📄 লাইসি মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আল-লাইস রহিমাহুল্লাহ (৯৭-১৭৫ হিজরি; ৭১৬-৭৯১ সাল)
ইমাম লাইস ইবন সা'দের নামানুসারে এ মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে। ৯৭ হিজরিতে পারস্য বংশোদ্ভূত পিতা-মাতার ঘরে ইমাম আল- লাইস মিশরে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন ইসলামি জ্ঞানের সব কটি শাখায় ব্যাপক অধ্যয়নের পর তিনি মিশরের প্রধানতম বিশেষজ্ঞ 'আলিমে পরিণত হন। তিনি ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম মালিকের সমসাময়িক ছিলেন। ইমাম মালিকের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে ইসলামি আইনের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি মত বিনিময় করেছেন। যেমন, ইমাম মালিক মাদীনার প্রthaকে ইসলামি আইনের একটি স্বতন্ত্র উৎস হিসেবে গ্রহণ করতেন, কিন্তু ইমাম আল-লাইস এ মতের বিপক্ষে চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাঁর যুক্তি উপস্থাপন করতেন।
মাযহাবটি বিলুপ্তির কারণ
১৭৫ হিজরিতে ইমাম লাইসের ইন্তেকালের কিছুদিন পরই নিম্মলিখিত কারণে এ মাযহাবটির বিলুপ্তি ঘটে:
১. তাঁর আইনগত মতামত, ব্যাখ্যা ও সেগুলোর সমর্থনে কুর'আন, সুন্নাহ ও সহীবিগণের মতামত থেকে সংগৃহীত প্রমাণগুলোকে তিনি নিজে লিপিবদ্ধ করেননি। এমনকি তাঁর ছাত্রদেরকেও তা লিপিবদ্ধ করার কোনো নির্দেশ দেননি। ফলে, তুলনামূলক ফিকহশাস্ত্রের আদি গ্রন্থগুলোতে কিছু উদ্ধৃতি ছাড়া তাঁর মাযহাবের তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই।
২. ইমাম লাইসের ছাত্রের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাছাড়া তাঁদের কেউই বিখ্যাত আইনজ্ঞে পরিণত হননি। আর তাই ইমাম লাইসের মাযহাবকে জনপ্রিয় করে তোলার মতো কোনো প্রভাব সৃষ্টিকারী অবস্থানেও তারা ছিলেন না।
৩. ইমাম লাইসের ইন্তেকালের পরেই ফিকহশাস্ত্রে অন্যতম অসাধারণ বিশেষজ্ঞ ইমাম শাফি'ই মিশরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর মাযহাব ইমাম লাইসের মাযহাবকে প্রতিস্থাপিত করে দেয়।
উল্লেখ্য যে, ইমাম শাফি'ই স্বয়ং ইমাম মালিকের কাছে ও ইমাম লাইসের ছাত্রদের কাছে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি ইমাম লাইসের ব্যাপারে এমন কথাও বলেছিলেন যে, তিনি ইমাম মালিকের চেয়ে বড় আইনজ্ঞ ছিলেন; তবে তাঁর ছাত্ররা তাঁকে অবহেলা করেছে।[১৪]
টিকাঃ
[১৪] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৫।
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আল-লাইস রহিমাহুল্লাহ (৯৭-১৭৫ হিজরি; ৭১৬-৭৯১ সাল)
ইমাম লাইস ইবন সা'দের নামানুসারে এ মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে। ৯৭ হিজরিতে পারস্য বংশোদ্ভূত পিতা-মাতার ঘরে ইমাম আল- লাইস মিশরে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন ইসলামি জ্ঞানের সব কটি শাখায় ব্যাপক অধ্যয়নের পর তিনি মিশরের প্রধানতম বিশেষজ্ঞ 'আলিমে পরিণত হন। তিনি ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম মালিকের সমসাময়িক ছিলেন। ইমাম মালিকের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে ইসলামি আইনের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি মত বিনিময় করেছেন। যেমন, ইমাম মালিক মাদীনার প্রthaকে ইসলামি আইনের একটি স্বতন্ত্র উৎস হিসেবে গ্রহণ করতেন, কিন্তু ইমাম আল-লাইস এ মতের বিপক্ষে চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাঁর যুক্তি উপস্থাপন করতেন।
মাযহাবটি বিলুপ্তির কারণ
১৭৫ হিজরিতে ইমাম লাইসের ইন্তেকালের কিছুদিন পরই নিম্মলিখিত কারণে এ মাযহাবটির বিলুপ্তি ঘটে:
১. তাঁর আইনগত মতামত, ব্যাখ্যা ও সেগুলোর সমর্থনে কুর'আন, সুন্নাহ ও সহীবিগণের মতামত থেকে সংগৃহীত প্রমাণগুলোকে তিনি নিজে লিপিবদ্ধ করেননি। এমনকি তাঁর ছাত্রদেরকেও তা লিপিবদ্ধ করার কোনো নির্দেশ দেননি। ফলে, তুলনামূলক ফিকহশাস্ত্রের আদি গ্রন্থগুলোতে কিছু উদ্ধৃতি ছাড়া তাঁর মাযহাবের তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই।
২. ইমাম লাইসের ছাত্রের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাছাড়া তাঁদের কেউই বিখ্যাত আইনজ্ঞে পরিণত হননি। আর তাই ইমাম লাইসের মাযহাবকে জনপ্রিয় করে তোলার মতো কোনো প্রভাব সৃষ্টিকারী অবস্থানেও তারা ছিলেন না।
৩. ইমাম লাইসের ইন্তেকালের পরেই ফিকহশাস্ত্রে অন্যতম অসাধারণ বিশেষজ্ঞ ইমাম শাফি'ই মিশরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর মাযহাব ইমাম লাইসের মাযহাবকে প্রতিস্থাপিত করে দেয়।
উল্লেখ্য যে, ইমাম শাফি'ই স্বয়ং ইমাম মালিকের কাছে ও ইমাম লাইসের ছাত্রদের কাছে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি ইমাম লাইসের ব্যাপারে এমন কথাও বলেছিলেন যে, তিনি ইমাম মালিকের চেয়ে বড় আইনজ্ঞ ছিলেন; তবে তাঁর ছাত্ররা তাঁকে অবহেলা করেছে।[১৪]
টিকাঃ
[১৪] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৫।
📄 সাওরি মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম সাওরি রহিমাহুল্লাহ (৯৭-১৬১ হিজরি; ৭১৯- ৭৭৭ সাল)
ইমাম সুফয়ান সাওরি ৯৭ হিজরিতে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। হাদীস ও ফিকহের ব্যাপক অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি কুফার প্রধানতম বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। অনেক ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার অনুরূপ মত পোষণ করলেও তিনি কিয়াস ও ইসতিহসান নীতির বিরোধী ছিলেন।
ইমাম সুফয়ান সাওরির সাথে 'আব্বাসি রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের বেশ কয়েকবার বাদানুবাদ হয়। কারণ, তিনি ছিলেন স্পষ্টবাদী প্রকৃতির মানুষ এবং শারী'আহ পরিপন্থী রাষ্ট্রীয় নীতিতে সমর্থন করার প্রস্তাবকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। খলীফা আল-মানসুর (শাসনকাল ১৩৬-১৫৮ হিজরি; ৭৫৯-৭৪৪ সাল) চিঠির মাধ্যমে ইমাম আস্-সাওরিকে কুফার বিচারকের পদ গ্রহণ করার অনুরোধ জানান। তবে এতে শর্ত দেওয়া হয় যে, তিনি রাষ্ট্রীয় নীতির সাথে সাংঘর্ষিক কোনো রায় কিংবা মতামত দেবেন না। চিঠিটি পাওয়ার পর ইমাম সাওরি তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বিরক্তির সাথে টাইগ্রিস নদীতে নিক্ষেপ করেন। কিন্তু, এর ফলে শিক্ষকতা ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য তিনি পলায়ন করতে বাধ্য হন। ১৬০ হিজরিতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করেই ছিলেন।
মাযহাবটির বিলুপ্তির কারণ
এই মাযহাবটি বিলুপ্তির মূল কারণগুলো ছিল:
১. ইমাম সুফ্যান আস-সাওরি জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আত্মগোপন করে কাটিয়েছেন। তাই তাঁর ছাত্রের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না যারা পরবর্তী সময়ে জ্ঞানী মহলে তাঁর মতামত ছড়িয়ে দিতে পারত।
২. তিনি হাদীস ও তার ব্যাখ্যার এক বিশাল সংকলন প্রস্তুত করেছিলেন। তবে, তিনি তাঁর প্রধান ছাত্র 'আম্মার ইবন সাইফকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁর সকল লেখা যেন মুছে ফেলা হয়, আর কোনোটা মুছে ফেলা সম্ভব না হলে তা যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। 'আম্মার কর্তব্যপরায়ণতার সাথে নিজ শিক্ষকের সব লেখা নষ্ট করে ফেলেন। তবে ইমাম সাওরির অনেক মতামতই অন্যান্য ইমামের ছাত্ররা সংকলন করেছেন। ফলে, সেগুলো আজও অগোছালোভাবে বিভিন্ন গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে।॥১৫।
টিকাঃ
[১৫] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৬-২০৭।
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম সাওরি রহিমাহুল্লাহ (৯৭-১৬১ হিজরি; ৭১৯- ৭৭৭ সাল)
ইমাম সুফয়ান সাওরি ৯৭ হিজরিতে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। হাদীস ও ফিকহের ব্যাপক অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি কুফার প্রধানতম বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। অনেক ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার অনুরূপ মত পোষণ করলেও তিনি কিয়াস ও ইসতিহসান নীতির বিরোধী ছিলেন।
ইমাম সুফয়ান সাওরির সাথে 'আব্বাসি রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের বেশ কয়েকবার বাদানুবাদ হয়। কারণ, তিনি ছিলেন স্পষ্টবাদী প্রকৃতির মানুষ এবং শারী'আহ পরিপন্থী রাষ্ট্রীয় নীতিতে সমর্থন করার প্রস্তাবকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। খলীফা আল-মানসুর (শাসনকাল ১৩৬-১৫৮ হিজরি; ৭৫৯-৭৪৪ সাল) চিঠির মাধ্যমে ইমাম আস্-সাওরিকে কুফার বিচারকের পদ গ্রহণ করার অনুরোধ জানান। তবে এতে শর্ত দেওয়া হয় যে, তিনি রাষ্ট্রীয় নীতির সাথে সাংঘর্ষিক কোনো রায় কিংবা মতামত দেবেন না। চিঠিটি পাওয়ার পর ইমাম সাওরি তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বিরক্তির সাথে টাইগ্রিস নদীতে নিক্ষেপ করেন। কিন্তু, এর ফলে শিক্ষকতা ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য তিনি পলায়ন করতে বাধ্য হন। ১৬০ হিজরিতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করেই ছিলেন।
মাযহাবটির বিলুপ্তির কারণ
এই মাযহাবটি বিলুপ্তির মূল কারণগুলো ছিল:
১. ইমাম সুফ্যান আস-সাওরি জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আত্মগোপন করে কাটিয়েছেন। তাই তাঁর ছাত্রের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না যারা পরবর্তী সময়ে জ্ঞানী মহলে তাঁর মতামত ছড়িয়ে দিতে পারত।
২. তিনি হাদীস ও তার ব্যাখ্যার এক বিশাল সংকলন প্রস্তুত করেছিলেন। তবে, তিনি তাঁর প্রধান ছাত্র 'আম্মার ইবন সাইফকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁর সকল লেখা যেন মুছে ফেলা হয়, আর কোনোটা মুছে ফেলা সম্ভব না হলে তা যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। 'আম্মার কর্তব্যপরায়ণতার সাথে নিজ শিক্ষকের সব লেখা নষ্ট করে ফেলেন। তবে ইমাম সাওরির অনেক মতামতই অন্যান্য ইমামের ছাত্ররা সংকলন করেছেন। ফলে, সেগুলো আজও অগোছালোভাবে বিভিন্ন গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে।॥১৫।
টিকাঃ
[১৫] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৬-২০৭।
📄 শাফি‘ই মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম শাফি'ই রহিমাহুল্লাহ (১৫০-২০৪ হিজরি; ৭৬৯-৮২০ সাল)
মুহাম্মাদ ইব্ন ইদরীস শাফি'ইর নামানুসারে এই মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে। তিনি ১৫০ হিজরিতে তদানীন্তন শাম এলাকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের গাজা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে ইমাম মালিকের তত্ত্বাবধানে ফিকহ ও হাদীস অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে তিনি বাল্য বয়সেই মাদীনাহ গমন করেন। তিনি ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা' এমনভাবে মুখস্থ করেছিলেন যে, তাঁকে স্মৃতি থেকে হুবহু তা পাঠ করে শুনিয়ে দিতে পারতেন।
১৭৯ হিজরিতে ইমাম মালিকের মৃত্যু পর্যন্ত ইমাম শাফি'ই তাঁর তত্ত্বাবধানেই থেকে যান। তারপর তিনি ইয়েমেনে গিয়ে শিক্ষাদান শুরু করেন। ১৮৯ হিজরিতে তাঁর বিরুদ্ধে শী'আহ বিশ্বাসের প্রতি ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। তখন তাঁকে ইয়েমেন থেকে গ্রেফতার করে ইরাকে 'আব্বাসি খলীফা হারুন আর-রাশীদের (শাসনকাল ১৭০-১৯৩ হিজরি; ৭৮৬-৮০৯ সাল) কাছে হাজির করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে তিনি তাঁর 'আকীদা-বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। পরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এরপর ইমাম শাফি'ই ইরাকেই থেকে যান এবং ইমাম আবু হানীফাহর বিখ্যাত ছাত্র ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানের তত্ত্বাবধানে কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীকালে, ইমাম লাইসের নিকট থেকে জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে তিনি মিশরে গমন করেন। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখেন ইমাম আল-লাইস ইতিমধ্যেই ইন্তেকাল করেছেন। পরে অবশ্য তিনি ইমাম লাইসের ছাত্রদের নিকট থেকে তাঁর মাযহাব অধ্যয়ন করতে সক্ষম হন। ইমাম শাফি'ই বাকি জীবন মিশরেই কাটিয়ে দেন। তিনি ২০৪ হিজরিতে খলীফা আল-মামুনের (শাসনকাল ১৯৭-২১৭ হিজরি; ৮১৩-৮৩২ সাল) শাসনামলে ইন্তেকাল করেন।১৬।
শাফি'ই মাযহাবের গঠন
ইমাম শাফি'ই হিজাযের মালিকি ফিকহকে ইরাকের হানাফি ফিকহের সাথে সমন্বিত করে একটি নতুন মাযহাব তৈরি করেন। এরপর তিনি আল-হুজ্জাহ নামক গ্রন্থাকারে নিজ ছাত্রদের সামনে তা উপস্থাপন করেন। এ গ্রন্থটির শ্রুতলিখনের কাজ সম্পন্ন হয় ১৯৪ হিজরিতে (৮১০ সাল) ইরাকে। তাঁর কিছু ছাত্র।১৭। গ্রন্থটিকে মুখস্থ করে অন্যদের কাছে বর্ণনা করেছেন। তাঁর এই গ্রন্থ ও তাঁর জ্ঞানচর্চার এ কালকে আল-মাযহাব আল-কাদীম বা পুরাতন মাযহাব নামে অভিহিত করা হয়।
মিশরে পৌঁছানোর পর তাঁর জ্ঞানচর্চার নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছিল। সেখানে তিনি ইমাম লাইসের মাযহাব পুরোপুরি আত্মস্থ করে আল-উম্ম নামে আরেকটি গ্রন্থের আকারে তাঁর ছাত্রদের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর এ গ্রন্থ ও জ্ঞানচর্চার এই কালকে মাযহাব আল-জাদীদ বা নতুন মাযহাব নামে অভিহিত করা হয়। সম্পূর্ণ নতুন কিছু হাদীস ও আইনি যুক্তির সাথে পরিচিত হয়ে তিনি তাঁর পূর্বের অনেক সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করেছেন। ইমাম শাফি'ই-ই প্রথম ফিক্হ শাস্ত্রের মৌলিক নীতিমালাকে সুশৃংখলভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর আর-রিসালাহ নামক গ্রন্থে তিনি এ সকল নীতি আলোচনা করেছেন।
শাফি'ই মাযহাবে আইনের উৎস ১. আল-কুর'আন
ইসলামি আইনের উৎসগুলোর মধ্যে কুর'আনের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে ইমাম শাফি'ইও পূর্বের ইমামদের সাথে একমত পোষণ করেছেন। অন্য ইমামদের মতো তিনিও কুর'আনের উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছেন। তবে, কুর'আনের গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি যে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছিলেন তার উপরও অনেক সময় নির্ভর করতেন।
২. সুন্নাহ
ইমাম শাফি'ই হাদীস গ্রহণের জন্য কেবল একটি শর্ত আরোপ করেছেন। তা হলো হাদীসটিকে অবশ্যই সহীহ হতে হবে। ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম মালিকের আরোপিত অন্য সকল শর্তকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। হাদীস শাস্ত্রে বিশেষ অবদান রাখার কারণেও তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন।
৩. ইজমা'
বেশ কিছু বিষয়ে আদৌ ইজমা' সংঘটিত হয়েছিল কি না তা নিয়ে ইমাম শাফি'ই-র যথেষ্ট সংশয় ছিল। তবে, অল্প যে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইজমা' হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে জানা গেছে—তাঁর মতে সেগুলোকে অবশ্যই ইসলামি আইনের তৃতীয় প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৪. সহাবিদের ব্যক্তিগত মত
ইমাম শাফি'ই সহাবিদের ব্যক্তিগত মতামতকে এই শর্তে গ্রহণ করছেন যে, সেগুলো পরস্পরবিরোধী হতে পারবে না। কোনো আইনগত বিষয়ে সহাবিগণের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে ইমাম আবু হানীফাহর মতো তিনিও মূল উৎস কুর'আন ও সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী মতকে বেছে নিয়ে বাকিগুলোকে পরিত্যাগ করতেন।
৫. কিয়াস ইমাম শাফি'ঈ-র মতে, উল্লিখিত উৎসগুলো থেকে আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিয়াস একটি বৈধ পদ্ধতি। তবে, তিনি এটিকে গুরুত্বের ক্রমধারায় শেষের দিকে স্থান দিয়েছেন। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত মতকে তিনি সাহাবিগণের মতামতের চেয়ে সবসময় কম গুরুত্ব দিতেন।
৬. ইসতিস্হাব ইমাম শাফি'ঈ ইমাম আবু হানীফাহ ইসতিহসান ও ইমাম মালিকের ইসতিসলাহ্—উভয় নীতিকেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। এগুলোকে তিনি এক প্রকার বিদ'আত মনে করতেন। তাঁর মতে, এগুলো এমন সব ক্ষেত্রে মানবীয় বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ যেখানে পূর্ব থেকেই ওয়াহয়ির আইন বিদ্যমান। তবে, একই রকম সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ইমাম শাফি'ঈ ইসতিহসান ও ইসতিসলাহ্-এর মতোই একটি নীতি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি এ নীতির নাম দিয়েছেন ইসতিসহাব। [১৮] আক্ষরিকভাবে ইসতিসহাব-এর অর্থ হলো সংযোগ খুঁজে বের করা। কিন্তু, আইনের পরিভাষায় এ শব্দটি দ্বারা পূর্বের কোনো পরিস্থিতির সাথে নতুন পরিস্থিতির সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে ফিকহি আইন বের করে আনার পদ্ধতিকে বোঝায়। এ নীতিটির ভিত্তি হলো, কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য আইন ততক্ষণই বহাল থাকবে, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি কোনো ব্যক্তির দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তার জীবিত বা মৃত হওয়া নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাহলে ইসতিসহাব নীতি অনুযায়ী, সে নিশ্চিতরূপে জীবিত থাকলে যেসকল নিয়মকানুন প্রযোজ্য হতো সেগুলোর সবকিছুই বলবৎ থাকবে।
শাফি'ই মাযহাবের প্রধান ছাত্র
যে সকল ছাত্র আজীবন ইমাম শাফি'ই-র মাযহাব অনুসরণ করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হলেন, ইমাম আল-মুযানি, আর-রাবী' ও ইউসুফ ইব্ন ইয়াহইয়া প্রমুখ।
ইমাম আল-মুযানি (১৭৫-২৬২ হিজরি; ৭৯১-৮৭৬ সাল) তাঁর পুরো নাম হলো ইসমা'ঈল ইব্ন ইয়াহ্ইয়া আল-মুযানি। ইমাম শাফি'ই-র মিশরে অবস্থানকালের পুরো সময় জুড়ে আল-মুযানি তাঁর সঙ্গী ছিলেন। তিনি শাফি'ই ফিক্হের উপর একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করার কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন। পরবর্তীকালে মুখতাসার আল-মুযানি শিরোনামে তিনি গ্রন্থটিকে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করেন। তাঁর রচিত এই গ্রন্থটিই পরবর্তীকালে শাফি'ই মাযহাবের সর্বাধিক পঠিত ফিক্হ গ্রন্থে পরিণত হয়।
আর-রাবী' মারাদি (১৭৪-২৫৯ হিজরি; ৭৯০-৮৭৩ সাল) আর-রাবী' মারাদি ইমাম শাফি'ই-র গ্রন্থ আল-উম্ম-এর প্রধান বর্ণনাকারী হিসেবে খ্যাত। তিনি আর-রিসালাহ ও অন্যান্য গ্রন্থের পাশাপাশি ইমাম শাফি'ই-র জীবদ্দশায় উক্ত গ্রন্থটির সংকলন সম্পন্ন করেন।
ইউসুফ ইবন ইয়াহ্ইয়া বুয়াইতি ইউসুফ ইব্ন ইয়াহ্ইয়া শাফি'ই মাযহাবের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ইমাম শাফি'ই-র স্থলাভিষিক্ত হন। সে সময়ে কুর'আন আল্লাহর সৃষ্টি বা সৃষ্ট বস্তু—মু'তাযিলি এই দর্শনকে রাষ্ট্র সমর্থন প্রদান করে। কিন্তু এ ভ্রান্ত দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে এই বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞকে বন্দি অবস্থায় নির্মম নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়। ১৯৷
শাফি'ই মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ শাফি'ই মাযহাবের অনুসারীবৃন্দের বেশিরভাগই বসবাস করেন মিশর, দক্ষিণ আরব (ইয়েমেন, হাদরামাওত), শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, পূর্ব আফ্রিকা (কেনিয়া, তানজানিয়া) ও দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনামে।
টিকাঃ
[১৬] আল-মাদখাল, পৃ. ১৯২।
[১৭] তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হানবালি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ ইবন হানবাল ও আবু সাওর মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু সাওর।
[১৮] আল-মাদখাল, পৃ. ১৯৫-১৯৬।
[১৯] বোযিনা গাজানী স্প্রেফেস্কা (Bozena Gajanee Stryzewska), তারীখ আত-তাশরী' আল-ইসলামি, (বৈরুত, লেবানন, দাঁর আল-আঁফাঁক আল-জাদীদাহ), প্রথম সংস্করণ, ১৯৮০, পৃ. ১৭৫-১৭৬।
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম শাফি'ই রহিমাহুল্লাহ (১৫০-২০৪ হিজরি; ৭৬৯-৮২০ সাল)
মুহাম্মাদ ইব্ন ইদরীস শাফি'ইর নামানুসারে এই মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে। তিনি ১৫০ হিজরিতে তদানীন্তন শাম এলাকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের গাজা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে ইমাম মালিকের তত্ত্বাবধানে ফিকহ ও হাদীস অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে তিনি বাল্য বয়সেই মাদীনাহ গমন করেন। তিনি ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা' এমনভাবে মুখস্থ করেছিলেন যে, তাঁকে স্মৃতি থেকে হুবহু তা পাঠ করে শুনিয়ে দিতে পারতেন।
১৭৯ হিজরিতে ইমাম মালিকের মৃত্যু পর্যন্ত ইমাম শাফি'ই তাঁর তত্ত্বাবধানেই থেকে যান। তারপর তিনি ইয়েমেনে গিয়ে শিক্ষাদান শুরু করেন। ১৮৯ হিজরিতে তাঁর বিরুদ্ধে শী'আহ বিশ্বাসের প্রতি ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। তখন তাঁকে ইয়েমেন থেকে গ্রেফতার করে ইরাকে 'আব্বাসি খলীফা হারুন আর-রাশীদের (শাসনকাল ১৭০-১৯৩ হিজরি; ৭৮৬-৮০৯ সাল) কাছে হাজির করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে তিনি তাঁর 'আকীদা-বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। পরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এরপর ইমাম শাফি'ই ইরাকেই থেকে যান এবং ইমাম আবু হানীফাহর বিখ্যাত ছাত্র ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানের তত্ত্বাবধানে কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীকালে, ইমাম লাইসের নিকট থেকে জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে তিনি মিশরে গমন করেন। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখেন ইমাম আল-লাইস ইতিমধ্যেই ইন্তেকাল করেছেন। পরে অবশ্য তিনি ইমাম লাইসের ছাত্রদের নিকট থেকে তাঁর মাযহাব অধ্যয়ন করতে সক্ষম হন। ইমাম শাফি'ই বাকি জীবন মিশরেই কাটিয়ে দেন। তিনি ২০৪ হিজরিতে খলীফা আল-মামুনের (শাসনকাল ১৯৭-২১৭ হিজরি; ৮১৩-৮৩২ সাল) শাসনামলে ইন্তেকাল করেন।১৬।
শাফি'ই মাযহাবের গঠন
ইমাম শাফি'ই হিজাযের মালিকি ফিকহকে ইরাকের হানাফি ফিকহের সাথে সমন্বিত করে একটি নতুন মাযহাব তৈরি করেন। এরপর তিনি আল-হুজ্জাহ নামক গ্রন্থাকারে নিজ ছাত্রদের সামনে তা উপস্থাপন করেন। এ গ্রন্থটির শ্রুতলিখনের কাজ সম্পন্ন হয় ১৯৪ হিজরিতে (৮১০ সাল) ইরাকে। তাঁর কিছু ছাত্র।১৭। গ্রন্থটিকে মুখস্থ করে অন্যদের কাছে বর্ণনা করেছেন। তাঁর এই গ্রন্থ ও তাঁর জ্ঞানচর্চার এ কালকে আল-মাযহাব আল-কাদীম বা পুরাতন মাযহাব নামে অভিহিত করা হয়।
মিশরে পৌঁছানোর পর তাঁর জ্ঞানচর্চার নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছিল। সেখানে তিনি ইমাম লাইসের মাযহাব পুরোপুরি আত্মস্থ করে আল-উম্ম নামে আরেকটি গ্রন্থের আকারে তাঁর ছাত্রদের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর এ গ্রন্থ ও জ্ঞানচর্চার এই কালকে মাযহাব আল-জাদীদ বা নতুন মাযহাব নামে অভিহিত করা হয়। সম্পূর্ণ নতুন কিছু হাদীস ও আইনি যুক্তির সাথে পরিচিত হয়ে তিনি তাঁর পূর্বের অনেক সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করেছেন। ইমাম শাফি'ই-ই প্রথম ফিক্হ শাস্ত্রের মৌলিক নীতিমালাকে সুশৃংখলভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর আর-রিসালাহ নামক গ্রন্থে তিনি এ সকল নীতি আলোচনা করেছেন।
শাফি'ই মাযহাবে আইনের উৎস ১. আল-কুর'আন
ইসলামি আইনের উৎসগুলোর মধ্যে কুর'আনের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে ইমাম শাফি'ইও পূর্বের ইমামদের সাথে একমত পোষণ করেছেন। অন্য ইমামদের মতো তিনিও কুর'আনের উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছেন। তবে, কুর'আনের গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি যে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছিলেন তার উপরও অনেক সময় নির্ভর করতেন।
২. সুন্নাহ
ইমাম শাফি'ই হাদীস গ্রহণের জন্য কেবল একটি শর্ত আরোপ করেছেন। তা হলো হাদীসটিকে অবশ্যই সহীহ হতে হবে। ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম মালিকের আরোপিত অন্য সকল শর্তকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। হাদীস শাস্ত্রে বিশেষ অবদান রাখার কারণেও তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন।
৩. ইজমা'
বেশ কিছু বিষয়ে আদৌ ইজমা' সংঘটিত হয়েছিল কি না তা নিয়ে ইমাম শাফি'ই-র যথেষ্ট সংশয় ছিল। তবে, অল্প যে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইজমা' হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে জানা গেছে—তাঁর মতে সেগুলোকে অবশ্যই ইসলামি আইনের তৃতীয় প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৪. সহাবিদের ব্যক্তিগত মত
ইমাম শাফি'ই সহাবিদের ব্যক্তিগত মতামতকে এই শর্তে গ্রহণ করছেন যে, সেগুলো পরস্পরবিরোধী হতে পারবে না। কোনো আইনগত বিষয়ে সহাবিগণের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে ইমাম আবু হানীফাহর মতো তিনিও মূল উৎস কুর'আন ও সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী মতকে বেছে নিয়ে বাকিগুলোকে পরিত্যাগ করতেন।
৫. কিয়াস ইমাম শাফি'ঈ-র মতে, উল্লিখিত উৎসগুলো থেকে আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিয়াস একটি বৈধ পদ্ধতি। তবে, তিনি এটিকে গুরুত্বের ক্রমধারায় শেষের দিকে স্থান দিয়েছেন। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত মতকে তিনি সাহাবিগণের মতামতের চেয়ে সবসময় কম গুরুত্ব দিতেন।
৬. ইসতিস্হাব ইমাম শাফি'ঈ ইমাম আবু হানীফাহ ইসতিহসান ও ইমাম মালিকের ইসতিসলাহ্—উভয় নীতিকেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। এগুলোকে তিনি এক প্রকার বিদ'আত মনে করতেন। তাঁর মতে, এগুলো এমন সব ক্ষেত্রে মানবীয় বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ যেখানে পূর্ব থেকেই ওয়াহয়ির আইন বিদ্যমান। তবে, একই রকম সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ইমাম শাফি'ঈ ইসতিহসান ও ইসতিসলাহ্-এর মতোই একটি নীতি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি এ নীতির নাম দিয়েছেন ইসতিসহাব। [১৮] আক্ষরিকভাবে ইসতিসহাব-এর অর্থ হলো সংযোগ খুঁজে বের করা। কিন্তু, আইনের পরিভাষায় এ শব্দটি দ্বারা পূর্বের কোনো পরিস্থিতির সাথে নতুন পরিস্থিতির সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে ফিকহি আইন বের করে আনার পদ্ধতিকে বোঝায়। এ নীতিটির ভিত্তি হলো, কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য আইন ততক্ষণই বহাল থাকবে, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি কোনো ব্যক্তির দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তার জীবিত বা মৃত হওয়া নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাহলে ইসতিসহাব নীতি অনুযায়ী, সে নিশ্চিতরূপে জীবিত থাকলে যেসকল নিয়মকানুন প্রযোজ্য হতো সেগুলোর সবকিছুই বলবৎ থাকবে।
শাফি'ই মাযহাবের প্রধান ছাত্র
যে সকল ছাত্র আজীবন ইমাম শাফি'ই-র মাযহাব অনুসরণ করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হলেন, ইমাম আল-মুযানি, আর-রাবী' ও ইউসুফ ইব্ন ইয়াহইয়া প্রমুখ।
ইমাম আল-মুযানি (১৭৫-২৬২ হিজরি; ৭৯১-৮৭৬ সাল) তাঁর পুরো নাম হলো ইসমা'ঈল ইব্ন ইয়াহ্ইয়া আল-মুযানি। ইমাম শাফি'ই-র মিশরে অবস্থানকালের পুরো সময় জুড়ে আল-মুযানি তাঁর সঙ্গী ছিলেন। তিনি শাফি'ই ফিক্হের উপর একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করার কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন। পরবর্তীকালে মুখতাসার আল-মুযানি শিরোনামে তিনি গ্রন্থটিকে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করেন। তাঁর রচিত এই গ্রন্থটিই পরবর্তীকালে শাফি'ই মাযহাবের সর্বাধিক পঠিত ফিক্হ গ্রন্থে পরিণত হয়।
আর-রাবী' মারাদি (১৭৪-২৫৯ হিজরি; ৭৯০-৮৭৩ সাল) আর-রাবী' মারাদি ইমাম শাফি'ই-র গ্রন্থ আল-উম্ম-এর প্রধান বর্ণনাকারী হিসেবে খ্যাত। তিনি আর-রিসালাহ ও অন্যান্য গ্রন্থের পাশাপাশি ইমাম শাফি'ই-র জীবদ্দশায় উক্ত গ্রন্থটির সংকলন সম্পন্ন করেন।
ইউসুফ ইবন ইয়াহ্ইয়া বুয়াইতি ইউসুফ ইব্ন ইয়াহ্ইয়া শাফি'ই মাযহাবের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ইমাম শাফি'ই-র স্থলাভিষিক্ত হন। সে সময়ে কুর'আন আল্লাহর সৃষ্টি বা সৃষ্ট বস্তু—মু'তাযিলি এই দর্শনকে রাষ্ট্র সমর্থন প্রদান করে। কিন্তু এ ভ্রান্ত দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে এই বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞকে বন্দি অবস্থায় নির্মম নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়। ১৯৷
শাফি'ই মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ শাফি'ই মাযহাবের অনুসারীবৃন্দের বেশিরভাগই বসবাস করেন মিশর, দক্ষিণ আরব (ইয়েমেন, হাদরামাওত), শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, পূর্ব আফ্রিকা (কেনিয়া, তানজানিয়া) ও দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনামে।
টিকাঃ
[১৬] আল-মাদখাল, পৃ. ১৯২।
[১৭] তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হানবালি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ ইবন হানবাল ও আবু সাওর মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু সাওর।
[১৮] আল-মাদখাল, পৃ. ১৯৫-১৯৬।
[১৯] বোযিনা গাজানী স্প্রেফেস্কা (Bozena Gajanee Stryzewska), তারীখ আত-তাশরী' আল-ইসলামি, (বৈরুত, লেবানন, দাঁর আল-আঁফাঁক আল-জাদীদাহ), প্রথম সংস্করণ, ১৯৮০, পৃ. ১৭৫-১৭৬।
📄 হানবালি মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ (১৬৪-২৪১ হিজরি; ৭৭৮-৮৫৫ সাল)
এ মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল আশ-শায়বানির নামানুসারে। তিনি ১৬১ হিজরিতে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীস মুখস্থকারী ও বর্ণনাকারী। ইমাম আবু হানীফা বিখ্যাত ছাত্র আবু ইউসুফের অধীনে হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন তিনি। এছাড়াও ইমাম শাফি'ই-র নিজ তত্ত্বাবধানে ফিক্হ ও হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
তাঁর সমকালীন খলীফাগণ অনেক মু'তাযিলি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। এ ভ্রান্ত আকীদাহ বিরোধিতার কারণে ইমাম আহমাদকে অনেক নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে হয়। কুর'আঁনকে সৃষ্টি করা হয়েছে—ভ্রান্ত এই দার্শনিক চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে খলীফা আল-মা'মূনের (শাসনকাল ১৯৭-২২৭ হিজরি; ৮১৩-৮৪২ সাল) নির্দেশে তিনি কারারুদ্ধ হয়ে দুবছর নির্যাতিত হন। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি পুনরায় বাগদাদে পাঠদান করতে থাকেন। আল-ওয়াসিক শাসনভার হাতে নেওয়ার পর (শাসনকাল ২২৭-২৩১ হিজরি; ৮৪২-৮৪৬ সাল) পুনরায় তাঁর উপর নির্যাতন আরম্ভ হয়। ফলে, ইমাম আহমাদ পাঠদান বন্ধ করে দেন এবং পরবর্তী খলীফা মুতাওয়াক্কিলের (শাসনকাল ২৩২-২৪৭ হিজরি; ৮৪৭-৮৬১ সাল) ক্ষমতা লাভের আগ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর তিনি আত্মগোপনে থাকেন। খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিল মু'তাযিলি বিশেষজ্ঞদের বহিষ্কার করে সরকারিভাবে তাঁদের দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে তাঁর উপর এ নির্মম নির্যাতনের অবসান ঘটে। ইমাম আহমাদ ২৪১ হিজরিতে (৮৫৫ সাল) ইন্তেকাল করার পূর্ব পর্যন্ত নিয়মিতভাবে বাগদাদে তাঁর পাঠদান অব্যাহত রাখেন।[২০]
হানবালি মাযহাবের গঠন
ইমাম আহমাদের মূল লক্ষ্য ছিল হাদীস সংগ্রহ, বর্ণনা ও তার ব্যাখ্যা প্রদান করা। তিনি ত্রিশ হাজারেরও বেশি হাদীসের একটি বিশাল সংকলন প্রস্তুত করেন যা মুসনাদ আহমাদ নামে পরিচিত। এ গ্রন্থ থেকে হাদীস বর্ণনা করাই ছিল তাঁর প্রধান শিক্ষাপদ্ধতি। পাশাপাশি তিনি সেসব হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সহাবিগণের বিভিন্ন মতামতও পর্যালোচনা করতেন। তারপর তিনি হাদীস কিংবা সিদ্ধান্তগুলোকে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করতেন। কোনো সমস্যা সমাধানে প্রাসঙ্গিক হাদীস কিংবা সহাবিদের কোনো মত পাওয়া না গেলেই কেবল তিনি নিজের মত প্রকাশ করতেন। সেক্ষেত্রেও তিনি ছাত্রদের তাঁর ব্যক্তিগত মত লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করতেন। ফলে, তাঁর মাযহাব তাঁর নিজ ছাত্রদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়নি; বরং সংরক্ষিত হয়েছে তাঁর ছাত্রদের ছাত্রদের মাধ্যমে।
হানবালি মাযহাবে আইনের উৎস ১. আল-কুর'আন পূর্বসূরী ইমামদের মতোই ইমাম আহমাদ ইবন হানবালের কাছেও মহা গ্রন্থ আল কুর'আন হলো আইনের প্রথম ও প্রশ্নাতীত উৎস। অন্য কথায়, তাঁর মাযহাবে সর্বক্ষেত্রে কুর'আনকে অন্য সবকিছুর উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
২. আস-সুন্নাহ আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মৌলিক উৎসগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নাবি -এর সুন্নাহ। হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর একমাত্র শর্ত ছিল যে, হাদীসটি মারফু' বা স্বয়ং নাবি থেকে বর্ণিত হতে হবে।
৩. সহাবিগণের ইজমা' ইমাম আহমাদ সহাবিগণের মতৈক্যকে আইনের মৌলিক উৎসগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থানে রেখেছেন। তবে, তিনি সহাবিগণের যুগের পর ইজমা'র দাবিকে ভুল বলেছেন। কারণ, পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই তাঁর মতে, সহাবিগণের যুগের পর কোনো বিষয়ে সত্যিকার অর্থে ইজমা' সংঘটিত হওয়া অসম্ভব।
৪. সহাবিদের ব্যক্তিগত মত কোন বিষয়ে সহাবিগণের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলে ইমাম মালিকের ন্যায় ইমাম আহমাদও সেসব মতের প্রত্যেকটিকে গুরুত্ব দিতেন। তাই এ মাযহাবের মধ্যে একই সমস্যার বহুমুখী সমাধান দেওয়ার ধারা পরিলক্ষিত হয়।
৫. দু'ঈফ হাদীস (দুর্বল হাদীস) কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে পূর্বের চারটি উৎসের কোথাও কোনো সমাধান না পাওয়া গেলে, ইমাম আহমাদ নিজস্ব কিয়াস ব্যবহারের চেয়ে একটি দুর্বল হাদীসের ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতেন। তবে, তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে, হাদীসটির দুর্বলতা বর্ণনাকারী ফাসিক্ (পাপাচারী) কিংবা কায্যাব (মিথ্যুক) হওয়ার কারণে হতে পারবে না।
৬. কিয়াস উল্লিখিত মূলনীতিগুলোর কোনটিই সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে সর্বশেষ উপায় হিসেবে ইমাম আহমাদ অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিয়াসের নীতি প্রয়োগ করতেন। পূর্বোক্ত মূলনীতিগুলোর মধ্য থেকে এক বা একাধিক মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি কিয়াসের মাধ্যমে একটি সমাধান বের করার চেষ্টা করতেন। ২১।
হানবালি মাযহাবের প্রধান ছাত্রবৃন্দ
ইমাম আহমাদের প্রধান ছাত্র ছিলেন তাঁর দুই পুত্র: সালিহ্ (মৃত্যু ২৬৫ হিজরি; ৮৭৩ সাল) ও 'আবদুল্লাহ (মৃত্যু ২৯০ হিজরি; ৯০৩ সাল)। তাঁর তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেছিলেন এমন বিখ্যাত হাদীস বিশারদের অন্যতম ছিলেন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থগুলোর সংকলকদ্বয় ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম। ২২।
হানবালি মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ
এ মাযহাবের অধিকাংশ অনুসারীই বসবাস করে ফিলিস্তিন ও সাউদি আরবে। মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেলেও সাউদি আরবে এ মাযহাবটি বেশ প্রভাব বিস্তার করে আছে। কারণ, সংস্কারবাদী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবন 'আবদুল-ওয়াহহাব হানবালি মাযহাবের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করেছেন, ফলে এটি অঘোষিতভাবে তার আন্দোলনের মাযহাবে পরিণত হয়। 'আবদুল-'আযীয ইবন সা'উদ আরব উপদ্বীপের বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে সাউদি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার পর তিনি হানবালি মাযহাবকে রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিণত করেন।
টিকাঃ
[২০] আল-মাদখাল, পৃ. ২০০।
[২১] আল-মাদখাল, পৃ. ২০২-২০৩।
[২২] তারীখ আল-মাজাহিব আল-ইসলামিয়্যাহ, খন্ড ২, পৃ. ৩৩৯-৩৪০।
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ (১৬৪-২৪১ হিজরি; ৭৭৮-৮৫৫ সাল)
এ মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল আশ-শায়বানির নামানুসারে। তিনি ১৬১ হিজরিতে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীস মুখস্থকারী ও বর্ণনাকারী। ইমাম আবু হানীফা বিখ্যাত ছাত্র আবু ইউসুফের অধীনে হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন তিনি। এছাড়াও ইমাম শাফি'ই-র নিজ তত্ত্বাবধানে ফিক্হ ও হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
তাঁর সমকালীন খলীফাগণ অনেক মু'তাযিলি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। এ ভ্রান্ত আকীদাহ বিরোধিতার কারণে ইমাম আহমাদকে অনেক নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে হয়। কুর'আঁনকে সৃষ্টি করা হয়েছে—ভ্রান্ত এই দার্শনিক চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে খলীফা আল-মা'মূনের (শাসনকাল ১৯৭-২২৭ হিজরি; ৮১৩-৮৪২ সাল) নির্দেশে তিনি কারারুদ্ধ হয়ে দুবছর নির্যাতিত হন। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি পুনরায় বাগদাদে পাঠদান করতে থাকেন। আল-ওয়াসিক শাসনভার হাতে নেওয়ার পর (শাসনকাল ২২৭-২৩১ হিজরি; ৮৪২-৮৪৬ সাল) পুনরায় তাঁর উপর নির্যাতন আরম্ভ হয়। ফলে, ইমাম আহমাদ পাঠদান বন্ধ করে দেন এবং পরবর্তী খলীফা মুতাওয়াক্কিলের (শাসনকাল ২৩২-২৪৭ হিজরি; ৮৪৭-৮৬১ সাল) ক্ষমতা লাভের আগ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর তিনি আত্মগোপনে থাকেন। খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিল মু'তাযিলি বিশেষজ্ঞদের বহিষ্কার করে সরকারিভাবে তাঁদের দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে তাঁর উপর এ নির্মম নির্যাতনের অবসান ঘটে। ইমাম আহমাদ ২৪১ হিজরিতে (৮৫৫ সাল) ইন্তেকাল করার পূর্ব পর্যন্ত নিয়মিতভাবে বাগদাদে তাঁর পাঠদান অব্যাহত রাখেন।[২০]
হানবালি মাযহাবের গঠন
ইমাম আহমাদের মূল লক্ষ্য ছিল হাদীস সংগ্রহ, বর্ণনা ও তার ব্যাখ্যা প্রদান করা। তিনি ত্রিশ হাজারেরও বেশি হাদীসের একটি বিশাল সংকলন প্রস্তুত করেন যা মুসনাদ আহমাদ নামে পরিচিত। এ গ্রন্থ থেকে হাদীস বর্ণনা করাই ছিল তাঁর প্রধান শিক্ষাপদ্ধতি। পাশাপাশি তিনি সেসব হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সহাবিগণের বিভিন্ন মতামতও পর্যালোচনা করতেন। তারপর তিনি হাদীস কিংবা সিদ্ধান্তগুলোকে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করতেন। কোনো সমস্যা সমাধানে প্রাসঙ্গিক হাদীস কিংবা সহাবিদের কোনো মত পাওয়া না গেলেই কেবল তিনি নিজের মত প্রকাশ করতেন। সেক্ষেত্রেও তিনি ছাত্রদের তাঁর ব্যক্তিগত মত লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করতেন। ফলে, তাঁর মাযহাব তাঁর নিজ ছাত্রদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়নি; বরং সংরক্ষিত হয়েছে তাঁর ছাত্রদের ছাত্রদের মাধ্যমে।
হানবালি মাযহাবে আইনের উৎস ১. আল-কুর'আন পূর্বসূরী ইমামদের মতোই ইমাম আহমাদ ইবন হানবালের কাছেও মহা গ্রন্থ আল কুর'আন হলো আইনের প্রথম ও প্রশ্নাতীত উৎস। অন্য কথায়, তাঁর মাযহাবে সর্বক্ষেত্রে কুর'আনকে অন্য সবকিছুর উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
২. আস-সুন্নাহ আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মৌলিক উৎসগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নাবি -এর সুন্নাহ। হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর একমাত্র শর্ত ছিল যে, হাদীসটি মারফু' বা স্বয়ং নাবি থেকে বর্ণিত হতে হবে।
৩. সহাবিগণের ইজমা' ইমাম আহমাদ সহাবিগণের মতৈক্যকে আইনের মৌলিক উৎসগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থানে রেখেছেন। তবে, তিনি সহাবিগণের যুগের পর ইজমা'র দাবিকে ভুল বলেছেন। কারণ, পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই তাঁর মতে, সহাবিগণের যুগের পর কোনো বিষয়ে সত্যিকার অর্থে ইজমা' সংঘটিত হওয়া অসম্ভব।
৪. সহাবিদের ব্যক্তিগত মত কোন বিষয়ে সহাবিগণের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলে ইমাম মালিকের ন্যায় ইমাম আহমাদও সেসব মতের প্রত্যেকটিকে গুরুত্ব দিতেন। তাই এ মাযহাবের মধ্যে একই সমস্যার বহুমুখী সমাধান দেওয়ার ধারা পরিলক্ষিত হয়।
৫. দু'ঈফ হাদীস (দুর্বল হাদীস) কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে পূর্বের চারটি উৎসের কোথাও কোনো সমাধান না পাওয়া গেলে, ইমাম আহমাদ নিজস্ব কিয়াস ব্যবহারের চেয়ে একটি দুর্বল হাদীসের ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতেন। তবে, তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে, হাদীসটির দুর্বলতা বর্ণনাকারী ফাসিক্ (পাপাচারী) কিংবা কায্যাব (মিথ্যুক) হওয়ার কারণে হতে পারবে না।
৬. কিয়াস উল্লিখিত মূলনীতিগুলোর কোনটিই সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে সর্বশেষ উপায় হিসেবে ইমাম আহমাদ অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিয়াসের নীতি প্রয়োগ করতেন। পূর্বোক্ত মূলনীতিগুলোর মধ্য থেকে এক বা একাধিক মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি কিয়াসের মাধ্যমে একটি সমাধান বের করার চেষ্টা করতেন। ২১।
হানবালি মাযহাবের প্রধান ছাত্রবৃন্দ
ইমাম আহমাদের প্রধান ছাত্র ছিলেন তাঁর দুই পুত্র: সালিহ্ (মৃত্যু ২৬৫ হিজরি; ৮৭৩ সাল) ও 'আবদুল্লাহ (মৃত্যু ২৯০ হিজরি; ৯০৩ সাল)। তাঁর তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেছিলেন এমন বিখ্যাত হাদীস বিশারদের অন্যতম ছিলেন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থগুলোর সংকলকদ্বয় ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম। ২২।
হানবালি মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ
এ মাযহাবের অধিকাংশ অনুসারীই বসবাস করে ফিলিস্তিন ও সাউদি আরবে। মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেলেও সাউদি আরবে এ মাযহাবটি বেশ প্রভাব বিস্তার করে আছে। কারণ, সংস্কারবাদী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবন 'আবদুল-ওয়াহহাব হানবালি মাযহাবের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করেছেন, ফলে এটি অঘোষিতভাবে তার আন্দোলনের মাযহাবে পরিণত হয়। 'আবদুল-'আযীয ইবন সা'উদ আরব উপদ্বীপের বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে সাউদি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার পর তিনি হানবালি মাযহাবকে রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিণত করেন।
টিকাঃ
[২০] আল-মাদখাল, পৃ. ২০০।
[২১] আল-মাদখাল, পৃ. ২০২-২০৩।
[২২] তারীখ আল-মাজাহিব আল-ইসলামিয়্যাহ, খন্ড ২, পৃ. ৩৩৯-৩৪০।