📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 চার মাযহাব

📄 চার মাযহাব


এ পর্যায়ে মাযহাবের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে চারটিতে নেমে আসে। এর মধ্যে তিনটি ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং অপরটি ছিল তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম প্রসিদ্ধ। অন্যকথায়, আওযাঁ'ই, সুফ্য়ান সাওরি, ইব্‌ন আবি লাইলা, আবু সাওর এবং আল-লাইস ইবন সা'দ এর মতো বিখ্যাত ইমামদের মাযহাবগুলো হারিয়ে গিয়ে কেবল ইমাম আবু হানীফাহ, মালিক, শাফি'ই ও আহমাদ ইবন হানবালের মাযহাব টিকে থাকে। সময় পরিক্রমায় এই মাযহাবগুলো এতটাই প্রভাব বিস্তার করে যে, সাধারণ মানুষ অল্প সময়ের মধ্যে ভুলেই গিয়েছিল অন্য কোনো মাযহাব আদৌ কখনো ছিল কি না।
এসব মাযহাবের প্রত্যেকটিই নিজ থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তাদের অনুসারীবৃন্দ নিজ নিজ মাযহাবের নামে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার প্রথা চালু করেন। উদাহরণস্বরূপ, বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ শারহ আস-সুন্নাহ লেখক হুসাইন ইবন মাস'ঊদ বাগাউইকে শাফি'ই মাযহাবের সাথে সম্পৃক্ত করে আশ-শাফি'ই নামে ডাকা হতো।
এ পর্যায়ে প্রত্যেকটি মাযহাবের বিশেষজ্ঞগণ নিজ নিজ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা বিশেষজ্ঞদের সব সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে সেগুলোর নেপথ্য মূলনীতিগুলো বের করে লিপিবদ্ধ করেন। মাযহাব প্রতিষ্ঠাতাগণ আলোচনা করেননি এমন কিছু বিষয়ে তাঁরা সীমিত পরিসরে ইজতিহাদও করেছেন। তবে, দরবারি বিতর্কের ভিতরে ও বাইরে ব্যাপকভাবে কল্পনাপ্রসূত ফিকহ চর্চার ফলে ইজতিহাদের সীমিত ক্ষেত্রটিও দ্রুত নিঃশেষিত হয়ে যায়।
পরিশেষে, মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মূলনীতিভিত্তিক ইজতিহাদকে বজায় রাখার স্বার্থে স্বাধীন ইজতিহাদ সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য হয়। এ সময় মাযহাবি ইজতিহাদ নামে নতুন একটি ধারা চালু হয়। এর মূল কাজ ছিল বিশেষ কোনো মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাদের প্রণীত মূলনীতি অনুযায়ী সমকালীন সমস্যা সমাধানের জন্য আইন উদ্ভাবন করা। এভাবে, এ যুগের বিশেষজ্ঞগণ মাযহাবগুলোর প্রতিষ্ঠাতাদের সাথে মাঝেমধ্যে ফুরু' বা শাখাগত কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও উসুল বা মূলনীতির ক্ষেত্রে তৎকালীন বিশেষজ্ঞদের সাথে নিজ নিজ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাদের মতবিরোধ হয়েছে খুবই অল্প।
মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা বিশেষজ্ঞগণ ও তাঁদের ছাত্রবৃন্দ অনেক ক্ষেত্রে তাদের পূর্বের মত পরিবর্তন করতেন। ফলে অনেক বিষয়ে একই মাযহাবের মধ্যেও মতের বিভিন্নতা দেখা দিয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী দুটি মতই সংরক্ষিত আকারে মাযহাবের বিভিন্নমুখী সিদ্ধান্ত হিসেবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে।
মাযহাবের প্রথম দিকের বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের বিভিন্ন ব্যাখ্যা থেকেও মতের ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে মাযহাবের বিশেষজ্ঞগণ তারজীহ নীতি ব্যবহার করেছেন। এ নীতির মাধ্যমে তাঁরা কোনো একটি বিষয়ে মাযহাবের কোনো বিশেষজ্ঞের মতকে একই মাযহাবের অন্যান্য বিশেষজ্ঞের মতের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। সুসংহতকরণের এ যুগে প্রত্যেকটি মাযহাবের বিশেষজ্ঞগণ নিজ নিজ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাদের প্রতি আরোপিত দুর্বল ও জাল বক্তব্যগুলোকে নিখুঁতভাবে যাচাই বাছাই করার চেষ্টা করেছেন। এরপর প্রতিষ্ঠাতাদের মতামতের বর্ণনাগুলোকে তাঁরা বিশুদ্ধতা অনুযায়ী শ্রেণিভুক্তও করেন। যাচাই বাছাই ও শ্রেণিভুক্তকরণের এ প্রক্রিয়াকে তাসহীহ নামে অভিহিত করা হয়।
মাযহাবের ভিতর ফিরে এই বিস্তৃত নিয়মতান্ত্রিক বিশ্লেষণ একটি মাযহাবের মধ্যেই আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পদ্ধতিকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে। পূর্ববর্তী পর্যায়ের মতো এই যুগের বিশেষজ্ঞগণও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তারা যদিও অত্যন্ত মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এ কাজ করেছেন; তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে পরবর্তীকালে মাযহাবি দলাদলি বৃদ্ধিতে এগুলো বরং আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 ফিক্‌হ সংকলন

📄 ফিক্‌হ সংকলন


'আব্বাসি শাসনামলের এ পর্যায়ে ফিক্হ গ্রন্থ রচনায় বিষয় বিন্যাসের একটি নতুন ধারা বিকশিত হয়। এ ধারাটি এমনই একটি আদর্শে পরিণত হয় যা আজও অব্যাহত আছে। বিভিন্ন বিষয়কে তাঁদের প্রধান শিরোনাম অনুসারে এবং শিরোনামগুলোকে বিভিন্ন অধ্যায়ে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। এগুলোর প্রত্যেকটি শারী'আহ্ একেকটি প্রধান আলোচ্য বিষয়কে উপস্থাপন করে। এমনকি পরিচ্ছেদগুলোর ক্রমধারাও একটি অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত হয়।
সাধারণত ইসলামি আকীদাহ বিষয়ক গ্রন্থে ঈমান নিয়ে আলোচনা করা হতো। তাই ফাকীহগণ ঈমানের পরের চারটি স্তম্ভ দিয়ে শুরু করতেন। পরিচ্ছেদগুলোকে নিম্নোক্ত ক্রমধারা অনুযায়ী বিন্যস্ত করা হতো। তুহারাহ বা পবিত্রতা, সলাত, সওম, যাকাত ও হাজ্জসংক্রান্ত বিষয়াবলি আলোচনা করার পর তাঁরা নিকাহ (বিয়ে) ও তলাক (বিবাহ-বিচ্ছেদ), তারপর বাই' (ব্যবসা-বাণিজ্য) ও আঁদাব (শিষ্টাচার) সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে নিয়ে আসতেন।
এ সকল বিষয়ের আলোচনায় লেখক নিজ মাযহাব ছাড়াও অন্যান্য মাযহাবের মতামতও উপস্থাপন করতেন। তারপর বিভিন্ন মাযহাবের যুক্তিগুলোকে খন্ডন করে নিজ মাযহাবের মতের বিশুদ্ধতা প্রমাণ করে আলোচনা শেষ করতেন。

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 অধ্যায় সারাংশ

📄 অধ্যায় সারাংশ


১ প্রথম যুগে যেসব মাযহাব বিকশিত হয়েছিল এ যুগে এসে সেগুলোর বেশিরভাগই হারিয়ে যায়। অবশিষ্ট থাকে কেবল চারটি মাযহাব।
২ মাযহাবগুলো সুসংহতকরণ ও নিয়মতান্ত্রিকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
৩ মাযহাবের কাঠামো বহির্ভূত ইজতিহাদ পরিত্যজ্য হয় এবং মাযহাবি ইজতিহাদ এই স্থানকে দখল করে নেয়।
৪ ফিক্হ মুকারান বা তুলনামূলক ফিক্হশাস্ত্র গড়ে ওঠে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা দলীয় চিন্তাধারাকে আরও বেগবান করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00