📄 হাদীসের বর্ণনা
হাদীস বর্ণনা ও প্রয়োগের ব্যাপারে আইনজ্ঞদের মধ্যে মূলত নিম্নোক্ত কারণে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে:
২.ক. হাদীস প্রাপ্তির সহজতা
মূলত দুটি কারণে অনেক বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু হাদীস অনেক বিশেষজ্ঞ ‘আলিমের কাছেই পৌঁছেনি।
১. হাদীস বর্ণনাকারী সহাবিগণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিলেন।
২. হাদীসের সংকলনগুলো প্রস্তুত হওয়ার পূর্বেই ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে প্রধান মাযহাবগুলো ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল। ইমাম আবু হানীফাহ (৮০-১৫০ হিজরি; ৭০২-৭৬৭ সাল), ইমাম মালিক (৯৩-১৭৯ হিজরি; ৭১৭-৮৫৫ সাল), ইমাম শাফি'ই ও ইমাম আহমাদের (১৬১-২৪২ হিজরি; ৭৭৮-৮৫৫ সাল) মাযহাবগুলো প্রতিষ্ঠিত হয় হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমাংশে। পক্ষান্তরে, হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি ও চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমাংশের আগে হাদীসের বিশুদ্ধ ও বিশাল সংকলনগুলোর (১০) কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
যথাযথ ও প্রাসঙ্গিক হাদীস না পাওয়ার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিশেষজ্ঞ 'আলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য হয়েছে। নিম্নোক্ত বিষয়টি সেগুলোর অন্যতম দৃষ্টান্ত:
ক) ইসতিস্কা বা বৃষ্টি প্রার্থনার সলাত প্রসঙ্গে ইমাম আবু হানীফাহর সিদ্ধান্ত ছিল যে, এর জন্য জামা'আত-বদ্ধভাবে সলাত আদায় করার প্রয়োজন নেই। তাঁর এ মতের ভিত্তি ছিল আনাস ইবন মালিকের বর্ণিত একটি হাদীস, যেখানে বলা হয়েছে, নাবি কোনো এক ঘটনায় সলাত আদায় না করেই বৃষ্টির জন্য দু'আ' করেছিলেন। (১৪)
খ) তবে, তাঁর ছাত্র আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ এবং অন্যান্য সকল ইমামই এ ব্যাপারে একমত যে, ইসতিস্কার জন্য জামা'আতে সলাত আদায় করা সঠিক। (১৫) তাঁদের এ মতের ভিত্তি হলো 'আব্বাদ ইবন তামীম ও অন্যদের কাছ থেকে বর্ণিত একটি হাদীস। যেখানে বলা হয়েছে যে, নাবি সলাত আদায়ের স্থানে গিয়ে কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে দু'আ' করলেন, তারপর তাঁর গায়ের জামাটি উল্টে পরিধান করলেন এবং অন্যদের সাথে নিয়ে জামা'আতের সাথে দুরক'আত সলাত আদায় করলেন। (১৬)
২.খ হাদীসের দুর্বল বর্ণনা
কিছু কিছু ক্ষেত্রে কতিপয় আইনবিদ দু'ঈফ তথা দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য হাদীসের ভিত্তিতে নিজেদের আইনগত মতামত প্রদান করেছেন। কারণ, তাঁরা হয়তো সে হাদীসটির দুর্বলতার ব্যাপারটি জানতেন না, অথবা তাঁরা মনে করতেন, দু'ঈফ হাদীসকে তাঁদের ব্যক্তিগত কিয়াসের উপর প্রাধান্য দিতে হবে। (১৭) যেমন,
ক) ইমাম আবু হানীফাহ, তাঁর ছাত্রবৃন্দ ও ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল মত দিয়েছিলেন যে, বমি করলে উদু' ভেঙে যাবে। তাঁদের এ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হলো 'আ'ইশাহ থেকে বর্ণিত একটি হাদীস। হাদীসটিতে নাবি বলেছেন,
"কোনো ব্যক্তি কাই', বুরু'আঁফ অথবা কাল্স (এগুলো বমির বিভিন্ন ধরন) আক্রান্ত হলে, তার উচিত কোনো কথা না বলে সলাত ছেড়ে দিয়ে উদু' করে সলাতের বাকি অংশ আদায় করা।" (১৮)
খ) ইমাম শাফি'ই ও ইমাম মালিক মত দিয়েছেন যে, কাই' বা বমি উদু' ভঙ্গের কারণ নয়। এর সপক্ষে তাঁরা দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, উল্লিখিত হাদীসটি সহীহ নয় এবং দ্বিতীয়ত, ইসলামি আইনের অন্যান্য উৎসগুলোর কোথাও বমিকে উদু' ভাঙার কারণ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
২.গ. হাদীস গ্রহণের শর্তাবলি
হাদীস গ্রহণের ব্যাপারে বিভিন্ন রকম শর্ত আরোপের কারণে সুন্নাহর ক্ষেত্রে আইনবিদদের মধ্যে একটি মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ,
ইমাম আবু হানীফাহর শর্ত হলো আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য হাদীসটিকে অবশ্যই মাশহুর বা সুপরিচিত হতে হবে। অন্যদিকে ইমাম মালিকের শর্ত হলো, প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য হাদীসটি মাদীনার প্রথার পরিপন্থী হতে পারবে না। ইমাম আহমাদ মুরসাল(১৯) হাদীসগুলোকেও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আর ইমাম শাফি'ই কেবল সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের মুরসাল হাদীসগুলোকে গ্রহণ করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসগুলোকে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ খুবই বিশুদ্ধ বলে মনে করতেন।(২০)
২.ঘ. হাদীসের পরস্পরবিরোধী মাতান-এর সমস্যা সমাধান
কিছু কিছু হাদীসের মাতান বা মূলপাঠের অর্থের মধ্যে আপাত দৃশ্যমান বিরোধ নিরসনের জন্য মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাগণ এবং তাঁদের ছাত্রবৃন্দ প্রধানত দুটি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
১. কতিপয় আইনবিদ তারজীহ্ পন্থা বেছে নিয়েছেন। অর্থাৎ একই বিষয়ে বিদ্যমান বিভিন্ন হাদীস পর্যালোচনা করে তাঁরা কোনোটিকে কোনোটির উপর প্রাধান্য দিতেন।
২. অন্য কতিপয় আইনবিদ জামা' (সমন্বয়)-এর পন্থা অবলম্বন করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁরা একটি হাদীসকে সাধারণ অর্থে ধরে নিয়ে বাকিগুলোর সাথে সমন্বয় সাধন করতেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, একটি বিশুদ্ধ হাদীসে নাবি বিশেষ কিছু সময়ে সলাত আদায় করতে নিষেধ করে বলেন,
"ফজর সলাতের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত আর 'আস্ত্র সলাতের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো সলাত নেই।” (২১)
তবে কিছু সমমানের সহীহ হাদীসে সময়ের কোনো উল্লেখ ছাড়াই সর্বাবস্থায় কিছু সলাতের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ,
"তোমাদের কেউ মাসজিদে প্রবেশ করলে তার উচিত বসার আগেই দু রক'আত সলাত আদায় করা।” (২২)
ক) ইমাম আবু হানীফাহ এক্ষেত্রে তারজীহ-এর পন্থা বেছে নিয়েছেন। তিনি প্রথম হাদীসকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন যে, নিষিদ্ধ সময়ে সব ধরনের সলাতই নিষিদ্ধ। অন্যদিকে, ইমাম মালিক, ইমাম শাফি'ই এবং ইমাম আহমাদ হাদীস দুটির জামা' বা সমন্বয় সাধন করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, প্রথম হাদীসটি সাধারণ এবং তার সম্পর্ক হলো নাফল সলাতের সাথে। অন্যদিকে দ্বিতীয় হাদীসটি সুনির্দিষ্ট, যেখানে সাধারণত নিষিদ্ধ সময়েও মুসতাহাব বা বিশেষভাবে উৎসাহ প্রদানকৃত সলাতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। (২৩)
টিকাঃ
(১৩) সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসা'ই ও ইন্ন মাঁজাহ এর হাদীস গ্রন্থগুলো।
(১৪) সহীহ মুসলিম, খন্ড ১, পৃ. ৪২৩-৪২৪, হাদীস নং ১৯৫৬।
(১৫) আল মুগনি, খন্ড ২, পৃ. ৩২০। আরও দেখুন বিদায়াহ আল-মুজতাহিদ, খন্ড ১, পৃ. ১৮২।
(১৬) সহীহ মুসলিম, খন্ড ১, পৃ. ৪২২, হাদীস নং ১৯৪৮।
(১৭) আল-মাদখাল, পৃ. ২১০।
(১৮) ''ইশাহ বর্ণিত এ হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইবন মাজাহ। শাইখ আলবানি এ হাদীসটিকে দু'ঈফ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। দা'ঈফ আল-জামি' আস-সগীর, (বৈরুত, আল-মাকতাব আল-ইসলামি, ১৯৭৯), খন্ড ৫, পৃ. ১৬৭, হাদীস নং ৫৪৩৪।
(১৯) তাবি'উন (সাহাবিদের ছাত্র) থেকে বর্ণিত হাদীস যেখানে ঐ সাহাবার নাম উল্লেখ করা হয়নি যার নিকট থেকে তাবি'উন হাদীসটি শুনেছেন।
(২০) ইবন তাইমিয়্যাহ, রাফ' উল-মালাম 'আন আল-আ'ইম্মাহ আল-আ'লাম, (বৈরুত, আল-মাকতাব আল-ইসলামি, ৩য় সংস্করণ, ১৯৭০), পৃ. ৩১।
(২১) সহীহ বুখারি, খণ্ড ১, পৃ. ৩২২, হাদীস নং ৫৫৫; সহীহ মুসলিম, খন্ড ২, পৃ. ৩৯৫, হাদীস নং ১৮০৫ এবং সুনান আবি দাউদ, খন্ড ১, পৃ. ৩৩৫-৩৩৬, হাদীস নং ১২৭১।
(২২) সহীহ বুখারি, খন্ড ১, পৃ. ২৫৯-২৬০, হাদীস নং ৪৩৫, মুসলিম, খন্ড ১, পৃ. ৩৪৭, হাদীস নং ১৫৪০ এবং সুনান আবি দাউদ, খণ্ড ১, পৃ. ১২০, হাদীস নং ৪৬৭।
(২৩) 'আস্ত্রের ফার্দ সলাতের পর নাবি যুহরের ছুটে যাওয়া নাফল সলাত আদায় করতেন যেখান থেকে দ্বিতীয় মতটির সমর্থন পাওয়া যায়। সহীহ বুখারি, খন্ড ১, পৃ. ৩২৫, অধ্যায় ৩৩ এবং সহীহ মুসলিম, খন্ড ২, পৃ. ৩৯৭-৩৯৮, হাদীস নং ১৮১৫ এবং বিদায়াহ আল-মুজতাহিদ, খণ্ড ১, পৃ. ৬৬-৯১।
📄 অধ্যায় সারাংশ
শারী'আহ্হ্ বিভিন্ন প্রমাণ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য থেকে জন্ম নিয়েছে নানামুখী সিদ্ধান্ত। আর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এ মতপার্থক্যের কারণ ছিল নিম্নরূপ: ১.ক. শব্দের অর্থ; একই শব্দের একাধিক অর্থ, আক্ষরিক ও রূপক অর্থ প্রভৃতি কারণে অর্থ নিয়ে মতপার্থক্য। ১.খ. ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের বিভিন্নতা; উদাহরণস্বরূপ, কুরু', লাম্স ও ইলা এই শব্দগুলোর ব্যাখ্যাসংক্রান্ত ভিন্নতা।
হাদীসের প্রাপ্তির সহজতা, নির্ভরযোগ্যতা, হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে আরোপিত শর্তাবলি ও মাতান বা বক্তব্যের বিরোধ নিরসনের পদ্ধতিগুলোর ভিন্নতার কারণে হাদীস প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
কতিপয় ইমাম বিশেষ কিছু নীতিমালা তৈরি করে সেগুলোর ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছিলেন। তবে এ নীতিগুলো সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। অন্যান্য ইমামগণ সেসব মূলনীতি ও সিদ্ধান্ত—উভয়টিকেই প্রত্যাখ্যান করেছেন, যেমন ইসতিহসান এবং মাদীনাবাসীদের প্রথা।
কিয়াস নামক মূলনীতিটি সাধারণভাবে গৃহীত হলেও এর মাধ্যমে আইন প্রণয়নের ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে বেশ মতপার্থক্য ছিল। ফলে দেখা যায়, একই রকম অনেক বিষয়ে ইমামগণ বিভিন্ন রকম সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন。