📄 হানবালি মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ (১৬৪-২৪১ হিজরি; ৭৭৮-৮৫৫ সাল)
এ মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল আশ-শায়বানির নামানুসারে। তিনি ১৬১ হিজরিতে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীস মুখস্থকারী ও বর্ণনাকারী। ইমাম আবু হানীফা বিখ্যাত ছাত্র আবু ইউসুফের অধীনে হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন তিনি। এছাড়াও ইমাম শাফি'ই-র নিজ তত্ত্বাবধানে ফিক্হ ও হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
তাঁর সমকালীন খলীফাগণ অনেক মু'তাযিলি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। এ ভ্রান্ত আকীদাহ বিরোধিতার কারণে ইমাম আহমাদকে অনেক নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে হয়। কুর'আঁনকে সৃষ্টি করা হয়েছে—ভ্রান্ত এই দার্শনিক চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে খলীফা আল-মা'মূনের (শাসনকাল ১৯৭-২২৭ হিজরি; ৮১৩-৮৪২ সাল) নির্দেশে তিনি কারারুদ্ধ হয়ে দুবছর নির্যাতিত হন। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি পুনরায় বাগদাদে পাঠদান করতে থাকেন। আল-ওয়াসিক শাসনভার হাতে নেওয়ার পর (শাসনকাল ২২৭-২৩১ হিজরি; ৮৪২-৮৪৬ সাল) পুনরায় তাঁর উপর নির্যাতন আরম্ভ হয়। ফলে, ইমাম আহমাদ পাঠদান বন্ধ করে দেন এবং পরবর্তী খলীফা মুতাওয়াক্কিলের (শাসনকাল ২৩২-২৪৭ হিজরি; ৮৪৭-৮৬১ সাল) ক্ষমতা লাভের আগ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর তিনি আত্মগোপনে থাকেন। খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিল মু'তাযিলি বিশেষজ্ঞদের বহিষ্কার করে সরকারিভাবে তাঁদের দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে তাঁর উপর এ নির্মম নির্যাতনের অবসান ঘটে। ইমাম আহমাদ ২৪১ হিজরিতে (৮৫৫ সাল) ইন্তেকাল করার পূর্ব পর্যন্ত নিয়মিতভাবে বাগদাদে তাঁর পাঠদান অব্যাহত রাখেন।[২০]
হানবালি মাযহাবের গঠন
ইমাম আহমাদের মূল লক্ষ্য ছিল হাদীস সংগ্রহ, বর্ণনা ও তার ব্যাখ্যা প্রদান করা। তিনি ত্রিশ হাজারেরও বেশি হাদীসের একটি বিশাল সংকলন প্রস্তুত করেন যা মুসনাদ আহমাদ নামে পরিচিত। এ গ্রন্থ থেকে হাদীস বর্ণনা করাই ছিল তাঁর প্রধান শিক্ষাপদ্ধতি। পাশাপাশি তিনি সেসব হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সহাবিগণের বিভিন্ন মতামতও পর্যালোচনা করতেন। তারপর তিনি হাদীস কিংবা সিদ্ধান্তগুলোকে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করতেন। কোনো সমস্যা সমাধানে প্রাসঙ্গিক হাদীস কিংবা সহাবিদের কোনো মত পাওয়া না গেলেই কেবল তিনি নিজের মত প্রকাশ করতেন। সেক্ষেত্রেও তিনি ছাত্রদের তাঁর ব্যক্তিগত মত লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করতেন। ফলে, তাঁর মাযহাব তাঁর নিজ ছাত্রদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়নি; বরং সংরক্ষিত হয়েছে তাঁর ছাত্রদের ছাত্রদের মাধ্যমে।
হানবালি মাযহাবে আইনের উৎস ১. আল-কুর'আন পূর্বসূরী ইমামদের মতোই ইমাম আহমাদ ইবন হানবালের কাছেও মহা গ্রন্থ আল কুর'আন হলো আইনের প্রথম ও প্রশ্নাতীত উৎস। অন্য কথায়, তাঁর মাযহাবে সর্বক্ষেত্রে কুর'আনকে অন্য সবকিছুর উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
২. আস-সুন্নাহ আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মৌলিক উৎসগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নাবি -এর সুন্নাহ। হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর একমাত্র শর্ত ছিল যে, হাদীসটি মারফু' বা স্বয়ং নাবি থেকে বর্ণিত হতে হবে।
৩. সহাবিগণের ইজমা' ইমাম আহমাদ সহাবিগণের মতৈক্যকে আইনের মৌলিক উৎসগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থানে রেখেছেন। তবে, তিনি সহাবিগণের যুগের পর ইজমা'র দাবিকে ভুল বলেছেন। কারণ, পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই তাঁর মতে, সহাবিগণের যুগের পর কোনো বিষয়ে সত্যিকার অর্থে ইজমা' সংঘটিত হওয়া অসম্ভব।
৪. সহাবিদের ব্যক্তিগত মত কোন বিষয়ে সহাবিগণের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলে ইমাম মালিকের ন্যায় ইমাম আহমাদও সেসব মতের প্রত্যেকটিকে গুরুত্ব দিতেন। তাই এ মাযহাবের মধ্যে একই সমস্যার বহুমুখী সমাধান দেওয়ার ধারা পরিলক্ষিত হয়।
৫. দু'ঈফ হাদীস (দুর্বল হাদীস) কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে পূর্বের চারটি উৎসের কোথাও কোনো সমাধান না পাওয়া গেলে, ইমাম আহমাদ নিজস্ব কিয়াস ব্যবহারের চেয়ে একটি দুর্বল হাদীসের ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতেন। তবে, তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে, হাদীসটির দুর্বলতা বর্ণনাকারী ফাসিক্ (পাপাচারী) কিংবা কায্যাব (মিথ্যুক) হওয়ার কারণে হতে পারবে না।
৬. কিয়াস উল্লিখিত মূলনীতিগুলোর কোনটিই সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে সর্বশেষ উপায় হিসেবে ইমাম আহমাদ অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিয়াসের নীতি প্রয়োগ করতেন। পূর্বোক্ত মূলনীতিগুলোর মধ্য থেকে এক বা একাধিক মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি কিয়াসের মাধ্যমে একটি সমাধান বের করার চেষ্টা করতেন। ২১।
হানবালি মাযহাবের প্রধান ছাত্রবৃন্দ
ইমাম আহমাদের প্রধান ছাত্র ছিলেন তাঁর দুই পুত্র: সালিহ্ (মৃত্যু ২৬৫ হিজরি; ৮৭৩ সাল) ও 'আবদুল্লাহ (মৃত্যু ২৯০ হিজরি; ৯০৩ সাল)। তাঁর তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেছিলেন এমন বিখ্যাত হাদীস বিশারদের অন্যতম ছিলেন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থগুলোর সংকলকদ্বয় ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম। ২২।
হানবালি মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ
এ মাযহাবের অধিকাংশ অনুসারীই বসবাস করে ফিলিস্তিন ও সাউদি আরবে। মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেলেও সাউদি আরবে এ মাযহাবটি বেশ প্রভাব বিস্তার করে আছে। কারণ, সংস্কারবাদী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবন 'আবদুল-ওয়াহহাব হানবালি মাযহাবের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করেছেন, ফলে এটি অঘোষিতভাবে তার আন্দোলনের মাযহাবে পরিণত হয়। 'আবদুল-'আযীয ইবন সা'উদ আরব উপদ্বীপের বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে সাউদি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার পর তিনি হানবালি মাযহাবকে রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিণত করেন।
টিকাঃ
[২০] আল-মাদখাল, পৃ. ২০০।
[২১] আল-মাদখাল, পৃ. ২০২-২০৩।
[২২] তারীখ আল-মাজাহিব আল-ইসলামিয়্যাহ, খন্ড ২, পৃ. ৩৩৯-৩৪০।
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ (১৬৪-২৪১ হিজরি; ৭৭৮-৮৫৫ সাল)
এ মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল আশ-শায়বানির নামানুসারে। তিনি ১৬১ হিজরিতে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীস মুখস্থকারী ও বর্ণনাকারী। ইমাম আবু হানীফা বিখ্যাত ছাত্র আবু ইউসুফের অধীনে হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন তিনি। এছাড়াও ইমাম শাফি'ই-র নিজ তত্ত্বাবধানে ফিক্হ ও হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
তাঁর সমকালীন খলীফাগণ অনেক মু'তাযিলি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। এ ভ্রান্ত আকীদাহ বিরোধিতার কারণে ইমাম আহমাদকে অনেক নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে হয়। কুর'আঁনকে সৃষ্টি করা হয়েছে—ভ্রান্ত এই দার্শনিক চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে খলীফা আল-মা'মূনের (শাসনকাল ১৯৭-২২৭ হিজরি; ৮১৩-৮৪২ সাল) নির্দেশে তিনি কারারুদ্ধ হয়ে দুবছর নির্যাতিত হন। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি পুনরায় বাগদাদে পাঠদান করতে থাকেন। আল-ওয়াসিক শাসনভার হাতে নেওয়ার পর (শাসনকাল ২২৭-২৩১ হিজরি; ৮৪২-৮৪৬ সাল) পুনরায় তাঁর উপর নির্যাতন আরম্ভ হয়। ফলে, ইমাম আহমাদ পাঠদান বন্ধ করে দেন এবং পরবর্তী খলীফা মুতাওয়াক্কিলের (শাসনকাল ২৩২-২৪৭ হিজরি; ৮৪৭-৮৬১ সাল) ক্ষমতা লাভের আগ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর তিনি আত্মগোপনে থাকেন। খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিল মু'তাযিলি বিশেষজ্ঞদের বহিষ্কার করে সরকারিভাবে তাঁদের দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে তাঁর উপর এ নির্মম নির্যাতনের অবসান ঘটে। ইমাম আহমাদ ২৪১ হিজরিতে (৮৫৫ সাল) ইন্তেকাল করার পূর্ব পর্যন্ত নিয়মিতভাবে বাগদাদে তাঁর পাঠদান অব্যাহত রাখেন।[২০]
হানবালি মাযহাবের গঠন
ইমাম আহমাদের মূল লক্ষ্য ছিল হাদীস সংগ্রহ, বর্ণনা ও তার ব্যাখ্যা প্রদান করা। তিনি ত্রিশ হাজারেরও বেশি হাদীসের একটি বিশাল সংকলন প্রস্তুত করেন যা মুসনাদ আহমাদ নামে পরিচিত। এ গ্রন্থ থেকে হাদীস বর্ণনা করাই ছিল তাঁর প্রধান শিক্ষাপদ্ধতি। পাশাপাশি তিনি সেসব হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সহাবিগণের বিভিন্ন মতামতও পর্যালোচনা করতেন। তারপর তিনি হাদীস কিংবা সিদ্ধান্তগুলোকে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করতেন। কোনো সমস্যা সমাধানে প্রাসঙ্গিক হাদীস কিংবা সহাবিদের কোনো মত পাওয়া না গেলেই কেবল তিনি নিজের মত প্রকাশ করতেন। সেক্ষেত্রেও তিনি ছাত্রদের তাঁর ব্যক্তিগত মত লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করতেন। ফলে, তাঁর মাযহাব তাঁর নিজ ছাত্রদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়নি; বরং সংরক্ষিত হয়েছে তাঁর ছাত্রদের ছাত্রদের মাধ্যমে।
হানবালি মাযহাবে আইনের উৎস ১. আল-কুর'আন পূর্বসূরী ইমামদের মতোই ইমাম আহমাদ ইবন হানবালের কাছেও মহা গ্রন্থ আল কুর'আন হলো আইনের প্রথম ও প্রশ্নাতীত উৎস। অন্য কথায়, তাঁর মাযহাবে সর্বক্ষেত্রে কুর'আনকে অন্য সবকিছুর উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
২. আস-সুন্নাহ আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মৌলিক উৎসগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নাবি -এর সুন্নাহ। হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর একমাত্র শর্ত ছিল যে, হাদীসটি মারফু' বা স্বয়ং নাবি থেকে বর্ণিত হতে হবে।
৩. সহাবিগণের ইজমা' ইমাম আহমাদ সহাবিগণের মতৈক্যকে আইনের মৌলিক উৎসগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থানে রেখেছেন। তবে, তিনি সহাবিগণের যুগের পর ইজমা'র দাবিকে ভুল বলেছেন। কারণ, পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই তাঁর মতে, সহাবিগণের যুগের পর কোনো বিষয়ে সত্যিকার অর্থে ইজমা' সংঘটিত হওয়া অসম্ভব।
৪. সহাবিদের ব্যক্তিগত মত কোন বিষয়ে সহাবিগণের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলে ইমাম মালিকের ন্যায় ইমাম আহমাদও সেসব মতের প্রত্যেকটিকে গুরুত্ব দিতেন। তাই এ মাযহাবের মধ্যে একই সমস্যার বহুমুখী সমাধান দেওয়ার ধারা পরিলক্ষিত হয়।
৫. দু'ঈফ হাদীস (দুর্বল হাদীস) কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে পূর্বের চারটি উৎসের কোথাও কোনো সমাধান না পাওয়া গেলে, ইমাম আহমাদ নিজস্ব কিয়াস ব্যবহারের চেয়ে একটি দুর্বল হাদীসের ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতেন। তবে, তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে, হাদীসটির দুর্বলতা বর্ণনাকারী ফাসিক্ (পাপাচারী) কিংবা কায্যাব (মিথ্যুক) হওয়ার কারণে হতে পারবে না।
৬. কিয়াস উল্লিখিত মূলনীতিগুলোর কোনটিই সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে সর্বশেষ উপায় হিসেবে ইমাম আহমাদ অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিয়াসের নীতি প্রয়োগ করতেন। পূর্বোক্ত মূলনীতিগুলোর মধ্য থেকে এক বা একাধিক মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি কিয়াসের মাধ্যমে একটি সমাধান বের করার চেষ্টা করতেন। ২১।
হানবালি মাযহাবের প্রধান ছাত্রবৃন্দ
ইমাম আহমাদের প্রধান ছাত্র ছিলেন তাঁর দুই পুত্র: সালিহ্ (মৃত্যু ২৬৫ হিজরি; ৮৭৩ সাল) ও 'আবদুল্লাহ (মৃত্যু ২৯০ হিজরি; ৯০৩ সাল)। তাঁর তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেছিলেন এমন বিখ্যাত হাদীস বিশারদের অন্যতম ছিলেন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থগুলোর সংকলকদ্বয় ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম। ২২।
হানবালি মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ
এ মাযহাবের অধিকাংশ অনুসারীই বসবাস করে ফিলিস্তিন ও সাউদি আরবে। মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেলেও সাউদি আরবে এ মাযহাবটি বেশ প্রভাব বিস্তার করে আছে। কারণ, সংস্কারবাদী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবন 'আবদুল-ওয়াহহাব হানবালি মাযহাবের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করেছেন, ফলে এটি অঘোষিতভাবে তার আন্দোলনের মাযহাবে পরিণত হয়। 'আবদুল-'আযীয ইবন সা'উদ আরব উপদ্বীপের বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে সাউদি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার পর তিনি হানবালি মাযহাবকে রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিণত করেন।
টিকাঃ
[২০] আল-মাদখাল, পৃ. ২০০।
[২১] আল-মাদখাল, পৃ. ২০২-২০৩।
[২২] তারীখ আল-মাজাহিব আল-ইসলামিয়্যাহ, খন্ড ২, পৃ. ৩৩৯-৩৪০।
📄 জাহিরি মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম দাউদ রহিমাহুল্লাহ (২০০-২৭০ হিজরি; ৮১৫- ৮৮৩ সাল)
২০০ হিজরিতে এ মাযহাবটির প্রতিষ্ঠাতা ইমাম দাউদ ইবন 'আলি কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমদিকে তিনি ইমাম শাফি'ই-র ছাত্রদের নিকট ফিক্হ অধ্যয়ন করেন। তবে পরবর্তীকালে হাদীস অধ্যয়নের প্রতি ঝুঁকে গিয়ে ইমাম আহমাদ ইবন হানবালের হাদীস শিক্ষাকেন্দ্রে যোগদান করে তাঁর তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেন। “কুর'আন একটি মু্হদাস বা নতুন অস্তিত্ব লাভকারী বস্তু এবং সেহেতু তা একটি সৃষ্টবস্তু”—এমন মত প্রকাশের কারণে ইমাম আহমাদের ক্লাস থেকে তাঁকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়। এরপর, কুর'আন ও সুন্নাহর মাতান বা মূল পাঠের সুস্পষ্ট ও আক্ষরিক অর্থভিত্তিক (জাহির) যুক্তিপদ্ধতির এক স্বতন্ত্র পন্থা তিনি অনুসরণ শুরু করেন। এ পদ্ধতির কারণে তাঁর মাযহাবের নাম দেওয়া হয় জাহিরি মাযহাব এবং তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন দাউদ আজ-জাহিরী নামে। ২৩।
জাহিরি মাযহাবে আইনের উৎস ১. আল-কুর'আন ও আস-সুন্নাহ
অন্যান্য ইমামদের ন্যায় ইমাম দাউদও মনে করতেন যে, কুর'আন হচ্ছে ইসলামি আইনের সর্বপ্রথম উৎস এবং এর পরই রয়েছে সুন্নাহ্র অবস্থান। তবে, তাঁর মতে সেগুলোর কেবল আক্ষরিক ব্যাখ্যাই আইনসম্মত। অর্থাৎ, যে নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য কুর'আন ও সুন্নাহর বিধিবিধানগুলো এসেছে কেবল সেই বিশেষ পরিস্থিতিতেই এগুলো প্রযোজ্য হবে।
২. সহাবিগণের ইজমা' ইমাম দাউদ সহাবিগণের ইজমা' কে আইনের উৎস হিসেবে গুরুত্ব দিতেন। তবে ইজমা'কে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর যুক্তি ছিল, বিষয়টি মূলত নাবি ﷺ-এর প্রতি ওয়াহয়ি করা হয়েছিল এবং সহাবাগণও তা জানতেন, তবে কোনো কারণে হয়তো তা হাদীস আকারে বর্ণিত হয়নি। আর কেবল এ ধরনের বিষয়েই তাঁদের মতৈক্য হয়েছে। তাই তিনি সহাবিগণের ইজমা'কে মানবীয় বুদ্ধি প্রয়োগ বা কিয়াস নির্ভর কোনো বিষয় মনে করতেন না।
৩. কিয়াস ইমাম দাউদ কুর'আন ও সুন্নাহর প্রয়োগকে আক্ষরিক অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। তাই, স্বভাবতই তিনি কিয়াসসহ সব ধরনের বুদ্ধিপ্রসূত সিদ্ধান্তের বৈধতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ২৪৷ তবে, কুর'আন ও সুন্নাহ থেকে আইন বের করার ক্ষেত্রে কিয়াসের পরিবর্তে তিনি মাফহুম বা "অনুধাবনকৃত অর্থ” নামে একটি নীতি প্রয়োগ করেছেন। অথচ তাঁর অনুসৃত এ নীতিটি ছিল কিয়াসেরই একটি ভিন্ন রূপ।২৫৷
মাযহাবটির বিলুপ্তির কারণ মূলত যে দুটি প্রধান কারণে জাহিরি মাযহাবের বিলুপ্তি ঘটেছিল তার একটি হলো, এই মাযহাবকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো বিখ্যাত কোনো বিশেষজ্ঞ ছিল না। আর অন্যটি হলো, জাহিরি মাযহাবের সীমিত পরিসর। বস্তুত, ইমাম দাউদের জীবদ্দশায়, এমনকি তাঁর মৃত্যুর পর দেড় শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের কোথাও এ মাযহাব প্রসার লাভ করতে পারেনি।
পরবর্তী সময়ে, যেসব বিশেষজ্ঞ কিয়াসের বৈধতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁদের সবাইকে ঢালাওভাবে জাহিরি উপাধি দেওয়া হয়েছে। অথচ তাঁরা হয়তো কেউই ইমাম দাউদ কিংবা তাঁর ছাত্রদের কারও কাছে কখনো অধ্যয়ন করেননি; এমনকি তাঁদের রচিত বই-পুস্তকও পড়েননি।
জাহিরি মাযহাবের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ব্যাক্তি ছিলেন 'আলি ইব্ন আহমাদ ইব্ন হাযম আল-আন্দালুসি (মৃত্যু ৪৫৬ হিজরি; ১০৭০ সাল) নামে এক স্পেনীয় মেধাবী বিশেষজ্ঞ। ইবন হাযম এ মাযহাবকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অসংখ্য জ্ঞানগর্ভ রচনার মাধ্যমে একে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলির অন্যতম হলো: উসুল আল-ফিক্হ-এর উপরে ইহকাম আল-আহকাম, ধর্মতত্ত্বের উপর আল-ফিসাল এবং ফিকহের উপর আল-মুহাল্লা। ইব্ন হাযমের নিরন্তর প্রচেষ্টার ফলে এ মাযহাবটি ইসলামি স্পেনে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। স্পেনে বিকশিত হয়ে এ মাযহাবটি উত্তর আফ্রিকার কিছু অঞ্চল ও অন্যান্য এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। চতুর্দশ শতকের শুরুর দিকে ইসলামি রাষ্ট্র ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এ মাযহাব স্পেনে প্রচলিত ছিল। আন্দালুসের মুসলিম রাষ্ট্রটির বিলুপ্তির সাথে সাথে এ মাযহাবটিও চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেবল পেছনে রেখে যায় কিছু মননশীল লেখনী যেগুলোর অধিকাংশ রচনা করেছিলেন ইব্ন হাযম নিজেই। [২৬]
টিকাঃ
[২৩] তারীখ তাশরী' আল-ইসলামি, পৃ. ১৮১-১৮২।
[২৪] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৬।
[২৫] জে.এইচ. ক্রেমার্স ও এইচ.এ.আর. গিব, শর্টার এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, (কর্নেল ইউনিভার্সিটি প্রেস, ইথাকা, নিউ ইয়র্ক), ১৯৫৩, পৃ. ২৬৬।
[২৬] তারীখ আল-মাজাহিব আল-ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৩৭৫-৪০৯।
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম দাউদ রহিমাহুল্লাহ (২০০-২৭০ হিজরি; ৮১৫- ৮৮৩ সাল)
২০০ হিজরিতে এ মাযহাবটির প্রতিষ্ঠাতা ইমাম দাউদ ইবন 'আলি কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমদিকে তিনি ইমাম শাফি'ই-র ছাত্রদের নিকট ফিক্হ অধ্যয়ন করেন। তবে পরবর্তীকালে হাদীস অধ্যয়নের প্রতি ঝুঁকে গিয়ে ইমাম আহমাদ ইবন হানবালের হাদীস শিক্ষাকেন্দ্রে যোগদান করে তাঁর তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেন। “কুর'আন একটি মু্হদাস বা নতুন অস্তিত্ব লাভকারী বস্তু এবং সেহেতু তা একটি সৃষ্টবস্তু”—এমন মত প্রকাশের কারণে ইমাম আহমাদের ক্লাস থেকে তাঁকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়। এরপর, কুর'আন ও সুন্নাহর মাতান বা মূল পাঠের সুস্পষ্ট ও আক্ষরিক অর্থভিত্তিক (জাহির) যুক্তিপদ্ধতির এক স্বতন্ত্র পন্থা তিনি অনুসরণ শুরু করেন। এ পদ্ধতির কারণে তাঁর মাযহাবের নাম দেওয়া হয় জাহিরি মাযহাব এবং তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন দাউদ আজ-জাহিরী নামে। ২৩।
জাহিরি মাযহাবে আইনের উৎস ১. আল-কুর'আন ও আস-সুন্নাহ
অন্যান্য ইমামদের ন্যায় ইমাম দাউদও মনে করতেন যে, কুর'আন হচ্ছে ইসলামি আইনের সর্বপ্রথম উৎস এবং এর পরই রয়েছে সুন্নাহ্র অবস্থান। তবে, তাঁর মতে সেগুলোর কেবল আক্ষরিক ব্যাখ্যাই আইনসম্মত। অর্থাৎ, যে নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য কুর'আন ও সুন্নাহর বিধিবিধানগুলো এসেছে কেবল সেই বিশেষ পরিস্থিতিতেই এগুলো প্রযোজ্য হবে।
২. সহাবিগণের ইজমা' ইমাম দাউদ সহাবিগণের ইজমা' কে আইনের উৎস হিসেবে গুরুত্ব দিতেন। তবে ইজমা'কে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর যুক্তি ছিল, বিষয়টি মূলত নাবি ﷺ-এর প্রতি ওয়াহয়ি করা হয়েছিল এবং সহাবাগণও তা জানতেন, তবে কোনো কারণে হয়তো তা হাদীস আকারে বর্ণিত হয়নি। আর কেবল এ ধরনের বিষয়েই তাঁদের মতৈক্য হয়েছে। তাই তিনি সহাবিগণের ইজমা'কে মানবীয় বুদ্ধি প্রয়োগ বা কিয়াস নির্ভর কোনো বিষয় মনে করতেন না।
৩. কিয়াস ইমাম দাউদ কুর'আন ও সুন্নাহর প্রয়োগকে আক্ষরিক অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। তাই, স্বভাবতই তিনি কিয়াসসহ সব ধরনের বুদ্ধিপ্রসূত সিদ্ধান্তের বৈধতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ২৪৷ তবে, কুর'আন ও সুন্নাহ থেকে আইন বের করার ক্ষেত্রে কিয়াসের পরিবর্তে তিনি মাফহুম বা "অনুধাবনকৃত অর্থ” নামে একটি নীতি প্রয়োগ করেছেন। অথচ তাঁর অনুসৃত এ নীতিটি ছিল কিয়াসেরই একটি ভিন্ন রূপ।২৫৷
মাযহাবটির বিলুপ্তির কারণ মূলত যে দুটি প্রধান কারণে জাহিরি মাযহাবের বিলুপ্তি ঘটেছিল তার একটি হলো, এই মাযহাবকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো বিখ্যাত কোনো বিশেষজ্ঞ ছিল না। আর অন্যটি হলো, জাহিরি মাযহাবের সীমিত পরিসর। বস্তুত, ইমাম দাউদের জীবদ্দশায়, এমনকি তাঁর মৃত্যুর পর দেড় শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের কোথাও এ মাযহাব প্রসার লাভ করতে পারেনি।
পরবর্তী সময়ে, যেসব বিশেষজ্ঞ কিয়াসের বৈধতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁদের সবাইকে ঢালাওভাবে জাহিরি উপাধি দেওয়া হয়েছে। অথচ তাঁরা হয়তো কেউই ইমাম দাউদ কিংবা তাঁর ছাত্রদের কারও কাছে কখনো অধ্যয়ন করেননি; এমনকি তাঁদের রচিত বই-পুস্তকও পড়েননি।
জাহিরি মাযহাবের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ব্যাক্তি ছিলেন 'আলি ইব্ন আহমাদ ইব্ন হাযম আল-আন্দালুসি (মৃত্যু ৪৫৬ হিজরি; ১০৭০ সাল) নামে এক স্পেনীয় মেধাবী বিশেষজ্ঞ। ইবন হাযম এ মাযহাবকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অসংখ্য জ্ঞানগর্ভ রচনার মাধ্যমে একে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলির অন্যতম হলো: উসুল আল-ফিক্হ-এর উপরে ইহকাম আল-আহকাম, ধর্মতত্ত্বের উপর আল-ফিসাল এবং ফিকহের উপর আল-মুহাল্লা। ইব্ন হাযমের নিরন্তর প্রচেষ্টার ফলে এ মাযহাবটি ইসলামি স্পেনে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। স্পেনে বিকশিত হয়ে এ মাযহাবটি উত্তর আফ্রিকার কিছু অঞ্চল ও অন্যান্য এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। চতুর্দশ শতকের শুরুর দিকে ইসলামি রাষ্ট্র ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এ মাযহাব স্পেনে প্রচলিত ছিল। আন্দালুসের মুসলিম রাষ্ট্রটির বিলুপ্তির সাথে সাথে এ মাযহাবটিও চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেবল পেছনে রেখে যায় কিছু মননশীল লেখনী যেগুলোর অধিকাংশ রচনা করেছিলেন ইব্ন হাযম নিজেই। [২৬]
টিকাঃ
[২৩] তারীখ তাশরী' আল-ইসলামি, পৃ. ১৮১-১৮২।
[২৪] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৬।
[২৫] জে.এইচ. ক্রেমার্স ও এইচ.এ.আর. গিব, শর্টার এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, (কর্নেল ইউনিভার্সিটি প্রেস, ইথাকা, নিউ ইয়র্ক), ১৯৫৩, পৃ. ২৬৬।
[২৬] তারীখ আল-মাজাহিব আল-ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৩৭৫-৪০৯।
📄 জারীরি মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আত-তাবারি রহিমাহুল্লাহ (২২৪-৩১০ হিজরি; ৮৩৯-৯২৩ সাল)
এ মাযহাবটি প্রতিষ্ঠা করেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবন জারীর ইবন ইয়াযীদ আত-তবারি। তিনি ২২৪ হিজরিতে ইরানের তাবারিস্তান প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। হাদীস, ফিক্হ ও ইতিহাস শাস্ত্রে তিনি ব্যাপক ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে ইমাম আবু হানীফাহ, ইমাম মালিক, শাফি'ই ও অন্যান্য আইনজ্ঞদের মাযহাবগুলো অধ্যয়ন করেন। মিশর থেকে ফেরার পর প্রথম দশ বছর তিনি কঠোরভাবে শাফি'ই মাযহাব অনুসরণ করেন। তারপর তিনি তাঁর নিজের মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অনুসারীরা মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতার নামানুসারে নিজেদের জারীরি হিসেবে পরিচয় দিতো। কিন্তু, তাঁর মাযহাব তুলনামূলকভাবে অতি দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ইবন জারীর তাঁর রচিত জাঁমি' আল-বায়ান নামক কুর'আনের তাফসীর গ্রন্থের জন্য সর্বাধিক খ্যাত। এটি তাফসীর আত-তবারি নামেই অধিক পরিচিতি লাভ করেছে। ইতিহাসের উপর তাঁর লিখিত একটি অনবদ্য গ্রন্থ হলো তারীখ আর-রুসুল ওয়াল মুলুক। এই গ্রন্থটি তারীখ আত-তবারি হিসেবে পরিচিত এবং এটিও তাঁর তাফসীর গ্রন্থের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত।।২৭।
টিকাঃ
[২৭] তারীখ তাশরী' আল-ইসলামি, পৃ. ১৮২-১৮৩।
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আত-তাবারি রহিমাহুল্লাহ (২২৪-৩১০ হিজরি; ৮৩৯-৯২৩ সাল)
এ মাযহাবটি প্রতিষ্ঠা করেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবন জারীর ইবন ইয়াযীদ আত-তবারি। তিনি ২২৪ হিজরিতে ইরানের তাবারিস্তান প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। হাদীস, ফিক্হ ও ইতিহাস শাস্ত্রে তিনি ব্যাপক ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে ইমাম আবু হানীফাহ, ইমাম মালিক, শাফি'ই ও অন্যান্য আইনজ্ঞদের মাযহাবগুলো অধ্যয়ন করেন। মিশর থেকে ফেরার পর প্রথম দশ বছর তিনি কঠোরভাবে শাফি'ই মাযহাব অনুসরণ করেন। তারপর তিনি তাঁর নিজের মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অনুসারীরা মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতার নামানুসারে নিজেদের জারীরি হিসেবে পরিচয় দিতো। কিন্তু, তাঁর মাযহাব তুলনামূলকভাবে অতি দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ইবন জারীর তাঁর রচিত জাঁমি' আল-বায়ান নামক কুর'আনের তাফসীর গ্রন্থের জন্য সর্বাধিক খ্যাত। এটি তাফসীর আত-তবারি নামেই অধিক পরিচিতি লাভ করেছে। ইতিহাসের উপর তাঁর লিখিত একটি অনবদ্য গ্রন্থ হলো তারীখ আর-রুসুল ওয়াল মুলুক। এই গ্রন্থটি তারীখ আত-তবারি হিসেবে পরিচিত এবং এটিও তাঁর তাফসীর গ্রন্থের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত।।২৭।
টিকাঃ
[২৭] তারীখ তাশরী' আল-ইসলামি, পৃ. ১৮২-১৮৩।
📄 অধ্যায় সারাংশ
১ প্রধান মাযহাবগুলো ছিল হানাফি, মালিকি, শাঁফি'ই, হানবালি ও যায়দি মাযহাব। এ মাযহাবগুলো প্রধানত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রথম প্রজ- ন্মের কিছু অসাধারণ ছাত্রের কারণে ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল।
২ কম প্রসিদ্ধ মাযহাবগুলোর মধ্যে ছিল আওযা'ই মাযহাব, লাইসি মাযহাব, সাওরি মাযহাব, জাহিরি মাযহাব ও জারীরি মাযহাব। রাজনৈ- তিক কারণ কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মাযহাবকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রদের ব্যর্থতার কারণে এ মাযহাবগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়।
৩ ইসলামি আইনের যে সকল উৎসের ব্যাপারে প্রধান মাযহাবগুলোর মধ্যে মতৈক্য লক্ষ্য করা যায় সেগুলো হলো: আল-কুর'আন, আস-সুন্নাহ, সহাবিগণের ইজমা' ও কিয়াস।
৪ সুন্নাহকে ইসলামি আইনের একটি প্রাথমিক উৎস হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সবগুলো মাযহাবই কোনো না কোনো শর্ত জুড়ে দিয়েছে। ৪. ক. হানাফি মাযহাবের শর্ত হলো, হাদীসটি ব্যাপকভাবে পরিচিত হতে হবে। ৪.খ. মালিকি মাযহাবের শর্ত হলো, হাদীসটি মাদীনাবাসীদের ইজমা'র সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। ৪.গ. শাফি'ই মাযহাব হাদীসটি সহীহ হওয়ার উপর জোর দিয়েছে। ৪.ঘ. হানবালি মাযহাবের একমাত্র শর্ত হলো, হাদীসটির বর্ণনাকারী- দের ধারা নাবি পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে এবং তা জাল হতে পারবে না। ফলে, নির্ভরযোগ্যতা সন্দেহ রয়েছে এমন হাদীসকেও হানবালি মাযহাবে সুন্নাহর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
৫ ইসলামি আইনের বিতর্কিত উৎসগুলো হলো:
৫.ক. হানাফি মাযহাবে সমর্থিত ইসতিহসান ও বিশেষজ্ঞদের ইজমা'।
৫.খ. মালিকি মাযহাবে অনুসৃত ইসতিস্লাহ্, মাদীনাবাসীদের ইজমা' ও তাঁদের প্রথাগুলো।
৫.গ. হানাফি ও মালিকি মাযহাবে সমর্থিত 'উরফ (প্রথা)।
৫.ঘ. হানবালি মাযহাবে সমর্থিত দুর্বল হাদীস।
৫.ঙ. যায়দি মাযহাবে সমর্থিত আকওয়াল 'আলি অর্থাৎ চতুর্থ খলীফা 'আলির বক্তব্য ও সিদ্ধান্তগুলো।
১ প্রধান মাযহাবগুলো ছিল হানাফি, মালিকি, শাঁফি'ই, হানবালি ও যায়দি মাযহাব। এ মাযহাবগুলো প্রধানত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রথম প্রজ- ন্মের কিছু অসাধারণ ছাত্রের কারণে ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল।
২ কম প্রসিদ্ধ মাযহাবগুলোর মধ্যে ছিল আওযা'ই মাযহাব, লাইসি মাযহাব, সাওরি মাযহাব, জাহিরি মাযহাব ও জারীরি মাযহাব। রাজনৈ- তিক কারণ কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মাযহাবকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রদের ব্যর্থতার কারণে এ মাযহাবগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়।
৩ ইসলামি আইনের যে সকল উৎসের ব্যাপারে প্রধান মাযহাবগুলোর মধ্যে মতৈক্য লক্ষ্য করা যায় সেগুলো হলো: আল-কুর'আন, আস-সুন্নাহ, সহাবিগণের ইজমা' ও কিয়াস।
৪ সুন্নাহকে ইসলামি আইনের একটি প্রাথমিক উৎস হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সবগুলো মাযহাবই কোনো না কোনো শর্ত জুড়ে দিয়েছে। ৪. ক. হানাফি মাযহাবের শর্ত হলো, হাদীসটি ব্যাপকভাবে পরিচিত হতে হবে। ৪.খ. মালিকি মাযহাবের শর্ত হলো, হাদীসটি মাদীনাবাসীদের ইজমা'র সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। ৪.গ. শাফি'ই মাযহাব হাদীসটি সহীহ হওয়ার উপর জোর দিয়েছে। ৪.ঘ. হানবালি মাযহাবের একমাত্র শর্ত হলো, হাদীসটির বর্ণনাকারী- দের ধারা নাবি পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে এবং তা জাল হতে পারবে না। ফলে, নির্ভরযোগ্যতা সন্দেহ রয়েছে এমন হাদীসকেও হানবালি মাযহাবে সুন্নাহর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
৫ ইসলামি আইনের বিতর্কিত উৎসগুলো হলো:
৫.ক. হানাফি মাযহাবে সমর্থিত ইসতিহসান ও বিশেষজ্ঞদের ইজমা'।
৫.খ. মালিকি মাযহাবে অনুসৃত ইসতিস্লাহ্, মাদীনাবাসীদের ইজমা' ও তাঁদের প্রথাগুলো।
৫.গ. হানাফি ও মালিকি মাযহাবে সমর্থিত 'উরফ (প্রথা)।
৫.ঘ. হানবালি মাযহাবে সমর্থিত দুর্বল হাদীস।
৫.ঙ. যায়দি মাযহাবে সমর্থিত আকওয়াল 'আলি অর্থাৎ চতুর্থ খলীফা 'আলির বক্তব্য ও সিদ্ধান্তগুলো।