📄 ইমাম মালিক ইবন আনাস রহিমাহুল্লাহ
(৯৩-১৭৯ হিজরি; ৭১৭-৮০১ সাল)
ইমাম মালিকের সিদ্ধান্তের বিপরীত কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে, তিনি জনসম্মুখে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতেও কখনো দ্বিধা করতেন না। তাঁর একজন প্রধান ছাত্র ইন্ন ওয়াহাব ইমামের এই উদার মনোভাব তুলে ধরে বলেছেন, "আমি একদিন এক ব্যক্তিকে ইমাম মালিককে উদূর সময় পায়ের আঙুলের মাঝখানে ধোয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে শুনলাম। জবাবে তিনি বললেন, 'ধোয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।' উপস্থিত লোকদের চলে যাওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করলাম। অধিকাংশ লোক চলে গেলে তাঁকে জানালাম যে, এ ব্যাপারে একটি হাদীস আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কী সেটি?' তখন আমি বললাম যে, আল-লাইস ইবন সা'দ, ইব্ন লুহায় 'আহ ও 'আম্র ইবন আল-হারীস—এঁরা সবাই মুস্তাওরিদ ইন্ন শিদাঁদ আল-কুরাশি থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি আল্লাহর রসূল -কে তাঁর হাতের কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে নিজ পায়ের আঙুলের মাঝখানে ঘষতে দেখেছেন। ইমাম মালিক একথা শুনে বললেন, "নিঃসন্দেহে এটি একটি উত্তম হাদীস। ইতিপূর্বে আমি কখনো হাদিসটি শুনিনি।” পরবর্তীকালে, আমি যখন লোকদের এ প্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞেস করতে শুনেছি, তখন ইমাম মালিক জোর দিয়ে বলতেন যে, অবশ্যই তা ধুতে হবে।" (৬)
বর্ণনাটি থেকে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, ইমাম আবু হানীফাহ মাযহাবের মতো ইমাম মালিকের মাযহাবও ছিল বিশুদ্ধ হাদীসের ভিত্তিতে গঠিত। যদিও এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফাহ্ মতো তাঁর থেকে প্রাপ্ত কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আমাদের জানা নেই।
ইমাম মালিক স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে নন এবং তাঁর সেসব মতই কেবল গ্রহণ করা উচিত যেগুলো কুর'আন ও হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। ইবন 'আব্দিল-বার বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম মালিক বলেন, "আমি একজন মানুষ, আমি ভুল করতে পারি। আবার কখনও সঠিক সিদ্ধান্তেও উপনীত হতে পারি। সুতরাং আমার মতামতগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করে দেখবে। যা কিছু কুর'আঁন ও সুন্নাহর সাথে সংগতিপূর্ণ তা গ্রহণ করবে, আর যা কিছু সাংঘর্ষিক তা প্রত্যাখ্যান করবে।" (৭)
এ বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ইমাম মালিকও অন্য সবকিছুর উপর কুর'আন ও সুন্নাহকে প্রাধান্য দিতেন। তিনি কখনো চাননি যে, তাঁর মতামত অন্ধভাবে অনুসরণ করা হোক। 'আব্বাসি খলীফা আবু জা'ফার আল-মানসুর ও হারুন আর-রাশীদ ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা' নামক হাদীস সংকলনকে গোটা ইসলামি রাষ্ট্রের সংবিধানে পরিণত করার জন্য তাঁর অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেছিলেন, সহাবিগণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং তাঁদের থেকে বর্ণিত অনেক হাদীসই তাঁর এ সংকলনে নেই।
এভাবে, ইমাম মালিক নিজ মাযহাবকে রাষ্ট্রীয় মাযহাবে পরিণত করার সুযোগ পেয়েও তা নাকচ করে দেন। এর মাধ্যমে তিনি এমন একটি অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যা নিঃসন্দেহে সকলের জন্য অনুকরণীয়।
টিকাঃ
(৬) ইবন আবি হাতিম, আল-জারহ ওয়াত-তা'দীল, হায়দ্রাবাদ, ভারত: মাজলিস দা'ইরাহ আল-মা'আরিফ আল-উসমানিয়্যাহ, ১৯৫২, মুখবন্ধ, পৃ. ৩১-৩৩।
(৭) ইবন 'আবদিল-বার, জামি' বায়ান আল-'ইল্ম, কায়রো, আল মুনীরিয়্যাহ, ১৯২৭, খন্ড ২, পৃ. ৩২।
📄 ইমাম আশ-শাফি‘ই রহিমাহুল্লাহ
(১৫০-২০৪ হিজরি; ৭৬৭-৮২০ সাল)
ইমাম আশ-শাফি'ই তাঁর শিক্ষক ইমাম মালিকের মতোই স্পষ্টভাষায় বলেছেন যে, তাঁর সময় (৮) নাবি থেকে বর্ণিত সকল হাদীস সম্পর্কে জানা বা প্রাপ্ত সব হাদীস মুখস্থ রাখা কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। তৎকালীন 'আলিমগণের কারও কারও কাছে কিছু হাদীস না পৌঁছার কারণে কিছু বিষয়ে তাঁরা ভুল সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। তাই ভুল-শুদ্ধ নিরূপণে সর্বাবস্থায় নির্ভরযোগ্য একমাত্র মানদণ্ড হলো নাবি -এর সুন্নাহ। হাদীস বিশেষজ্ঞ ইমাম হাকিম ইমাম শাফি'ই-র একটি বক্তব্য সংকলন করেছেন; যেখানে তিনি বলেছেন, "আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই, যে আল্লাহর রাসুল -এর সব সুন্নাহ জানেন বা কোনো কিছুই ভুলে যাননি। কাজেই, আমি যে-মূলনীতি বা যে-আইনই প্রণয়ন করি না কেন, তাতে আল্লাহর রাসুল-এর সুন্নাহ্ খেলাফ কিছু থাকাটাই স্বাভাবিক। অতএব, আল্লাহর রসূল যে বিধান দিয়েছেন তাই একমাত্র সঠিক বিধান এবং সেটাই আমার প্রকৃত মাযহাব।" (৯)
ইমাম শাফি'ই ব্যক্তিগত মতের উপর সুন্নাহ গুরুত্বের বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, "আমার যুগের মুসলিমদের মধ্যে ইজমা' ছিল যে, কারও কাছে আল্লাহর রসূল-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ চলে এলে, অন্য কারও মতকে প্রাধান্য দিয়ে তা পরিত্যাগ করা তার জন্য মোটেই বৈধ নয়।” (১০)
নিঃসন্দেহে ইমাম শাফি'ইর এ বক্তব্য তাকলীদ-এর মূলে আঘাত করে। তাল্লীদ-এর কারণে অনেক ক্ষেত্রে মাযহাবের মতকে সুন্নাহ্ উপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়; এমনকি মাযহাবের মতকে সমর্থন করতে গিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নাবি -এর সুন্নাহকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়।
ইমাম আল-হাকিম ইমাম শাফি'ই থেকেও ইমাম আবু হানীফাহর অনুরূপ বক্তব্য সংকলন করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, “কোনো সহীহ হাদীস পাওয়া গেলে, তা-ই আমার মাযহাব।” (১১)
তাকলীদ-এর বিপক্ষে এ মহান ইমামের অবস্থান ছিল একেবারেই আপসহীন। তিনি বাগদাদে অবস্থানকালে নিজ মাযহাবের সারাংশ হিসেবে আল-হুজ্জাহ নামক একখানা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এরপর মিশর ভ্রমণ করে ইমাম আল-লাইস ইবন সা'দের মাযহাব অধ্যয়ন করার পর তিনি অনেক বিষয়ে তাঁর পূর্বের মত পরিবর্তন করেন। এরপর তিনি আল-উম্মু নামে একখানা নতুন গ্রন্থ রচনা করেন।
টিকাঃ
(৮) বুখারি ও মুসলিমের মতো হাদীসের প্রধান সংকলনগুলো ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থগুলো হিজরি তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি সময়ে রচিত হয়।
(৯) ইবন 'আসাকির, তারীখ দিমিক্ক আল কাবীর, (দামাস্কাস, রাওদাহ আশ-শাম, ১৯১১-১৯৩২), খন্ড ১৫, প্রথম অংশ, পৃ. ৩।
(১০) ইন্ন কায়্যিম, ই'লাম আল-মুক্'িঈন, বৈরুত, দাঁর আল-জীল, খণ্ড ২, পৃ. ৩৬১।
(১১) ইয়াহইয়া ইবন শারাফ আদ-দীন আন-নাওয়াউই, আল-মাজমূ', কায়রো, ইদাঁরাহ আত- তাবা' আহ আল-মুনীরিয়্যাহ, ১৯২৫, খন্ড ১, পৃ. ৬৩।
📄 ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল রহিমাহুল্লাহ
(১৬১-২৪১ হিজরি; ৭৭৮-৮৫৫ সাল)
ইমাম আহমাদ তাঁর ছাত্রদের অন্তরে ইসলামের মূল উৎসগুলোর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলেছিলেন। কারও ব্যক্তিগত মতের অন্ধ অনুসরণের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করার মাধ্যমে ইমাম আহমাদ তাঁর শিক্ষক ইমাম শাফি'ই ও অন্যান্য ইমামদের অনুসৃত রীতি অব্যাহত রেখেছিলেন। আগের ইমামদের কিছু কিছু অনুসারীর মধ্যে তাকলীদ-এর প্রবণতা দেখা দেওয়ায় ইমাম আহমাদ আরও বেশি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ইমাম আবু হানীফাহ তাঁর ছাত্রদেরকে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত লিপিবদ্ধ করতে শুধু নিরুৎসাহিত করেছিলেন। ইমাম আহমাদ আরও একধাপ এগিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত লিপিবদ্ধ করার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
তাই তাঁর ছাত্রদের যুগের পূর্বে তাঁর মাযহাব লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা হয়নি।
ইমাম আহমাদ প্রকাশ্যে তাকলীদ-এর বিরোধিতা করার মাধ্যমে অন্যদের এ ব্যাপারে সতর্ক করতেন। ইবন আল-কায়্যিম এ ব্যাপারে তাঁর নিম্নোক্ত বক্তব্যটি সংকলন করেছেন। ইমাম আহমাদ বলেছেন, “মালিক, আশ-শাফি’ই, আল-আওযা’ই, আস-সাওরি কিংবা আমার কোনো মত অন্ধভাবে অনুসরণ করবে না। তাঁরা যেখান থেকে তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, তোমরাও সেখান থেকে তোমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো।” (১২)
একইভাবে, ইবন ‘আব্দিল-বার তাঁর আরেকটি বক্তব্য সংগ্রহ করেছেন। সেখানে তিনি বলেন, “ইমাম আল-আওযা’ই, মালিক ও আবু হানীফাহ্ সিদ্ধান্তগুলো কেবল তাঁদের মতামত হিসেবেই বিবেচ্য। আমার কাছে তাদের সকলের মর্যাদা সমান। এক্ষেত্রে সঠিক ও ভুল নিরূপণের প্রকৃত মানদণ্ড হলো আল্লাহর রসূলের সুন্নাহ।” (১৩)
ইমাম আহমাদ হাদীসকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, তিনি ক্বিয়াসের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তের উপর একটি দুর্বল হাদীসকেও প্রাধান্য দিতেন। তিনি আল-মুসনাদ আল-কাবীর শিরোনামে ত্রিশ হাজারেরও অধিক হাদীস সম্বলিত একটি গ্রন্থ সংকলন করেছেন। নাবি ﷺ-এর সুন্নাহর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ এত বেশি ছিল যে, কেউ নাবি ﷺ-এর একটি হাদীসকেও অবজ্ঞা করার দুঃসাহস দেখালে তিনি তাঁকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিতেন। ইবন আল-জাওযি বর্ণনা করেন যে, ইমাম আহমাদ বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর রসূল ﷺ-এর একটি বিশুদ্ধ হাদীস প্রত্যাখ্যান করে, সে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে।” (১৪)
নাবি ﷺ তাঁর উম্মাহ্র প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন যে, “আমার কাছ থেকে তোমরা যা শুনেছ তা পৌঁছে দাও, এমনকি তা যদি একটি আয়াতও হয়।” (১৫)
মূলত কিয়ামাত পর্যন্ত গোটা মানবজাতির কাছে হিদায়াতের বাণী পৌঁছে দেওয়াই ছিল এ নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য। এ কারণে, ইমাম আহমাদ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সকলের কাছে হিদায়াহ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন প্রত্যেকটি বিষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন।
টিকাঃ
(১২) ঈকাজি আল-হিমাম, পৃ. ১১৩।
(১৩) জামি' বায়ান আল-'ইলম, খন্ড ২, পৃ. ১৪৯।
(১৪) ইবন আল-জাওযি, আল-মানাকিব, বৈরুত, দাঁর আল-আফাক আল-জাদীদাহ, ২য় সংস্করণ, ১৯৭৭, পৃ. ১৮২।
(১৫) 'আবদুল্লাহ ইবন 'আম্র ইবন আল-'আঁস থেকে বর্ণিত এ হাদীসটি সংকলন করেছেন বুখারি, খন্ড ৪, পৃ. ৪৪২, হাদীস নং ৬৬৭।
📄 মহান ইমামিদের ছাত্রবৃন্দ
মহান ইমামগণ তাঁদের ছাত্রদেরকে অন্ধ অনুসরণের ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। এ কারণে তাঁরা কোনো বিষয়ে নতুন কোনো হাদীস জানতে পারলে নিজ শিক্ষকের মতের বিপরীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে কখনো দ্বিধা করতেন না। কারণ ইমামগণ তাঁদের এমনটি করারই নির্দেশ দিয়েছিলেন। হানাফি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানীফার সাথে তাঁরই ছাত্র আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ তাঁদের মাযহাবের প্রায় এক তৃতীয়াংশ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। (১৬) একইভাবে আল-মুযানি ও অন্যান্য ছাত্রবৃন্দ অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁদের শিক্ষক ইমাম শাফি'ই-র সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
টিকাঃ
(১৬) আল-হাশিয়্যাহ, খন্ড ১, পৃ. ৬২।