📄 মন্তব্য
উল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলো প্রধান চার ইমাম ও তাঁদের ছাত্রবৃন্দের অসংখ্য বক্তব্যের কিয়দংশ মাত্র। তাঁরা সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ দাবি করেছেন এবং তাঁদের ব্যক্তিগত মতের অন্ধ অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য একেবারেই স্পষ্ট এবং যুক্তিযুক্ত। এগুলোর অপব্যাখ্যা করার কোনো অবকাশ নেই। অতএব, প্রত্যেকেরই উচিত সুন্নাহকে যথাযথভাবে অনুসরণের চেষ্টা করা।
সুন্নাহ অনুসরণ করতে গিয়ে তাকে কিছু ক্ষেত্রে নিজ মাযহাবের ইমামের মতের বিপরীতেও যেতে হতে পারে। তবে এর দ্বারা তিনি নিজ মাযহাব ও ইমামের বিরুদ্ধে গিয়েছেন বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং এর মাধ্যমে "আল্লাহর রজ্জুকে" দৃঢ়ভাবে ধারণ করে তিনি যুগপৎ সবকটি মাযহাবের অনুসরণ করছেন। বিপরীত দিকে, কেবল ইমামদের মতের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে নির্ভরযোগ্য হাদীসকে পরিত্যাগ করা হলে তা হবে স্বয়ং ইমামদের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। অধিকন্তু, নির্ভরযোগ্য হাদীস প্রত্যাখ্যান সরাসরি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণের নামান্তর (১৭)। এ ব্যাপারে কুর'আনে রসূল -কে উদ্দেশ করে আল্লাহ বলেছেন: فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا )
"না, তোমার রবের কসম! তারা কখনো (আল্লাহর একত্বে) বিশ্বাসী হতে পারে না, যতক্ষণ না তাদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে তারা তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেবে; তারপর তুমি যা সিদ্ধান্ত দেবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো কুণ্ঠাবোধ করবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে।" (আন-নিসা', ৪:৬৫)
ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান ইমাম মালিকের গ্রন্থ আল-মুয়াত্তা' পাঠ করার পর প্রায় বিশটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষক ইমাম আবু হানীফাহর সাথে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ইমাম মুহাম্মাদ বলেছেন, 'ইমাম আবু হানীফাহ মনে করতেন যে, ইসতিস্কার (১৮) জন্য কোনো নির্দিষ্ট সলাত নেই। কিন্তু আমার মতে, ইমামের উচিত জনসাধারণকে নিয়ে ইসতিস্কার জন্য দু রক'আত সলাত আদায় করে দু'আ (১৯) করা এবং নিজ পোষাকটি উল্টে পরিধান করা।' (২০)
আরেকটি উদাহরণ হলো, কোনো ব্যক্তি যদি এমন অবস্থায় মারা যায় যে, তার পিতা জীবিত নেই কিন্তু দাদা আছেন; তাহলে এই পৌত্রের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে দাদার উত্তরাধিকারের আইনটি। আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ উভয়ই তাঁদের শিক্ষক ইমাম আবু হানীফাহর সাথে দ্বিমত পোষণ করে বাকি তিন ইমামের মতো একই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, পিতা জীবিত থাকলে যে অংশটুকু তার জন্য বরাদ্দ হতো সেটুকু অর্থাৎ উত্তরধিকারের এক-ষষ্ঠাংশ এক্ষেত্রে দাদা পাবেন।
ইমাম ইবন ইউসুফ আল-বালাখি ছিলেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল- হাসানের ছাত্র এবং আবু ইউসুফের ঘনিষ্ঠ অনুসারী। তিনি অনেক ক্ষেত্রেই আবু হানীফাহ ও তাঁর এই দুই ছাত্রের সিদ্ধান্ত থেকে ভিন্নতর মত দিয়েছেন। কারণ, কিছু বিষয়ের প্রমাণ তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি, কিন্তু পরবর্তীকালে ইবন ইউসুফ আল-বালাখি সেগুলো জানতে পেরেছিলেন। (২১) দৃষ্টান্তস্বরূপ, তিনি রুকু'র পূর্বে ও পরে দুহাত কাঁধ বরাবর তুলতেন (২২)। কিছু সহাবির কাছ থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীস থেকে তিনি এই বিষয়ে প্রমাণ পেয়েছিলেন। অথচ তাঁর মাযহাবের প্রধান তিন ইমামের কাছে উক্ত প্রমাণটি না পৌঁছায় তাঁরা ভিন্নরূপ সিদ্ধান্ত প্রদান করেছিলেন।
নাবি ﷺ-এর সুন্নাহ প্রত্যাখ্যানকারীকে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন, .... فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"রসূলের হুকুমের বিরুদ্ধাচারণকারীদের ভয় করা উচিত যেন তারা কোনো বিপর্যয়ের শিকার না হয় অথবা তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক আযাব না এসে পড়ে।" (আন-নূর, ২৪:৬৩)
উল্লেখ্য যে, তাকলীদ নিষিদ্ধ মানে এই নয় যে, প্রত্যেককেই প্রতিটি কাজ করার পূর্বে মূল প্রমাণ ঘেটে দেখতে হবে। এর অর্থ এও নয় যে, প্রথম দিকের বিশেষজ্ঞ 'আলিমদের অবদানকে প্রত্যাখ্যান কিংবা উপেক্ষা করতে হবে। কারণ, তা সম্পূর্ণ বাস্তবতা পরিপন্থী এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসম্ভব। তবে ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে তাদের উচিত মাযহাব নির্বিশেষে সকল বিশেষজ্ঞের মতামতের দিকে দৃষ্টিপাত করা। জ্ঞানান্বেষণের ক্ষেত্রে একজন 'আলিমকে অবশ্যই উদার মানসিকতার অধিকারী হতে হবে; নতুবা তাঁর সিদ্ধান্তগুলো পক্ষপাতদুষ্ট ও দলঘেঁষা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ কথা স্মরণ রাখা উচিত যে, আইনের মূলনীতি অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও তিনি পূর্বসূরি বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মহান কীর্তিগুলোর উপর নির্ভর করতে বাধ্য। ফিকহশাস্ত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চিন্তা করা একেবারেই অসম্ভব। এবং এই অপচেষ্টা করাও অনুচিত। কারণ তা নির্ঘাত বিচ্যুতি ও পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যাবে। কোনো বিশেষ বিষয়ে সত্যপন্থী বিশেষজ্ঞগণ হয় আগের কোনো বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবেন, নতুবা তাঁদের প্রণীত নীতিমালার উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আগের ইমামদেরই অনুসরণ করবেন। তবে, এ ধরনের অনুসরণকে সুয়ং ইমামদের দ্বারা নিষিদ্ধ তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণ আখ্যা দেওয়া যায় না। এ পদ্ধতিকে বলা হয় ইত্তিবা'। এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য হাদীসগুলো সকল মতামতের উপর প্রাধান্য লাভ করবে, যেমনটি ইমাম আবু হানীফাহ ও শাঁফি'ই বলেছেন, "কোনো সহীহ হাদীস পাওয়া গেলে, তা-ই আমার মাযহাব।"
এটি সুস্পষ্ট যে, জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে অধিকাংশ মুসলিমের পক্ষেই ব্যক্তিগত পর্যায়ে আইনের মূলনীতিগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা রাখা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব হলো, সামর্থ্য অনুযায়ী ইত্তিবা'র নীতি অনুসরণ করা। কুর'আঁন-সুন্নাহ অধ্যয়ন ও 'আলিমদের দেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের প্রমাণের ব্যাপারে প্রশ্ন করার মাধ্যমে তার প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আরও বিস্তারিত জেনে নেওয়া। সত্যিকার জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে যথাযথ বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করা হলে কোনো সত্যপন্থী বিশেষজ্ঞই এধরনের প্রশ্নে মনঃক্ষুণ্ণ হবেন না। বই থেকে সমাধান খুঁজে বের করার প্রয়োজন হলে, সাধারণ মুসলিম ভাইদের উচিত ব্যাখ্যা ও প্রমাণসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে এবং সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রচিত নয় এমন বই বাছাই করা।
সর্বাবস্থায় কেবল একটি মাযহাবের গ্রন্থগুলোর মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এভাবে তারা অন্ধ অনুসরণের নিন্দিত ধারা এড়িয়ে চলতে পারেন। যে মাযহাবেই পাওয়া যাক না কেন নির্ভরযোগ্য সুন্নাহ অনুসরণের জন্য সদা প্রস্তুত থাকলে, তারা মহান ইমামদের তাকলীদ নয়; বরং যথার্থ ইত্তিবা'ই করছেন।
টিকাঃ
(১) আল্লাহর প্রাপ্য 'ইবাদাতের ভাগ অন্য কাউকে দেওয়া, যেমন: মূর্তিপূজা।
(১৭) মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানি, সিফাহ সলাত আন-নাবি, মুখবন্ধ পৃ. ৩৪-৩৫।
(১৮) খরার সময় বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা।
(১৯) অনানুষ্ঠানিক প্রার্থনা।
(২০) মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান, আত-তা'লীক আল-মুমাজ্জিদ 'আলা মুয়াত্তা' মুহাম্মাদ, পৃ. ১৫৮, সিফাহ সলাত আন-নাবি, পৃ. ৩৮।
(২১) ইবন 'আবিদীন, রাসস্ম আল-মুফতি, খণ্ড ১, পৃ. ২৭, সিফাহ সলাত আন-নাবি, পৃ. ৩৭।
(২২) আল-ফাওয়া'ইদ আল-বাহিয়্যাহ ফী তারাজিম আল-হানাফিয়াহ, পৃ. ১১৬, সিফাহ সলাত আন-নাবি, মুখবন্ধ, পৃ. ৩৮।
📄 অধ্যায় সারাংশ
কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের অন্ধ অনুসরণ হলো মাযহাবগুলোর প্রতিষ্ঠা- তা ইমামদের অবস্থান ও শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী; যদিও এ ব্যাপারে অধিকাংশ মুসলিমই অসচেতন।
মহান ইমামগণ ও তাঁদের ছাত্রবৃন্দের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, তারা ছিলেন অন্ধ অনুসরণের সম্পূর্ণ বিরোধী। বরং তাঁরা সব সময় আইনগত সিদ্ধান্তের ভিত্তি তথা কুর'আন ও সুন্নাহ্ দিকে ফিরে যাওয়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
ইমাম ও তাঁদের ছাত্রবৃন্দ বারবার স্বীকার করেছেন যে, তাঁদের সিদ্ধান্ত- গুলোও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।
ইমামগণ তাঁদের ব্যক্তিগত মতামতের উপর সহীহ হাদীসকে প্রাধান্য দিতেন। বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য হাদীস মাযহাব প্রতিষ্ঠা- তা ইমামদের কাছে পৌঁছায়নি কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁদের ছাত্রবৃন্দ তা জানতে পেরেছেন। আর এগুলোর ভিত্তিতে তাঁরা ইমামদের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
কোনো মাযহাবের মতামতকে সহীহ হাদীসের উপর প্রাধান্য দেওয়া এক ধরনের শির্ক। কারণ এটি আল্লাহ ও তাঁর মনোনীত রসূলের প্রাপ্য আনুগত্যের পরিপন্থী।
যে অবস্থায় ইসলাম নাবি -এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাঁর সাহাবিদের কাছে পৌঁছেছে সেই আদি বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে সকল মুসলিমের উচিত ইত্তিবা' করা। অর্থাৎ বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে পূর্বসূরি বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্তগুলো অনুসরণ করা।