📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 ইমাম আশ-শাফি‘ই রহিমাহুল্লাহ

📄 ইমাম আশ-শাফি‘ই রহিমাহুল্লাহ


(১৫০-২০৪ হিজরি; ৭৬৭-৮২০ সাল)
ইমাম আশ-শাফি'ই তাঁর শিক্ষক ইমাম মালিকের মতোই স্পষ্টভাষায় বলেছেন যে, তাঁর সময় (৮) নাবি থেকে বর্ণিত সকল হাদীস সম্পর্কে জানা বা প্রাপ্ত সব হাদীস মুখস্থ রাখা কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। তৎকালীন 'আলিমগণের কারও কারও কাছে কিছু হাদীস না পৌঁছার কারণে কিছু বিষয়ে তাঁরা ভুল সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। তাই ভুল-শুদ্ধ নিরূপণে সর্বাবস্থায় নির্ভরযোগ্য একমাত্র মানদণ্ড হলো নাবি -এর সুন্নাহ। হাদীস বিশেষজ্ঞ ইমাম হাকিম ইমাম শাফি'ই-র একটি বক্তব্য সংকলন করেছেন; যেখানে তিনি বলেছেন, "আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই, যে আল্লাহর রাসুল -এর সব সুন্নাহ জানেন বা কোনো কিছুই ভুলে যাননি। কাজেই, আমি যে-মূলনীতি বা যে-আইনই প্রণয়ন করি না কেন, তাতে আল্লাহর রাসুল-এর সুন্নাহ্ খেলাফ কিছু থাকাটাই স্বাভাবিক। অতএব, আল্লাহর রসূল যে বিধান দিয়েছেন তাই একমাত্র সঠিক বিধান এবং সেটাই আমার প্রকৃত মাযহাব।" (৯)
ইমাম শাফি'ই ব্যক্তিগত মতের উপর সুন্নাহ গুরুত্বের বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, "আমার যুগের মুসলিমদের মধ্যে ইজমা' ছিল যে, কারও কাছে আল্লাহর রসূল-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ চলে এলে, অন্য কারও মতকে প্রাধান্য দিয়ে তা পরিত্যাগ করা তার জন্য মোটেই বৈধ নয়।” (১০)
নিঃসন্দেহে ইমাম শাফি'ইর এ বক্তব্য তাকলীদ-এর মূলে আঘাত করে। তাল্লীদ-এর কারণে অনেক ক্ষেত্রে মাযহাবের মতকে সুন্নাহ্ উপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়; এমনকি মাযহাবের মতকে সমর্থন করতে গিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নাবি -এর সুন্নাহকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়।
ইমাম আল-হাকিম ইমাম শাফি'ই থেকেও ইমাম আবু হানীফাহর অনুরূপ বক্তব্য সংকলন করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, “কোনো সহীহ হাদীস পাওয়া গেলে, তা-ই আমার মাযহাব।” (১১)
তাকলীদ-এর বিপক্ষে এ মহান ইমামের অবস্থান ছিল একেবারেই আপসহীন। তিনি বাগদাদে অবস্থানকালে নিজ মাযহাবের সারাংশ হিসেবে আল-হুজ্জাহ নামক একখানা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এরপর মিশর ভ্রমণ করে ইমাম আল-লাইস ইবন সা'দের মাযহাব অধ্যয়ন করার পর তিনি অনেক বিষয়ে তাঁর পূর্বের মত পরিবর্তন করেন। এরপর তিনি আল-উম্মু নামে একখানা নতুন গ্রন্থ রচনা করেন।

টিকাঃ
(৮) বুখারি ও মুসলিমের মতো হাদীসের প্রধান সংকলনগুলো ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থগুলো হিজরি তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি সময়ে রচিত হয়।
(৯) ইবন 'আসাকির, তারীখ দিমিক্ক আল কাবীর, (দামাস্কাস, রাওদাহ আশ-শাম, ১৯১১-১৯৩২), খন্ড ১৫, প্রথম অংশ, পৃ. ৩।
(১০) ইন্ন কায়্যিম, ই'লাম আল-মুক্'িঈন, বৈরুত, দাঁর আল-জীল, খণ্ড ২, পৃ. ৩৬১।
(১১) ইয়াহইয়া ইবন শারাফ আদ-দীন আন-নাওয়াউই, আল-মাজমূ', কায়রো, ইদাঁরাহ আত- তাবা' আহ আল-মুনীরিয়‍্যাহ, ১৯২৫, খন্ড ১, পৃ. ৬৩।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল রহিমাহুল্লাহ

📄 ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল রহিমাহুল্লাহ


(১৬১-২৪১ হিজরি; ৭৭৮-৮৫৫ সাল)
ইমাম আহমাদ তাঁর ছাত্রদের অন্তরে ইসলামের মূল উৎসগুলোর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলেছিলেন। কারও ব্যক্তিগত মতের অন্ধ অনুসরণের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করার মাধ্যমে ইমাম আহমাদ তাঁর শিক্ষক ইমাম শাফি'ই ও অন্যান্য ইমামদের অনুসৃত রীতি অব্যাহত রেখেছিলেন। আগের ইমামদের কিছু কিছু অনুসারীর মধ্যে তাকলীদ-এর প্রবণতা দেখা দেওয়ায় ইমাম আহমাদ আরও বেশি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ইমাম আবু হানীফাহ তাঁর ছাত্রদেরকে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত লিপিবদ্ধ করতে শুধু নিরুৎসাহিত করেছিলেন। ইমাম আহমাদ আরও একধাপ এগিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত লিপিবদ্ধ করার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
তাই তাঁর ছাত্রদের যুগের পূর্বে তাঁর মাযহাব লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা হয়নি।
ইমাম আহমাদ প্রকাশ্যে তাকলীদ-এর বিরোধিতা করার মাধ্যমে অন্যদের এ ব্যাপারে সতর্ক করতেন। ইবন আল-কায়্যিম এ ব্যাপারে তাঁর নিম্নোক্ত বক্তব্যটি সংকলন করেছেন। ইমাম আহমাদ বলেছেন, “মালিক, আশ-শাফি’ই, আল-আওযা’ই, আস-সাওরি কিংবা আমার কোনো মত অন্ধভাবে অনুসরণ করবে না। তাঁরা যেখান থেকে তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, তোমরাও সেখান থেকে তোমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো।” (১২)
একইভাবে, ইবন ‘আব্দিল-বার তাঁর আরেকটি বক্তব্য সংগ্রহ করেছেন। সেখানে তিনি বলেন, “ইমাম আল-আওযা’ই, মালিক ও আবু হানীফাহ্ সিদ্ধান্তগুলো কেবল তাঁদের মতামত হিসেবেই বিবেচ্য। আমার কাছে তাদের সকলের মর্যাদা সমান। এক্ষেত্রে সঠিক ও ভুল নিরূপণের প্রকৃত মানদণ্ড হলো আল্লাহর রসূলের সুন্নাহ।” (১৩)
ইমাম আহমাদ হাদীসকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, তিনি ক্বিয়াসের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তের উপর একটি দুর্বল হাদীসকেও প্রাধান্য দিতেন। তিনি আল-মুসনাদ আল-কাবীর শিরোনামে ত্রিশ হাজারেরও অধিক হাদীস সম্বলিত একটি গ্রন্থ সংকলন করেছেন। নাবি ﷺ-এর সুন্নাহর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ এত বেশি ছিল যে, কেউ নাবি ﷺ-এর একটি হাদীসকেও অবজ্ঞা করার দুঃসাহস দেখালে তিনি তাঁকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিতেন। ইবন আল-জাওযি বর্ণনা করেন যে, ইমাম আহমাদ বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর রসূল ﷺ-এর একটি বিশুদ্ধ হাদীস প্রত্যাখ্যান করে, সে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে।” (১৪)
নাবি ﷺ তাঁর উম্মাহ্র প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন যে, “আমার কাছ থেকে তোমরা যা শুনেছ তা পৌঁছে দাও, এমনকি তা যদি একটি আয়াতও হয়।” (১৫)
মূলত কিয়ামাত পর্যন্ত গোটা মানবজাতির কাছে হিদায়াতের বাণী পৌঁছে দেওয়াই ছিল এ নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য। এ কারণে, ইমাম আহমাদ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সকলের কাছে হিদায়াহ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন প্রত্যেকটি বিষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন।

টিকাঃ
(১২) ঈকাজি আল-হিমাম, পৃ. ১১৩।
(১৩) জামি' বায়ান আল-'ইলম, খন্ড ২, পৃ. ১৪৯।
(১৪) ইবন আল-জাওযি, আল-মানাকিব, বৈরুত, দাঁর আল-আফাক আল-জাদীদাহ, ২য় সংস্করণ, ১৯৭৭, পৃ. ১৮২।
(১৫) 'আবদুল্লাহ ইবন 'আম্র ইবন আল-'আঁস থেকে বর্ণিত এ হাদীসটি সংকলন করেছেন বুখারি, খন্ড ৪, পৃ. ৪৪২, হাদীস নং ৬৬৭।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 মহান ইমামিদের ছাত্রবৃন্দ

📄 মহান ইমামিদের ছাত্রবৃন্দ


মহান ইমামগণ তাঁদের ছাত্রদেরকে অন্ধ অনুসরণের ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। এ কারণে তাঁরা কোনো বিষয়ে নতুন কোনো হাদীস জানতে পারলে নিজ শিক্ষকের মতের বিপরীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে কখনো দ্বিধা করতেন না। কারণ ইমামগণ তাঁদের এমনটি করারই নির্দেশ দিয়েছিলেন। হানাফি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানীফার সাথে তাঁরই ছাত্র আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ তাঁদের মাযহাবের প্রায় এক তৃতীয়াংশ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। (১৬) একইভাবে আল-মুযানি ও অন্যান্য ছাত্রবৃন্দ অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁদের শিক্ষক ইমাম শাফি'ই-র সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।

টিকাঃ
(১৬) আল-হাশিয়্যাহ, খন্ড ১, পৃ. ৬২।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 মন্তব্য

📄 মন্তব্য


উল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলো প্রধান চার ইমাম ও তাঁদের ছাত্রবৃন্দের অসংখ্য বক্তব্যের কিয়দংশ মাত্র। তাঁরা সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ দাবি করেছেন এবং তাঁদের ব্যক্তিগত মতের অন্ধ অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য একেবারেই স্পষ্ট এবং যুক্তিযুক্ত। এগুলোর অপব্যাখ্যা করার কোনো অবকাশ নেই। অতএব, প্রত্যেকেরই উচিত সুন্নাহকে যথাযথভাবে অনুসরণের চেষ্টা করা।
সুন্নাহ অনুসরণ করতে গিয়ে তাকে কিছু ক্ষেত্রে নিজ মাযহাবের ইমামের মতের বিপরীতেও যেতে হতে পারে। তবে এর দ্বারা তিনি নিজ মাযহাব ও ইমামের বিরুদ্ধে গিয়েছেন বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং এর মাধ্যমে "আল্লাহর রজ্জুকে" দৃঢ়ভাবে ধারণ করে তিনি যুগপৎ সবকটি মাযহাবের অনুসরণ করছেন। বিপরীত দিকে, কেবল ইমামদের মতের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে নির্ভরযোগ্য হাদীসকে পরিত্যাগ করা হলে তা হবে স্বয়ং ইমামদের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। অধিকন্তু, নির্ভরযোগ্য হাদীস প্রত্যাখ্যান সরাসরি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণের নামান্তর (১৭)। এ ব্যাপারে কুর'আনে রসূল -কে উদ্দেশ করে আল্লাহ বলেছেন: فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا )
"না, তোমার রবের কসম! তারা কখনো (আল্লাহর একত্বে) বিশ্বাসী হতে পারে না, যতক্ষণ না তাদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে তারা তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেবে; তারপর তুমি যা সিদ্ধান্ত দেবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো কুণ্ঠাবোধ করবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে।" (আন-নিসা', ৪:৬৫)
ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান ইমাম মালিকের গ্রন্থ আল-মুয়াত্তা' পাঠ করার পর প্রায় বিশটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষক ইমাম আবু হানীফাহর সাথে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ইমাম মুহাম্মাদ বলেছেন, 'ইমাম আবু হানীফাহ মনে করতেন যে, ইসতিস্কার (১৮) জন্য কোনো নির্দিষ্ট সলাত নেই। কিন্তু আমার মতে, ইমামের উচিত জনসাধারণকে নিয়ে ইসতিস্কার জন্য দু রক'আত সলাত আদায় করে দু'আ (১৯) করা এবং নিজ পোষাকটি উল্টে পরিধান করা।' (২০)
আরেকটি উদাহরণ হলো, কোনো ব্যক্তি যদি এমন অবস্থায় মারা যায় যে, তার পিতা জীবিত নেই কিন্তু দাদা আছেন; তাহলে এই পৌত্রের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে দাদার উত্তরাধিকারের আইনটি। আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ উভয়ই তাঁদের শিক্ষক ইমাম আবু হানীফাহর সাথে দ্বিমত পোষণ করে বাকি তিন ইমামের মতো একই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, পিতা জীবিত থাকলে যে অংশটুকু তার জন্য বরাদ্দ হতো সেটুকু অর্থাৎ উত্তরধিকারের এক-ষষ্ঠাংশ এক্ষেত্রে দাদা পাবেন।
ইমাম ইবন ইউসুফ আল-বালাখি ছিলেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল- হাসানের ছাত্র এবং আবু ইউসুফের ঘনিষ্ঠ অনুসারী। তিনি অনেক ক্ষেত্রেই আবু হানীফাহ ও তাঁর এই দুই ছাত্রের সিদ্ধান্ত থেকে ভিন্নতর মত দিয়েছেন। কারণ, কিছু বিষয়ের প্রমাণ তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি, কিন্তু পরবর্তীকালে ইবন ইউসুফ আল-বালাখি সেগুলো জানতে পেরেছিলেন। (২১) দৃষ্টান্তস্বরূপ, তিনি রুকু'র পূর্বে ও পরে দুহাত কাঁধ বরাবর তুলতেন (২২)। কিছু সহাবির কাছ থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীস থেকে তিনি এই বিষয়ে প্রমাণ পেয়েছিলেন। অথচ তাঁর মাযহাবের প্রধান তিন ইমামের কাছে উক্ত প্রমাণটি না পৌঁছায় তাঁরা ভিন্নরূপ সিদ্ধান্ত প্রদান করেছিলেন।
নাবি ﷺ-এর সুন্নাহ প্রত্যাখ্যানকারীকে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন, .... فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"রসূলের হুকুমের বিরুদ্ধাচারণকারীদের ভয় করা উচিত যেন তারা কোনো বিপর্যয়ের শিকার না হয় অথবা তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক আযাব না এসে পড়ে।" (আন-নূর, ২৪:৬৩)
উল্লেখ্য যে, তাকলীদ নিষিদ্ধ মানে এই নয় যে, প্রত্যেককেই প্রতিটি কাজ করার পূর্বে মূল প্রমাণ ঘেটে দেখতে হবে। এর অর্থ এও নয় যে, প্রথম দিকের বিশেষজ্ঞ 'আলিমদের অবদানকে প্রত্যাখ্যান কিংবা উপেক্ষা করতে হবে। কারণ, তা সম্পূর্ণ বাস্তবতা পরিপন্থী এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসম্ভব। তবে ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে তাদের উচিত মাযহাব নির্বিশেষে সকল বিশেষজ্ঞের মতামতের দিকে দৃষ্টিপাত করা। জ্ঞানান্বেষণের ক্ষেত্রে একজন 'আলিমকে অবশ্যই উদার মানসিকতার অধিকারী হতে হবে; নতুবা তাঁর সিদ্ধান্তগুলো পক্ষপাতদুষ্ট ও দলঘেঁষা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ কথা স্মরণ রাখা উচিত যে, আইনের মূলনীতি অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও তিনি পূর্বসূরি বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মহান কীর্তিগুলোর উপর নির্ভর করতে বাধ্য। ফিকহশাস্ত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চিন্তা করা একেবারেই অসম্ভব। এবং এই অপচেষ্টা করাও অনুচিত। কারণ তা নির্ঘাত বিচ্যুতি ও পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যাবে। কোনো বিশেষ বিষয়ে সত্যপন্থী বিশেষজ্ঞগণ হয় আগের কোনো বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবেন, নতুবা তাঁদের প্রণীত নীতিমালার উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আগের ইমামদেরই অনুসরণ করবেন। তবে, এ ধরনের অনুসরণকে সুয়ং ইমামদের দ্বারা নিষিদ্ধ তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণ আখ্যা দেওয়া যায় না। এ পদ্ধতিকে বলা হয় ইত্তিবা'। এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য হাদীসগুলো সকল মতামতের উপর প্রাধান্য লাভ করবে, যেমনটি ইমাম আবু হানীফাহ ও শাঁফি'ই বলেছেন, "কোনো সহীহ হাদীস পাওয়া গেলে, তা-ই আমার মাযহাব।"
এটি সুস্পষ্ট যে, জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে অধিকাংশ মুসলিমের পক্ষেই ব্যক্তিগত পর্যায়ে আইনের মূলনীতিগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা রাখা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব হলো, সামর্থ্য অনুযায়ী ইত্তিবা'র নীতি অনুসরণ করা। কুর'আঁন-সুন্নাহ অধ্যয়ন ও 'আলিমদের দেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের প্রমাণের ব্যাপারে প্রশ্ন করার মাধ্যমে তার প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আরও বিস্তারিত জেনে নেওয়া। সত্যিকার জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে যথাযথ বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করা হলে কোনো সত্যপন্থী বিশেষজ্ঞই এধরনের প্রশ্নে মনঃক্ষুণ্ণ হবেন না। বই থেকে সমাধান খুঁজে বের করার প্রয়োজন হলে, সাধারণ মুসলিম ভাইদের উচিত ব্যাখ্যা ও প্রমাণসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে এবং সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রচিত নয় এমন বই বাছাই করা।
সর্বাবস্থায় কেবল একটি মাযহাবের গ্রন্থগুলোর মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এভাবে তারা অন্ধ অনুসরণের নিন্দিত ধারা এড়িয়ে চলতে পারেন। যে মাযহাবেই পাওয়া যাক না কেন নির্ভরযোগ্য সুন্নাহ অনুসরণের জন্য সদা প্রস্তুত থাকলে, তারা মহান ইমামদের তাকলীদ নয়; বরং যথার্থ ইত্তিবা'ই করছেন।

টিকাঃ
(১) আল্লাহর প্রাপ্য 'ইবাদাতের ভাগ অন্য কাউকে দেওয়া, যেমন: মূর্তিপূজা।
(১৭) মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানি, সিফাহ সলাত আন-নাবি, মুখবন্ধ পৃ. ৩৪-৩৫।
(১৮) খরার সময় বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা।
(১৯) অনানুষ্ঠানিক প্রার্থনা।
(২০) মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান, আত-তা'লীক আল-মুমাজ্জিদ 'আলা মুয়াত্তা' মুহাম্মাদ, পৃ. ১৫৮, সিফাহ সলাত আন-নাবি, পৃ. ৩৮।
(২১) ইবন 'আবিদীন, রাসস্ম আল-মুফতি, খণ্ড ১, পৃ. ২৭, সিফাহ সলাত আন-নাবি, পৃ. ৩৭।
(২২) আল-ফাওয়া'ইদ আল-বাহিয়্যাহ ফী তারাজিম আল-হানাফিয়াহ, পৃ. ১১৬, সিফাহ সলাত আন-নাবি, মুখবন্ধ, পৃ. ৩৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00