরিবেষ্টিত করে রেখেছিলেন।"
তবে প্রত্যেক নতুন ইমামের পদবি অনুসারে তাদের মধ্যে নতুন শী'আহ উপদল সৃষ্টি হয়েছে। তারা নতুন ইমামের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এসব কারণে ঐতিহাসিকভাবেই শী'আহদের দলাদলির প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। তারা বিচিত্র ধরনের বিশ্বাস লালন করত। উল্লেখ্য যে, ইসলামের মূল ধারা থেকে ছিটকে পড়া বিদ'আতি উপদলগুলোর অধিকাংশই কোনো না কোনো শী'আহ ফিরকা থেকে জন্ম নিয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, মুহাম্মাদ ইবন নুসাইরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নুসাইরি উপদলটি ২৪০ হিজরিতে (৮৫৫ সাল) দাবি করেছিল যে, 'আলি ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর আত্মপ্রকাশ। মুহাম্মাদ ইবন ইসমাঈল আদ-দুরযির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত উপদলটি দাবি করেছিল যে, মিশরের ফাতিমি শী'আহ খলীফা হাকিম বিআমরিল্লাহ (৩৫৫-৪১১ হিজরি; ৯৬৬-১০২১ সাল) ছিলেন মানবাকৃতিতে আল্লাহর সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ। আর নুবুওয়াতের দাবিদার 'আলি মুহাম্মাদ রিদা ও তার শিষ্য হুসাইন 'আলি (বাহাউল্লাহ) বাহাই নামের উপদলটি প্রতিষ্ঠা করে যে নিজেকে প্রতীক্ষিত ঈসা ও আল্লাহর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দাবি করেছিল।
পরিশিষ্ট ৩: ফিক্হশাস্ত্রের কিছু পরিভাষা উরফ
কোনো বিশেষ এলাকা বা জনগোষ্ঠীর সাধারণ যেসব প্রথা বা ঐতিহ্য ইসলামি আইনে সন্নিবিষ্ট হয়েছে সেগুলোই 'উরফ। ইসলামি আইনের কোনো মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক না-হলে স্থানীয় প্রথা ইসলামি আইনের একটি দ্বিতীয় পর্যায়ের উৎস হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিয়ের স্থানীয় প্রথা। ইসলামের বিধান অনুসারে, বিবাহ সম্পাদনের অংশ হিসেবে দেনমোহর অবশ্যই সুনির্ধারিত হতে হবে। তবে তা পরিশোধের জন্য কোনো সময়সীমা বেধে দেওয়া হয়নি। মিশরীয় ও অন্য কিছু অঞ্চলের প্রথা হলো যে, মুকাদ্দাম নামে এর একটি অংশ বিয়ের সময় প্রদান করতে হবে। আর বাকিটুকু কেবল মৃত্যু কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদের সময় দিতে হবে। একে বলা হয় মু'আখার।
'উরফ-এর আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যেতে পারে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাড়া দেওয়া-নেওয়া সংক্রান্ত বিচিত্র নিয়মনীতির মধ্যে। ইসলামি আইন অনুযায়ী বিক্রীত পণ্য সম্পূর্ণরূপে হস্তান্তরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মূল্য পরিশোধের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে এটি একটি প্রচলিত নিয়ম যে, ভাড়ার স্থান বা বস্তু নির্দিষ্ট সময় ধরে ব্যবহৃত হওয়ার আগেই ভাড়া পরিশোধ করা হয়। 'উরফ-এর আরেকটি উদাহরণ হলো, সিরিয়া অঞ্চলে দাব্বাহ শব্দের প্রচলিত অর্থ। সেখানে দাব্বাহ শব্দ দ্বারা ঘোড়াকে বোঝানো হয়। অথচ আরবিতে এর স্বাভাবিক অর্থ হলো যেকোনো চতুষ্পদ জন্তু। অতএব, সিরিয়াতে সম্পাদিত কোনো চুক্তিতে কোনো কিছু দাব্বাহ আকারে পরিশোধের শর্ত দেওয়া হলে তার সঠিক অর্থ হবে ঘোড়া। পক্ষান্তরে, আরব বিশ্বের অন্যত্র এটিকে অধিকতর স্পষ্টতার সাথে ঘোড়া হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।
ইসতিহসান (আক্ষরিক অর্থ: প্রাধান্য) ইসতিহসান হলো পরিস্থিতির জন্য অধিকতর উপযোগী হওয়ার কারণে একটি প্রমাণকে আরেকটি প্রমাণের উপর প্রাধান্য দেওয়া। হতে পারে যে, প্রাধান্য দানকৃত প্রমাণটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এটি হতে পারে একটি ‘আঁম বা সাধারণ হাদীসের উপর একটি খাঁস বা সুনির্দিষ্ট হাদীসকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে। কিংবা হতে পারে কিয়াসের মাধ্যমে গৃহীত আইনের উপর অধিকতর উপযোগী অন্য কোনো আইনকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে। কোনো পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়সংক্রান্ত চুক্তির আলোচনায় ইসতিহসান নীতির অধিক প্রয়োগ দেখা যায়। নাবি ﷺ বলেছেন,
"কেউ যেন নিজ অধিকারে না আসা পর্যন্ত কোনো খাদ্যদ্রব্য বিক্রি না করে।" কিয়াস ও এই হাদীস অনুযায়ী উৎপাদনকারীর সাথে পণ্য ক্রয়ের সকল অগ্রিম চুক্তি অবৈধ। কারণ চুক্তির সময় এক্ষেত্রে পণ্যটির কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে, লোকেরা এ ধরনের চুক্তি সার্বজনীনভাবে গ্রহণ করে নেওয়ায় এবং এ ধরনের চুক্তির প্রয়োজন সুস্পষ্ট হওয়ায় কিয়াসভিত্তিক সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করে ইসতিহসান নীতির ভিত্তিতে এগুলোকে বৈধ করা হয়েছে।
ইসতিসহাব (আক্ষরিক অর্থ: সংযোগ অনুসন্ধান) কোনো অবস্থাকে ইতিপূর্বে সংঘটিত কোনো অবস্থার সাথে সংযোগ করে ফিকহি আইন বের করে আনার প্রক্রিয়া। এ নীতির ভিত্তি হলো যে, বিশেষ অবস্থাতে প্রযোজ্য ফিকহি আইন ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ থাকে যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে জানা যাবে যে, সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কারও দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তার জীবিত থাকা কিংবা মৃত্যুবরণ করার বিষয়টি সংশয়পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে সে এখনো জীবিত থাকলে যেসব নীতি প্রযোজ্য হতো ইসতিসহাব নীতির ভিত্তিতে সেসবই বলবৎ থাকবে।
ইসতিসলাহ্ (আক্ষরিক অর্থ: কল্যাণ অনুসন্ধান)
ইমাম আবু হানীফাহ্ উদ্ভাবিত ইসতিহসান নীতি ইমাম মালিক ও তাঁর ছাত্রবৃন্দও আরও নিয়ন্ত্রিতভাবে ইসতিসলাহ্ নামে প্রয়োগ করেছেন। এর সরল অর্থ হলো, কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে অধিক উপযোগী কোনো পন্থা অবলম্বন করা। এতে এমন কিছু বিষয় আলোচিত হয় যা শারী'আহতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা না হলেও তার বৃহত্তর মানবকল্যাণ নীতির মধ্যে তা নিহিত রয়েছে।
খলীফা 'আলি-এর একটি সিদ্ধান্তে ইসতিসলাহ্-এর উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। সিদ্ধান্তটি ছিল এই যে, সংঘবদ্ধ হত্যাকারী চক্রের প্রত্যেক সদস্যকেই হত্যার অপরাধে অভিযুক্ত করা হবে, যদিও প্রকৃত হত্যাকাণ্ডটি মাত্র একজন সংঘটিত করেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে শারী'আহ আইনে কেবল প্রকৃত হত্যাকারীর কথাই বলা হয়েছে। আরেকটি উদাহরণ হলো, রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে ধনী মানুষের কাছ থেকে যাকাত ছাড়াও অন্যান্য কর আদায় করার ব্যাপারে একজন মুসলিম শাসকের অধিকার। অথচ শারী'আহতে কেবল যাকাতকে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিয়াসের মাধ্যমে উৎসারিত আইনের তুলনায় মানবকল্যাণের সাথে অধিক সংগতিপূর্ণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও ইমাম মালিক ইসতিসলাহ নীতি প্রয়োগ করেছেন।

পরিশিষ্ট ক: 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আয-যুবাইর
খলীফা ইয়াযীদ ইবন মু'আউইয়াহর শাসনামলের (৬০-৬৪ হিজরি; ৬৮০-৬৮৩ সাল) শেষ দিকে 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আয-যুবাইরকে হিজায অঞ্চলের খলীফা ঘোষণা করা হয়। হিজাযের এ বিদ্রোহের কথা জানতে পেরে ইয়াযীদ তা দমন করার জন্য তার সেনাপতি মুসলিম ইবন 'উকবাহর নেতৃত্বে একদল সৈনিক প্রেরণ করেন। ৬৪ হিজরিতে (৬৮৩ সাল) খলীফার প্রেরিত সেই সেনাবাহিনী মাক্কা যাওয়ার পথে মাদীনায় ব্যাপক লুটতরাজ চালায়। তবে মাক্কা পৌঁছার পূর্বে তাদের বাহিনী প্রধান মারা যায় এবং হুসাইন ইবন নুমাইর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়।
এ সেনাবাহিনী পবিত্র মাক্কা নগরী অবরোধ করে ও শহরের চারপাশে পাহাড়ের উপর ভারী প্রস্তর নিক্ষেপক কামান স্থাপন করে। এমনকি বৃষ্টির মতো তাঁদের এ পাথর নিক্ষেপের কারণে কা'বার দেওয়ালের কিয়দংশ ভেঙে পড়ে এবং কা'বার কালো পাথরে (হাজ্ব আসওয়াদ) ফাটল ধরে। তবে অবরোধকালে ইয়াযীদের মৃত্যু হওয়ায় উমাইয়া সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তারপর উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে ইব্‌ন আয-যুবাইরের বিদ্রোহে ইরাকিরাও একাত্মতা ঘোষণা করে। ইব্‌ন আয-যুবাইরের ভাই মুস'আবকে ইরাকের আমীর নিয়োগ করা হয়। তার অল্প কিছুদিন পর দক্ষিণ আরব, মিশর ও সিরিয়ার কিছু অংশও খলীফা ইব্‌ন আয-যুবাইরের সাথে যোগ দেয় এবং তার নেতৃত্বকে সুসংহত করার জন্য তাকে মাক্কা ছাড়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু ইব্‌ন আয-যুবাইর পবিত্র মাক্কা নগরী ত্যাগ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন।
মারওয়ান ইবন আল-হাকাম (৬৪-৬৫ হিজরি; ৬৮৩-৬৮৫ সাল) উমাইয়া খিলাফাতের দায়িত্ব নেওয়ার পর দামাস্কাস ও সিরিয়াকে আবারও উমাইয়া শাসনের অধীনে নিয়ে আসে। মারওয়ানের পুত্র 'আবদুল-মালিকের (৬৫-৮৬ হিজরি; ৬৮৫-৭০৫ সাল) শাসনামলের প্রায় মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হিজায ছিল খলীফা ইন্ন আয-যুবাইরের শাসনাধীন। পরিশেষে 'আবদুল-মালিক তার লৌহহস্ত সেনাপতি হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের নেতৃত্বে একটি বিশাল সিরীয় সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। তারা হিজাযের উপর সর্বশেষ আঘাত হানে।
৭২ হিজরির ১ জুল-কাদা (২৫ মার্চ ৬৯২ সাল) থেকে হাজ্জাজ সাড়ে ছয় মাসের জন্য মাক্কা অবরোধ করে রাখে। আবু বাক্রের কন্যা ও 'ইশাহ এর বোন আসমা ছিলেন ইন্ন আয-যুবাইরের মা। তার বীরোচিত উপদেশে উদ্বুদ্ধ হয়েই ইব্‌ন আয-যুবাইর শহীদ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যান। তার মস্তক বিচ্ছিন্ন করে দামাস্কাস পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং দেহটি প্রকাশ্য স্থানে কিছু সময় ঝুলিয়ে রাখার পর তার বৃদ্ধ মা'র নিকট হস্তান্তর করা হয়। ইব্‌ন আয-যুবাইরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রথম যুগের সর্বশেষ বীরপুরুষদের একজনের বিদায় ঘটে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্ব উমাইয়াদের লৌহমুষ্টিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
পরিশিষ্ট খ: কিছু বিপথগামী উপদল
খাওয়ারিজ (একবচনে খারিজি; আক্ষরিক অর্থ বিচ্ছিন্নতাবাদী)। এরা ছিল মূলত খলীফা 'আলি ইবন আবি তালিবের সেনাবাহিনীরই একটি অংশ। ৩৭ হিজরিতে (৬৫৭ সাল) 'আলি ও মু'আঁউইয়াহ (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) ইন আবি সুফিয়ান এর মধ্যে সিফফীনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। খিলাফাহকে কেন্দ্র করে 'আলি ও মু'আউইয়াহর মধ্যকার ভুল বোঝাবোঝি এক পর্যায়ে যুদ্ধের রূপ নেয়। এই যুদ্ধের সময়ই এই ফিরকা 'আলির সেনাবাহিনী থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। রক্তপাত বন্ধ করার লক্ষ্যে যখন দুপক্ষের মধ্যে সালিশ অনুষ্ঠিত হলো তখন 'আলি-এর অনুসারীদের একটি বিশাল অংশ প্রধানত তামীম গোত্রের লোকেরা সালিশের বিরোধিতা করে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন ওয়াহহ্ রাসিবীকে তাদের নেতা নির্বাচিত করে। তারা 'আলি ও মু'আউইয়াহ উভয়কে কাঁফির ঘোষণা করে। কারণ তাদের মতে, তারা উভয়ে ওয়াহয়ির আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত ফায়সালা বাদ দিয়ে মানবীয় সালিশের আশ্রয় নিয়েছেন। যারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নেয়নি এবং 'আলি ও মু'আউইয়াহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি এমন প্রত্যেককে তারা কাফির আখ্যায়িত করেছে।
খাওয়ারিজদের মতে সকল বিচার ফয়সালা সরাসরি কুর'আঁন থেকে আসা উচিত। তারা তাদের এ অবস্থানের বিরোধিতাকারী যেকোনো মুসলিমের রক্তপাত ও তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করাকে বৈধ মনে করত। খাওয়ারিজরা অন্য মুসলিমকে বিয়ে করা ও তাদের থেকে উত্তরাধিকার লাভ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী যে ব্যক্তি ব্যভিচার, মিথ্যাচার, নেশাগ্রহণ ইত্যাদি কাবীরা গুনাহে লিপ্ত হয় সে একজন মুরতাদ (ধর্মত্যাগী)।
তাদের চরমপন্থী শাখা আজরাকীদের ধারণা অনুযায়ী, এভাবে যে একবার কাফির হয়েছে সে কখনো ঈমানে পুনঃপ্রবেশ করতে পারবে না; তাকে তার স্ত্রী ও সন্তানাদিসহ হত্যা করতে হবে। খলীফা 'আলি বাধ্য হয়ে তাদের শিবিরে আক্রমণ করেন ও তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। ৩৭ হিজরির (৬৫৭ সাল) সে আক্রমণে ইন্ন ওয়াব ও তার অধিকাংশ অনুসারী নিহত হয়। এটি নাহরাওয়ানের যুদ্ধ নামে পরিচিত। তবে এ বিজয়ের বিনিময়ে 'আলি-কে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। বিদ্রোহ দমন হওয়া তো দূরের কথা, এর ফলে বরং পরের দুবছরে আরও বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। আব্দুর-রহমান ইবন মুলযিম নামক এক খারিজির ছুরিকাঘাতে 'আলি নিহত হন। মুলযিম ছিল এমন এক মহিলার স্বামী যার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য নাহরাওয়ানের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল।
মু'তাযিলা একটি দার্শনিক মতবাদ, এটি সাধারণত যুক্তিবাদ নামে পরিচিত। হিজরি দ্বিতীয় শতকে ওয়াসিল ইবন 'আতা' ও 'আম্ম ইবন 'উবাইদ এ মতবাদটি প্রচার শুরু করেন। পরবর্তীকালে 'আব্বাসি শাসকরা এ দর্শন দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এমনকি তৎকালীন সকল বিশেষজ্ঞকে এ মতবাদ মেনে চলতে বাধ্য করার লক্ষ্যে একটি সরকারি তদন্ত বাহিনী তৈরি করা হয়। অবশ্য খলীফা মুতাওয়াক্কিল (৫৭২-৫৮৮ হিজরি; ১১৭৭-১১৯২ সাল) মতবাদটি পরিত্যাগ করেন এবং এ তদন্ত প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেন। এদের উল্লেখযোগ্য বিচ্যুত আকীদাগুলো হলো: আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান, কুর'আঁন একটি সৃষ্ট বস্তু এবং তার অর্থগুলোই কেবল ঐশী, জান্নাতি লোকেরা আল্লাহকে দেখবে না, ঐশী হস্তক্ষেপ ছাড়াই মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি রয়েছে এবং কাবীরা গুনাহ সম্পাদনকারী ব্যক্তি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থানে চলে যায়।
শী'আহ (বাংলায় এদের শিয়া বলা হয়)। ইয়াযীদ ইবন মু'আউইয়াহর শাসনামলের শুরুতে চতুর্থ খলীফা 'আলি ইবন আবি তালিবের পুত্র হুসাইন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। 'আলি ইবন আবি তালিবের ইরাকি অনুসারীরা তাকে ইরাকে এসে নেতৃত্ব দেওয়ার নিমন্ত্রণ জানায়। তবে পরবর্তীকালে তারা তাকে পরিত্যাগ করে এবং এর পরিণতিতে কারবালায় ইয়াযীদের সৈনিকদের হাতে (৬১ হিজরি; ৬৮০ সাল) তিনি শাহাদাত বরণ করেন। 'আলি-এর অনুসারীদের অনেকেই এই নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় ইসলামের মূল স্রোত থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। 'আলি-এর প্রতি তাদের ভালোবাসা ও তাঁর বিরোধীদের প্রতি তাদের ঘৃণা প্রকাশে তারা মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাদের ধারণা প্রথম তিন খলীফা আবু বাক্স, 'উমার ও 'উসমান, 'আলির কাছ থেকে ইমামের পদ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। তাই তাদেরকে এরা প্রথমে জবরদখলকারী ও পরে কাফির বলে আখ্যায়িত করে। প্রথম তিন খলীফার খিলাফআহকে মেনে নেওয়ার কারণে নাবি-এর সকল সহাবিকে মুরতাদ ঘোষণা করা হয়। কেবল সালমান আল-ফারিসি, আবু জার আল-গিফারি ও মিকদাদ ইবন আল-আসওয়াদ কিন্দকে এ গুরুতর অভিযোগ থেকে ছাড় দেওয়া হয়। অবশ্য কিছু কিছু বর্ণনায় আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়। কারণ তাদের ব্যাপারে ধারণা করা হয় যে, তারা নাবি-এর মৃত্যুর পর 'আলির খিলাফাহ লাভের অধিকারকে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছিলেন। এ দাবির সমর্থনে কিছু জাল হাদীস উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব জাল হাদীসের ভিত্তিতে দাবি করা হয় যে, নাবি তাঁর সকল সহাবিদের কাছ থেকে এই মর্মে আনুগত্যের একটি শপথ পাঠ করিয়েছিলেন, নাবি -এর মৃত্যুর পর 'আলীই হবেন তাদের নেতা। তাদের ধারণা অনুযায়ী, ১০ম হিজরীর জুল-হিজ্জাহ মাসের ১৮ তারিখে বিদায় হাজ্জের পর মাক্কা থেকে মাদীনায় ফেরার পথে গাদীর খুম নামক স্থানে এ শপথ গ্রহণ করা হয়েছিল। তারা আরও দাবি করে যে, 'আলি ও নাবি কন্যা ফাতিমার বংশধরদের কয়েকজনই কেবল মুসলিম উম্মাহর ইমাম হওয়ার অধিকার রাখতেন। এমনকি তারা যাদেরকে ইমাম উপাধি দিয়েছে তাদের প্রতি তারা আল্লাহর কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যও আরোপ করেছে। তাদেরকে আল্লাহর নবীদের চেয়েও উপরে স্থান দিয়েছে। এসব বিশ্বাসকে আঁয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি নিম্নোক্ত ভাষায় ব্যক্ত করেছেন:
"ইমামের রয়েছে একটি সম্মানিত অবস্থান, একটি সমুন্নত পদমর্যাদা এবং একটি সৃষ্টিশীল প্রতিনিধিত্ব বা খিলাফাহ। তার সার্বভৌমত্ব ও রাজত্বের সামনে মহাবিশ্বের সকল পরমাণু আনুগত্য করে। আর আমাদের (শী'আহ) মাযহাবের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস হলো, ইমামদের এমন একটি স্থান রয়েছে যেখানে কোনো নৈকট্যশীল ফেরেশতা কিংবা কোনো নবীও পৌঁছাতে পারেন না। অধিকন্তু আমাদের নিকট যেসব বর্ণনা ও হাদীস রয়েছে সেগুলোর ভিত্তিতে জানা যায় যে, এ পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে সর্বশ্রেষ্ঠ নাবি মুহাম্মাদ ও বারো জন ইমাম আলো আকারে বিদ্যমান ছিলেন। তাদের দিয়ে আল্লাহ পাক তাঁর সিংহাসন পরিবেষ্টিত করে রেখেছিলেন।"
তবে প্রত্যেক নতুন ইমামের পদবি অনুসারে তাদের মধ্যে নতুন শী'আহ উপদল সৃষ্টি হয়েছে। তারা নতুন ইমামের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এসব কারণে ঐতিহাসিকভাবেই শী'আহদের দলাদলির প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। তারা বিচিত্র ধরনের বিশ্বাস লালন করত। উল্লেখ্য যে, ইসলামের মূল ধারা থেকে ছিটকে পড়া বিদ'আতি উপদলগুলোর অধিকাংশই কোনো না কোনো শী'আহ ফিরকা থেকে জন্ম নিয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, মুহাম্মাদ ইবন নুসাইরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নুসাইরি উপদলটি ২৪০ হিজরিতে (৮৫৫ সাল) দাবি করেছিল যে, 'আলি ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর আত্মপ্রকাশ। মুহাম্মাদ ইবন ইসমাঈল আদ-দুরযির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত উপদলটি দাবি করেছিল যে, মিশরের ফাতিমি শী'আহ খলীফা হাকিম বিআমরিল্লাহ (৩৫৫-৪১১ হিজরি; ৯৬৬-১০২১ সাল) ছিলেন মানবাকৃতিতে আল্লাহর সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ। আর নুবুওয়াতের দাবিদার 'আলি মুহাম্মাদ রিদা ও তার শিষ্য হুসাইন 'আলি (বাহাউল্লাহ) বাহাই নামের উপদলটি প্রতিষ্ঠা করে যে নিজেকে প্রতীক্ষিত ঈসা ও আল্লাহর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দাবি করেছিল।
পরিশিষ্ট ৩: ফিক্হশাস্ত্রের কিছু পরিভাষা উরফ
কোনো বিশেষ এলাকা বা জনগোষ্ঠীর সাধারণ যেসব প্রথা বা ঐতিহ্য ইসলামি আইনে সন্নিবিষ্ট হয়েছে সেগুলোই 'উরফ। ইসলামি আইনের কোনো মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক না-হলে স্থানীয় প্রথা ইসলামি আইনের একটি দ্বিতীয় পর্যায়ের উৎস হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিয়ের স্থানীয় প্রথা। ইসলামের বিধান অনুসারে, বিবাহ সম্পাদনের অংশ হিসেবে দেনমোহর অবশ্যই সুনির্ধারিত হতে হবে। তবে তা পরিশোধের জন্য কোনো সময়সীমা বেধে দেওয়া হয়নি। মিশরীয় ও অন্য কিছু অঞ্চলের প্রথা হলো যে, মুকাদ্দাম নামে এর একটি অংশ বিয়ের সময় প্রদান করতে হবে। আর বাকিটুকু কেবল মৃত্যু কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদের সময় দিতে হবে। একে বলা হয় মু'আখার।
'উরফ-এর আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যেতে পারে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাড়া দেওয়া-নেওয়া সংক্রান্ত বিচিত্র নিয়মনীতির মধ্যে। ইসলামি আইন অনুযায়ী বিক্রীত পণ্য সম্পূর্ণরূপে হস্তান্তরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মূল্য পরিশোধের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে এটি একটি প্রচলিত নিয়ম যে, ভাড়ার স্থান বা বস্তু নির্দিষ্ট সময় ধরে ব্যবহৃত হওয়ার আগেই ভাড়া পরিশোধ করা হয়। 'উরফ-এর আরেকটি উদাহরণ হলো, সিরিয়া অঞ্চলে দাব্বাহ শব্দের প্রচলিত অর্থ। সেখানে দাব্বাহ শব্দ দ্বারা ঘোড়াকে বোঝানো হয়। অথচ আরবিতে এর স্বাভাবিক অর্থ হলো যেকোনো চতুষ্পদ জন্তু। অতএব, সিরিয়াতে সম্পাদিত কোনো চুক্তিতে কোনো কিছু দাব্বাহ আকারে পরিশোধের শর্ত দেওয়া হলে তার সঠিক অর্থ হবে ঘোড়া। পক্ষান্তরে, আরব বিশ্বের অন্যত্র এটিকে অধিকতর স্পষ্টতার সাথে ঘোড়া হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।
ইসতিহসান (আক্ষরিক অর্থ: প্রাধান্য) ইসতিহসান হলো পরিস্থিতির জন্য অধিকতর উপযোগী হওয়ার কারণে একটি প্রমাণকে আরেকটি প্রমাণের উপর প্রাধান্য দেওয়া। হতে পারে যে, প্রাধান্য দানকৃত প্রমাণটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এটি হতে পারে একটি ‘আঁম বা সাধারণ হাদীসের উপর একটি খাঁস বা সুনির্দিষ্ট হাদীসকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে। কিংবা হতে পারে কিয়াসের মাধ্যমে গৃহীত আইনের উপর অধিকতর উপযোগী অন্য কোনো আইনকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে। কোনো পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়সংক্রান্ত চুক্তির আলোচনায় ইসতিহসান নীতির অধিক প্রয়োগ দেখা যায়। নাবি ﷺ বলেছেন,
"কেউ যেন নিজ অধিকারে না আসা পর্যন্ত কোনো খাদ্যদ্রব্য বিক্রি না করে।" কিয়াস ও এই হাদীস অনুযায়ী উৎপাদনকারীর সাথে পণ্য ক্রয়ের সকল অগ্রিম চুক্তি অবৈধ। কারণ চুক্তির সময় এক্ষেত্রে পণ্যটির কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে, লোকেরা এ ধরনের চুক্তি সার্বজনীনভাবে গ্রহণ করে নেওয়ায় এবং এ ধরনের চুক্তির প্রয়োজন সুস্পষ্ট হওয়ায় কিয়াসভিত্তিক সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করে ইসতিহসান নীতির ভিত্তিতে এগুলোকে বৈধ করা হয়েছে।
ইসতিসহাব (আক্ষরিক অর্থ: সংযোগ অনুসন্ধান) কোনো অবস্থাকে ইতিপূর্বে সংঘটিত কোনো অবস্থার সাথে সংযোগ করে ফিকহি আইন বের করে আনার প্রক্রিয়া। এ নীতির ভিত্তি হলো যে, বিশেষ অবস্থাতে প্রযোজ্য ফিকহি আইন ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ থাকে যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে জানা যাবে যে, সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কারও দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তার জীবিত থাকা কিংবা মৃত্যুবরণ করার বিষয়টি সংশয়পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে সে এখনো জীবিত থাকলে যেসব নীতি প্রযোজ্য হতো ইসতিসহাব নীতির ভিত্তিতে সেসবই বলবৎ থাকবে।
ইসতিসলাহ্ (আক্ষরিক অর্থ: কল্যাণ অনুসন্ধান)
ইমাম আবু হানীফাহ্ উদ্ভাবিত ইসতিহসান নীতি ইমাম মালিক ও তাঁর ছাত্রবৃন্দও আরও নিয়ন্ত্রিতভাবে ইসতিসলাহ্ নামে প্রয়োগ করেছেন। এর সরল অর্থ হলো, কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে অধিক উপযোগী কোনো পন্থা অবলম্বন করা। এতে এমন কিছু বিষয় আলোচিত হয় যা শারী'আহতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা না হলেও তার বৃহত্তর মানবকল্যাণ নীতির মধ্যে তা নিহিত রয়েছে।
খলীফা 'আলি-এর একটি সিদ্ধান্তে ইসতিসলাহ্-এর উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। সিদ্ধান্তটি ছিল এই যে, সংঘবদ্ধ হত্যাকারী চক্রের প্রত্যেক সদস্যকেই হত্যার অপরাধে অভিযুক্ত করা হবে, যদিও প্রকৃত হত্যাকাণ্ডটি মাত্র একজন সংঘটিত করেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে শারী'আহ আইনে কেবল প্রকৃত হত্যাকারীর কথাই বলা হয়েছে। আরেকটি উদাহরণ হলো, রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে ধনী মানুষের কাছ থেকে যাকাত ছাড়াও অন্যান্য কর আদায় করার ব্যাপারে একজন মুসলিম শাসকের অধিকার। অথচ শারী'আহতে কেবল যাকাতকে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিয়াসের মাধ্যমে উৎসারিত আইনের তুলনায় মানবকল্যাণের সাথে অধিক সংগতিপূর্ণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও ইমাম মালিক ইসতিসলাহ নীতি প্রয়োগ করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00